বেঁচে ফেরার সত্যি গল্প (প্রথম পর্ব)

শামীমা রহমান শান্তা

মুন্সী মেহেরুল্লাহর দুটো লাইন ছোটবেলা থেকেই মনে গেঁথে আছে:
“ভাবো মন দমে দম
রাহা দূর বেলা কম!”
জীবন-মৃত্যু ও জীবন এর ক্ষণস্থায়ী সময়, এসব নিয়ে ভাবনা চিন্তা করার সময় আমাদের নেই। আমরা সবাই শুধু ছুটছি আর ছুটছি। কিছু ঘটনাএক মুহূর্তৈ মানুষের জীবনে এমন কিছু শিক্ষা দিয়ে যায় যে আমরা বুঝতে পারি এ জীবন কত তুচ্ছ ও সীমিত, যেকোনো সময় আমরা হারিয়ে যেতে পারি কালের অতল গহ্বরে।
জীবন এরকমই একটি অবিস্মরণীয় ঘটনার মুখোমুখি করে দিয়েছে আমাকে উনিশে ডিসেম্বর ২০২০ এ।
গত ১৫ ডিসেম্বর শশুর বাড়ি চলে এলাম ঢাকা থেকে। তিন বাচ্চা ও তাদের বাবা আর আমি। পুরো করোনাকালীন ঢাকায় বন্দিদশা কাটিয়েছি।বাচ্চাদের অনলাইন ক্লাস-পরীক্ষা সবকিছু ধকল কাটিয়ে সিদ্ধান্ত নিলাম কিছুদিন নিজেদের মত করে উপভোগ করব। আমার উনি তার মায়ের সাথে কিছুদিন থাকবেন আর আমিও আমার মা-বাবার সাথে কিছুদিন থাকব, বাচ্চারা সংগ পাবে দাদু ও নানু বাড়ির।
আলহামদুলিল্লাহ শ্বশুর বাড়ি মাগুরাতে আমরা নির্বিঘ্নে সবার সাথে মজা করে কাটালাম, বাড়ির অন্য সদস্যরাও বাড়িতে এলো আমাদের উপলক্ষে। বাড়ি ভরে গেল গূড়োগাড়া বাচ্চাদের হইচই এ। আনন্দে উচ্ছ্বসিত আমাদের পুরো বাড়িটা তখন! শাশুড়ি মা অনেক যত্ন করে তার নিজ হাতে অনেক পদের খাবার রান্না করে খাওয়ালেন আমাদের। সবকিছুর ফাঁকে ফাঁকে আমি সঙ্গে করে আনা স্কুলের খাতা মূল্যায়ন শেষ করে ফেললাম। আমার মনে হয়েছিল যে করেই হোক আমি আমার স্কুলের রেজাল্ট তৈরীর কাজ সময়মতো শেষ করব। এটা আমার দায়িত্বের একটা অংশ। স্কুল প্রদত্ত দায়িত্বের আমানত।
প্রচন্ড ঠান্ডায় আক্রান্ত হয়ে শ্বাসকষ্ট হচ্ছিল আমার। এর মধ্যে কিছুটা সুস্থ হয়ে সিদ্ধান্ত নিলাম শনিবারে সকালে যশোরের উদ্দেশ্যে রওনা হব। সকালে মা নিজ
হাতে রান্না করলেন, আমাদের কাছে বসিয়ে যত্ন করে খাওয়ালেন। তারপর সবকিছু গুছিয়ে আমরা যখন সাড়ে বারোটার দিকে ইজিবাইকে উঠলাম মা অনেক দোয়া করে দিলেন, বললেন,
বাবা তোমরা সাবধানে যেও , পৌঁছে আমাকে ফোন দিও, আল্লাহ ভরসা!
কেন জানি আসতে মন চাইছিল না। বারবার পিছন ফিরে তাকালাম। বাচ্চারা এলোমেলো কথা বলছিল।
ইজিবাইক আমাদের নিয়ে সামনে এগিয়ে চলল। মা পিছন থেকে হাত নাড়িয়ে যাচ্ছেন, সাথে পরিবারের অন্য সদস্যরা। বাচ্চাদের বাবা দুই কেজির একটি দই এর ঠিলা যত্ন করে কিনে এনেছে নিজের শশুড়বাড়ির জন্য। মোটমাট ৬/৭ টি ব্যাগের বোঝা আমাদের ঘাড়ে।
শশুর বাড়ি থেকে মাগুরা শহর ১৪ কিলো দূরে।পুরো সময়টা ইজি বাইকে যেতে যেতে বাংলার চিরায়িত সবুজ ফসলের খেত, সরষেখেত হাতছানি দিয়ে ডাকছিল যেন। ওদিকে আমার ছোট জা তাহেরা সকাল-সকাল মাগুরা তার কলেজে গিয়েছে অ্যাসাইনমেন্ট জমা দিতে। সেখানে সে অপেক্ষা করছিল তার বাবার বাড়ি থেকে তার মায়ের দেয়া উপহার হাতে ভাজা মুড়ি আমাদের জন্য দিবে বলে। মাওই মা মাগুরা এসেছেন একটা জরুরী কাজে। আমি তার বাড়িতে যেতে পারিনি বলে যত্ন করে আমাদের জন্য হাতে ভাজা মুড়ি এনেছেন।
