মা থেকে শাশুড়ি

মনসুর আলম

যেহেতু আমি নিজে একজন পুরুষ তাই আগে পুরুষদের উদ্দেশ্যে বলি-বউয়ের হাতের রান্না খেতে খারাপ হলে বিচলিত হবার কিছু নেই – আপনি যেমন এতদিন মায়ের হাতের রান্না খেয়েছেন, সেও তার মায়ের হাতের রান্না খেয়ে এসেছে। ধৈর্য্য ধরে উৎসাহ দিন, কিছুদিন পর দেখবেন তার হাতের রান্নাই অমৃত মনে হচ্ছে।

ভুলেও মায়ের হাতের রান্নার সাথে বউয়ের রান্নার তুলনা করবেন না। আমাদের মা’ও একদিন নতুন বউ হয়েই এসেছিলেন। তরকারিতে হলুদ বেশি, লবণ কম হলে বুঝে নিবেন সব ঠিক আছে – উল্টোটা হলে সাবধান হতে হবে।খাবার মুখে দেবার আগেই প্রশংসা শুরু করুন, রং আর ঘ্রাণ দিয়ে।রান্নার বিষয়টি এক‌টি রূপক উদাহরণ মাত্র, প্রতিটি ক্ষেত্রে একই দৃষ্টিভঙ্গি লালন করুন।

এবার নারীদের উদ্দেশ্যে বলছি-সবচেয়ে জরুরী বিষয় হচ্ছে- বাবা, ভাই, স্বামী, ছেলের পরেও তাঁদের এক‌টি সাধারণ চরিত্র আছে; সেটি হচ্ছে ‘পুরুষ’। ছেলেদের যেমন ‘পুরুষ’ হয়ে উঠাতে স্বার্থকতা …

এদিকে মা,বোন,স্ত্রী,মেয়ের পরেও তাঁদের এক‌টি সাধারণ চরিত্র হচ্ছে ‘নারী’! মেয়েদের ঠিক তেমনি ‘নারী ‘হয়ে উঠাতেই স্বার্থকতা। রমনী ‘নারী’ হয়ে উঠতে পারলেই স্বার্থক। তাই ফোকাস সেট করুন সেদিকে।

শাশুড়ীকে ‘মা’ হিসেবে দেখার চেষ্টা করবেন না। শাশুড়ীকে ‘শাশুড়ী’ হিসেবেই দেখুন, সেই অনুযায়ী আচরণ করার চেষ্টা করুন। মনে রাখা ভালো আপনিও একদিন শাশুড়ী হবেন। আপনার ছেলের বউয়ের কাছ থেকে যে ধরনের আচরণ আশা করেন সেই আচরণ নিজে করুন; এটি আপনার জন্য রাজ্যের রাণী হয়ে উঠার প্রথম ধাপ।

ভুলেও এটা ভাববেন না যে, আপনার বাপ, ভাই ভরণপোষণ করতে পারবে না বলে আপনাকে বিয়ে দিয়েছে, তাই নির্যাতন মেনে নিতে হবে। বরং এটা ভাবুন বিয়ে এক‌টি সামাজিক, স্বাভাবিক প্রথা। আপনাকে নির্যাতিত হতে কিংবা নির্যাতন করতে পাঠানো হয়নি; আপনাকে বিকশিত হতে পাঠানো হয়েছে – নিজের বিকাশে মনোনিবেশ করুন। এই পৃথিবীর সুস্থতা নির্ভর করছে আপনার প্রজ্ঞার উপর।

