নিয়তের বিশুদ্ধতা

তানজিয়া ইসলাম তানহা 
এক.

শফিকের মনে নতুন নতুন কিছু আইডিয়া ঘুরঘুর করছে, কী করে মানুষের মাঝে দাওয়াতি কাজ করা যায়। কিছুদিন একটা অর্গানাইজেশনের সাথে যুক্ত হয়ে বিখ্যাত ইংরেজি লেকচারগুলোর বাংলা অনুবাদ করে দিলো। কয়েকটা প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানেরও অনুবাদের কাজ করে সে। এ থেকে তার নিজেরও ইসলামিক জ্ঞান অর্জনের পথে অগ্রগতি হয়েছে বেশ। মনে তৈরি হচ্ছে নিজস্ব কিছু ধারণাও। যতই পড়ছে আর শুনছে, ভাবনার জগতে ততই যেনো আরো নতুন ছানাপোনা তৈরী হচ্ছে। ক্রমে ক্রমে মানুষের কাছেও সেগুলো দাওয়াত হিসেবে পৌঁছানোর তাগিদ অনুভব করলো সে। মনে তার খুব নেক ভাবনা। ভিডিও ব্লগিং শুরু করবে। সে মারা গেলেও ভিডিওগুলো যেনো তার রেখে যাওয়া সাদাকায়ে জারিয়াহ হিসেবে থেকে যায় তা ভাবতে গেলেই শফিক খুশিতে শিহরিত হচ্ছে।

কত কী ঘুরছে মাথায়! কত আইডিয়া, কত স্ক্রিপ্ট কতকিছুর প্রেক্ষাপট! কোনটা রেখে কোনটা দিয়ে শুরু করবে সেটা চুজ করতেই যেনো হিমশিম খেয়ে যাচ্ছে। নিজেকে কন্ট্রোলে এনে ঠান্ডা মাথায় ভাবতে বসলো সে। প্রথমে নিজের সাথে নিজে খুব করে বোঝাপড়া করলো কেনো সে ইসলাম নিয়ে ভিডিও ব্লগিং করছে। ফ্যান্টাসিতে নাকি সত্যি আল্লাহকে খুশি করার জন্য? মনে মনে খুব করে শক্ত প্রতিজ্ঞা করলো কোনো প্রকার ফ্যান্টাসিতে ভোগা যাবে না। ভিউ বা সাবস্ক্রাইব বা লাইক-ডিসলাইক নিয়ে মোটেই মাথা ঘামাবে না। মতের বিরুদ্ধ কমেন্টও সহনশীলতার সাথে নেবে, কেউ ভুল ধরিয়ে দিলে নিজেকে সাদরে সংশোধন করবে। শুধুমাত্র দ্বীনের পথে মানুষকে ডাকা ও ইসলাম নিয়ে তার সুন্দর ভাবনাগুলো মানুষের কাছে পৌঁছে দিয়ে ইসলামের সৌন্দর্য্ বোঝানোর মাধ্যমে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনই হবে তার একমাত্র উদ্দেশ্য। খ্যাতির মোহ বা নেগেটিভ মানসিকতার লোকেদের আক্রমণাত্মক সমালোচনা যেনো তাকে কাবু করতে না পারে সেভাবে সে তার মনকে ট্রেইন করতে লাগলো।

