একরত্তি ছায়া

মাহফুজা শিরীন

সকাল আর দুপুরের মাঝামাঝি এক সুন্দর সময়। সূর্যের তেজদীপ্ততা প্রখর হয়ে উঠেনি তখনো। যৌবনের দিকে ধাবমান কোন এক কিশোরের তেজ চাপা নম্রতার মতো সূর্য তার প্রখরতাহীন উজ্জ্বলতায় চারদিক উদ্ভাসিত করে রেখেছে। গ্রামের প্রতিটি আনাচে কানাচে সে আলো ছড়িয়ে, পুরো গ্রামের মাঠ,ঘাট, প্রান্তর সুদৃশ্যমান হয়ে আছে।

সুখানিয়া গ্রাম! গ্রামের একপ্রান্তে একটি দৃষ্টিনন্দন, ছিমছাম বাড়ি। বাড়ির একদিকে ফাঁকা। বাকি তিনদিকে ঘর। ইউ সিস্টেমের সুন্দর একটি বাড়ি। বারান্দায় গ্রিল দেয়া,উঠানের একধারে রজনীগন্ধা,হাসনাহেনা, গোলাপ গাঁদার বাগান।

বাড়ির মালিক রাহেলা বেগম। রাহেলা বেগমের তিন মেয়ে। রেখা,রানু ও রিতা। বাড়ির পরতে পরতে তার মেয়েদের যত্নের হাতের ছাপ দেখতে পাওয়া যাচ্ছে।

বাড়ির মতো আজ রাহেলা বেগমের ভাগ্যটাও বদলে গেছে। তিন মেয়ে আর মায়ের পরিশ্রমের জোরে আজ তাদের সুখ-সমৃদ্ধি সীমাহীন। বাড়িটাকেও তাই রাহেলা বেগম মেয়ের মতো করেই আগলে রাখে।

রাহেলা বেগম বাড়ির সামনের ফাঁকা অংশে এসে দাঁড়ালো। সদর দরজার সাথে প্যাঁচিয়ে বেড়ে উঠা সন্ধ্যামণি গাছটা ফুলে ফুলে নুয়ে পড়েছে। পরম মমতায় সে ফুলগুলোর দিকে তাকিয়ে থাকে।

জীবন যুদ্ধে আজ সে বিজয়ী। একটা সময় ছিলো যখন সে একাই জীবন সংগ্রামে লড়ে গিয়েছে। পরবর্তীতে মেয়েরা তার সাথে অংশ নিয়েছে।

মুহূর্তেই রাহেলা কতগুলো বছর পিছনে ফিরে গেলো।

অন্য সবার মতো বিয়ের পর বেশ সুখেই দিন কাটছিলো রাহেলার। স্বামীর ভালোবাসার কোন থৈ ছিলোনা সে দিনগুলোতে।

তার স্বামী আফজাল মিয়া ছিলো পেশায় রাজমিস্ত্রী। দূর দূরান্তে সে কাজ করতে যেতো। বিশেষ করে দূরে শহর এলাকায়। রাহেলা তাই সকাল সকাল উঠে রান্না করতো। আফজাল সকালের খাবার খেয়ে টিফিন ক্যারিয়ারে করে দুপুরের খাবারটাও নিয়ে যেতো।

প্রতিদিন কাজের শেষে আফজাল যা টাকা পেতো তা দিয়ে বাজার- সদাই এবং রাহেলার পছন্দের কোন খাবার কিনে নিয়ে আসতো।

বড় দুই মেয়ে রেখা আর রানুর জন্ম অবধি আফজালের এ ভালোবাসা বজায় ছিল। বিপত্তি বাঁধলো তৃতীয় মেয়ে রিতা জন্ম নেয়ার পর।

রাহেলা যখন তৃতীয়বার গর্ভবতী হলো আফজাল ধরেই নিয়েছিলো এবার তার ছেলে সন্তানই হবে। দুইবার হয়নি বলে কী তৃতীয়বারে হবেনা??

সে ছেলে সন্তানের আশায় রাহেলাকে নিজের সীমিত টাকা দিয়ে ভালোমন্দ কিনে খাওয়াতে লাগলো। বড় মাছের মাথা, পেটি বরাবর আফজালের জন্য নির্ধারিত থাকলেও সেই দিনগুলোতে আফজাল নিজের হাতে তুলে সেগুলো রাহেলার পাতে দিয়ে দিতো।

ছেলেই হবে এমন একটি বিশ্বাসে আফজাল রাহেলার প্রতি যত্নআত্তির কোন কমতি করতোনা। বাইরে বের হওয়ার আগে বলতো : বৌ তর লাইগা আজ কী আনুম? সেও সুন্দর করে তার পছন্দের জিলাপি, গজা বা খিলি মিষ্টি পানের বায়না ধরতো। ঐ সময়টায় তাদের আগের যে সম্পর্কের ভাঙনগুলো ছিল সেগুলোও যেন জোড়া লেগে গিয়েছিল।

ধীরে ধীরে রাহেলার সন্তান প্রসবের দিন ঘনিয়ে আসতে লাগলো। আফজাল এখন তার বৌকে আরও বেশি সময় দিতে লাগলো। সকালে দেরিতে কাজে যায় এবং সন্ধ্যায় তাড়াতাড়ি বাড়ি ফিরে আসে।

অতঃপর একদিন রাহেলার প্রসব ব্যথা উঠলো। আফজাল ব্যতিব্যস্ত হয়ে পড়লো, অতি দ্রুত যেয়ে দুই গ্রাম পর থেকে ছমিরন দাইকে ডেকে নিয়ে এসে আতুর ঘরের বাইরে দাঁড়িয়ে খুশি ও উত্তেজনায় কাঁপতে লাগলো।

