মাতৃত্ব হোক উচ্ছ্বসিত!

সাজেদা হোমায়রা

মাতৃত্ব’ একটা অদ্ভুত এক্সপেরিয়েন্সের নাম! এটি একই সাথে আনন্দের আবার একই সাথে স্ট্রেসের।

প্রতিটি মেয়ের কাছেই মাতৃত্ব মানে নতুন এক অনুভূতি! নিজের মধ্যে একটু একটু করে অন্য একটি প্রাণ বেড়ে ওঠার ভালো লাগা!

সন্তানের হাসিতে হারিয়ে যাওয়ার সুখ! অথবা জীবনকে নতুন করে উপলব্ধি করার আনন্দ!

মা হওয়ার প্রতিটি মুহূর্তই ভীষণ সুন্দর। পুরো প্রেগন্যান্সি পিরিয়ড যদিও নানা ধরনের শারীরিক কষ্টের মধ্য দিয়ে পার করতে হয়…তবুও সে কষ্ট সুখের অনুভূতিই দেয়! অন্যরকম একটা ভালো লাগা!

তবে কখনো কখনো এই মাতৃত্ব একটা মেয়ের মনে দ্বন্দ্ব ও অশান্তি তৈরি করে।

আর এর জন্য তার আশেপাশের মানুষরাই বেশিরভাগ ক্ষেত্রে দায়ী। একেকজনের একেকরকম কথা, কখনো মেয়েটাকে অযোগ্য/দায়িত্বহীন মা বলা, অথবা বাচ্চার জন্মের পরই তার চেহারা নিয়ে খারাপ মন্তব্য করা, ছেলে/মেয়ে হয়নি কেন…ইত্যাদি বিভিন্ন প্রশ্নে তাকে দোষারোপ করা বা ছোট করা… এগুলো একজন মাকে প্রচণ্ড কষ্ট দেয়।

মাতৃত্বের যাত্রাপথে হাজারো প্রশ্ন আর দোষারোপের সামাল দিতে যেয়ে অনেক সময়ই ম্লান হয়ে যায় মাতৃত্বের আনন্দ ও উচ্ছ্বাস…

প্রেগন্যান্সি পিরিয়ড, ডেলিভারি, বাচ্চা লালন পালন সবকিছুতেই মায়েদের একটা উৎকণ্ঠা থাকে। এ সময় হাজবেন্ডের কাছে এক্সপেকটেশনটা একটু বেশিই থাকে। সব মেয়েরাই চায়, তার শারীরিক কষ্ট বা মন খারাপ তার কাছের মানুষটা বুঝুক।

মা হওয়ার পর অনেকের ক্যারিয়ার কিছুটা থমকে যায়, এ নিয়েও একটা হতাশা এসে যায়। কখনো অন্যের সাথে নিজেকে তুলনা করতে গিয়ে হীনমন্যতায় ভুগতে হয়। মনে হয়, ‘আমার ফ্রেন্ডরা এতো ডিগ্রিধারী হচ্ছে বা এতো বড় চাকরী করছে…আমি কিছুই করতে পারছি না।’ আর যখনই এ জায়গায় একটা কমপেরিজম আসে তখনই খুব মন খারাপ হয়।

একজন আদর্শ মা হয়ে উঠতে পারা নিয়ে সংশয় অথবা ক্যারিয়ার নিয়ে উৎকণ্ঠা একটা মেয়েকে প্রচণ্ড হতাশায় ফেলে।
কেউ হয়তো মনের কষ্ট চেপে রাখে আবার কেউবা সমঝোতা করে।

মাতৃত্বের পুরো সময়টাই খুব সুন্দর! তাই মেয়েদের উচিত অবশ্যই তার মাতৃত্বের প্রতিটি মুহূর্তকে উপভোগ করা…
এবং সন্তানকে তার ভবিষতের জন্য খুব ভালো ভাবে তৈরি করা।

