কেমন হবে একজন মুসলিমের সাহিত্যচর্চা?

।। ড. সাজেদা হোমায়রা ।।
জীবনের সবক্ষেত্রে সৌরভ ছড়ানো এক জীবন বিধান ইসলাম। এ থেকে বাদ যায়নি ‘সাহিত্য’ও। জীবনের অন্য সব বিষয়ের মতো এটিও একটি অপরিহার্য বিষয়। সুন্দর, সুস্থ ও মার্জিত সাহিত্য চর্চা ইসলামের বিধান।পৃথিবীর প্রায় সব ভাষার সাহিত্যই কবিতাকে কেন্দ্র করেই গড়ে উঠেছে। আরবী সাহিত্যও ঠিক তেমনই ছিলো। তাই রাসূল সা. এর পূর্ববর্তী ও পরবর্তী সময়ে আরবে সাহিত্য বলতে কবিতাকেই বোঝানো হতো। তবে সে যুগে গদ্যের কোনো লিখিত রূপ না থাকলেও মৌখিক গদ্য হিসেবে খুতবা ও বক্তৃতার ব্যাপক চর্চা ছিলো।
বর্তমানকালে সাহিত্য বলতে গল্প, কবিতা, বাস্তব জীবনবোধ সম্পন্ন লেখা, বিভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গী থেকে বিভিন্ন লেখা- সব ধরনের লেখালেখিকেই বোঝানো হয়।
সাহিত্য দুই ধরনের…
– একটি হলো সত্য ও সুন্দরের পথ প্রদর্শক।
– আরেকটি হলো মানুষের জন্য অকল্যানকর ও বিভ্রান্ত চিন্তার ধারক।
বিকৃত সাহিত্য সমাজকে বিকৃত করে। আর সুস্থ সাহিত্য সমাজকে করে বিকশিত। সত্য বিবর্জিত সাহিত্যের মধ্যে নেই কোনো কল্যাণ।
আরব সমাজে জাহেলী যুগে কবিতার চরম উৎকর্ষ সাধিত হয়েছিলো। ইসলামী যুগেও এ ধারা অব্যাহত থাকে। তবে তা জাহেলী যুগের মতো করে নয়। ইসলামী যুগের কবিতাগুলো ছিলো পরিশীলিত ভাষায়, আদর্শের মোড়কে। অশ্লীলতা সেখানে স্পর্শ করেনি।
কবি ও কবিতার প্রতি রাসূল সা. এর ছিলো খুব আগ্রহ। তিনি নিজে কবিতা শুনতে ভালোবাসতেন এবং অন্যদেরও কবিতার প্রতি আগ্রহী করে তুলতে সচেষ্ট ছিলেন।রাসূল সা. কবিদের খুব ভালোবাসতেন। তাঁদের মর্যাদা দিতেন। তিনি প্রায়ই তাঁর কবি সাহাবীদের কবিতা সম্পর্কে খোঁজ-খবর নিতেন। তাঁদেরকে উৎসাহ দিতেন। তাঁদের কবিতার শুদ্ধতার দিকে খেয়াল রাখতেন। মনোযোগ দিয়ে তাঁদের কবিতা আবৃত্তি শুনতেন। এমনকি রাসূল সা. মাঝে মাঝে নিজেও কবিতা আবৃত্তি করতেন।
রাসূল সা. বলেছেন, “নিশ্চয়ই কোনো কোনো কবিতায় রয়েছে প্রজ্ঞা।” (বুখারী-৬১৪৫)
তিনি আরো বলেছেন,”কবিতাও কথার মতোই। ভালো কথা যেমন সুন্দর ভালো কবিতাও তেমন সুন্দর। আবার খারাপ কবিতা খারাপ কথার মতোই অসুন্দর।” (আল আদাবুল মুফরাদ-৮৭৩)
সত্য বাক্য দিয়ে গঠিত কবিতার গুরুত্ব বুঝিয়ে তিনি বলেছেন:”নিশ্চয়ই কবিতা হচ্ছে সুসংবদ্ধ কথামালা। কাজেই যে কবিতা সত্য আশ্রিত, সে কবিতা সুন্দর।”
রাসূল সা. এর সময়ের উল্লেখযোগ্য কবিদের মধ্যে ছিলেন- হাসসান ইবনে সাবিত (রা.), কা’ব ইবনে মালিক (রা.), আব্দুল্লাহ ইবনে রাওয়াহা (রা.), কা’ব ইবনে জুহাইর (রা.), লাবিদ ইবনে রাবিয়্যাহ (রা.)।
