একজন আবরার ও আমাদের নৈতিক অবক্ষয়ঃ জাপানের শিক্ষা ব্যবস্থার অভিজ্ঞতা থেকে উত্তরণের উপায়

এ. টি. এম. রফিকুল ইসলাম

দেশের সর্বশ্রেষ্ঠ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় বুয়েটের মেধাবী শিক্ষার্থী আবরার ফাহাদকে তার ফেসবুক স্ট্যাটাসের কারণে হত্যা করা হলো। দেশের শ্রেষ্ঠ মেধাবীরাই কেবল এই দেশ সেরা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে অধ্যায়নের সুযোগ পায় । যে বা যারা আবরার কে হত্যা করল তারাও এই বুয়েটের ছাত্র অর্থাৎ তারাও মেধাবী ; শুধু মেধাবী নয় বরং দেশ সেরা মেধাবী । অর্থাৎ ভালো মেধাবী মানেই সে একজন নৈতিক ও মানবিকতা সম্পন্ন ভালো মানুষ, তা নয় ।

আমরা সম্ভবত আমাদের নৈতিক বিপর্যয় এর চরম সীমায় অবস্থান করছি ; নৈতিক মূল্যবোধের অভাবে দিন দিন সামাজিক অস্থিরতা বাড়ছে । তুচ্ছ ঘটনা বা সামান্য স্বার্থের জন্য কত মানুষকে জীবন পর্যন্ত দিতে হচ্ছে । নৈতিক বা অনৈতিক যেভাবেই হোক আমরা নিজের স্বার্থ হাসিল করতে মরিয়া । দৈনন্দিন জীবনে নৈতিকতা ও মূল্যবোধের অবক্ষয় দিনদিন বেড়েই চলছে যার লাগাম না টানলে জাতিকে চরম মাসুল দিতে হতে পারে । এখনি এই অবস্থা থেকে উত্তরণের যথাযথ পদক্ষেপ না নিলে জাতি হিসেবে আমরা ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে যাব ।

যে দেশে দিনের আলোয় জনসম্মুক্ষে একজন স্ত্রীর সামনে তার স্বামীকে হত্যা করা হয় সেদেশের মানুষের নৈতিকতা কোন পর্যায়ে পৌঁছেছে তা আমরা অনেক আগেই উপলব্ধি করেছি ,আমরা বিশ্বজিৎ হত্যা দেখেছি, দিনের আলোয় জনসম্মুখে নৃশংসভাবে কুপিয়ে হত্যা করা হয়েছে তাকে । প্রতিনিয়ত আমাদের দেশের মা-বোনেরা এমনকি শিশুরা পর্যন্ত ধর্ষণের শিকার হচ্ছে , এ সব কিছুই আমাদের নৈতিকতা বিপর্যয়ের চরম অবক্ষয়ের ফলাফল । সম্ভবত আমাদের প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা ব্যবস্থা ও পারিবারিক শিক্ষা ব্যবস্থার গলদ এর কারনে আমাদের নৈতিকতার আজ এই বিপর্যয় ও মূল্যবোধের চরম অবক্ষয় ঘটেছে ।

আমাদের দেশের পিতা-মাতারা তাদের সন্তানকে মেধাবী শিক্ষার্থী হিসেবে গড়ে তোলার জন্য তাদের সর্বোচ্চ চেষ্টাটুকু করে থাকেন কিন্তু সে একজন ভাল মানুষ হিসেবে গড়ে উঠছে কিনা তার চেষ্টা আমরা কতটুকু করি ? আমরা শুধু আমাদের সন্তানদের জিপিএ-5 পাওয়ার পিছনে ছুটে বেড়াই । আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থায় শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের পাঠ্যসূচিতে অনেক বিষয় অন্তর্ভুক্ত করলেও নৈতিকতা ও মানবিক মূল্যবোধ সম্পর্কিত বিষয় খুব কমই অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে এবং যা খুবই অপ্রতুল ও নগণ্য । আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থায় আমরা আমাদের সন্তানদেরকে শিশু বয়স থেকেই এত এত বইয়ের ভারে নুইয়ে ফেলি যে, ফলশ্রুতিতে তারা মেধাবী হয় ঠিকই কিন্তু একজন ভালো মানুষ হয়ে উঠে না । কিন্তু নৈতিকতা বিপর্যয়ের ভয়াবহ এই অবস্থা থেকে আমাদের উত্তরণের উপায় কি ?

