মেয়েটিকে ছুঁয়ে দিয়েছিল বহুবার

এইচ বি রিতা

একটা জীবন হয়ত এভাবেই চেপে চেপে কেটে যায়। জন্মের চিৎকারের পর হঠাৎ নিস্তব্ধতা চলে আসে। ভেঙ্গে দেয় মন, আত্মবিশ্বাস, নিয়ম-শৃঙ্খলা। শুধু নৈঃশব্দে থেকে যায় অপ্রকাশিত ঘটনাগুলো। খন্ড খন্ড ঘটনায় মন অবসন্ন হয়, তবু হেসে যেতে হয় বানোয়াট প্রলাপে। এটাই তো জীবন, অপ্রকাশিত গল্প নিয়ে যার সহবাস।

তৃতীয় শ্রেণিতে পড়া মেয়েটি সেদিন দৌড়ে বাড়ি ফিরে এসে একদম চুপটি মেরে গিয়েছিল। ভয়ে মা’কে কিছু বলতে পারেনি। অবশ্য বয়সটাও এমন ছিল যে, কি ঘটেছিল বা কেন ঘটেছিল, সেটা বুঝার মত অবস্থা ছিলনা তার।

মা তাকে পাশের বাড়ি পাঠিয়েছিল কিছু একটা আনতে। কি আনতে পাঠিয়েছিল, আজ ঠিক তার মনে পড়ছে না। তবে মনে আছে, পাশের বাড়িতে ঢুকার কোন গেইট ছিল না। দরজাটা খোলা ছিল। যখনই যে বাড়ির ভিতর ঢুকলো, কাউকে দেখতে পেল না। ভাবলো ফিরে যাই। গা ফিরাতেই টের পেল, পিছন থেকে সেই বাড়ির এক ছেলে গায়ের সাথে গা লেগে দাঁড়িয়ে আছে। মেয়েটি ঘুরতে গিয়ে তার গায়ের সাথে গা ঘষা লেগে গেল। কিছু বুঝে উঠার আগেই ছেলেটি সামনের দিকে ঠেলে তাকে আরো চেপে ধরতে চাইলো।  অবুঝ শিশুটি সেদিন ছেলেটির শরীরের তাপ বুঝতে না পারলেও, নারীত্বের দাবীতে বুঝতে পেরেছিল, ভাল কিছু হয়নি।

শিশু বয়সেও মেয়েটির শারীরিক গঠন ছিল নজর কাড়ার মত। সেই শরীর নজর এড়াতে পারেনি তার এক দূরসম্পর্কের নানার কাছ থেকেও। ফ্রগ পরা মেয়েটি রাস্তা দিয়ে হেঁটে যাচ্ছিলো। বৃদ্ধ নানা হঠাৎ এসে মেয়েটির কাঁধে দুই হাত দিয়ে চেপে ধরে। নরম তুলতুলে শরীরটা ছুঁয়ে দিতে দিতে বলে, “ওরে শালি তুই তো বড় হয়েছিস। তোরে তো আমার বউ বানাতে হবে।”

শুরুতে সে ভেবেছিল, হয়তো ইয়ার্কি করছে। কিন্তু পরক্ষণেই টের পেল বৃদ্ধ লোকটার আঙুলগুলো ফিতাকৃমির মত শরীরের নানান দিকে স্পর্শ করছে। স্তন যুগলের দিকে ধেয়ে আসছে। সেই স্পর্শের ধরণ তার কাছে অস্বাভাবিক মনে হতেই নিজেকেই ছাড়াতে চেষ্টা করলো। কিন্তু যখন ব্যর্থ হল, তখন বৃদ্ধকে হাতে কামড় দিয়ে দৌড়ে বাড়ি চলে এলো।

এসব কথা সবই সে তার মা’কে জানাতো। কিন্তু আজ থেকে ২০ বছর আগে উত্তরবঙ্গের রংপুর গ্রামাঞ্চলগুলোতে কোন শিশুর মুখে শোনা এইসব গল্পগুলোকে কেবল, লজ্জা ভেবেই মুখ চেপে রাখা হতো।

মেয়েটির বয়স তখন নয় কি দশ। বাবার সাথে একদিন বাজারে গেল। কিন্তু ফিরতে রাত হয়ে গেল। অন্ধকারে বাবার হাত ধরে হাঁটছিল। কেউ একজন আচমকা, সদ্য বেড়ে উঠতে থাকা স্তনটাকে ছুঁয়ে পাশ কাটিয়ে চলে গেল।  সে তখন বুঝতে শিখেছে। পানিতে চোখ ভরে উঠলো ক্ষোভে। তবু, পিতাকে বলতে পারল না সে কথা।

শুধু কি তাই, সেই শিশু বয়সে কোন এক প্রতিবেশী মহিলা একদিন তার স্তনগুলো চেপে ধরে বলেছিল, “উফ্ফ! এগুলি তো বেশ বড় হয়েছে।” লজ্জা ভয় দুটোই তাকে সেদিন আতঙ্কিত করেছিল। নোংরামির শেষ কোথায়? সে জানতো না। সারাক্ষন ভয়ে থাকতো, কখন কে ছুঁয়ে দিবে!

