ব্যক্তিসত্তা সম্পর্কে সাইকোলজি কি বলে?

মো: মিরাজুল ইসলাম

সমাজে প্রত্যেক ব্যক্তি, জনগোষ্ঠী তাদের নিজেদের বিশ্বাস, আদর্শ, ঐতিহ্য, সংস্কৃতি, ধর্ম, মূল্যবোধ, চিন্তন, দর্শন, ইত্যাদি নিয়ে বেড়ে উঠতে চায়। তারা চায় নিজেদের স্বাভাবিক ও স্বাধীনচেতা মনোভাব। কিন্তু কখনো কখনো সাম্রাজ্যবাদের আগ্রাসন এবং অধীনতার শৃঙ্খলার জাঁতাকলে আবদ্ধ থাকার ফলে তাদের বিশ্বাস, আদর্শ, ঐতিহ্য, সংস্কৃতি, ধর্ম, মূল্যবোধ, চিন্তন,দর্শন, ইত্যাদির জলাঞ্জলি দিতে হয়। তবে তারাও অন্যদের আদর্শের কাছে মাথা নত করতে চায় না। এটাই প্রকৃতির নিয়ম। একদিকে নিজেদের বাস্তব সত্তার বিকাশ সাধন করার মত পরিবেশ সৃষ্টি হচ্ছে না, অন্যদিকে অন্যদের আদর্শের কাছে নিজেদের অস্তিত্ব বিক্রি করতে হচ্ছে। তাই এসব ব্যক্তি বা জনগোষ্ঠী সন্ত্রাস, অপরাধ, ইত্যাদির আশ্রয় নিচ্ছে অথবা দুশ্চিন্তা, হতাশা, অশান্তির পাহাড়, অপূর্ণতা ইত্যাদি নিয়ে ভুগছে।

আগেই বলছি, এরা পরিবেশের ইতিবাচক মনোভাব পোষণের অভাবে নিজেদের ব্যক্তি সত্তার উন্নতি করতে পারেনি, তবে অন্যদের ইচ্ছার প্রতিফলনও তারা চায় না। তাদের অধিকার নিয়মিতভাবে লুণ্ঠন করা হচ্ছে। নেই তাদের কথা বলার অধিকার, না আছে মুক্তচিন্তার বিকাশ, তাই বিচ্ছিন্নতাবাদ-ই তাদের শিক্ষণ হয়ে দাঁড়ায়।

আমরা যদি সিরিয়া, লিবিয়া, ইত্যাদির বিচ্ছিন্নতাবাদদের সৃষ্টির দিকে তাকাই, তবে এমন উদাহরণ স্পষ্ট হবে।

আবার কোথায়ও ধনতন্ত্রের আগ্রাসন, কিন্তু জনগোষ্ঠী চায় সমাজতন্ত্র, এই দু’য়ের মাঝে তালমিলাতে না পেরে তারা হয়ে ওঠে বিচ্ছিন্নতাবাদী। যদি আমরা চীনের নিয়ন্ত্রিত হংকং এর অবস্থাটা বিচার করি, তবে এটা আমাদের কাছে স্পষ্ট হবে। হংকং এর জনগণ দীর্ঘদিন ধরে বাজার অর্থনীতি তথা মুক্ত অর্থনীতির সাথে সম্পৃক্ত। কিন্তু চীন সরকার তাদেরকে সমাজতন্ত্রের জাতাঁকলে দিনের পর দিন পিষে পিষে মারতেছে। নিরাপত্তা আইন থেকে শুরু করে নানান নিয়ম-কানুন সৃষ্টি করে হংকং এর জনগণের সত্তাকে ধ্বংস করে দিচ্ছে।

আবার উল্টোটাও হয়। ঠিক এমনটাই দেখা যাচ্ছে ভারত-নেপালের মাওয়াবাদীদের মাঝে। এরা চায় সমাজতন্ত্র, কিন্তু দেশ তাদেরকে গণতন্ত্রের বেড়াজালে বন্দী করে রেখেছে। তাই তারাও দিনের পর দিন বিচ্ছিন্নতাবাদের ঝুঁকছে।

মনে করার চেষ্টা করুন,

১৯৭৯ সালে সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নের আফগানিস্তানে আগ্রাসনের কথা। তখন আফগানিস্তানের জনগোষ্ঠী কিছুটা ধর্মীয় ও গণতন্ত্রের ধারায় বিশ্বাসী ছিল । কিন্তু আগ্রাসী সোভিয়েত ইউনিয়নের চাপিয়ে দেওয়া সমাজতন্ত্র মেনে নিতে না পেরে তালেবানদের মত আরো অনেক জনগোষ্ঠীর সৃষ্টি হয়। যারা পূর্বে নিরস্ত্র থাকলে সোভিয়েত আগ্রাসন রুখতে অর্থাৎ নিজেদের ব্যক্তি সত্তা, নিজেদের সংস্কৃতি, মূল্যবোধ, বিশ্বাস ইত্যাদি ঠিক রাখতে সশস্ত্র হতে বাধ্য হয় যা অন্যদের চোখে তারা সন্ত্রাসী হিসেবে সংজ্ঞায়িত হয়।

তুর্কী-সিরিয়া-ইরাকের কুর্দি ওয়াইপিজি, ভারতের উলফা, কলম্বিয়ার ফার্ক,মিয়ানমারের কাচিন বিদ্রোহ, এগুলো একই কারণে উৎপত্তি। তারা তাদের নিজস্ব বাস্তব সত্তার বিকাশে ইতিবাচক মনোভাব তো পায়নি, বরং নেতিবাচক দৃষ্টির চরম স্বীকার। তাই তারা একসময় বিচ্ছিন্নতাবাদের আশ্রয় নিয়েছে।

✳️তো এই ব্যক্তিসত্তা বা সেলফ্ কি?

