কর্মজীবী নারীর জীবন

রোকেয়া পপি

অফিস থেকে ফিরে ব্যাগটা বিছানায় ছুড়ে ফেলে আগে চায়ের পানি বসালাম।শাশুড়ি দরোজা খুলেছে মুখ চোখ অন্ধকার করে। আজকে আমার অডিট ছিল একটু দেরি হয়ে গেছে বাসায় ফিরতে।না জানি আজ কতো কথা শুনতে হয়।

অফিস থেকে ফিরে তমাল কি সুন্দর মায়ের সাথে টিভি দেখতে বসে যায়।কথায় কথায় রুহি এটা দাও,ওটা দাও। শাশুড়ি ও বসে বসে অর্ডার করবে।অথচ তমাল যেমন অফিসে কাজ করে বাসায় ফিরে, আমি ও তাই।কিন্তু আমার দম নেওয়ার সময় নেই।
সেই ভোর পাঁচটায় উঠে নামাজ পড়ে, কাজের মেয়েটাকে সাথে নিয়ে সকালের নাস্তা বানিয়ে তুনতুনের জন্য টিফিন, দুপুরের তরকারি সব রেডি করে অফিস যাই।
দুপুরে শুধু কাজের মেয়ে টা ভাত রান্না করে।
আমার নয়টা পাঁচটা অফিস। আমি এসে বিকেলের চা নাস্তা না দেওয়া পর্যন্ত এক কাপ চা বানিয়ে খাবে না।আবার রাতে ভালো মন্দ রান্না না হলে একেকজনের মুখে রুচে না। দুপুরের খাওয়া নাকি তাদের মনমতো হয় না।রাতে একটু শান্তি করে খায়।

আর সুযোগ পেলে কথা শুনাতে ছাড়ে না। শুনতে শুনতে কান পচে গেছে। এখন আর পাত্তা দেই না।এক কান দিয়ে শুনে আরেক কান দিয়ে বের করে দেই।

চায়ের পানি বসিয়ে দিয়ে খুব দ্রুত চেন্জ হয়ে আরেক চুলায় পাকুরা ভেজে যখন গরম গরম চা আর পাকুরা নিয়ে ড্রয়িং রুমে ঢুকবো, শুনলাম আমার শাশুড়ি তার ছেলের কাছে বলতেছে তোর বৌ সারাজীবন ফাঁকিবাজি করে গেল। এক কাপ চা সেটাও বিকেলবেলা পাইনা ।চা খেতে খেতে রাত আটটা।
সংসারের ঝামেলা কি জিনিস বুঝলো না, খালি চাকরি আর চাকরি।
অফিস ছাড়া কিছুই বোঝে না। ওই একটা কাজই ভালো পারে।

আমি যখন গলাখাকারি দিয়ে চা নিয়ে ভেতরে ঢুকলাম তখন আমার শাশুড়ি থতমত খেয়ে একদম চুপ।

তমাল চা নিতে নিতে বললো, রুহি এতো দেরি হলো যে আজ?
কুলসুম কে চা বানানো শিখিয়ে দিলেইতো পারো।
যেদিন তোমার দেরি হবে ফিরতে ও বানিয়ে খাওয়াবে মাকে।

জাহানারা বেগম ছেলের কথা শুনে ফুঁসে উঠলেন।
কি বলিস তমাল!
ঐসব হাগারে পাগারে থেকে ধরে আনা কাজের লোকের হাতে তৈরি খাবার আমি খাবো নাকি।

এমনিতে মাথা টা খুব ধরেছে। অফিসে কাজের চাপ ছিল অনেক বেশি। আমি আর মা ছেলের কথায় অংশ নিলাম না। চুপচাপ চা খাচ্ছি।
তুনতুন কে দেখলাম মুখ শক্ত করে বসে আছে। কোন কিছু খাচ্ছে না।
কি ব্যাপার তুনতুন, তুমি খাচ্ছো না কেন?

আমি। পাকুরা খাবো না মা।
আমাকে নুডুলস করে দাও।

যা করেছি তাই খাবে।

বললাম তো খাবো না।

রুহির মেজাজ খারাপ হতে শুরু করেছে।
তুনতুন একদম মুখে মুখে তর্ক করবে না।যখন যা করবো তাই খাবে এখন থেকে। একটু পরে আবার রাতের রান্না করতে হবে। এখন আমি আর নতুন করে তোমাকে কিছু তৈরি করে দিতে পারবো না।

না পারলে করবে না।
তবু ও আমি কিছু খাব না।
না খেয়ে থাকবো।

রুহি মেজাজ ঠিক রাখতে না পেরে তুনতুনের গালে দিল কষে এক চড়।

জাহানারা বেগম সাথে সাথে নাতনিকে টেনে কাছে নিয়ে, তোমার এতো বড়ো সাহস ,তুমি আমার নাতনির গায়ে হাত তোলো।
সারাদিন পড়ে থাকো অফিসে, মেয়ের প্রতি কতটুকু দায়িত্ব পালন করো, কতটুকু সময় দাও যে কথায় কথায় গায়ে হাত তোলা।
সাংসারে রান্না ছাড়া আর কিছুই করো না, তাও আবার কুলসুম মেয়েটা সব গুছিয়ে দেয়।
আমাদের মত পুরো সংসারের ঘানি টানতে, ঘরভর্তি ছেলেপেলে মানুষ করতে, তবেনা বুঝতে সংসার কাকে বলে।