কিছুক্ষণের মধ্যেই নতুন শিশুর চিৎকারে আকাশ বাতাস প্রকম্পিত হয়ে উঠলো। ছমিরন দাই একটি পুরাতন কাপড়ে জড়িয়ে বাচ্চাটিকে আফজালের কাছে নিয়ে আসলো আর হাসতে হাসতে বললো : দ্যাহ মিয়া! তোমার আরেকখান চান্দের লাহান মাইয়া অইছে। শোকর আলহামদুলিল্লাহ পড় মিয়া! মাইয়ার মাও কিন্তুক বালা আছে।

ছমিরন দাই যতই একান ওকান হাসি দিয়ে সুখবরটি প্রচার করুক না কেন আফজালের মুখে যেন এ খবরে অমাবস্যার অন্ধকার নেমে এলো। সে তাড়াতাড়ি বলে উঠলো : ও খালা! মাইয়ারে তো কোলে নিব তয় মাইয়ার লাইগা নতুন জামা কিনন লাগবোনা? খাড়াও অর লাইগা গঞ্জের মার্কেট থাইকা নতুন জামা- কাপড় কিন্যা নিয়া আহি।

এই ছিলো তার শেষ কথা। এই কথা বলে সে-ই যে গেলো আর কোনদিন সে ফিরে এলো না।

রাহেলা দিনের পর দিন তার অপেক্ষায় রইল… একদিন দুইদিন করে মাস পার হয়ে গেলেও আফজালের আর কোন দেখা পাওয়া গেলোনা।

রাহেলা বুঝে গেল আফজাল আর কখনো ফিরে আসবেনা। সে তার গর্ভে একটি ছেলে শিশু ধারণ করতে না পারায় আফজাল তাকে পরিত্যক্ত ন্যাকড়ার মতো ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে গেছে।

যখনি রাহেলা একথাটি বুঝতে পারল তখনি সে তার শিরদাঁড়া সোজা করে দাঁড়ালো। ছোট মেয়েটিকে বুকে আঁকড়ে বড় দুই মেয়েকে মাথা উঁচু করে দাঁড় করানোর জন্য আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে যেতে লাগলো।

সে কিছু হাঁস মুরগী পুষতো, ঘরের চালায়, বাড়ির আনাচে কানাচে, আশেপাশে সবজি চাষ করতো। এগুলোই তাকে দুর্দিনে মেয়েদের নিয়ে বেঁচে থাকতে সাহায্য করেছে।

সৃষ্টজীব একজন আরেকজনকে খুব সহজেই ছুঁড়ে ফেললেও সৃষ্টিকর্তা কিন্তু এত সহজে তার সৃষ্টিকে ছেড়ে যাননা। তাই হয়তো রাহেলা বরাবরের মতোই যে কাজেই হাত দেয় সে কাজেই সোনা ফলতে থাকে।

সে বিভিন্ন রকমের হাতের কাজ জানতো। আগে থেকেই তার হাতের কাজের সুনাম ছিলো এখন পরিচর্যা পেয়ে সেটা আরো ভালো হয়ে উঠতে লাগলো। ধীরে ধীরে রাহেলার কষ্টের দিনগুলো শেষ হয়ে আসতে লাগলো। তার মেয়েরাও ধীরে ধীরে বড় হতে লাগলো।

রাহেলা মেয়েদেরকে স্কুলে ভর্তি করালো। তার মেয়েরাও যেন এক একটি রত্ন। প্রতিটি ক্লাসেই আকর্ষণীয় রেজাল্ট করে উপরের ক্লাসে টপকে যেতে লাগলো।

একসময় তিন বোন পড়াশুনা শেষ করে ভালো ভালো জায়গায় নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করলো। রাহেলার সেই অবাঞ্ছিত, অবহেলিত তিন মেয়ে আজ এলাকার গর্ব, মানুষের কাছে উদাহরণ।

আজ রাহেলার সীমাহীন সুখের দিন। বাহ্যিক সুখের চেয়ে মানসিক সুখে যেন সে আজ পরিপূর্ণ।

কিছুদিন আগে রাহেলা পড়ো পড়ো মাটির ঘর ভেঙে ইট দিয়ে সুন্দর এই বসত বাড়িটি তৈরি করেছে। আর তার মেয়েরা সে বাড়িটিকে যত্ন আর ভালোবাসা দিয়ে সুষমা মণ্ডিত করেছে।

এখন তার আলয় সারাক্ষণ আলোতে জ্বলজ্বল করে, সৌরভে মৌ মৌ করে।

দূর অতীতে কোন এক আফজাল তাকে ছেলে সন্তানের মা হতে পারেনি বলে যে একরাশ দু:খ, অবহেলা আর অন্ধকারের গহ্বরে ছুঁড়ে ফেলে দিয়েছিলো সে ছবিটি আজ এতো এতো সুখ, ভালোবাসা আর ছোপ ছোপ রংয়ের মাঝে রাহেলার কাছে একেবারেই ম্লান মনে হয়।

রাহেলা সন্ধ্যামণির অজস্র ফুলগুলোকে দু’হাত দিয়ে জড়িয়ে ধরার চেষ্টা করে, কাছে টেনে নাক ডুবিয়ে বুক ভরে নিঃশ্বাস নেয়।

একসময় তার দৃষ্টি প্রসারিত হতে হতে দূর দিগন্তে মিলিয়ে যায়… কিন্তু সেখানে সে একজনও অবিবেচক, মূঢ় আফজাল মিয়াদের মতো মানুষদের একরত্তি ছায়াও কোনদিকে দেখতে পায়না।
২৯/০৬/২০২০

লেখকঃ কবি ও গল্পকার

 

আরও পড়ুন