অধিকার এবং দায়ীত্ব দুটোকেই সমান গুরুত্ব দিন। স্বামীর মা, বাবা, ভাই, বোনদেরকে যদি আন্তরিকভাবে নিতে না পারেন, অন্ততঃ খারাপ আচরণ করবেন না। তাঁদেরকে আপনার অনাগত সন্তানের দাদা, দাদী, চাচা, ফুফু হিসেবে দেখুন; আপনার সন্তানের সুস্থ পরিচর্যা, বেড়ে উঠার জন্য তাঁদের ভূমিকা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। পরিবারের সকল সদস্যদেরকে বিমুখ করে শুধু স্বামীকে নিয়ে ব্যস্ত হবেন না; এই স্বামীই আপনার একাকীত্বের সুযোগ নিবে। যে স্বামী আপনার অন্যায়কে প্রশ্রয় দেয় সে যে আপনার উপর অন্যায়ের প্রশ্রয় দিবে না সেই গ্যারান্টি কোথায়? সে নিজেও অত্যাচারী হয়ে উঠতে পারে – কাজেই তামাশা দেখার মত দর্শক তৈরি করবেন না।

যৌথ পরিবার মন থেকে গ্রহণ করতে না পারলে বিয়ের আগেই সেটা স্পষ্ট করে জানিয়ে দিন, বিয়ের পরে নাটক করবেন না। নিজের বাপ, ভাইকে যা বলতে পারেননি, অন্যের বাপ, ভাইকে তা বলার মত বোকামি করবেন না।

কোন অন্যায়ের প্রতিবাদ করলে ছেলের বউ হিসেবে কথা বলবেন না। সংসারের সদস্য হিসেবে কথা বলুন, নিজে আগে নিজেকে স্বিকৃতি দিন, বাকীটা সময়ে হয়ে যাবে। নিজের মধ্যে সংসারের প্রধানমন্ত্রীর যোগ্যতা দেখুন, বিরোধী নেত্রীর নয়।

শাশুড়িদেরক একটি প্রশ্ন করি – আপনার ছেলেটিকে বিয়ে দিয়ে পুত্রবধূ ঘরে এনেছেন; আপনার ছেলে আপনার ঘরেই রইলো, ভাই/বোন সব ঠিক থাকলো, বাড়তি শুধু যোগ হলো আপনার ছেলের বউ। আপনার ছেলের ছোট্ট এক‌টি হিস্যা পেলো সে। আপনার ছেলেকে আপনি শুধু পুত্রবধূর সাথে শেয়ার করছেন।

অপরদিকে সেই পুত্রবধূ তার স্বামীকে শেয়ার করছে শ্বশুর, শাশুড়ি, দেবর, ননদ সবার সাথে। তার আত্মত্যাগের সামনে আপনার ছেলের একটি অংশ ছেড়ে দেওয়া কিছুই না।

আপনার কি মনে হয় শুধুমাত্র বিছানা শেয়ার করার জন্য সে তার গোটা চেনা জগৎ ছেড়ে আপনার ছেলের হাত ধরে চলে এসেছে? মোটেই নয়; সে এসেছে রাজত্ব কায়েম করতে যেমনটি আপনি করে এসেছেন। সে যদি নিজেকে অধিষ্ঠিত করতে না পারে আপনি অবসরে যাবেন কী করে? ছেলেকে হারিয়ে ফেলার শঙ্কা থেকে আপনি যদি পুত্রবধূর সাথে নেতিবাচক আচরণ করেন- এতে আপনার আত্মবিশ্বাসের ঘাটতি প্রতীয়মান হয়। নিজের ছেলের উপর এতটা দুর্বল বিশ্বাস থাকলে মা হিসেবে আপনার ভূমিকা কী?