তো এজন্য সে ঠিক করলো প্রথম ভ্লগটাই সে তৈরী করবে নিয়তের বিশুদ্ধতা নিয়ে। বুখারী শরীফের প্রথম হাদিস ‘ইন্নামাল আমালু বিন্নিয়াতি’– ‘প্রত্যেক কাজের কর্মফল নিয়তের উপর নির্ভরশীল’– হাদীসটি রাসূল সাঃ-এর বলার পেছনের প্রেক্ষাপট, সাথে নিয়তের অবিশুদ্ধতার কারণে অনেক আলেম ও শহীদরা কিভাবে কিয়ামতের দিন প্রথম শাস্তি পেতে শুরু করবে সেসব নিয়ে তথ্যপূর্ণ একটা স্ক্রিপ্ট রেডি করলো সে। মোটামুটি আট মিনিটের মত হবে ভিডিওটা। শুরুটা কয়েক মিনিট দিয়েই করতে চেয়েছিলো সে। সবকিছু রেডি। এবার সে দু’রাকাত নামাজ পড়ে নিলো। এরপর আল্লাহর কাছে খুব করে দুআ করলো আল্লাহ যেনো তাকে বিশুদ্ধ নিয়তে দ্বীনের কাজের জন্য কবুল করেন। খুব করে সে আকুতি করলো, যদি কোনোদিন তার নিয়তে আল্লাহকে সন্তুষ্ট করা ছাড়া অন্য কিছু প্রবেশ করে, তবে যেনো সে আর এ কাজ না করতে পারে। চোখ থেকে কখন যে জল গড়িয়ে পড়ছে খেয়ালই করেনি!
যাক। অবশেষে নিজের রুমের সাদা দেয়ালের সামনে খুব সাধারণ লুক নিয়ে তৈরী থাকা স্ক্রিপ্টের কথাগুলো গুছিয়ে বলে ফেললো সে। একবারে পুরোটা শেষ করেই সে থামলো। নো ডিএসএলআর, নো গর্জিয়াস ব্যাকগ্রাউন্ড। মেইন ফোকাস যেনো শুধু ম্যাসেজগুলো ছাড়া আর কোনোদিকে না থাকে সেজন্য ব্যাকগ্রাউন্ড বা লুক বা এডিটিং কোনোটাই খুব গর্জিয়াস করলোনা সে। খুব সাদামাটাভাবে সে প্রথম ভিডিওটা আপলোড দিলো।

তার চ্যানেলের নাম Shafiq’s Good Wishes For You. যার প্রথম ভিডিওটির নাম ‘ইন্নামাল আমালু বিন্নিয়াতি’।

দুই.

ফারজানা সদ্য দ্বীনের পথে এসেছে। পরিবারের সাথে দ্বন্দ্ব, বন্ধুদের সাথে মতের অমিল আর পুরোনো খারাপ অভ্যাসগুলোর সাথে প্রতিনিয়ত জিহাদ তাকে পর্যুদস্ত করে তুলেছে। বার বার মনে হয় আর বুঝি সে পারবেনা! জীবনযুদ্ধে বুঝি সে পরাজিত সৈনিকই হবে। প্রতিনিয়ত দুআ করে যায় সে মানসিক শক্তি বৃদ্ধির জন্য। মনের কথাগুলো মুনাজাতে বলার পাশাপাশি ডায়রীতেও লিখে রাখে সে। কেউ জানেনা সে কথা, এ যেনো আল্লাহর সাথে তার একান্ত চুপকথা!

ছোটবেলা থেকেই খুব ইন্ট্রোভার্ট স্বভাবের ফারজানা, বাবা-মায়ের আদরের নয়নমনি। কখনোই বাবা-মায়ের কোনো কথার উপরে আরেকটা কথা সে বলেনি, বরাবরই স্টুডেন্ট ভালো। বন্ধুদের মাঝেও তাকে চুপচাপ হিসেবে সবাই পছন্দ করতো। কারো সাথেই কখনো সে কথা কাটাকাটি বা মতবিরোধ করেছে এমন কখনো শোনা যায়নি স্কুল কলেজে। সবসময় সে সবরকম অশান্তি এড়িয়েই চলতো। সেই মিষ্টি ফারজানা আজ সবার কাছে এক তিক্ত ব্যাক্তি! শুধুমাত্র দ্বীনের জন্য সে নতুনভাবে নিজেকে গড়ে তুলেছে সে কারণে! বাবা-মায়ের চির বাধ্য সে ফারজানা তাঁদের নিষেধ মান্য না করে আজ বোরকা পড়ে, কাজিন ব্রাদারদের সাথে গল্প করে না। পাশের বাসার আন্টিদের সাথে গীবতের রসালো গল্প করলে মা-কে সে নিষেধ করে, বাবাকে ব্যাংকের চাকরিটা ছেড়ে দিতে বলে। এসবের দ্বারা সে বাবা-মায়ের চোখের মণি থেকে চক্ষুশূলে পরিণত হয়েছে যেনো।

