জীবনের কবিতা

আব্দুল্লাহ আল মামুর

আমি মাঝে মাঝে খুবই উদ্বিগ্ন হই, বলতে পারেন ভয়ই পাই। একটা বিষয় বারবার আমার মনের দরজায় করাঘাত করে। রাত না দিন, সকাল না বিকাল তা ভেবে দেখার অবকাশ পাই নাকি? আর জানেন? আজকাল এই ভাবনাটা যেনো একটু বেশিই বৃদ্ধি পেয়েছে। আর ভনিতা নয়, চলুন দেখি কী এমন চিন্তা আমাকে রাত দিন সমানতালে ভাবাচ্ছে!

হুম, তাদের কথাই বলছিলাম; আমরা যারা কমপক্ষে নিয়মিত পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়ি তাদের অনেকেই নিয়মিত কোরআন তেলাওয়াত করিনা বা করতে পারিনা। তাতে কী হবে? যদিও কোরআন হাদিস নিয়মিত না পড়ি তবুও কিছু সূরা ও দোয়া বুঝে হোক বা না বুঝেই হোক মুখস্থ করে ফেলেছি তো। এমন সংখ্যাও নেহায়েতই কম হবে না যারা শুধু পাঁচ-সাতটা দোয়া ও সূরা দিয়েই সারা জীবন পার করে দেয়। আমরা যারা কমপক্ষে পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়ি তাঁদের এতটুকু জানা অবশ্যই কর্তব্য যে নামাজের মাঝে আরবীতে আমরা আসলেই কী বলছি, কী চাইছি আল্লাহর কাছে, কী প্রতিজ্ঞা করছি বারংবার আমার প্রভুর সাথে। তবেই না আমাদের বিবেক জেগে উঠবে, আমাদের দায়িত্ব সম্পর্কে সচেতন হবো, কমপক্ষে প্রতিদিন আল্লাহর নিকট যে ওয়াদা করছি তা পালনে সচেষ্ট হবো। আর হ্যাঁ! আমরা নামাজে কী বললাম সেটাই যদি না বুঝি তবে নামাজ থেকে খুব বেশি উপকার পাওয়া যাবে বলে আমার মনে হয় না।

যারা আমরা এই দলে আছি যে, যেভাবেই হোক পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ কখনো মিস করিনা বা বাদ দেইনা তারা সূরা ত্বীন পড়েননি কিংবা ইমামের নিকট থেকে হলেও শুনেননি এমন কেউ অাছে অার যে যা-ই বলুক আমি অন্তত বিশ্বাস করিনা।

চলুন দেখি সূরা ত্বীনের ৪ ও ৫ নং অায়াতে আল্লাহতালা কী বলেছেন। لَقَدْ خَلَقْنَا الْإِنسَانَ فِي أَحْسَنِ تَقْوِيمٍ ثُمَّ رَدَدْنَاهُ أَسْفَلَ سَافِلِينَ আমি মানুষকে সৃষ্টি করেছি সুন্দরতর অবয়বে। অতঃপর তাকে নীচতমদেরও নীচে পৌঁছিয়ে দিয়েছি।

অন্য আরেকটি জায়গায় সূরা আল আরাফের ১৭৯ নং আয়াতে আল্লাহতা’লা বলেছেন: “আর আমি সৃষ্টি করেছি দোযখের জন্য বহু জ্বিন ও মানুষ। তাদের অন্তর রয়েছে, তার দ্বারা বিবেচনা করে না, তাদের চোখ রয়েছে, তার দ্বারা দেখে না, আর তাদের কান রয়েছে, তার দ্বারা শোনে না। তারা চতুষ্পদ জন্তুর মত; বরং তাদের চেয়েও নিকৃষ্টতর। তারাই হল গাফেল, উদাসীন।”

সূরা ত্বীনের এই দু’টো আয়াত পড়ে আমি যা বুঝেছি তা হলো যে আমাদের প্রভু আল্লাহতা’লা সকল মানুষকেই খুব সুন্দর অবয়বে, জ্ঞান, বুদ্ধি দিয়ে আশরাফুল মাখলুকাত হিসেবে তৈরি করেছেন। এরপর কিতাব দিয়েছেন বা দিকনির্দেশনা দিয়েছেন যা মেনে চললে রবের সন্তুষ্টি নিয়ে তাঁর সাথে সাক্ষাৎ হবে জান্নাতে। কিন্তু কেউ যদি তাঁর নির্দেশনা না মেনে চলে তবে দুনিয়ায় নানান দুষ্কর্ম ও নৈতিক অধঃপতনের এমন স্তরে পৌঁছাতে পারবে যা কোনো পশুর পক্ষেও সম্ভব নয়। এর জ্বলন্ত উদাহরণ আমরা প্রতিদিন দেখতে পারছি বিভিন্ন পেপার পত্রিকা ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে। কেউ কেউ তো এমন মানুষরূপী পশুদের লালসার শিকার হচ্ছে স্কুলে, কলেজে, পথে, ঘাটে, অফিসে, আদালতে, এমনকি নিজের বাসায়, নিজের বেডরুমেও! কেউ কেউ তো ভদ্র বেশে মুখোশের আড়ালে থেকে আস্ত একেকটা চতুষ্পদ জন্তু বা তাঁর থেকেও নিকৃষ্ট কোনো প্রাণীর মতো আচরণ করেন (ভুক্তভোগীরা এখানে যথার্থ শব্দ বা ইচ্ছেমতো পশুর নাম গালি হিসেবে ব্যবহার করতে পারবেন)।