প্রত্যেকটি মানুষের জীবনের গল্প আলাদা। প্রত্যেকের হ্যাপিনেসের সংজ্ঞাও আলাদা।

তাই এ সময়টায় কষ্ট না পেয়ে বরং মাতৃত্বকে ভালোবাসলে হতাশা কমে যায়। এটা ভেবেই তো খুশী হওয়া যায়, ‘আমি বাচ্চার সাথে আছি, তার সাথে খেলছি, ঘুরছি…বাচ্চার ব্রেইন ডেভেলপ করছে।’

মনে করুন, এটা ক্যারিয়ার স্যাক্রিফাইস না, এটা আপনার ভালো লাগা! আপনার প্রশান্তি!
তবে হ্যাঁ, তাই বলে স্বপ্নগুলোকে ছেড়ে দেবেন না …স্বপ্নগুলোকে বাঁচিয়ে রাখুন!

পরবর্তীতে কোনো এক সময় স্বপ্নগুলোর বাস্তবায়ন করুন। মা হওয়ার কারণে সব বাদ দিতে হবে, এমনটি নয়। বরং আস্তে আস্তে আবার নিজেকে সাজিয়ে তুলুন। নিজের ভালো লাগার কাজগুলো করুন।

প্রতিটি মায়ের উচিত সন্তানের প্রতি নিজের প্রতিটি হক আদায় করা।
প্রতিটি শিশুই আলাদা, তাই তাদের বড় করার পদ্ধতিটাও আলাদা।

কখনো কখনো মায়েরা নিজের বাচ্চাকে অন্যর বাচ্চার সাথে তুলনা করে মন খারাপ করেন, হতাশায় ভুগেন।

একটা বাচ্চাকে কখনোই আরেকটা বাচ্চার সাথে তুলনা করতে নেই। কারণ প্রতিটি মানুষই সম্পূর্ণ আলাদা ও অনন্য। সবাই সবদিকে সমান হবে না, একেকজন একেকদিক দিয়ে পারদর্শী হবে, এটাই স্বাভাবিক!

আর হ্যাঁ, সন্তানের সঙ্গে একটা বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তুলুন। এটি মাতৃত্বের আনন্দকে আরো রূপময় করে তুলবে!

কাজেই নানা জনের নানা মতে বিভ্রান্ত না হয়ে নিজের মতের ওপর বিশ্বাস রাখুন। সন্তান লালন পালনের সময়টায় মানুষের এক্সপেকটেশন যেমন প্রেশার ক্রিয়েট করে তেমনি নিজের এক্সপেকটেশনও একটা অস্হিরতা তৈরি করে।

আর সবচেয়ে বড় কথা, নিজেকে ভালো রাখা। মা উচ্ছসিত, আনন্দিত থাকলেই সে সন্তান কে সুস্থভাবে ও সুন্দরভাবে বড় করতে পারবে।

মা হাসিখুশি থাকলে সন্তানও থাকবে আনন্দে…
মার মানসিক ও শারীরিক সুস্থতার সাথেই জড়িয়ে আছে সন্তানের মানসিক বন্ধন!

একজন মায়ের লালন পালনের ধরন হয়তো অন্য আরেকজনের সাথে নাও মিলতে পারে…তাই বলে তার মমত্ববোধ বা দায়িত্বশীলতার ব্যাপারে বিরূপ মন্তব্য করা কখনোই উচিত না। প্রত্যেকটি মাই চায় একটু স্নেহমিশ্রিত পরামর্শ যা তার নতুন জীবনকে সাজিয়ে তুলবে, তার মাতৃত্বের যাত্রাপথ মসৃণ করবে।

একজন মায়ের মাতৃত্ব কে দ্বন্দ্বময় নয় বরং উচ্ছসিত করে তুলতে সাহায্য করি!
প্রতিটি মা উপলব্ধি করুক, ‘সে একজন যোগ্য মা।’

মাতৃত্বের প্রেরণা যদি মায়ের মধ্যে অবিচল থাকে, তাতে সন্তানের কল্যাণ…পরিবারের কল্যাণ…পৃথিবীর কল্যাণ!

লেখকঃ সাহিত্যিক ও কলামিস্ট

আরও পড়ুন