ক’দিন আগেই মা তার বোরকাটা পুড়িয়ে ফেললো। ‘দেখি তোর হুজুরগিরি কিভাবে দেখাস’– বলে এতো কষ্টে রিকশাভাড়া বাঁচিয়ে কেনা বইগুলো বাবা ছিঁড়ে ফেললো। যে বাবা কোনোদিন একটা ধমক পর্যন্ত দেয়নি ব্যাংকের চাকরি ছাড়তে বলায় সে বাবা ফারজানার গায়ে পর্যন্ত হাত তুললো! ফ্লোরে হ্যাঁচরাতে হ্যাঁচরাতে গেট পর্যন্ত নিয়ে গিয়ে বললো ‘এসব তামাশা আমার বাড়িতে চলবেনা। দরবেশগিরি দেখাতে চাইলে বাইরে গিয়ে দেখা।’ কাঁদতে কাঁদতে হেঁচকি উঠে গেলো ফারজানার। কোথায় যাবে সে? এরকম বেপর্দা অবস্থায় বাইরে যাওয়া সে ভাবতেও পারেনা। আরো কয়েকটা থাপ্পড় দিয়ে বাবা ভেতরে চলে গেলেন। অনেকক্ষণ কান্না করে গুটিগুটি পায়ে সে ঘরে ঢুকলো।

জোহরের নামাজের সিজদায় তার সব কষ্ট যেনো অশ্রু হয়ে ঝরতে শুরু করলো, এ ঝরণা যেনো আর থামবার নয়! নামাজ শেষ করে এক অদ্ভুত প্রশান্তি অনুভব করতে থাকলো সে। একটু আগেও যে বেদনা কখনো শেষ হবেনা ভাবছিলো নিমিষেই যেনো আল্লাহ সে ব্যাথা অশ্রুর মাধ্যমে বের করে দিয়েছেন। জীবনে যত কঠিন সময়ই আসুক, কখনোই সে দ্বীন ছাড়বেনা আরো দৃঢ় প্রতিজ্ঞা করলো সে। প্রভুর কাছে কাঁদার সে অমিয় প্রশান্তি সে পেয়েছে তার জন্য হাজার মার খেতেও সে প্রস্তুত, তবু দ্বীনের সাথে সে স্যাক্রিফাইস করবে না।

বান্ধবীদের সাথেও ক্রমাগত মতবিরোধ হয়ে আসছিলো তার। ক’দিন আগে এক স্যারকে নিয়ে ওরা হাসাহাসি করছিলো সময় তাদেরকে সে মানা করেছিলো এভাবে কাউকে ছোট করতে। ব্যাস! শুরু হয়ে গেলো উল্টো তাকে নিয়েই হাসাহাসি। হুজুরনী, পীরালী আম্মা, দরবেশীনি আরো কত নামে ব্যাঙ্গ করতে লাগলো ওরা। ফারজানা ভাবতেও পারেনি এতোদিনের বান্ধবীরা তাকে এভাবে মোকিং করতে পারে! যেনো এক নিমিষেই বন্ধুত্ব মূল্যহীন হয়ে গেলো শুধুমাত্র সে ইসলাম প্র্যাকটিস শুরু করেছে তাই! শুধু আল্লাহর জন্য ছাড়া বাকি সব বন্ধুত্বের অসাড়তা সেদিনই ফারজানা বুঝতে পেরে গেছে।

