দ্বিতীয় জন্ম

কামরুন নাহার মিশু

দু’বছরেও যখন বাচ্চা হচ্ছিল না, তখন আত্মীয়-স্বজনের চেয়েও বেশি উদ্ধিগ্ন হয়েছিলাম আমি। কাউকে বুঝতে দিতাম না, ভেতরে ভেতরে মরমে মরে যেতাম। কোনো ভাবে ক্লাসে মনোযোগ দিতে পারতাম না( তখন একটা কলেজে হিসাববিজ্ঞান পড়াতাম)।

একইদিন বিয়ে হওয়া জা যখন ছেলে কোলে নিয়ে হাঁটত, খেলত। তখন ভেতরাটা কেমন যেন ফাঁকা ফাঁকা লাগত। সারাদিন অফিসের কাজে ব্যস্ত বর যখন রাতে কল দিত, আমি খুশি না হয়ে বরং বিরক্ত হতাম। বাড়ি আসছে না কেন?
প্রতিমাসে পিরিওডের সময় একদিন অতিক্রম করলেই ফার্মেসি থেকে প্রেগনেন্সি কিট এনে পরীক্ষা করে হতাশ হতাম। বাড়ি না আসায় আমি যে মানুষটার উপর রাগ দেখাতাম, সেই মানুষটাই বাড়ি আসার পরও নেগেটিভ রেজাল্ট আসায় আমার উপর রাগ দেখানো শুরু করল। ঠিক রাগ নয়, তবে আমি বুঝতে পারতাম তার বদলটা।

এদিকে রান্নাঘরে, ভাবিদের আড্ডায় অনেকেই শুনিয়ে শুনিয়ে বলত অনেকের কোনো কারণ ছাড়াই, জীবনেও বাচ্চা হয় না। আবার বিভিন্ন লোকের উদাহরন দিতো বাচ্চা না হওয়ায় বর আবার বিয়ে করেছে। আরও নানান ভয়ানক গল্প।এবার সত্যি সত্যি ভয় করতে শুরু করল, যদি সত্যি মা হতে না পারি! আমাদের দুশ্চিন্তার আরও একটা কারণ হলো এক নিকট আত্মীয়ের বিয়ের পাঁচ বছরে বাচ্চা হচ্ছিল না, অথচ ডাক্তার বলছিল কারো কোনো সমস্যা নেই।

অবশেষে একদিন সেই কাঙ্খিত খবর পেলাম আমরা বাবা-মা হব। সেই দিন ছিল আমাদের ম্যারিজ এনিভারসারি।
একটা সন্তান জন্মের আগমনী বার্তায় একজন মানুষ, একটা পরিবার যে কী পরিমান আবেগে আনন্দে ভাসতে পারে, নিজের চোখে না দেখলে সত্যি বিশ্বাস হতো না।

এরপরদিন থেকে যেন আমি সদ্য ভুমিষ্ঠ হওয়া কোনো শিশুর মতো সেবা পেতে শুরু করলাম। শ্বাশুড়ি এক গ্লাস পানিও নিজের হাতে খেতে দিতেন না। গোসল পর্যন্ত করিয়ে দিতেন।
বর ব্যবসা- বাণিজ্য সব ফেলে রেখে বাড়ি এসে বসে রইলেন। আমাকে শোয়া থেকে উঠতে দিতেন না, নিজের হাতে খেতে দিতেন না। ওয়াশরুমে একা যেতে দিতেন না।এত বিরক্ত হতাম, সুস্থ সবল একটা মেয়ের উপর এমন সেবা যত্নের অত্যাচারে আমি প্রায় অতিষ্ঠ।

একদিন কলেজে গিয়েছিলাম একাদশ প্রথম বর্ষের ওরিয়েন্টেশান ক্লাস ছিল, লেকচার শুরুরপাঁচ মিনিটের সময় মাথা ঘুরে একদম স্ট্রেজের নিচে পড়ে গেলাম, সবাই মিলে ধরাধরি করে পাঁচতলা থেকে দোতলা অফিস রুমে নিয়ে এলেন। এবার আমাকে চেয়ারে বসাতে যাবে এমন সময় এক কলিগ চেয়ারের পজিশন ঠিক করতে গিয়ে আমি দ্বিতয়বার আবার অফিস রুমে পড়ে গেলাম। দ্বিতয়বার পড়ারপর আমার অবস্থা বুঝতেই পারেন কেমন হয়েছে। কলিগরা তো সবাই হুলুস্হুল শুরু করে দিয়েছেন। মাথায় পানি দিয়ে একাকার অবস্থা। সবাই বরকে চিনতেন। ভাগ্য ভালো তাকে কল দিয়েছিল। তিনি দৌড়ে এসে ক্লিনিকে নিয়ে গেলেন। ডাক্তার সব শুনে সাথে আমার ব্লিডিং দেখে ভেবেছেন হয়তো সব শেষ।
সৃষ্টকর্তার কী অশেষ রহমত সে যাত্রায় দুজনেই বেঁচে গেলাম। তবে সারা জীবনের জন্য আমার কলেজ নিষিদ্ধ হলো।