রুহির খুব মন খারাপ। ইচ্ছে করছে তুনতনকে বুকে জড়িয়ে ধরে একটু আদর করে দিতে।
কিন্তু এখন কোন ভাবেই জাহানারা বেগমের সামনে যাওয়া যাবে না।
গেলেই আবার দশ কথা শুনতে হবে।

আমার শাশুড়ি মা আমার চাকরি করাটা একদম পছন্দ করে না। তার কথা হলো ছেলের বৌ থাকবে ঘরে।ঘর সামলাবে, বাচ্চা সামলাবে।
ঘরের বৌ কেন বাইরে কাজ করবে সারাদিন।
অথচ আমার টাকায় কতো উপকার হচ্ছে এই পরিবারের, সেটা কখনো স্বীকার করে না।
মেয়েটা ভালো একটা স্কুলে পড়ে।
ননদের বিয়েতে কতো টাকা লাগলো। দেশের বাড়িতে বিল্ডিং করছে, ঘরের ভেতরে বাথরুম।সব জায়গায় তো আমি টাকা দিয়েছি।
ভালোটা কখনো বলে না।
দোষ একটাই অফিস ছাড়া আমি আর কিছুই ভালো পারি না।
অথচ শরীর খুব খারাপ থাকলেও আমি রান্না করি।অন্যের হাতের রান্না তারা খাবে না।
এটাই আমার জীবনের প্রতিদিনের চিত্র।
মন খারাপ হলে ও কিছু করার নেই।
প্লাস পয়েন্ট একটাই
আমার চাকরি করা নিয়ে তমাল কখনো কিছু বলে না।
ওর সাপোর্ট না পেলে হয়তো আমার চাকরি করা হতো না।
তমাল বাতি নিভিয়ে ঘুমাতে এলো। অফিস থেকে এক সপ্তাহের ট্যুরে সুইডেন যেতে হবে আমাকে।
অথচ কিভাবে যে বলি সাহস পাচ্ছি না।ট্যুরটা আমার জায়গায় যদি তমালের হতো তাহলে এতোক্ষণে বাসায় আনন্দের জোয়ার বয়ে যেতো ।

তমাল ঘুমিয়ে গেছো।

না। কিছু বলবে।

আমি যদি এক সপ্তাহের জন্য দেশের বাইরে ট্যুরে যাই। তাহলে কেমন হয় তমাল?

দেশের বাইরে যাওয়ার প্রসঙ্গ আসছে ‌কেন?

অফিস থেকে আমাকে সিলেক্ট করেছে।

দেখো রুহি পরিবারে মেয়েদের দায়িত্ব অনেক বেশি থাকে। আমি চাই না তুমি তুনতুনকে রেখে দেশের বাইরে যাও।

তুমি কি বলতে চাইছো
আমি কি আমার দায়িত্ব ঠিক মতো পালন করিনা?

আমি তা বলছি না। তবে একটা মা হিসেবে তার সন্তানকে যতোটুকু সময় দেয়া উচিত তুমি তা দিতে পারছো না।
এতে তুনতুনের মানসিক বিকাশ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

তার মানে তুমি বলতে চাইছো তুনতুন মানসিক ভাবে সুস্থ নয়।

রাত-দুপুরে তর্ক ভালো লাগছে না।
ঘুমাও। সকালে দুজনকেই অফিসে যেতে হবে।

তমাল কথা এড়িয়ে যাচ্ছো তুমি।
তুমি কি চাও না আমি চাকরি টা করি।

আমার চাওয়া না চাওয়ায় কি আসে যায়। আমি না চাইলে কি তুমি চাকরি ছেড়ে দিবে? কখনো দেবে না। প্রয়োজন হলে সংসার ছাড়বে, কিন্তু চাকরি ছাড়বে না। চাকরি করা মেয়েরা যে স্বাধীনতা ভোগ করে।সে কখনো এই স্বাধীনতা হারাতে চাইবে না। সংসার ভেসে গেলেও না।
ঘুমাও। অনেক রাত হয়েছে।

কিছুক্ষণের মধ্যেই তমাল নাক ডাকতে শুরু করেছে।
অথচ আমার চোখ ভারি হয়ে গেছে কিন্তু ঘুম নেই।
আকাশে আজ চাঁদ নেই কিন্তু তারার আলোয় আবছায়া আলোকিত হয়ে আছে চারপাশ।
রুহি ঘুমাতে পারলো না। কিছুক্ষণের মধ্যেই ফজরের আজান শোনা গেল।ভোর হচ্ছে। শুরু হবে প্রতিদিনের মতো আরেকটা নতুন দিন।
রুহি খেয়াল করলো ওর চোখ দিয়ে টপাস টপাস করে পানি পড়ছে।

লেখকঃ সাহিত্যিক

 

আরও পড়ুন