ঘরে, বাইরে ক্রমাগত ফারজানার পৃথিবীটা ছোট থেকে ছোট হয়ে আসতে লাগলো। তবে মাটির পৃথিবী যত ছোট হচ্ছে, আকাশের উপরের পৃথিবীর দ্বার ততই যেনো খুলে যাচ্ছে! ধীরে ধীরে সেই ছোট্ট মিষ্টি ফারজানা ইমানে এমন শক্ত হয়ে উঠছে যেনো আল্লাহর জন্য সে এরকম আরো সাতটা পৃথিবীর সমস্ত মানুষের সাথেও ফাইট করতে পারবে! মা-বাবা বন্ধুবান্ধব কোন ছাড়! নিজের স্ট্রাগল আর ইমানের বুস্ট আপের অনুভূতিগুলো সে ডায়রীতে লিখে রাখতো। বাসায় কেউ তার সাথে কথা বলেনা, বলে তো শুধু বকাঝকা। বান্ধবীদের সাথেও আর মিল হয় না। আল্লাহর সাথেই সে নিজের একটা জগত বানিয়ে নিয়েছে, ডায়রীটাও তার সে জগতেরই অংশ।

একদিন শুরু থেকে পড়া শুরু করলো সে ডায়রীটা। এক হাজার থেকে পাঁচ/ছয় হাজার শব্দের সত্তরটা আর্টিকেল লিখে ফেলেছে সে! পড়তে পড়তে হারিয়ে গেলো কখনো কান্নায়, কখনো ইমানের বুস্ট আপে, কখনো আল্লাহর থেকে পাওয়া অনাবিল প্রশান্তিতে! তার লেখাগুলো যে কারও হৃদয়ে নাড়া দেয়ার মতো সেটা বুঝতে পারলো ফারজানা। তখনই তার মাথায় এলো আল্লাহ যখন তাকে এই লেখাগুলো লেখার তাওফীক দিয়েছেন তবে এগুলো আল্লাহর পথেই বিলিয়ে দেবে সে। একজন মানুষও যদি এ থেকে ইসলামের পথে ফিরে আসে তবে সেটাই হবে তার জীবনের সবচেয়ে বড় অর্জন। এর মধ্যে শয়তান যেনো তার নিয়তের কোনো ক্ষতি করতে না পারে তাই সে নিজেকে সম্পূর্ণ আড়াল রাখার সিদ্ধান্ত নিলো। নিজের রিয়েল আইডি থেকে সে এ লেখাগুলো পোস্ট করবে না । অপরিচিতা আমাতুল্লাহ নামে একটা আইডি খুললো। তারপর বিভিন্ন ইসলামিক গ্রুপগুলোতে দিতে থাকলো সে ধারাবাহিকভাবে।

তিন.
শফিকের প্রথম ভিডিওতে মাত্র বিশটা ভিউ হলো। নো কমেন্টস, নো লাইক ডিজলাইক। এতে বিচলিত না সে। সে তার কাজ চালিয়ে যেতে লাগলো। সপ্তাহে চারটা করে ভিডিও দেয় সে। আস্তে আস্তে ভিউ বাড়তে লাগলো, লাইক আর কমেন্টও। বেশিরভাগই প্রশংসাসূচক কমেন্ট। ডিজলাইকও পড়ে না, সবই লাইক। একদিন একটা নেগেটিভ মন্তব্য পড়লো। কমেন্টকারী শফিকের মতের সাথে একমত না। এই সিম্পল ব্যাপারটা তার ভালো লাগলো না। প্রসংশার কমেন্ট পেতে পেতে এই বিরোধী মন্তব্যটা তাকে ক্ষুব্ধ করলো। কিছুদিন পর থেকে বেশ আরো অনেকেই মতবিরোধ করতে থাকলো, লাইকের পাশাপাশি ডিজলাইকও আসা শুরু করলো তার। ব্যাপারটা মানতে শফিকের ভালো লাগছিলো না।

