অসম্ভবকে সম্ভব করাই মানুষের চিরন্তন প্রয়াশ

আত্মোন্নয়ন

এস এম মুকুল

এখন করোনাকাল। ঘরবন্দি জীবনে রয়েছে মৃত্যু ভয়। প্রতিদিন পৃথিবী থেকে বিদায় নিচ্ছে হাজার হাজার মানুষ। এর আগে এতবড় মৃত্যু মহামারির মুখোমুখি হয়নি মানুষ জাতি। করোনাকালের মৃত্যু মহামারিতে বেচে থাকাটাই অন্যতম শুকরিয়া। সুস্থ্যতা হচ্ছে মানুষের জীবনের সুখের প্রথম ও শেষ নেয়ামক। তাই প্রতিদিন শপথ নিন- ‘আলহামদুলিল্লাহ ভালো আছি। আমি ভালো আছি। আমি সুস্থ্য আছি। এজন্য মহান প্রতিপালকের কাছে শতকোটি শুকরিয়া জানাই। আমি শুকরিয়া জানাই, কারণ আমার প্রতিপালক আমার সৃষ্টিকর্তা আমাকে অনন্য অসাধারণ হিসেবে সৃষ্টি করেছেন। তিনিই আমাকে সৃষ্টি জগতের শ্রেষ্ঠত্ব দান করেছেন। আমি আশরাফুল মাখলুখাত- আমি সৃষ্টিকূলের সেরা জীব। আমি মানুষ এটি আমার প্রথম পরিচয়। তারপর আমার ধর্ম, বর্ণ, গোত্র। আমি দরিদ্র দেশের গ্রামের কুঁড়ে ঘরে নাকি উন্নত দেশের বিলাসবহুল অট্টালিকায় জন্মেছি, সেটা আমার কাছে মুখ্য বিষয় নয়। আমার বিশ্বাস সব মানুষের আত্মমর্যাদা আছে তার মৌলিক সাম্যতার মধ্যে। পৃথিবীর সব মানুষই শান্তি চায়। তারপরও কেন এত অশান্তির হুলিখেলা জগতময়। লোভ, হিংসা আর অপ্রয়োজনীয় প্রতিপত্তির অসম প্রতিযোগিতায় আমরা জীবনের মাহাত্ম্য ভুলে গেছি। ্এটাই অশান্তির কারণ। আমরা কি কখনো ভাবি- অসাধারণ সুন্দর এক পৃথিবীর বাসিন্দা এই আমরা। আমাদের কর্ম দিয়ে কেন অযথাই একে কুলষিত করছি। আমরা সবাই এক মানব সম্প্রদায়েরই অংশ। সমতার পৃথিবী গড়ার জন্য সবাই সবার সহযোগি হবো। এই মনোভাব পরিবার, সমাজ, রাষ্ট্র এমনকি বিশ্ব পরিপ্রেক্ষিতে একইরকম। আমি জীবনের সর্বক্ষেত্রে শ্রেষ্ঠত্বেও স্বীকারোক্তি হিসেবে- সদা বিনয়ী হব। সৃষ্টির সৌন্দর্যের প্রতি শ্রদ্ধাশীল ও দায়িত্বশীল হব। ব্যক্তি জীবনে, পরিবারে, রাষ্টের অধিকার এবং দায়িত্ব সম্পর্কে সজাগ থেকে ভুমিকা পালন করব। আমি মানুষ, আমি শ্রেষ্ঠ- এই শ্রেষ্ঠত্ব যিনি আমাকে সৃষ্টি করেছেন তিনিই ঘোষণা করেছেন। অতএব আমি এমন কিছু করবো না যাতে আমার শ্রেষ্ঠত্বেও প্রতি অসন্মান করা হয়। আমি মানুষ- আমার মাঝে অনন্য, অসাধারণ ক্ষমতা দিয়েছেন আমার প্রভু। তাই আমি মানুষের কল্যাণে নিয়োজিত থাকব। আমি শরীর ও মনের সর্বোত্তম ব্যবহার করবো। আমি মানুষ, চিরজীবি নই- তাই আমি এমন ভোগ বিলাসিতার চিন্তা করবোনা যাতে অপরের অধিকার খর্ব হয়।

