বাংলাদেশে কি রেসিজমের চর্চা হয় না?

আদনান মাহমুদ

‘রেসিজম’ শব্দটা এখন টক অব দ্য ওয়ার্ল্ড।আমেরিকার এক কৃষ্ণাঙ্গ হত্যার ঘটনাকে কেন্দ্র করে সারা পৃথিবীতে বর্ণবাদের বিরুদ্ধে আন্দোলন শুরু হয়েছে। বাংলাদেশের অনলাইন জগত এই ইস্যুতেও গরম বেশ।

আমাদের দেশে রেসিজমের শিকার কালো মানুষেরা, বিশেষ করে কালো মেয়েরা। একুশ শতকের এই দশকেও গায়ের রং কালো হলে “মেয়েকে বিয়ে করবে কে” এই ভাবনায় কাহিল হতে হয় বাবা মায়ের। জন্মের পর থেকেই চলে মেয়েকে ফর্সা করার প্রানান্তর চেষ্টা।

বাংলাদেশের বিয়ের বাজারে ফর্সা চামড়ার চাহিদা ব্যাপক। সেটা ছেলে মেয়ে উভয়ের বেলাতেই। চামড়া কালো হলে মেয়ের বেলায় যৌতুক আর ছেলের বেলায় বিশেষ প্রনোদনা প্রস্তুত রাখতে হয়। কখনো সেটা মোহরানার মোটা অংকও হতে পারে।

সর্বত্র তথাকথিত ফর্সা মেয়ের চাহিদা। ফ্রন্ট ডেস্কে, রিসিপশনে, নাটক সিনেমায়, অনুষ্ঠান উপস্থাপনায়, সংবাদ পাঠে, বিজ্ঞাপনে, সব জায়গায়।রং ‘ফর্সা’, নয়, কেবল যোগ্যতা দিয়ে কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে পৌঁছাতে পেরেছে হয়তো কেউ কেউ। তবে সেটা কড়া প্রসাধনীতে কালো রং আড়াল করে!

আমি যদি কোন কালো মেয়েকে ভালোবাসি তাহলে বন্ধুমহলের আনলিমিটেড তিরস্কার হজম করতে হবে। আর বিয়ে করতে চাইলে সবার আগে বাঁধা আসবে পরিবার থেকেই। আমাদের এই দেশে কোন পরিবারের সবার চামড়া কালো হলেও বিয়ের বেলায় ওই পরিবার সাদা চামড়াটাই খোঁজ করে।

বস্তুত আমরা ফর্সা চামড়ার মানুষকে উন্নত জাত মনে করি। এটাকে রেসিজম বললে কি তিল পরিমান ভুল হবে??

আমাদের দেশের এই বর্ণবাদের বিরুদ্ধে কারও কোন কোন পদক্ষেপ নেই। আমরা নিরবে যেন সবাই এই রেসিজমকে লালন করি। সাহিত্যে, লেখনীতে সবাই সাদা চামড়াকেই সুন্দর হিসেবে উপস্থাপন করে। নিকট অতীতে শামছুর রহমানের ‘কালো মেয়ে’ কবিতার পরে কোন কবি সাহিত্যিক কালো রংকে মর্যাদা দিয়ে দু’লাইন লিখেছে কিনা জানা নেই আমার।

নুসরাত ইমরোজ তিশার অভিনীত “সৌন্দর্য মানেই ফর্সা নয়” শিরোনামে একটি ভিডিও দেখেছিলাম। সেখানেও পরোক্ষভাবে ফর্সা রংকেই বিশেষ মর্যাদা দেয়া হয়েছে।

