আগত কন্যার কাছে গর্ভধারিনী মায়ের চিঠি

তানজিয়া ইসলাম তানহা

প্রিয় বৎস,
তোমার মা বলছি। আজ যখন এ চিঠি তোমার কাছে লিখছি তখন তুমি জন্মও নাওনি, এখনও জানোনা এ বসুন্ধরার কাঁটাঘেরা ভূমি সম্পর্কে। না জন্মালেও তুমি আমার হৃদয়ে সবসময় আছো প্রস্ফুটিত রাজগোলাপ হয়ে, যার সুবাসে তুমি আমার কাছে সবসময়ই অস্তিত্ববান।

বৎস,
তোমাকে কয়েকটি কথা বলি। মানুষ হয়ে যখন এ পৃথিবীতে জন্মাবে, তোমার পদবী যখন সকল জীবের শ্রেষ্ঠ ‘আশরাফুল মাখলুকাত’ হিসেবে লিপিবদ্ধ হবে, জেনে রেখো; পৃথিবীতে তোমাকে এর চরম মূল্য দিতে হবে।

সৃষ্টিগতভাবে আশরাফুল মাখলুকাত হয়ে জন্মালেও প্রকৃত সেরা হওয়া আসলে অর্জন করে নিতে হয়। আর এ মহাপরীক্ষাময় পৃথিবীতে সে সৌভাগ্য অর্জনের পথে রয়েছে পদে পদে বাঁধা। এ বাঁধায় বারবার তুমি আটকে যাবে, বারবার এ রঙিন দুনিয়ার মিথ্যা ধোঁকায় তোমার চোখ ধাঁধিয়ে যাবে, পরক্ষণেই বুঝতে পারবে এর আসাড়তা!

জীবনসংগ্রামে লড়তে লড়তে কখনো তোমার মনে হবে, ব্যাস! আর পারবোনা!
আর বুঝি তোমাকে দিয়ে হবেনা!

বৎস!
জেনে রেখো! এ মিথ্যামায়ার পৃথিবীতে অনবরত ধোঁকায় পড়তে পড়তে, ভুল করতে করতে তোমার কখনো মনে হবে তোমাকে দিয়ে বুঝি আর লড়াই করা হবেনা!
তুমি বোধহয় মিছে ধোঁকা খাওয়ার বলয় থেকে বের হতে পারবেনা!

কিন্তু মনে রেখো স্নেহাস্পদ,
ভুল তো সেই করে যে কিছু করে! যে কখনো ভুল করেনা সে আসলে কিছুই করেনা! তো, তুমি ভুল করছো, জয় পরাজয়ের চক্রে আবর্তিত হচ্ছো মানেই সত্যি তুমি লড়াই করছো। এ লড়াইয়ে ভুল আর সাময়িক পরাজয় মানেই হেরে যাওয়া নয়।

এ চক্রে ঘুরতে ঘুরতে বারবার তোমার হৃদয়টা ভেঙে চৌচির হবে, টুকরো টুকরো হয়ে চিৎকার করে বলতে চাইবে, ‘আর পারছিনা! আর পারছিনা!’
হয়তো জীবন থেকেই মুক্তি পেয়ে যেতে চাইবে!

রাতগুলো কাটবে বালিশ ভেজা কান্নায়, দিনগুলো কাটবে ভালো থাকার অভিনয়ে!
এ পৃথিবীতে সবার কাছে থেকেও হয়তো তুমি থাকবে দূরে, বহু দূরে!
মেকি হাসির আড়ালে তোমার লুকানো কান্না’টা হয়তো কাউকে বুঝতে দেবেনা!

বৎস,
আজ তোমাকে অগ্রীম বলে রাখতে চাই প্রিয়,
আমি শুধু তোমাকে খাইয়ে পড়িয়ে বড় করে দায়িত্ব পালন করা মা হতে চাইনা।
তোমার সেই বিভীষিকাময় বেদনার রাতগুলোতে বালিশে মুখ গুজে নয়, তোমার এই মা’কে জড়িয়ে ধরে কেঁদো।

বিশ্বাস রাখো কলিজার টুকরা আমার,
তুমি যদি ভুল করে পৃথিবীর সবচেয়ে বড় অপরাধটিও করে ফেলো,
কথা দিলাম সে অপরাধের অনুতাপের অশ্রু মুছতে তোমার মা’কে সবসময় পাশে পাবে।
কখনো ভেবোনা মা তোমাকে ঘৃণা করবে! দুর দুর করে তাড়িয়ে দেবে! না বৎস!

জেনে রাখো, তোমার মা কেবল তোমার সুখের সময় আর জয়ী হওয়ার হাসিতেই গর্বিত হতে চায়না, চোরাবালিতে তলাতে থাকা তুমিটাকেও মমতার আঁচলে বেঁধে উদ্ধার করতে চায়।
তোমার টুকরো টুকরো হৃদয় জোড়া লাগানোর আঠা হতে চায় তোমার মা।
কাঁটার উপর চলতে চলতে রক্তাক্ত তুমি কখনো ভেবোনা তোমার পাশে কেউ নেই!
বরং সবসময়ই সে ক্ষত নিরাময়ের স্নেহের জায়গাটা আমায় দিয়ো।

তোমার হৃদয়ভারের গল্পগুলো শুনতে সবসময়ই তোমার মা উন্মুখ, ভেবোনা ভুলের কাহিনীগুলো জেনে আমি তোমায় ভালোবাসবো না! না বলা কথাগুলো মায়ের কাছে নির্ভয়ে বলে তোমার হৃদয়টা হালকা কোরো। যদি বলতে না-ও পারো,
বালিশের বদলে আমাকে জড়িয়ে ধরে তোমার অঝোর অশ্রুগুলো বিসর্জন দিয়ো।
বিশ্বাস রেখো, আমার স্নেহের আঁচল সে অশ্রু শুষে নিতে কোনোদিনও ক্লান্ত হবেনা।

ইতি
তোমার গর্ভধারিনী মা।

 

আরও পড়ুন