সে খেয়াল করতে লাগলো কোন টাইপের টপিকগুলোতে ডিজলাইক আর মতবিরোধ বেশি আসছে আর কোন টাইপের ভিডিওতে শুধু প্রশংসা আর লাইক আসছে। অবচেতন মনে সে শুধু সেই টাইপেরই নতুন নতুন ভিডিও করতে লাগলো। চার মাসের মাথায়ই তার পঞ্চাশ হাজারের মত ভিউ পড়তে লাগলো। সাবস্ক্রাইবার দাঁড়ালো বারো হাজার, পঁচিশ হাজারের মত লাইক হয়। আর শয়ে শয়ে প্রসংশার কমেন্ট তো আছেই!

নিজের মতের বিরুদ্ধে কথা হতে পারে এমন ভিডিও সে বানায়ই না! এরই মধ্যে আবার ভিউ বাড়ার কারণে তার ক্রেডিট কার্ডে টাকা আসতে লাগলো। শফিক ভাবলো তার ভিডিও ব্যাকগ্রাউন্ড আর এডিটিংটা আরেকটু হাই ক্লাস হওয়া দরকার। এখন তার চ্যানেলের একটা স্ট্যাটাস আছে, সবকিছু একটা ক্লাস মেইনটেনেন্সের প্রয়োজন আছে। ডিএসএলআর দিয়ে আরো হাই রেজুলেশনের কোয়ালিটিফুল ভিডিও বানাতে শুরু করে সে। সাথে চমকার এডিটিং। ব্যাস! তরতর করে আরো বাড়তে থাকে ভিউ, সাবস্ক্রাইব, লাইক, প্রসংশা! বান্ধুরা, আত্মীয় স্বজন যারাই দেখে তারাই খুব প্রসংশা করে শফিকের।

তার কন্ঠটা নাকি আতিফ আসলামের চেয়েও সুন্দর! ব্যাপারটা আগে মাথায় আসেনি ওর। কন্ঠের মেলোডি আরো বাড়াতে নিয়মিত গরম পানির গড়গড়া করতে শুরু করে শফিক। চলতে থাকে তার ভ্লগিং। প্রথম ভিডিওটার সাদামাটা রূপের সাথে এখন ছয়মাস পরের ভিডিও গুলোর কত পার্থক্য! এ পার্থক্য দৃশ্যমান। তবে অদৃশ্যমানভাবে আরো একটা পার্থক্য শফিকের মধ্যেও এসে গেছে।

চার.
ফারজানার লেখাগুলো পড়ে তার লেখায় বারাকাহ চেয়ে, তার কষ্ট দূর হওয়ার দুআ করে অনেক কমেন্টস আসতে থাকে। শুকরিয়ায় সে আরো অবনত হয়ে যায় আল্লাহর কাছে। ইনবক্সে অনেক আপুর ম্যাসেজ আসে তার কাছে এরকমই কষ্টের কথা জানিয়ে। ফারজানা বুঝতে পারলো এরকম কষ্টে সে একা না, আরো অনেকেই আছে। অনেকেই তার আসল পরিচয় জানতে চাইলো, কিন্তু তার নিয়তের বিশুদ্ধতা রক্ষার্থে নিজেকে গোপন রাখায় অনড়। হাজার হাজার লাইক, শত শত শেয়ার হতে লাগলো তার লেখায়। মাত্র তিন মাসেই বিশ হাজার ফলোয়ার হয়ে গেলো। তবু সে নিজেকে প্রকাশ করার বিন্দুমাত্র চেষ্টা করলো না।