উত্তর হতে পারে, এক্ষেত্রে আমরা জাপানের শিক্ষা ব্যবস্থার অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগাতে পারি । জাপানিরা নৈতিক ও মানবিক মূল্যবোধসম্পন্ন সুশৃংখল অমায়িক চরিত্রের অধিকারী একটি জাতি হিসেবে পরিচিত । কিন্তু যে জাতি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আগ পর্যন্ত পৃথিবীর বর্বর জাতি গুলোর মধ্যে অন্যতম খারাপ একটি জাতি হিসেবে পরিচিত ছিল তারা আজ এত ভদ্র নৈতিক ও মানবিক মূল্যবোধ সম্পন্ন এবং সুশৃংখল জাতি কেন? এই পরিবর্তন জাপানিরা হাজার বছর ধরে লালন করে আসেনি, মূলত এই পরিবর্তন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর খুব হঠাৎ করেই শুরু হয়েছে ।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের নির্মমতা আর মানবতা জাপানিদের চেয়ে আর বেশি কেউ উপলব্ধি করতে পারেনি, কেননা মানবজাতির ইতিহাসে প্রথম ও দ্বিতীয় পারমাণবিক নিউক্লিয়ার বোমার আঘাত যে শুধু তাদেরকেই সইতে হয়েছে । দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের শেষ দিকে ১৯৪৫ সালে পৃথিবীর ইতিহাসে প্রথম ও দ্বিতীয় পারমাণবিক হামলার শিকার হয় জাপান । দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের এই ভয়াবহতা থেকে শিক্ষা নিয়ে “যুদ্ধ নয় শান্তি” এই আদর্শকে সামনে রেখে তারা দেশ গড়ায় মনোযোগ দেয় । এবার আসি জাপানীরা কেন এত ভদ্র শান্তিপ্রিয় নৈতিক ও মানবিক মূল্যবোধ সম্পন্ন ও সুশৃংখল জাতি । এক কথায় এই প্রশ্নের উত্তর হলো-জাপানের আছে অবিশ্বাস্য একটি সুন্দর শিক্ষা ব্যবস্থা; যা তাদেরকে এই ভদ্র শান্তিপ্রিয় নৈতিক ও মানবিক মূল্যবোধ সম্পন্ন সুশৃংখল একটি জাতিতে পরিণত করেছে ।

জাপানের শিক্ষাব্যবস্থার একটি বড় অংশজুড়ে রয়েছে নৈতিক শিক্ষা। তাদের বিশ্বাস, আগে নীতিনৈতিকতা, পরে পাঠ্য শিক্ষা। জাপানে ১০ বছর বয়স পর্যন্ত অর্থাৎ চতুর্থ গ্রেড পর্যন্ত কোনো ধরনের পুঁথিগত বিষয়ে পরীক্ষা না নিয়ে শিশুদের শারীরিক, মানসিক এবং নৈতিক বিকাশের দিকেই বিশেষভাবে নজরদারি করা হয়। স্কুলজীবনের প্রথম তিন বছর মেধা যাচাইয়ের জন্য নয়; বরং ভদ্রতা, নম্রতা, শিষ্টাচার, দেশপ্রেম ও ন্যায়পরায়ণতা শেখানো হয়। জাপানিরা নম্রতা, ভদ্রতা বা নীতিনৈতিকতায় পৃথিবী খ্যাত। শুধু বয়সে বড় হওয়া নয়, বরং মনুষ্যত্বের বৈশিষ্ট্য তাদের চরিত্রে যেন প্রতিফলিত হয় এবং আদর্শ মানুষ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হতে পারে এ সময় শুধু এই প্রয়াসই চালানো হয়। স্কুলকে জীবন যুদ্ধের প্রস্তুতি নেওয়ার স্থান হিসেবে না দেখিয়ে জীবনকে সুন্দর করার একটি মিলনস্থান হিসেবে প্রদর্শন করার চেষ্টা করছে জাপান সরকার। ধারণাটি নিতান্তই সহজ-সরল হলেও এই বিষয়টির কারণেই জাপানের শিক্ষা ব্যবস্থা সব থেকে আলাদা এবং ভালোও বটে। জাপানে শিশুদের স্কুলে পড়ালেখার পাশাপাশি আদব-কায়দা শেখানোর বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে দেখা হয়ে থাকে। গুরুজনদের সম্মান করা, মানুষের সাহায্যে হাত বাড়িয়ে দেওয়া, সবাই মিলে কাজ করা ইত্যাদি শিক্ষা একদম ছেলেবেলায় জাপানিদের মনে গেঁথে দেওয়া হয়।