আমাদের টিভি, মিডিয়া, সোশ্যাল সাইটগুলোতে চলে ফর্সা হওয়ার নানা প্রসাধনীর তুমুল প্রচার৷ “ফর্সা হওয়ার কয়েকটি উপায়, অল্প খরচে যেভাবে ফর্সা হবেন, এক সাপ্তাহেই অবিশ্বাস্য সাফল্য” ইত্যাদি হাজার রকমের এড। নানান প্রসাধনী কিনে ফর্সা হওয়ার লড়াইয়ে নামে কালো মেয়েরা। যেন ফর্সা হওয়াই পরম সাফল্য। BBC নিউজের তথ্য মতে ২০১৭ সালে বিশ্বে ফর্সা হওয়ার প্রসাধনীর বাজারের আকার ছিল ৪৮০ কোটি ডলার। যেটি দ্বিগুণ হতে পারে কয়েক বছরের মধ্যেই.।

সিনেমা নাটকের মতো বিনোদন শিল্পতেও কালো রং এর কোন ঠাঁই নেই। সেখানে কেবল ফর্সা চামড়ার উপর জোর দেওয়া হয়। কালোদেরকে খুব সূক্ষ্বভাবে মেসেজ দেয়া হচ্ছে যে এই সমাজে চলনসই হতে হলে তোমাকে ফর্সা হতেই হবে!! কালো যেন এই ভিন্ন সমাজের নিচু শ্রেনী..

বিয়ের ক্ষেত্রে মেয়ের রং কালো হলে মোটা অংকের যৌতুক অথবা দামী প্রনোদনা হাজির রাখা এই সমাজের ‘সংস্কৃতি’ হয়ে দাড়িয়েছে। অথবা বিয়ে হলেও কি মুক্তি মেলে? আমাদের সমাজে কালো মেয়েরা ভয়ংকর অবজ্ঞার পাত্র। কেবল মাত্র কালো হওয়ার কারণে বিয়ের পরেও শহরে-গ্রামে অসংখ্য নারী নির্যাতন, এবং নানা কটুক্তির শিকার। এমন শতশত নিউজ জাতীয় দৈনিক গুলোতে ছাপা হয়েছে আজ অব্দি।

আমি কয়েজন সুন্দর মানুষকে জানি, যারা কেবল কালো হবার কারণে প্রচন্ডভাবে বৈষম্যের শিকার। পরিবার থেকে কর্মস্থল এবং সর্বত্র যাদের বৈষম্য হজম করতে হয়। আমার পরিচিত একজন তার স্ত্রীকে কখনো শপিং করতে নিয়ে যায়নি, কখনো তাকে নিয়ে বাইরে ঘুরতে বের হয়নি কেবল স্ত্রীর গায়ের রং কালো তাই!! অথচ সে তার সুন্দরী ভাবী, বান্ধবীর সাথে ঠিকই শপিং থেকে ফাস্টফুড হয়ে লং ট্যুরে পর্যন্ত যায়। এমন হাজারো রেসিস্ট আছে আমাদের দেশে।

কেবল কালো হওয়ার কারণে ভালোলাগার মানুষটাকে মুখ ফুটে প্রনয়ের আবেদন জানাতে পারেনি, যদি কালো বলে অপমান করে যদি ফিরিয়ে দেয় এই ভয়ে। অথবা ফিরিয়েই দিয়েছে। এমন হাজারো গল্প আছে আমাদের আশপাশেই। এইসমস্ত ঘটনায় বুঝা যায় এই সমাজে রেসিজম কত আষ্টেপৃষ্টে জড়িয়ে আছে।

অথচ এই দেশের ভয়ংকর বর্ণবাদের বিরুদ্ধে কারো আওয়াজ নেই। কোন সামাজিক আন্দোলন নেই।

দূর দেশে কৃষ্ণাঙ্গ হত্যার ঘটনায় মানবিক চেতনা উথলে উঠলো সবার। এই চেতনা দিয়ে রেসিজম দূর করা যায় না। নিজ দেশে রেসিজম চর্চা করে দূর দেশের ঘঠনায় “ব্লাক লাইভ ম্যাটার” বলে গলা ফাটানো ডাবল স্টান্ডার্ড। অতএব মুখোশ খুলে রেখে গলা ফাটান।

আসুন সুস্থ হই, কালোকে মূল্যায়ন করি, রেসিজম কে না বলি।

লেখকঃ কলামিস্ট ও ছাত্র

 

আরও পড়ুন