ফেসবুকে এ দাওয়াতি কাজ যেনো তাকে আবার নতুন জীবন দিলো। বাবা-মা এখন আর আগের মত ততটা রুড বিহেভ করেন না। খুব কাছেও টানেন না কিন্তু ধর্মকাজে আর বাঁধাও দেন না। বুঝে গেছেন হয়তো লাভ নেই ফারজানাকে বাঁধা দিয়ে, সে নড়বেনা। ফারজানাও ক্রমাগত বাবা-মায়ের হেদায়াতের জন্য দুআ করে যেতো আল্লাহর কাছে। বিশেষ করে, বাবা যেনো ব্যাংকের চাকরিটা ছেড়ে দেন আর নতুন করে যেনো আল্লাহ রিজিকের ব্যাবস্থা করে দেন।

কয়েক মাস পর ফারজানার ইনবক্সে একটা ম্যাসেজ আসে। একজন প্রকাশক তার লেখাগুলো বই আকারে ছাপাতে চান। জবাব না দিয়েই ইস্তিখারা সালাতে দাঁড়িয়ে যায় শায়লা। সিজদায় দীর্ঘক্ষণ প্রার্থনা করে- এতে যদি কল্যাণ থাকে তবেই যেনো তা বই হয়, নয়তো নাহ। সালাতের পর অনেক ভেবেচিন্তে তার মনে পজিটিভ ভাবনা আসলো। তার নাম তো গোপনই থাকছে। মানুষের কাছে দাওয়াত পৌঁছানোই তো তার উদ্দেশ্য ছিলো। তবে এ সুযোগ আল্লাহই করে দিয়েছেন। সে মত দিয়ে দিলো। তখনও সে জানতো না তার দুআর ফল আল্লাহ কিভাবে তাকে দিতে চলেছেন।

পাঁচ.
কয়েক মাস পরের ঘটনা। শফিকের আচমকা গলা ব্যথা। এই ভরা গ্রীষ্মে গলাব্যাথা কেনো হচ্ছে ভেবে পায় না শফিক। ঠান্ডাও তো লাগেনি! টনসিলের প্রবলেমও তার নেই। ডাক্তারের টেস্টেও কিছু ধরা পড়লোনা। নামাজে ঠিকমত কিরাতটাও পড়তে পারছে না। সারাক্ষণ ব্যাথা। ভিডিও করা তো অসম্ভব, এই ভাঙা গলা নিয়ে! তবুও সে ভিডিও করতে চাইলো। পাছে সাবস্ক্রাইবার না কমে যায়! তাছাড়া অটোটিউনে নিজের আগের গলার টোন বসিয়ে সেটা সেট করে নিলেই হবে। এডিটিং সে ভালোই পারে। ভিডিও শুরু করতে যাবে হঠাৎ যান্ত্রিক গোলযোগ দেখা দিলো।

ক্যামেরাটা ওপেন হচ্ছিলো না কেনো জানি। রিপেয়ারিংয়ে দেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়ে আপাতত ভিডিওর চিন্তা বন্ধ করে সে সিরিয়ালে প্রথম থেকে তার ভিডিওগুলো দেখতে চাইলো। তখনই তার সামনে ভেসে উঠলো তার আপলোড করা প্রথম ভিডিও। ইন্নামাল আমালু বিন্নিয়াতি!! শফিকের কানে যেনো নিজের কথাগুলোই হাতুড়ীর আঘাতের মত লাগতে থাকলো! কী বলছে সে! আর কী করেছে এতোদিন! কোথায় তার সে নিয়ত! তার নিয়তের আর কোথাও কি সেই আল্লাহর সন্তুষ্টিটা রয়ে গেছে? কোথায়? প্রসংশার লোভ, বেশি ভিউ-লাই-সাবস্ক্রাইবার, ক্রেডিট কার্ডে আসা টাকায় খুশি হওয়া, এতো কিছুর ভিড়ে কোথায় আর তার সেই প্রভুকে সন্তুষ্ট করা? কোথায় সেই সদকায়ে জারিয়াহ-র চিন্তা?!!

