রোবটিক বিচার এবং মানবিক ঘাটতি

মানছুরা আক্তার

ন্যায়বিচার বা জাস্টিসকে দুইরকমভাবে দেখা যেতে পারে। লিগ্যাল জাস্টিস হলো প্রচলিত আইনের আলোকে ন্যায়বিচার বা আইনের ব্যখ্যার আলোকে আসা বিচারিক সিদ্ধান্ত। সোশ্যাল জাস্টিস বা সামাজিক ন্যায়বিচার হলো এমন বিচার যা দৃশ্যত ন্যায়বিচার বলে যেকোনো সুস্থ ব্যক্তি/প্রুডেন্ট হিউম্যান/সাউন্ড মাইন্ডেড পারসন এর বিবেচনায় ন্যায়বিচার বলে প্রতীয়মান হয়। দ্বিতীয়োক্তের ক্ষেত্রে আদালত ঠিক “জুডিশিয়াল রোবট” হয়ে আইনের অক্ষরগুলোকে “স্বর্ণের নিক্তিতে” ব্যাখ্যার চেয়ে বেশি কিছু করেন। বিচারিক সিদ্ধান্তের অক্ষরমালায় বিচারক মহোদয় এমন ছন্দ আনেন যে বিচার শুধুমাত্র “ভার্ডিক্ট” এ সীমাবদ্ধ না থেকে তার সাথে যুক্ত হয় এক টুকরো দারুণ “রেশিও ডিসাইডেন্টি”। ঐ এক টুকরো রেশিওতেই তিনি লিখে রাখেন সাক্ষ্য-প্রমাণ বিশ্লেষণ করে পাওয়া ঘটনাবলী, তিনি লিখে রাখেন সিদ্ধান্তের পেছনের যুক্তিসংগত কারণ, লিখে রাখেন একখানি যৌক্তিক মস্তিষ্কের সঠিক ব্যবহারের প্রমাণচিহ্ন, লিখে রাখেন বিচারকের বোতামআটা পোষাকের নিচে ঢেকে রাখা একখানি মানবিক হৃদয়। এই জাস্টিসকে আপনারা ” কাব্যিক ন্যায়বিচার” বা “পোয়েটিক জাস্টিস” বলেও ডাকতে পারেন। তখন আইনবিদের কলমে লিখিত হয়, ” Justice should not only be done, but manifestly and undoubtedly seen to be done!” এমন বিচারিক রায় এমনকি লেজিসলেশন/আইনের ত্রুটি সংশোধনেও ভূমিকা রাখতে পারে।

জুডিশিয়াল রোবটিজম এর উর্ধ্বে উঠে যৌক্তিক/মানবিক/সামাজিক/কাব্যিক ন্যায়বিচার কেবল যে বিচারক মহোদয়কে তার পাঠকের দৃষ্টিতে নন্দিত এবং কর্মদক্ষ প্রমাণ করে তাই নয়, বরং পুরো সমাজকে মুখাপেক্ষী, আস্থাশীল ও শ্রদ্ধাশীল করে রাখে বিচারব্যবস্থার প্রতি। সম্ভাব্য আসামী সন্ত্রস্ত হয়ে আত্মসংযম অভ্যেস করে, ঘটিত অপরাধের ভিকটিম প্রতিহিংসা সংবরণ করে মুখোমুখি হয় আদালতের। কিন্তু জাস্টিস যখন কেবল লিগ্যাল জাস্টিস, তখন তাতে আশংকা থাকে মানবিক বিচারকের বদলে একজন জুডিশিয়াল রোবটের অস্তিত্বের। আশংকা থাকে কাগুজে পক্ষপাতিত্ব কিম্বা আইন রচয়িতা বা অন্য প্রভাবশালীর প্রভাবের। এ ধরনের বিচারিক সিদ্ধান্ত যেকোনো ত্রুটিপূর্ণ আইনের বাস্তবায়নে ভূমিকা রাখতে সক্ষম।

বিচারবিভাগের প্রতি আস্থাহীনতা সমাজে যে প্রভাব ফেলতে পারে:

ক) অপরাধীর আইনভীতি না থাকায় অপরাধের মাত্রা বাড়তে থাকা

খ) ভুক্তভোগীর বিচারব্যবস্থায় আস্থা না থাকায় প্রতিশোধপরায়নতা বাড়তে থাকা যা নতুন অপরাধের জন্ম দেয়।

জুডিশিয়াল রোবটের হাতে কাগুজে বিচার মূলত অবিচার। এমন বিচারে প্রকৃত অপরাধী মুক্তি পেয়ে অপরাধমালা চালিয়ে যেতে পারে কিংবা নিরপরাধী সাঁজা পেয়ে ভিক্টিম হতে পারে। কিংবা সম্পূর্ণ সঠিক বিচার হওয়া সত্ত্বেও মানুষের হৃদয়ংগম না হওয়ার কারণে এমন বিচার একটি আস্থাহীনতার পরিবেশ তৈরি করে। এমন ব্যবস্থা মূলত একটি দুষ্টচক্রের জন্ম দেয়। তারা বিচারিক ব্যবস্থার ভিক্টিম, তাই তারা বিচারব্যবস্থা/এডমিনিস্ট্রেশন অফ জাস্টিস এ আস্থাহীন, বিচারব্যবস্থায় আস্থাহীন তাই তারা প্রতিশোধপরায়ণ, তারা প্রতিশোধপরায়ণ, তাই তারা অপরাধী।

বিচারব্যবস্থার প্রতি ক্রমাগত বাড়তে থাকা অনাস্থা কোনো স্বাভাবিক/সাধারণ ঘটনা নয়। এটি একটি জাতির সম্ভাব্য ধ্বংসের মতো ভয়াবহ দুর্যোগের পূর্বাভাস/সংকেত।

লেখকঃ সহকারী অধ্যাপক, মেরিটাইম ল’ এন্ড পলিসি বিভাগ, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান মেরিটাইম ইউনিভার্সিটি

আরও পড়ুন

উত্তর দিন

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রচার করা হবে না.