যুক্তি ছাড়া নৈতিকতা সাংঘর্ষিক

এইচ বি রিতা

আমি তখন খুব ছোট। সম্ভবত পঞ্চম শ্রেণিতে পড়ি। আমার বাবার রাজনৈতিক কার্যকলাপের সুবাদে সে সময়টাতে দেখতাম বাড়ির বিশাল ফটক সারাদিন খোলা থাকতো। যে কোন সময় যে কেউ চলে আসতো বাড়িতে।
ভিক্ষুকদের (শব্দটার ব্যাবহার আমার অপছন্দ, অন্য কোন শব্দ জানা নেই) যাতায়াত চলতো মাঝ রাত পর্যন্ত। আমার দাদী কখনোই তাদের খালি হাতে ফিরাতেননা।

একদিন এক বৃদ্ধ মহিলা তার সাত বছর বয়সী নাতনীকে নিয়ে চাল নিতে এলেন। নাতনীর গায়ের জামাটা ছিল খুব অপরিষ্কার এবং ছেঁড়া। শরীরের প্রায় পুরোটাই দৃশ্যমান। দেখে আমার খুব কান্না পেল। সে সময়ের শিশু আমি ভাবছিলাম, ‘আমার এত সুন্দর জামা আছে, ওর কেন নেই!’
মাকে বললে অবশ্যয়ই একটা জামা দিত তাকে। কিন্তু ততটা বিবেচনায় রাখার মত বয়স যে ছিলনা।

সেদিনই আমি আম্মার একটা শাড়ি আলমারি থেকে চুরি করে রাখলাম। পরদিন সেই বৃদ্ধ মহিলা আবারো আসলেন নাতনী নিয়ে। চুরি করা শাড়িটা উনার আঁচলে লুকিয়ে দিয়ে দিলাম সেই মেয়েটির জন্য একটা জামা বানাতে। শাড়ি কেটে জামা বানাতেও যে টাকার দরকার কিংবা চুরি করা যে অপরাধ, সেই বোধটুকুও আমার ছিলনা তখন। শুধু মনে হয়েছিল, ‘আমার আছে, ওর নাই কেন?’

একেক জনের দৃষ্টিভঙ্গিতে আমার এই আচরণ একেক রকম হতে পারে। তবে আমি বিচার করবো ভিন্ন ভাবে।
চুরি করে অসহায় একটি শিশুর শরীরে কাপড় দেয়া নৈতিক এবং অনৈতিক আচরণ দু’টোকেই সংজ্ঞায়ীত করে। কারণ
নৈতিকতা আমাদের শেখায় চুরি করা বা অন্যের সম্পদ হরণ করা পাপ, অন্যায়। সেক্ষেত্রে চুরি করা ছিল আমার ‘‌অনৈতিক’ আচরণ। আবার চুরির মত অন্যায় কাজটা করার পিছনেও আমার যথার্থ কারণ ছিল এবং সেটাই এখানে ‘যুক্তি’। যুক্তিটা হল-শিশুটি অর্ধনগ্ন ছিল।
এবং এই যুক্তিটা এতটাই শক্ত যে, এটা আমার অপরাধকে মায়ের কাছে শাস্তি পাওয়া থেকে কিছুটা শীথিল করে দিয়েছিল। যুক্তিকে পাশ কেটে নৈতিকতার পাশে দাঁড়ানো মানে কখনো কখনো মানবতা লঙ্ঘন করা।

যেহেতু আমরা মানুষ, আমরা বিশ্বাস করি যে, মানব জীবনের উন্নতি ও বিকাশ লাভে আমাদের ন্যায়বিচার এবং নৈতিকতার প্রয়োজন রয়েছে। আবার যুক্তি ছাড়া একটি নৈতিক কর্মও অনৈতিক হতে পারে।
নৈতিকতা বনাম যুক্তি (morality vs reasoning) একে অপরের সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। অর্থাৎ সব সময় দু’টি সহাবস্থানে থাকে।

নৈতিকতার ধারণাটি আমাদের ব্যাক্তিগত আদর্শ, আশেপাশের পরিবেশ এবং তাদের সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় বিশ্বাস ব্যবস্থার আকারকে ধারণ করে। একে অস্বীকার করা মানে সভ্যতা হতে দূরে সরে আসা।
অপরপক্ষে, যুক্তি আমাদের দৈনন্দিন জীবনের এক স্তম্ভ যা বিদ্যমান তথ্যের উপর ভিত্তি করে অনুশীলন, প্রতিষ্ঠান এবং বিশ্বাসকে ন্যায্যতা বা ন্যায়সঙ্গত করার ক্ষমতা রাখে।

জ্ঞানচর্চায় যুক্তির ব্যবহার আমাদের নৈতিকতা বোধকে শিথিল করে দিতে পারে। আবার নৈতিকতা থেকে মুক্ত থাকার কারণ আমাদের মানবাধিকার লঙ্ঘনের দিকেও পরিচালিত করতে পারে। এই দুটি বৈশিষ্ট্য পারস্পরিক একচেটিয়া নয়, বরং তারা একটি জটিল সম্পর্কের মধ্য দিয়ে জড়িত।
উদাহরণস্বরূপ, একটি উপজাতির পক্ষে নিয়মতান্ত্রিক গণহত্যায় প্রতিদ্বন্দ্বী উপজাতির সমস্ত সদস্যকে হত্যা করা যুক্তিসঙ্গত। সর্বোপরি এটিই অন্য উপজাতির আক্রমন হতে নিজ উপজাতিকে রক্ষা করার একমাত্র উপায়। তবে নৈতিকতা এবং ন্যায়বিচার আমাদের বলে যে, শত শত নিরীহ মানুষ, বিশেষত শিশুদের হত্যা করা একটি নৃশংসতা। আবার অন্যদিকে একই বিষয়টি যুক্তিহীন নৈতিকতায় পড়তে পারে যা একটি সমাজের জন্য চরম ক্ষতিকারক হতে পারে।