মাথায় তো সেসব আর কিচ্ছু নেই! যেন এক নিমেষে বিস্বাদ হয়ে গেলো শফিকের পৃথিবী!! এ কিসের ভেতর আছে সে! কোথায় হারিয়ে ফেলেছে নিজেকে! নিজের নিয়তকে!! কী মরিচিকার পেছনে ছুটে চলেছে সে! এর পরিণতি সে কী পাবে? তার ভিডিওতে তারই কথা বাজতে থাকলো কিয়ামতের দিন আল্লাহ মিথ্যা নিয়তওয়ালা আলেমকে বলতে থাকবেন তুমি ইলম অর্জন করেছো যাতে লোকে তোমাকে বড় জ্ঞানী বলে! কথাটা যেন শফিককেই জীবন্তই আগুনে পুড়িয়ে দিলো! তার অর্জিত ইলমের ব্যাপারে যদি আল্লাহ এটাই বলে! সেও তো জ্ঞানের প্রদর্শনে সুনামই কুড়ানোর মোহেই হারিয়ে গেছে কোন অতলে! কী হবে এর পরিণতি? কোথায় যাবে সে? তার আরো মনে পড়ে গেলো সে আল্লাহর কাছে দুআ করেছিলো নিয়তে গড়বড় ঢুকে গেলে যেনো আল্লাহ আর কাজ করার তাওফীক না দেন! তাই কি আল্লাহ তার কন্ঠে অসুখ দিয়ে দিলো?

ছয়.
বইমেলায় বেস্টসেলার হলো ফারজানার বই, ‘দি আনটোল্ড স্টোরি’। সবার মুখে মুখে প্রসংশা, ফেসবুক গ্রুপে গ্রুপে শুধু এ বইয়েরই রিভিউ! সবাই লেখিকার আসল পরিচয় জানতে চায়। ম্যাসেজে ভরে যায় ফারজানার ইনবক্স, শুধু তার পরিচয় জানতে চায়। করুণাময়ের প্রতি অগাধ শুকরিয়া জানিয়ে সে আত্মপ্রকাশ থেকে বিরত থাকে। বান্ধবীর বিকাশ নাম্বারে প্রকাশকের থেকে সে পেয়ে যায় নগদ চার লক্ষ টাকা। এ থেকে দুই লক্ষ টাকা সে সরাসরি আবার আল্লাহর রাস্তায় দিয়ে দেয়, একটা এতিমখানায়, বাবা-মা’কে যেনো আল্লাহ হিদায়াত দেন আর বাবা যেনো ব্যাংকের চাকরিটা ছেড়ে দেন সে প্রার্থনায়! দুআ করতে করতে বাসায় ফেরে সে।

এসে দেখে বাবা মাথায় দিয়ে বসে আছেন। ব্যাংকে নাকি বাবার বিরুদ্ধে শত্রুতা করে একজন স্টাফ অভিযোগ এনেছেন তিনি ব্যাংকের টাকা আত্মসাৎ করেছেন। নগদে দু’লাখ টাকা ফিরিয়ে না দিলে মামলা হবে। বাকিটা কোথ্যেকে আসবে সেটাও বুঝতে পারছেন না ফারজানার বাবা। বাবার হাতে দু’লাখ টাকা ধরিয়ে দিয়ে ফারজানা কাঁদো কাঁদো হয়ে বিনীতভাবে বলতে লাগলো ‘এই টাকা দিয়ে দাও ওদেরকে বাবা। এ চাকরি ছেড়ে দাও। তোমার পেনশন যত পাওনা ছিলো সেটা থেকে তাদের বলে দাও বাকিটা রেখে দিতে। আমরা না খেয়ে থাকবো বাবা, কিন্তু সুদের সাথে কোনোভাবেই জড়িত থাকবোনা’। বলেই অঝোরে কাঁদতে থাকলো ফারজানা। সন্তানের কান্নায় নিমেষেই যেনো ফারজানার বাবার তার উপর থাকা সব রাগ ধুয়ে চলে গেলো। মেয়ের ইমানের জোরের সামনে তাঁর এতোদিনের সাধের ব্যাংকের চাকরি ছেড়ে দেয়াও যেনো আর কোনো বিপদই মনে হলো না! এ ছাড়া আর কোনো উপায়ও নেই। মেয়ের উপর কত দুর্ব্যাবহার করেছেন তিনি।