স্কুলে ভর্তির পর থেকে প্রথম চার বছর পর্যন্ত শিশুদের তাদের দোষ-গুণের মানদণ্ডে বিচার করা হয় না। তাদের মধ্যে কে ভাল বা কে খারাপ সে বিচার না করে বরং কোনটা ভাল, কোনটা খারাপ, কোনটা ঠিক, কোনটা ভুল সে শিক্ষা দেওয়া হয়। এর পাশাপাশি মানুষের সঙ্গে কেমন ব্যবহার করা উচিত, বা কার সঙ্গে কীভাবে কথা বলতে হয় ইত্যাদি নীতিগত শিক্ষা প্রদানের ওপর জোড় দেওয়া হয়। শুধু তাই নয়,পাশাপশি প্রকৃতির মধ্যে পশু-পাখির সঙ্গে কেমন আচরণ করতে হয়,-সেই শিক্ষাও ছাত্র-ছাত্রীরা স্কুল থেকেই পায়। শুধু তাই নয়, শিশুরা যাতে খুব অল্প বয়স থেকে স্বনির্ভর হয়ে উঠতে পারে, তার জন্য, জামাকাপড় পড়া, নিজে হাতে খাবার খাওয়া, নিজের জিনিস নিজেই গুছিয়ে রাখার মতো ছোট ছোট কাজ হাতে ধরে শিখিয়ে দেন শিক্ষক-শিক্ষিকারা।

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী তাঁর সর্বশেষ জাপান সফর শেষে তিনি বাংলাদেশকে জাপান বানাবো এই আশাবাদ ব্যক্ত করেছিলেন। প্রধানমন্ত্রীর এই আশাবাদ অনুযায়ী বাংলাদেশকে জাপান বানাতে হলে প্রথমেই আমাদেরকে নৈতিক ও মানবিক মূল্যবোধ শিক্ষা অর্জন করতে হবে । আর এই শিক্ষা আমরা জাপানের শিক্ষা ব্যবস্থার অভিজ্ঞতার আলোকেই গ্রহণ করতে পারি । কাজেই পরিবার এবং স্কুল জীবনের প্রথম থেকেই শুরু হোক নৈতিক ও মূল্যবোধের শিক্ষা অর্জন । শিক্ষার লক্ষ্য হোক সত্যিকারের মানুষ হওয়া । আর যেন কোন মাকে তার সন্তানের লাশ বুকে টেনে কাঁদতে না হয় ; আর যেন কোন বাবাকে তার সন্তানের লাশ কাঁধে নিয়ে বইতে না হয় । সঠিক তদন্তের মাধ্যমে আবরার হত্যায় জড়িতদের উপযুক্ত বিচার প্রত্যাশা করি । আবরারের জন্য ন্যায়বিচার ।

লেখকঃ বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী অধ্যাপক  ও জাপানের হিরোশিমা বিশ্ববিদ্যালয়ের পিএইচডি গবেষক

আরও পড়ুন

উত্তর দিন

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রচার করা হবে না.