বয়স তখন তার তেরো। কিশোরী বয়সে পা বাড়লো। দোকানে গেয়েছিল তেল-নুন আনতে। দোকানির ছেলেকে খরচ দিল। কিন্তু ছেলে বলল, ভাঙ্গতি টাকা নাই, বাড়িতে আছে, চলো বাড়ি গিয়ে বাকি টাকাটা দেই। পাশাপাশি বাড়ি বলে সেও গেল। বাড়িতে এনেই ছেলেটি বার বার তাকে খুপটি ঘরের ভিতর যেতে জোর করতে লাগলো। ছেলেটির চোখের ইঙ্গিত বুঝার মত বয়স তার তখন কিছুটা হয়েছিল। তাই হয়তো সে যাত্রায় সে বেঁচে গিয়েছিল। সে দৌড়ে বাড়ি চলে এলো।

বাড়ি এসে মাকে জানালো। সান্তনা দিয়ে মা বলেছিল সেদিন, “ভাল করেছিস, ছেলেটার মতলব ভাল ছিল না। আর যাবি না কেউ ডাকলে।”
নারী শরীরের সংজ্ঞা না জানা অবুঝ মেয়েটি ভাবতে লাগলো, কি আছে এ শরীরে? কেন তারা এত ছুঁয়ে দিতে চায়?  বলেছিল, “মা। সবাই কেন শরীর-স্তনগুলো ছুঁয়ে দিতে চায়?  অসহায়ত্ব নিয়ে মা তাকিয়েছিল মেয়েটির দিকে। বলেছিল, “মেয়ে বলে।”

মেয়ে হয়ে জন্মাবার অপরাধবোধ তার শৈশব-কৈশোরকালকে বড় পীড়া দিত।

দিন চলে যায়, ঘটনা থেকে যায়। আজ, এখন সেই শিশুটি এক সন্তানের মা। সুন্দর সুখী একটা পরিবার তার। তবু, সেই সব শৈশবের ঘটনাগুলো তাকে মানসিক ভাবে প্রায়ই পীড়া দিয়ে যায়। আজও তার সেই মানুষগুলোর সাথে দেখা হয়। তারা হেসে কথা বলে। এদিকে রাগ, ক্রোধ, ঘৃণায় তার মুখ বিবর্ণ হয়ে উঠে। তবু, কিছু বলার থাকে না।

বিষণ্ণতায় স্বচ্ছ আকাশ মেঘে ঢেকে গেলে প্রায়শই মেয়েটা ভাবে, কেন আমার শৈশবের দিনগুলো এত কঠিন তিতকুটে! কেন নয় নির্মল, সহজ সুখগাঁথা! সে ভাবে, এই বেদনাময় অভিজ্ঞতাগুলো যদি মুছে ফেলা যেত! কিংবা চিৎকার করে যদি বলা যেত, একটি শিশুর দিকে তাদের যৌন ক্ষুদায় লালিত জিহ্বাটা কতটা হিংস্র, কতটা নোংরা ছিল!
কিছুই বলা যায়না। ঘৃণা নিয়ে শুধু অশ্রুপাত ছাড়া।

শিশু থেকে মেয়েটা আজ নারী। সে ভাবে,

আমাদের শৈশবকালটা কেন এমন অনিরাপদ, অসন্তুষজনক? কেন সুযোগ পেলেই একটা শিশুর শরীরটা ছুঁয়ে দিতে হবে? আমাদের বদলাতে হবে। পরিবর্তন ঘটাতে হবে।

সে আজ তার ছেলে সন্তানের শিক্ষক হতে চায়। সে ভাবে,

এই ছেলে শিশুটিও একদিন পুরুষ হবে। তারও শরীরের ক্ষুধা জাগবে। কিন্তু এ সন্তান দ্বারা যেন কোনদিন তার মায়ের মতই কোন নারীকে যৌন হয়রানির শিকার হতে না হয়, তাই নিয়ে সন্তানকে মানবিক, ধর্মীয়, নৈতিক মূল্যবোধ গঠনে শিক্ষা দেবার আপ্রাণ চেষ্টা তার।

লেখকঃ যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসী সাহিত্যিক, সাংবাদিক ও শিক্ষক

আরও পড়ুন