ধরুন মিষ্টার জন একজন খুনি। তিনি নিজেকে রক্ষা করতে গিয়ে কাউকে খুন করেছেন। এখন আমার নৈতিকতা আমাকে বলছে যে, তাকে ক্ষমা করা উচিৎ কেননা তিনি পরিস্থিতির শিকার। কিন্তু এখানে আপনার নৈতিকতা আপনাকে বলছে যে, পরিস্থিতি যতই খারাপ হোক না কেন খুন করা অপরাধ।
তাহলে এখানে কে সঠিক? আপনি না আমি?
এক্ষেত্রে ভুল, সঠিক নির্ণয় করার আগে আমাদের প্রথমে হত্যাকাণ্ড কী তা সংজ্ঞায়িত করতে যুক্তি ব্যবহার করতে হবে। তারপরে যা ঘটেছিল তা হত্যাকাণ্ড কিনা তা নির্ধারণ করতে হবে সকল প্রমাণগুলি মূল্যায়ন করতে হবে। এবং এখানে কোনও ব্যতিক্রম কিছু ঘটেছিল কিনা বা আছে কিনা তা নির্ধারণ করতে হবে।

প্রশ্ন করতে পারেন, নৈতিক সিদ্ধান্তের সাথে কারণ যুক্ত হওয়ার কী আছে?
স্কটিশ আলোকিত দার্শনিক, ইতিহাসবিদ, অর্থনীতিবিদ, গ্রন্থাগারিক ও প্রাবন্ধিক ডেভিড হিউম তাঁর ‘ট্রিটাইজ অন হিউম্যান ন্যাচার গ্রন্থ্য’টিতে এই প্রশ্নের উত্তর খুব স্পষ্টভাবে এবং সুনির্দিষ্টভাবে দিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘আমাদের মতে অপরাধ একটি নির্দিষ্ট ব্যক্তিত্ব এবং একটি নির্দিষ্ট পরিস্থিতির সাথে সম্পর্কিত বিভিন্ন উদ্দেশ্য, চিন্তাভাবনা বা ক্রিয়াকলাপ ছাড়া আর কিছুই নয়। আমরা সেই সম্পর্কটি তদন্ত করতে পারি, চুক্তির উৎস এবং কর্মক্ষমতা ব্যাখ্যা করতে পারি। তবে এখানে যখন আমরা আমাদের আবেগকে কথা বলতে দিই, তখন তদন্ত অস্বীকৃতি পায় এবং সেই পুরো বিষয়টাই নৈতিকভাবে মন্দ হিসাবে কাজ করে যা অনৈতিক ও মানবাধীকার লঙ্ঘন।’

মূল কথা, যুক্তি ছাড়া কোনও অগ্রগতি, উদ্ভাবন বা সত্য সন্ধান করা সম্ভব নয়।
কেন ব্যাক্তির যুক্তি ব্যবহারে সঠিক এবং ভুলের মধ্যে পার্থক্য নির্ধারণ করার চেষ্টাকে নৈতিক যুক্তি প্রক্রিয়া হিসাবে সংজ্ঞায়িত করা হয়। এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ দৈনন্দিন প্রক্রিয়া যা আমরা প্রায়শই সঠিক কিছু করতে ব্যবহার করে থাকি। প্রতিদিন আমরা একটি নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে মিথ্যা কথা বলতে হবে কি না, তা নিয়ে দ্বিধায় পড়ে যাই। আমরা সম্ভাব্য ক্রিয়াকলাপগুলির নৈতিকতা যুক্তি দিয়ে এবং সম্ভাব্য পরিণতির বিরুদ্ধে তাদের ক্রিয়াগুলি মাপার মাধ্যমে এই সিদ্ধান্ত নেই।

যেমন-প্রবাসী আমাদের কাউকে দেশ থেকে পরিবারের স্বজনরা ফোন করে শারীরিক অবস্থা জানতে চাইলে প্রায়শই আমরা ‘ভাল আছি’ বলে মিথ্যা বলি। কিংবা মন্দ থেকেও ‘ভাল আছি’ বলবো কিনা তা নিয়ে দ্বিধায় পরে যাই। কেন করি এটা? কারণ, আমরা দূর দেশে থেকে চাইনা পরিবারের কেউ আমাদের নিয়ে চিন্তিত হোক, ব্যাথিত হোক। কাউকে ভাল রাখার উদ্দেশ্যে মিথ্যা বললেও এখানে নৈতিক যুক্তি প্রক্রিয়া বিদ্যমান।
আবার যখন পরিবারের স্বজনদের এড়াতে আমরা অহেতুক বলি, ‘ভাল নেই’, তখন সেটা অনৈতিক যুক্তি প্রক্রিয়া, কেননা আমরা মিথ্যা বলে পরিবারের স্বজনদের হয়রান করছি, বিভ্রান্ত করছি।

লেখকঃ সাহিত্যিক, শিক্ষক, সাংবাদিক ও ইউএসএ প্রবাসী 

আরও পড়ুন