মুসলিম হতে পেরেছি কি!

রিতু কুন্ডু

হুজুর আর চোরের গল্প জানা আছে? সেই যে ফজরের ওয়াক্তে চোর আর হুজুর দুইজনই পুকুরপাড়ে গেলেন।পুকুরের পানিতে ভালভাবে হাত মুখ ধুয়ে নিজেদের পরিস্কার করছিলেন।হাত পা ধুতে ধুতে চোর ভাবছিল এই হুজুর ব্যাটা না জানি আমার চেয়ে কত্ত বড় চোর।সারারাত চুরি করে এখন নিজেকে সাফাই করছে।

অন্যদিকে হাত পা ধুতে ধুতে হুজুর ভাবছিলেন ইশ দেখে বোঝার উপায় নেই যে আল্লাহর বান্দা।তারপরও সারারাত ধরে আল্লাহর ইবাদত করে এখন ফজরের নামাযের জন্য নিজেকে সাফাই করছে।আমি হুজুর হয়েও ও হয়তো আমার চেয়ে বেশি পূন্য করে ফেললো।

এই গল্পটার মূলে হল পার্সেপশন বা সেল্ফপার্সেপশন।একজন মানুষ নিজের দৃষ্টিভঙ্গিতে সবকিছু দেখে এবং তা উপলব্ধি করার চেষ্টা করে।সে তার জ্ঞানের বাইরে ভাবতে পারে না।সে ততটুকুই উপলব্ধি করে যা একটি নির্দিষ্ট সময়ে তার সীমার মাঝে অবস্থান করে।এককথায় আমি যা, অন্যকেও তাই ভাবা।

এইসব ভূমিকার অবতারণা নতুন একটা প্রেক্ষাপটের আলোকে।আজ একটা নতুন তথ্য পেলাম আমার পরিচিত মন্ডলে।আমি নাকি ইসলাম ধর্ম গ্রহণ, পালন,এর বিধানের আলোকে নিজের জীবন গঠনের কাজ করছি এবং ততোধিক উৎসাহ নিয়ে তা প্রচার করছি শুধুমাত্র আমার পক্ষে মানুষের সিম্প্যাথি পাওয়ার আশায়।এতে নাকি আমার সমাজ ও পরিচিত মন্ডল আমাকে অনেক সিম্প্যাথি জানাবে এবং আমি অনেক কিছু হয়ে যাবো ব্লা ব্লা।আসলে এগুলো সব মেকি আমার পাব্লিসিটি স্টান্ট!!শুনে নিজেকে ইস্টার ইস্টার ভাবা শুরু করেছি।মনে হচ্ছে আমি শাহরুখ বা টমক্রুজের সাথে পরবর্তী ছলচ্ছিত্রে অভিনয় করতে যাচ্ছি তাই পাব্লিসিটি স্টান্ট করে নিজের দিকে দর্শক স্রোতা বা ফলোয়ার্স টানছি!!!

আসল ঘটনা ঐ চোর হুজুরের মতো।আমি আসলে আল্লাহর রহমত, বরকত আর মাগফেরাত অনেক ভাগ্যগুণে পেয়ে গেছি।আমার জীবনের এমন কিছু মিরাকল আছে যা আমাকে যেকোন মানুষের চেয়ে দ্রুত আল্লাহর নিকট এনেছে।তা যত গুণাহই করি না কেন আমি সেই ব্যক্তি যাকে আল্লাহ নিজের হাতে মাফ করার জন্য সৎপথে টেনে নিয়ে আসছেন, আলহামদুলিল্লাহ।

এখন একটা বিষয় আছে সেটা হল প্রকাশ করছি কেন –এটা একটা প্রশ্ন? এটা কি রিয়া হয়ে যাচ্ছে!!! এটা কি সিম্প্যাথি টানার জন্য!!! এটা কি পাব্লিসিটি স্টান্ট!!!এটা কি নিজেকে খুব বড় কিছু ভাবা!!!