আমরা সবসময়ই মাগুরা থেকে ঢাকা থেকে আগত পরিবহনে করে যশোর যাই।সাধারনত পরিবহন বিকেল বেলার দিকে বেশি পাওয়া যায়। দুপুরে খুব কম পাওয়া যায় এবং সাধারণত তারা যাত্রী মাঝখান থেকে নেয়না। আমরা দুজন চিন্তা করলাম এবার লোকাল বাসে যাই না কেন। সবাইতো যায়। আমরা সে নিয়তে ভাইনার মোড় থেকে লোকাল বাসে চড়ে বসলাম। আধাঘন্টা বসে থাকার পর গাড়ি ছাড়লো।আমরা মাঝখানে চারটা সিট নিলাম। ডান পাশের তিনটা সিট বাচ্চাদের সহ ওদের বাবা বসলো। আমি বাম পাশে আর এক মহিলার সাথে বসলাম। বাচ্চাদের ছাড়া বসি না আমি কখনো। বারবার বাচ্চাদের দিকে তাকাচ্ছিলাম। আর বাইরের দিকে তাকাচ্ছিলাম। এভাবে গাড়ি এগিয়ে চললো।
মুড়ির টিনের মত বাস। ১০ মিনিট পর পর থামছিল।কত মানুষ যে উঠলো আর নামল শুধু চেয়ে চেয়ে দেখলাম। খাজুরায় আসার পর আমার পাশে বসা মহিলা নেমে গেল।আমি আমার বড় মেয়ে নাবিহা কে বললাম আমার পাশে এসে বসো। ও বসার পর ও বেশ খানিকটা জায়গা খালি আছে। পাশে দাঁড়িয়ে থাকা ছোট্ট মেয়েটি কে সেখানে বসিয়ে নিলাম। খানিক পর বাসের কন্ট্রাকটর এসে ঐ মেয়েকে তার মায়ের পাশে পাঠিয়ে দিয়ে এক মধ্যবয়সী মহিলা কে বসিয়ে দিল। নাবিহা কে কোলে টেনে তাকে বসতে দিলাম। কেন জানি তিনি আমার দিকে খুব মায়া করে তাকালেন।
আমি মুচকি হেসে জানালায় সর্ষে ক্ষেতের দিকে তাকালাম।চোখে দেখছি শুধু হলুদ আর হলুদ মনে পড়ছি সুবহানাল্লাহ।
হটাৎ করে বিকট আওয়াজ হল। আমাদের গাড়ি টা ভয়াবহভাবে গড়িয়ে পড়ল নীচে। মনে হচ্ছিল ওয়াশিং মেশিনের কাপড়ের মত জোরসে ঘুরে পড়ে গেলাম। মুহূর্তে ঝুরঝুর করে চারিদিকে ছিটকে পড়ে গেল সব জানালার কাঁচ। এক লহমায় গাড়িটা খেলনা গাড়ির মতো ভেঙে চুরে চুরমার হয়ে গেল। কেমন যেন ঘোরের মধ্যে ছিলাম।
হুশ হলে নিজের তিন বাচ্চা আর উনাকে আমার কোলের মধ্যে পেলাম। চারিদিকে চিৎকার চেঁচামেচি। ছোট বড় সমস্ত মানুষের ভয়ার্ত কান্নার আওয়াজ। আমি চিৎকার করে বললাম:
কিছু হয়নি, আলহামদুলিল্লাহ। আমরা বেঁচে আছি। আলহামদুলিল্লাহ।
আমার বাচ্চারা চিৎকার করে বললো আলহামদুলিল্লাহ।
কিন্তু চোখ ফিরিয়ে দেখলাম চারিদিকে রক্ত। আমার ডান হাতের পাতা থেকে ফিনকি দিয়ে রক্ত ছুটছে। খানিকটা জখম হয়েছে।বাম হাত দিয়ে চেপে রক্ত বন্ধ করলাম। ততক্ষণে আসেপাশের লোকজন ছুটে এসে উদ্ধার কাজ শুরু করেছে।
বাস আনুমানিক ৬ ফিট নিচে উল্টে পড়েছিল। ভাঙা জানালার ফাঁক দিয়ে বাচ্চাদের টেনে বাইরে থেকে বের করে নিচ্ছিল উদ্ধারকারীরা। আমার তিন বাচ্চাকে উঁচু করে তাদের মাধ্যমে বের করে দিল ওদের বাবা। তারপর নিজেদের কাছের ব্যাগ জুতা কুড়িয়ে ভাবছিলাম কিভাবে বের হব সবাই! বাইরে তখন আম্বুলেন্স আর মানুষের ভয়ার্ত আহাজারি।
হটাৎ আমাদের পাশে বসা মহিলার কথা মনে হল। এক মুহূর্তে সে যেন উধাও হয়ে গেছে কোথাও । তাকে অনেক খুঁজলাম কোথাও পেলাম না। এরই মধ্যে দু’জন লোক এসে সুরঙ্গ মত করে নিচের দিক থেকে আমাদেরকে বের হতে সাহায্য করল। রাস্তার উপর উঠে আমার উনি আমার গায়ের শাল পেতে শুয়ে পড়লেন রাস্তায়। আমার ছেলেমেয়েরা ভয়ে আব্বু আব্বু করে কাঁদছে।
আমি ভাঙ্গা হাত উঁচু রেখে অন্য হাতে তার পালস দেখলাম। মনে হলো ঠিক আছে। বললাম
চোখ খোলো, কথা বল, কোথায় কি হচ্ছে জানাও।
অস্ফুট স্বরে সে বলল, ‘ব্যথা, ব্যথা, পিঠে অনেক ব্যথা……
(চলবে)

পরের পর্ব-বেঁচে ফেরার সত্যি গল্প (দ্বিতীয় ও শেষ পর্ব)

বিঃ দ্রঃ লেখকের জীবনের সত্য ঘটনা অবলম্বনে 

লেখকঃ সাহিত্যিক ও শিক্ষক 

আরও পড়ুন