এদের জন্যেই সমাজে এতো অনাচার, এতো অশান্তি। এদের নিশ্বাসের বিষবাষ্পে অনেক হৃদয়ের ভিতরে ও বাইরে আজ জ্বলন আর দহনের রাজত্ব। চুরি, ডাকাতি, জেনা, ব্যভিচার, খুন, লুটতরাজ, ঘরে বাইরে, অফিসে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন এখন নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার।

এখন প্রশ্ন হচ্ছে, আমি আর আপনি কোন দলে আছি?

আমরা কী ঐ দলে আছি যাদের সম্পর্কে আল্লাহতা’লা বলেছেন তাদের অন্তর রয়েছে কিন্তু তার দ্বারা বিবেচনা করে না, তাদের চোখ রয়েছে কিন্তু তার দ্বারা দেখে না, আর তাদের কান রয়েছে কিন্তু তার দ্বারা শোনে না। তারা চতুষ্পদ জন্তুর মত; বরং তাদের চেয়েও নিকৃষ্টতর। তারাই হল গাফেল, উদাসীন।

যদি তাই হয়ে থাকে তবে আসুন তাওবা করে আল্লাহর দিকে ফিরে আসি। সেই পাপের জগৎ থেকে ফিরে এসে নিজেদের অন্তর্ভূক্ত করি সেই দলে যাদের ব্যাপারে আমাদের রব সূরা ত্বীনের ৬ নং অায়াতেই বলেছেন : إِلَّا الَّذِينَ آمَنُوا وَعَمِلُوا الصَّالِحَاتِ فَلَهُمْ أَجْرٌ غَيْرُ مَمْنُونٍ কিন্তু যারা বিশ্বাস স্থাপন করেছে ও সৎকর্ম করেছে, তাদের জন্যে রয়েছে অশেষ পুরস্কার। পুরস্কার কেমন হবে এই বিষয়ে আল্লাহতা’লা সূরা বাকারাহ’র ২৫ নং আয়াতে বলেন, ‘আর খুশখবর দাও তাদের যারা ঈমান এনেছে আর সৎকর্ম করে, তাদের জন্য আছে জান্নাত, যাদের নিচ দিয়ে বয়ে চলেছে ঝরনারাজি! যতবার এ থেকে ফলফসল তাদের খেতে দেয়া হয় তারা বলে — “এ সেই যা এর আগে আমাদের খাওয়ানো হয়েছিল”, কারণ তাদের এগুলো দেয়া হয় অনুকরণে। আর তাদের জন্য এর মধ্যে আছে পবিত্র সঙ্গিসাথী আর এতে তারা থাকবে চিরকাল।’

সূরা হজ্বের ২৩ ও ২৪ নং আয়াতে তিনি আরও বলেছেন: “নিশ্চয় যারা বিশ্বাস স্থাপন করে এবং সৎকর্ম করে, আল্লাহ তাদেরকে দাখিল করবেন উদ্যান সমূহে, যার তলদেশ দিয়ে নির্ঝরিণীসমূহ প্রবাহিত হবে। তাদেরকে তথায় স্বর্ণ-কংকন ও মুক্তা দ্বারা অলংকৃত করা হবে এবং তথায় তাদের পোশাক হবে রেশমী। তারা পথপ্রদর্শিত হয়েছিল সৎবাক্যের দিকে এবং পরিচালিত হয়েছিল প্রশংসিত আল্লাহর পথপানে।”

আসুন মনে প্রাণে চেষ্টা করি আল্লাহতা’লা আমাদের যে আশরাফুল মাখলুকাত হিসেবে সৃষ্টি করেছেন তা সবসময় মনে রাখি। সেখান থেকে মূর্খতা, অজ্ঞতা বা দুনিয়ার লোভ লালসার বেড়াজালে জড়িয়ে পড়ে কোনোমতেই যেনো তাঁর অকৃতজ্ঞ বান্দা ও আল কোরআনে উল্লিখিত চতুষ্পদ জন্তুর চেয়েও নিকৃষ্ট না হয়ে যায়। আসুন প্রতিজ্ঞা করি, আল্লাহর দেখানো পথ আমরা নিয়মিত কোরআন, হাদিস ও ইসলামী সাহিত্য পড়ে জেনে নেবো এবং তাঁর সন্তুষ্টির পথেই জীবন পরিচালনা করতে আজ, হ্যাঁ, আজ এখন থেকেই সচেষ্ট হবো ইনশাল্লাহ। আল্লাহতা’লা আমাদের সবাইকে কবুল করুন। আমীন।

লেখকঃ সাহিত্যিক ও  ব্যাংকার

 

আরও পড়ুন