এই প্রশ্নগুলো হল অন্যদের পার্সেপশান।আমার পার্সেপশানটা ব্যাখ্যা করতেই আজকের লেখার অবতারণা।

আমি নিজেকে খুব ছোট থেকেই সেলিব্রিটি ভাবি।আমার পরিবার আমাকে এটা খুব ছোট থেকেই ফিল করতে শিখিয়েছে ‘ ইউ আর প্রিসিয়াস টু আস,ইউ আর সেলিব্রিটি টু আস।’ তাই এসব সস্তা বাইরের জনপ্রিয়তা আমার প্রয়োজন পড়েনি কখনও।ছোটবেলায় পরিবারে আমার গানের এত্ত প্রশংসা কুড়িয়েছি মঞ্চে বসে কারও হাততালির আকাঙখা হয়নি কখনও। তরুণ বয়সে মডেলিং বা নাটকের অফার যে পাইনি তা কিন্তু নয়, যাইনি।কারণ ওই একটাই,জনপ্রিয়তা আমার প্রয়োজন নেই বলে।শ্বশুড়বাড়ি, সংসার বা পরিবারে কোনদিন অভিনয় করে চলিনি সবার চোখে ভাল সাজবো বলে।যা বুঝি তাই করি,যা ভাবি তাই বলি।সমাজের চোখেও নিজেকে ভালো সাজাতে মনের বিরুদ্ধে কোন কাজ করিনি,এমনকি সবক্ষেত্রেই নিজের পছন্দকে প্রাধান্য দিয়েছি সামাজিক নিয়ম বা ধর্মীয় অন্ধত্ব ও কুসংস্কারের বেড়াজালকে ডিঙিয়ে।এসবের কোনটাতেই পাব্লিসিটি স্টান্ট ছিল না।বরং ছিল জনপ্রিয়তাকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে অন্তরের সত্যকে আকড়ে ধরার প্রবণতা।

আল্লাহকে কিভাবে চিনলাম,কেন চিনলাম,কেন আত্মসমর্পণ করলাম তার পুঙখানুপুঙখ বর্ণনা ইন শা আল্লাহ লিখবো অন্য কোন লেখায়।আজ শুধু জানাবো কেন প্রচার করছি,কেন এত বলছি।এর পেছনে সিম্প্যাথি ট্র‍্যাপ আছে কি না!!

আমি ইসলাম গ্রহণের পর প্রথম নাম এভিডেফিট করেছিলাম।নাম নিলাম আদ্রিতা জামান রিতু।স্বামী ও সন্তানের নামের সাথে মিলিয়ে।কিন্তু হাদিস জানলাম, স্বামীর নামের সাথে মিলিয়ে নাম রাখা হল অবিশ্বাসীদের কর্ম।মুমিন নারী-পুরুষ তার পিতার পরিচয়ে পরিচিত হবে।আর যদি নামে শিরকি অংশ থাকে তাহলে পরিবর্তনের প্রয়োজন আছে নতুবা নেই।নাম পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত পূনঃবিবেচনা করলাম।রিতু কুন্ডু নামে যখন আল্লাহর কথা বলি,রাসূলের কথা বলি,ইসলামের বিধানের কথা বলি,সকলেই একবার জিজ্ঞেস করে আপনি কি মুসলিম? আমি স্বগর্বে বলি,হ্যা আমি মুসলিম।কোরানের আয়াতে এসেছে,সেই ব্যক্তির কথাই উত্তম যাকে প্রশ্ন করা হলে সে বলে ‘আমি মুসলিম’। আমার নাম যদি তাসলিমা,জরিনা বা রহিমা হত কেউ কি আমাকে একবারের মতোও জিজ্ঞেস করতো আমি মুসলিম কি না!!! তাহলে আমি কিভাবে বলতাম ‘আমি মুসলিম’?? কেউ যখন বোরকা পরিহিত আমাকে বলে নাম কি? আমি বলি রিতু কুন্ডু। শতকরা ৯৯ জন জিজ্ঞেস করে আপনার ধর্ম? আমি বলি,’ইসলাম’। কজন প্রতিদিন বলতে পারে আমি মুসলিম,আমি ইসলামের বিধানে বিশ্বাসী।আমি বলতে পারি।তিন বছর ধরে বলতে পারি।আমার আনন্দ হয়।আমি গুণাহগার বান্দা প্রতিদিন বলতে চাই আমি মুসলিম,আমি উম্মাতে মুহাম্মদী(স),আমি আল্লাহর বান্দা, আলহামদুলিল্লাহ।

আমি যখন রিতু কুন্ডু পরিচয়ে বারবার বলতে থাকি আল্লাহর কথা,কেয়ামতের আযাবের কথা,জান্নাতের কথা,জাহান্নামের ভয়ঙ্করতম বর্ণনা, পর্দার কথা, সমাজে ইসলামী জীবনাচরনের কথা আমার মনে সুক্ষ্ম একটা আশা কাজ করে।মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণকারী অথচ আল্লাহর প্রতি উদাসীন,দুনিয়াবী আনন্দে আর ভোগে নিমজ্জিতরা একবার ভেবে দেখবে,একবার চিন্তা করবে সঠিক ও বেঠিকের মাঝে।উদ্ধতরা একবার নিজেকে বিনিয়ীভাবার চেষ্টা করবে।অন্যায়ের কাছে সমর্পণকারীরা একবারের জন্য হলেও ন্যায়ের সাথে পরিচিত হতে চাইবে।সমাজের ঘুনে ধরা মেরুদন্ডগুলো একবার আল্লাহপ্রেমে সাহসী হবে।অন্ধকারে নিমজ্জিত অন্তরগুলোতে আলোর একটা স্পার্ক জ্বলে উঠবে।