আপনার কেন মনে হয় বিয়ের পর ছেলে পর হয়ে গেছে? নিজের মেয়ের জন্য যা যা কামনা করেন পুত্রবধূকে সেগুলো পেতে দেখলে আপনি ঈর্ষান্বিত হবেন কেন? নিজের ছেলেকে রোমান্টিক দেখতে পারলে আপনারতো তৃপ্তি পাবার কথা, ছেলে এবং ছেলের বউয়ের মধ্যে সুসম্পর্ক থাকলে আপনারতো নির্ভার থাকার কথা। তাহলে কি ছেলে এবং মেয়ের মধ্যে আপনার ভালোবাসার রকমফের আছে? পুত্রবধূকে আপনি প্রতিদ্বন্দ্বী ভাববেন কেন? বরং হাতে-কলমে শিক্ষা দিয়ে ঝানু প্রধানমন্ত্রী হিসেবে গড়ে তুলুন। এই মেয়েই আপনাকে নাতি/নাতনী উপহার দিবে, আপনার ছেলেকে সামলে রাখবে যেমনটি আপনি রেখেছেন আপনার স্বামীকে।

বিয়ের পরপরই কিছু ছেলেদেরকে এই বদনাম মাথায় নিতে হয় যে ছেলে পর হয়ে গেছে, বউপাগল হয়ে গেছে। আরে ভাই স্পষ্ট করে বলো না কেন “আমি বাবা/মাকে দেখে শিখেছি। আমার বাবা যদি মায়ের জন্য পাগল হতে পারে; আমি আমার বউয়ের জন্য পাগল হবো সেটাই কি স্বাভাবিক নয়? আমার ‘মা’ যদি বাবার কাছে উপেক্ষিত হয়ে থাকে, আমি মায়ের যন্ত্রনা দেখেছি; যে কষ্ট আমার মা পেয়েছেন সেই একই কষ্ট আমার বউকে পেতে দিবো না। সে কেবলই আমার জীবনসঙ্গী নয়, সে আমার অনাগত সন্তানের মা, ভবিষ্যতের শাশুড়ি। আমার মাকে যেরকম সম্মান করি, আমার সন্তানের মাকেও সেরকম সম্মান করি। গোটা নারী জাতিকেই সম্মান করি। একজনকে সন্তুষ্ট করার জন্য আরেকজনের উপর অন্যায় করা সম্ভব নয়।”

হতভাগ্য পুরুষ, তুমি যদি ব্যক্তিত্বের সাথে ব্যালেন্স করতে না পারো তাহলে তোমার সংসারের ছন্দপতন ঘটবে। মা’কে বলে দাও, “তোমার বিকল্প ভরসাস্থল রয়েছে তোমার স্বামী, আমার বাবা। এই নারীর ভরসাস্থল একমাত্র আমি তার স্বামী। আমার কাছে ঠোকর খেলে সে যাবে কোথায়?”

তোমার স্ত্রীকে বলে দাও, “এই নারী আমার মা, তোমার শাশুড়ি। তুমি আজ যে অবস্থায় আছো তিনি সেটি পার করে এসেছেন। তিনি আজ যে অবস্থায় আছেন তুমি আগামীকাল সেই অবস্থায় যাবে। ওনার মধ্যে তুমি তোমার ভবিষ্যৎ দেখো। শ্রদ্ধা করতে না পারলেও অশ্রদ্ধা করো না। তুমি যা করবে সেটিই ফেরত পাবে। শাশুড়ি হিসেবে ভালোবাসতে না পারলেও আমার ‘মা’ হিসেবে ভালোবাসো যতটা সম্ভব।

পুরুষ হয়ে জন্মেছো, তুমি শুধু পুরুষ নও; তুমি ছেলে, স্বামী, ভাই, পিতা, প্রেমিক সবকিছু। মনে রেখো ঔদ্ধত্য প্রকাশে কোনো পৌরুষত্ব নেই – পৌরুষত্ব হচ্ছে ভালোবাসায়, দায়িত্ব পালনে, ত্যাগে, সাহসিকতায়, ন্যায়পরায়ণতায়। অন্যায় দেখলে রুখে দাঁড়াও – সে অন্যায় তোমার বোন, মা কিংবা স্ত্রী যার বিরুদ্ধেই হোক না কেন।

লেখকঃ সাহিত্যিক, কলামিস্ট এবং প্রবাসী বাংলাদেশী,সাউথ আফ্রিকা

 

আরও পড়ুন