কার্ল রজার্স এর একটা গুরুত্বপূর্ণ কনসেপ্ট হল: “Self”.
Self: একজন ব্যক্তি তার পরিপার্শ্ব থেকে যে অভিজ্ঞতা অর্জন করে, তা-ই ব্যক্তিসত্তা বা self। অর্থাৎ, একজন ব্যক্তির ব্যক্তিত্বটাই self. এককথায়, বক্তির নিজস্ব সত্তা, নিজের অস্তিত্বটাই ব্যক্তিসত্তা বা সেলফ্।

এই সত্তা বা সেলফ্ এর বৃদ্ধি হওয়ার অন্যতম মাধ্যম হলো ব্যক্তির পরিবেশ থেকে “ইতিবাচক দৃষ্টি ” (Positive Regard)।
✳️যেমন :
➡️ ব্যক্তিকে ভালোবাসা,
➡️তার ব্যক্তিত্বকে শ্রদ্ধা করা,
➡️সর্বাবস্থায় ব্যক্তির ব্যক্তিত্বকে গ্রহণ করা(Acceptance),
➡️ ব্যক্তির প্রতি যত্নশীল হওয়া,
➡️ব্যক্তির যোগ্যতাকে খাটো করে না দেখে তা মূল্যায়ন করা,
➡️ব্যক্তির চাওয়া-পাওয়ার প্রতি শ্রদ্ধাশীল হওয়া।

মনে রাখতে হবে, এই “ইতিবাচক মনোভাব”( self regard) টা কোনো শর্ত ছাড়াই (unconditional) হতে হবে। কিন্তু সমস্যাটা হলো, বাল্যকাল থেকেই আমাদেরকে এক প্রকার শর্তযুক্ত (conditional) করেই পরিবার, সমাজের মনোভাবে জোর করে বাধ্য করা হয়, যার কারণে “আদর্শিক সত্তা” (Ideal Self) এবং “বাস্তব সত্তা” ( Real self) এর মাঝে একটা সাংঘর্ষিক অবস্থা  রয়েই যায়। তখন ব্যক্তি তার ব্যক্তিত্বকে প্রায়ই হারিয়ে ফেলে। অন্যের চাওয়া-পাওয়ার কাছে নিজের “সম্ভাব্য সুপ্ত গুণাবলিকে” (potentiality) জলাঞ্জলি দিতে হয়।

🟩আদর্শিক সত্তা (Ideal Self) এবং বাস্তব সত্তা(Real Self) এর মাঝে পার্থক্য:

আদর্শিক সত্তা:
➡️এ ধরণের ব্যক্তিত্ব গঠন করার জন্য ব্যক্তিকে সংগ্রাম করতে হয়।
➡️নিজের অস্তিত্ব হারিয়ে ফেলে।
➡️ব্যক্তি ভারসাম্যহীন হয়ে যেতে পারে।
➡️অন্যদের প্রতি নির্ভরশীলতা বেড়ে যায়।
➡️নতুন অবস্থার সাথে খাপ খাওয়াতে গিয়ে মানসিক চাপের সৃষ্টি হয়।
➡️এরা নেশার জগতে চলে যেতে পারে।
➡️এসব মানুষ ভীতু প্রকৃতির।
➡️কোনো কিছুতে এরা স্থির হতে পারে না।
➡️এদের মাঝে সবকিছুতে একটা সন্দেহ বা অপূর্ণতা কাজ করে।
➡️এরা মনে করে তাদের সবকিছুকে অন্যরা বিচার করে। তাই তারা অন্যদের ইচ্ছার চাওয়ার মত হওয়ার জন্য দিয়ে হতাশার মাঝে ডিবে যায়।

বাস্তব সত্তা:
➡️ বক্তি নিজে যা, তাই ব্যক্তির বাস্তব সত্তা।
➡️সমাজের উষ্ণ মনোভাবের মাধ্যমে ইহার বৃদ্ধি ঘটে।
➡️নিজেকে নিজে জানতে পারে।
➡️নিজের পারদর্শিতা এবং বুদ্ধিমত্তা দিয়ে শুধু নিজেকেই নয়, একটা জনগোষ্ঠীর মাঝে আমূল পরিবর্তন সাধিত করতে পারে।
➡️এরা স্বয়ংসম্পূর্ণ হতে পারে।
➡️এরা পরিবর্তনশীল পরিবেশের সাথে খাপ খাওয়াতে পারে।
➡️এরা সাহসী হয়।
➡️এরা জীবনের সুখী।
➡️এরা সবকিছুতে সন্তুষ্ট থাকে।
➡️এরা কারোর বিচার-বিবেচনা নিয়ে মাথা ঘামায় না।

লেখকঃ কলাম লেখক ও মাস্টার্সের ছাত্র, মনোবিজ্ঞান, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় 

আরও পড়ুন