এবার চব্বিশ ঘণ্টার জন্য আম্মা একজন মহিলা নিয়োগ করে দিলেন আমার জন্য। আমি ঘুমালেও মহিলা আমার পাশে বসে থাকতেন। আমি টিভি দেখতাম না, মোবাইলও ছিল না। তবে বাসায় কয়েকটা পত্রিকা থাকত। নামাজ পড়ে কুরআন পড়ে, পত্রিকা পড়ে কতক্ষণ কাটানো যায়।
এত বিরক্ত লাগত রুমের বাইরেও যেতে দিতেন না।
এবার সে কাঙ্খিত সময় এলো। আমার মা হওয়ার সময়।
সকাল নয়টা থেকে ব্যথা শুরু হয়েছে। হাসপাতাল বাড়ির পাশে থাকায় আমরা বিকেল তিনটায় হাসপাতালে গেলাম।

সব কিছু ঠিক ছিল। বাচ্চার পজিশন, পানির পরিমান, আমার ব্যথা সব। হাসপাতালে কোনো গাইনী বিশেষজ্ঞ ছিল না। তবে একজন অভিজ্ঞ নার্স ছিল, যিনি হাসপাতালের সব নরমাল ডেলিভারি নিজে করতেন।
ঐ দিন নার্সটা ছুটিতে ছিলেন। হাসপাতাল থেকে ইমারজেন্সি কল করা হলো তিনি রাতের দশটায় এসে জয়েন করবেন। রাত যতই বাড়ছিল আমার ব্যথার পরিমানও অসহনীয় হচ্ছিল। অথচ তখনও নার্স এসে পৌঁছায়নি।
ডেলিভারি করার নার্স যে নেই, সেটা কিন্তু আমাদের কাউকে লেবার রুমে নেয়ার একমিনিট আগেও জানানো হয়নি।

আমাকে লেবার রুমে নিয়ে সব কিছু ঠিক করলেন, পজিশন করে শোয়ালেন এমন সময় চট্রগ্রাম থেকে নার্স এসে পৌঁছালেন। উনি ড্রেস চেঞ্জ না করে সরাসরি লেবার রুমে এলেন। তখন রাত সাড়ে এগারোটা। সকাল নয়টা থেকে ব্যথায় চিৎকার চেঁচামেচি করতে করতে আমি এতটাই দুর্বল হয়ে গেলাম শেষ মুহূর্তে আর আমার কোনো শক্তি অবশিষ্ট নেই। এর মধ্যে পানি শেষ হয়ে গেছে, ব্যথাও আর আসছিল না। আমিও আর প্রেশার দিতে পারছিলাম না।
এবার কানে আসছে, সবাই অালোচনা করছে সিজার করতে হবে বাচ্চা অর্ধেক পর্যন্ত এসেছে। এখন নরমালি হওয়া আর সম্ভব নয়। পানি শেষ হয়ে গেছে। যে কোনো একজনকে বাঁচানোর সিদ্ধান্ত নিতে হবে।
কী কঠিন সিদ্ধান্ত! আজও জানি না তারা কী সিদ্ধান্ত দিয়েছেন।

ডাক্তারকে কল দিয়ে অন্য হাসপাতাল থেকে আনা হয়েছে, ওটি রেডি করা হয়েছে, স্ট্রেচারে তুলে আমাকে ওটি রুমে নিবে। যে কোনো একটা জীবন বাঁচবে হয় মেয়ে না হয় আমি।
প্রায় পনেরো মিনিট আমার কোনো ব্যথা ছিল না। হঠাৎ করে এমন তীব্র ব্যথা এসেছে।
আমি প্রাণপনে চেষ্টা করে প্রেসার দিয়েছি। নার্স সবাইকে দোয়া পড়তে বললেন। সৃষ্টকর্তার অশেষ মেহেরবানীতে আর সবার দোয়ায় আমি স্বাভাবিক ও সুস্থ সুন্দর এক সন্তানের কন্যা সন্তানের মা হলাম। আমাকে যখন বেডে এনে ওর পাশে শোয়ালেন। ছোট্ট সোনা পরিকে ছুঁয়ে দিয়ে মনে হলো আমার যেন দ্বিতৃয় জন্ম হলো। আলহামদুলিল্লাহ আর চারদিন পর আমার সোনা মেয়েটার ছয় বছর পূর্ণ হবে।

আমি মাঝেমাঝে ওর মুখের দিকে তাকিয়ে ভাবি, সৃষ্টকর্তা না চাইলে তো এই সুন্দর পৃথিবীতে হয় আমি থাকতাম না হয় আমার মেয়েটা।
আমার মেয়ে কাকে মা বলে ডাকত!

লেখকঃ সাহিত্যিক ও কলামিস্ট

আরও পড়ুন