রাসূল সা. সাহিত্যকে এতো বেশি প্রাধান্য দিতেন যে মসজিদে নববীর ভেতরে শুধু কবিতা আবৃত্তির জন্যই একটি স্টেজ করা হয়েছিলো। কবি হাসসান ইবনে সাবিত রা. সেখানে দাঁড়িয়ে স্বরচিত কবিতা আবৃত্তি করতেন। তাঁর কবিতায় থাকতো মুসলিমদের গৌরবগাঁথা, রাসূলের (সা.) প্রশংসা, কাফিরদের নিন্দাবাদ ও ইসলামের বহু বিষয়ের বর্ণনা।
রাসূল সা. বলেন, “হাসসানের কবিতা কাফিরদের মধ্যে তীরের আঘাতের চেয়েও তীব্র আঘাত করে।” (সীয়ারু আ’লাম আন-নুবালা-২/২০)
রাসূল সা. কখনো কখনো কবিদের পুরস্কৃতও করতেন। একবার কা’ব ইবনে জুহাইর রা. রাসূল সা. এর প্রশংসা করে কবিতা লিখলে রাসূল সা. তাঁকে নিজের একটি চাদর উপহার দেন।
এভাবেই রাসূল সা. রুচিশীল ও সুন্দর সাহিত্যচর্চার প্রশংসা করেছেন, উৎসাহ দিয়েছেন।
রাসূলের যুগের সাহাবীরা কবিতা রচনা করে বুঝিয়ে দিয়েছিলেন সাহিত্যের মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে সত্যের প্রচার, কল্যাণের প্রতিষ্ঠা। অন্যায় আর অসত্যের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ।
সূরা আশ শু’আরার ২২৭ নম্বর আয়াতে সাহিত্য চর্চা সম্পর্কে ইসলামের দৃষ্টিভঙ্গী ফুটে উঠেছে। এখানে মুসলিমদের দিক নির্দেশনা দিয়ে তাদের সাহিত্যচর্চাকে বেগবান ও পরিশীলিত করতে বলা হয়েছে। স্পষ্ট করে বলে দেয়া হয়েছে কেমন হবে তাদের লেখালেখির ধরণ।
এ আয়াত অনুযায়ী আল্লাহর পছন্দের কবি/লেখক হচ্ছেন তারা…
– যারা মুমিন।
– যারা নিজেদের কর্ম জীবনে সৎ ও নৈতিকতার বাঁধনে বাঁধা।
– যারা আল্লাহকে বেশি বেশি স্মরণ করেন নিজদের ব্যক্তিগত জীবনে এবং নিজেদের লেখালেখির ক্ষেত্রেও।
– মানবতা যখন বিপন্ন ও নির্যাতিত হয় তখন তারা তাদের লেখনী দিয়ে এর প্রতিশোধ গ্রহণের প্রাণান্তকর চেষ্টা করেন এবং মানুষকে তার প্রাপ্য অধিকার সম্পর্কে সচেতন করেন। তারা লেখার মাধ্যমে বিরুদ্ধবাদীদের মোকাবিলা করেন।
কবি/লেখকের কাজ মানুষকে কল্যাণের দিকে উদ্দীপ্ত করা। একটি সুন্দর লেখার জন্য প্রয়োজন লেখকের নিজের উপলব্ধি। তাকে উপলব্ধি করতে হবে নিজের কল্যাণ ও অকল্যাণ, নিজের আশা ও নিরাশা, নিজের সুখ ও দুঃখ। আর এ উপলব্ধিকে যদি তিনি উদার মানবতাবোধের অনুভূতিতে প্রকাশ করতে পারেন তবে সেই লেখাই হবে সুন্দর।
আজকের অপসংস্কৃতির সয়লাবে ইসলামী সাহিত্যচর্চা খুব প্রয়োজন।
একজন মুসলিমের কখনো এমন বিষয় নিয়ে লেখা উচিত নয়, যা মানবতার জন্য প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে ক্ষতিকর। আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনই হোক আমাদের সাহিত্যের লক্ষ্য। এ লক্ষ্যই ফুটে উঠুক আমাদের কবিতায়, আমাদের গল্পে, আমাদের প্রতিটি লেখায়! সুস্থ সাহিত্যের শক্তিতে বদলে যাক আমাদের পৃথিবী!
লেখকঃ ইসলামী বিষয়ে কলাম লেখক

 

 

আরও পড়ুন