সবাই অন্তত একবার হলেও ভাববে তিরিশ বছর অবিশ্বাসী জীবনযাপনকারী একজন মানুষ কি করে নিজেকে এত দ্রুত ইসলামে নিমজ্জিত করতে পারে, কেন তার অন্তরে নামায,রোযা,হজ্জ্ব,যাকাত আর পর্দা করার ইচ্ছা জেগে উঠে।কোন সে মহান শক্তি চোখের পলকে সম্পূর্ণ বিপরীত মেরুর একজনকে অন্য মেরুতে এনে ফেলতে পারে!!! নিশ্চই একজন মানুষের পক্ষে এত্ত এত্ত অসম্ভবকে সম্ভব করা সম্ভব নয়।তাও ঠিক সেই সমাজের মানুষের মাঝে থাকা ব্যক্তি যেখানে ইসলামকে তুচ্ছ তাচ্ছিল্য করাই স্মার্টনেস, সভ্যতা ও সংস্কৃতি।কি এমন যা তাকে স্রোতের বিপরীতে ঠেলছে!!!

আমি শুধু ভাবি একজন অবিশ্বাসী পরিবারে জন্মগ্রহণকারী,তিরিশ বছর অবিশ্বাসী হিসেবে জীবনযাপনকারী ব্যক্তির মুখে ইসলামের কথা শুনে,ইসলামী আচরণ দেখে অনেকের অন্তরটা একটাবারের জন্য হলেও একটু টলে যাক না।একবার ভাবুক না মাত্র দুইদিনে একজন মানুষ আল্লাহকে ভালোবাসতে পারলে বিশ্বাসী পরিবারে জন্ম নেয়া এই আমি কি সে আল্লাহ থেকে দূরে থাকি,কি সে নিজেকে প্রদর্শনে আনন্দ খুঁজে পাই,কি সে আল্লাহর অবাধ্যতা করি।একটা দুই দিনের মুসলিম দুনিয়ার সবকিছুকে তুচ্ছতাচ্ছিল্য করে আল্লাহতে সমর্পণ করলে কি সে একজন জন্মসূত্রে মুসলিম আল্লাহর বিধানকে অস্বীকার করে শ্বাস নেই।বিপদে ডাকি আল্লাহকে কিন্তু তাঁর প্রতি ওবিডিয়েন্ট হতে লজ্জা পাই কি সে!!! একবার ভাবুক সবাই।একবার নিজেকে আয়নার সামনে দাড়িয়ে জিজ্ঞেস করুক, মুসলিম হতে পেরেছে কি না!!! একবার নিজেকে আল্লাহর কাছে সঁপে দিয়ে প্রমাণ করুক এই দুইদিনের বৈরাগীর কাছে হারেনি,জিতে গেছে।আল্লাহকে পাওয়ার প্রতিযোগিতায় আমার মতো ৩০ বছর পিছিয়ে যাওয়া মানুষের সাথে নিজেকে মিলিয়ে দেখুক হারে না কি জিতে।।।এতে আমার কোন লাভ নেই,কারও সিম্প্যাথি নিয়ে বাঁচিনি একদিনও,চাইও না মানুষের সিম্প্যাথি।শুধু আল্লাহর রহমত চাই।

শুধু কেয়ামতের দিন আল্লাহ যদি জিজ্ঞেস করেন আমি যে সত্য জেনেছিলাম তা সকলকে জানিয়েছিলাম কি না?– তার উত্তরে যেন বলতে পারি আলহামদুলিল্লাহ।এই প্রশ্নের উত্তরে যেন মুখ কালো করতে না হয় তাই উপযাচক হয়ে সবাইকে মুহূর্তে মুহূর্তে জানিয়েছি।বারংবার বলেছি।অন্যের কাছে ভালো সাজার জন্য না,লোক দেখানোর জন্য না,আল্লাহর বাধ্যগত হয়েই জানিয়েছি, আলহামদুলিল্লাহ।

লেখকঃ কলামিস্ট, রিভারটেড মুসলিম এবং জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী অধ্যাপক 

আরও পড়ুন