তাই কি আল্লাহ তাঁকে এ শাস্তি দিলেন? নাকি এ আল্লাহরই রহমত যে তিনি সুদের চাকরি ছাড়তে যাচ্ছেন! নিমিষেই মেয়েকে বুকে জড়িয়ে ধরে বলতে থাকলেন ‘তোকে অনেক কষ্ট দিয়েছি মা, আমাকে ক্ষমা করে দিস’! ওদিকে ফারজানার মা-ও কাঁদতে লাগলেন অনুশোচনায়। এতে অশ্রুর মাঝেও ফারজানা আল্লাহর মিরাকল দেখতে লাগলো। কিভাবে আল্লাহ বাবা-মা’কে হেদায়াতের দিকে ঝুঁকিয়ে দিলেন, বাবা-কে সুদের চাকরি ছাড়িয়ে দিচ্ছেন, কিভাবে ধারণাতীত উৎস থেকে রিজিক পৌঁছে দিলেন! মনে মনে সে পড়তে লাগলো
‘ফাবি আইয়্যি আলা-ই রাব্বিকুমা তুকায্যিবান’- ‘অতএব তোমার রবের কোন কোন নেয়ামত তুমি অস্বীকার করবে?’! –

সাত.
ডাক্তাররা শফিকের কোনো সমস্যা ধরতে পারল না। গলা ব্যাথা বেড়েই চলেছে, ওষুধ খেয়েও সারছেনা! আল্লাহ কি তবে তার কন্ঠ চিরতরে ছিনিয়ে নেয়ার শাস্তির সিদ্ধান্ত নিয়েছেন? যে কন্ঠে সে গড়গড়া করে আরো মধুর বানিয়ে নিজের নফসের গোলামি পূর্ণ করেছিলো সে কন্ঠ কী তবে আল্লাহ মোহর মেরে শাস্তি দেবেন? আতংকে শফিকের কান দিয়ে ধোঁয়া বেরোতে লাগলো! ভয়ে তার হৃদস্পন্দন যেনো বেড়ে লাফাতে লাগলো! পূণ্যবান হতে গিয়ে তবে কি সে অভিশপ্ত হয়ে গেলো?

চিৎকার করে কান্না শুরু করলো শফিক। তার আম্মু দৌড়ে ছুটে এলো! ছেলেকে জড়িয়ে ধরে হতবিহ্বল হয়ে বলতে লাগলেন ‘কী হয়েছে বাবা? গলার ব্যাথাটা আবার বেড়েছে? খুব বেশি ব্যাথা করছে? কী হয়েছে বল?’ শফিক কোনো কথা বলতে পারেনা। গলা না, তার বুকটা ব্যাথায় ফেটে যাচ্ছে অনুশোচনায়। এ ব্যাথা ভাষায় প্রকাশ করা যায় না, অক্ষরে লেখা যায় না। সাগরের ঢেউয়ের চেয়ে বিশাল এ অনুতাপের স্রোত তার হৃদয় যেনো জ্বালিয়ে দিচ্ছে! জীবনকে তার মৃত্যুর চেয়ে বেশি কষ্টের মনে হচ্ছে। কানে বাজছে শুধু তার উচ্চারিত সেই হাদিস,
ইন্নামাল আমালু বিন্নিয়াতি। ইন্নামাল আমালু বিন্নিয়াতি।

আরও পড়ুন