মনে রাখতে হবে, জীবনটা একটা লড়াইয়ের ক্ষেত্র- এ লড়াইয়ে জয়লাভ করার বা টিকে থাকার জন্যে সদা সবার জন্য নিরাপদ ও সর্বোত্তম পন্থা অবলম্বন করবো। আমার জীবনেরও সমাপ্তি আছে- আমার হিসাবেরও প্রয়োজন আছে। আমি আমার সৃষ্টিকর্তার কাছে ঋণী। তারপর আমি আমার পরিবারের কাছে ঋণী। এরপর আমি সমাজ ও রাষ্ট্রের কাছে ঋণী। আমি জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে এই ঋণ আদায়ে কিছু না কিছু করব। আমার প্রথম কাজ হবে ভাল ব্যবহার করা। বিনয় প্রদর্শন করা। সহযোগি মনোভাব নিয়ে কাজ করা। সততার সাথে কাজ করা। বিশ্বাস ভঙ্গ না করা। সত্য কথা বলা। দান করা। আমি প্রতিদিন-  ছোট ছোট হলেও, একটি করে হলেও ভাল কাজ করার চেষ্টা করবো। ব্যক্তিজীবনে স্থিরতা ও শালীণতা আনব। পারিবারিক শান্তি রক্ষায় ভুমিকা রাখবো। পরিবারের প্রতি সর্বোত্তম দায়িত্ব পালন করবো। সদাচারনের মাধ্যমে মানুষের সাথে সুসম্পর্ক বজায় রাখবো। অন্যায়ের প্রতিবাদ করবো কিন্তু অন্যায়কারীকে তিরস্কার করব না। মন্দকে ভাল পথে আনার চেষ্টা করবো। সব সময় ভাল চিন্তা করব। অন্যকে সৎ পরামর্শ দিবো। কারো দুঃসময়ে পাশে দাঁড়াবো। ভাল ¯^প্ন দেখব- আশা নিয়ে বাঁচার চেষ্টা করবো। আমি তা-ই করবো যা নিজের এবং মানুষের কল্যাণে আসবে। আমি নিজে ভালো থাকবো এবং অপরকেউ ভালো রাখবো। কারণ সবাই মিলে ভালো না থাকলে- শ্রেষ্ঠত্বে মর্যাদা ও জীবনের আনন্দ পাওয়া যাবে না।

নিয়মতান্ত্রিকভাবে নিজের জীবন পরিচালনা করতে হবে নিজেকেই। জীবনটা খুব জটিল, ঝামলেপূর্ণ, খুব কঠিন, বাজে, নীরস- অনেক সময় আমাদের মনে  হয়। আবার অনেক ক্ষেত্রে আমরা নিজেই নিজের অজান্তে জীবনের জটিলতা বাড়িয়ে দিই। মানুষ কাজ করে সংসার জীবনের জন্য আবার সংসার জীবন সুন্দর হয় কাজের মাধ্যমে। এই জীবন সংসারকে কেন্দ্র করেই এতকিছু, তাহলে আমাদের কর্মময় জীবন কতটা সংসারমুখিÑ অনেক সময় একসঙ্গে এতো কাজ এসে জমা হয় যে, আপনি কোনটি রেখে কোনটি করবেন তা বুঝে উঠতে পারেন না। এ রকম পরিস্থিতিতে অযথা উদ্বিগ্ন না হয়ে একটি একটি করে কাজের কথা চিন্তা করুন এবং বাকিগুলো মন থেকে মুছে ফেলুন। আপনার খুব ভোরে বাইরে যাওয়ার প্রয়োজন হতে পারে। তাই রাতেই ঠিক করে রাখুন কোন ড্রেসটি পরবেন, দেখুন সেটা ঠিকঠাক আছে কি না। দরকারী যে জিনিসগুলো নেবেন তা আগেই গুছিয়ে রাখুন। ছিমছাম সাজানো-গোছানো মানুষের মনকে সতেজ রাখে। অফিসে আপনার ব্যবহার্য জিসিপত্তর গুছিয়ে রাখুন। মাসে দু’বার অন্ততপক্ষে একবার হলেও সবকিছু পরিষ্কার করুন অথবা করান। বাড়িতে একই সঙ্গে বিভিন্ন বিলের কাগজ ও অন্যান্য আরো অনেক দরকারী কাগজ এসে জমা হয়। কিন্তু সব কাগজ যদি একই জায়গায় রাখা হয় তাহলে দরকারের সময় প্রয়োজনীয় কাগজটি খুঁজে পেতে অনেক সমস্যা হয়। তাই এগুলো আলাদা সাজিয়ে রাখুন এবং ফাইলে নির্দিষ্ট বিলের নাম লিখে রাখুন। তাহলে অতি সহজেই আপনার বিলটি খুঁজে পাবেন। অনেক সময় আপনি প্রয়োজনীয় অনেক কাজের কথা ভুলে যেতে পারেন, যদিও সেটা আপনার ডায়েরিতে লেখা থাকে। এ সমস্যা থেকে মুক্তি পাওয়ার সবচেয়ে সহজ উপায় হলো আপনার মোবাইল কিংবা ইন্টারনেটের রিমাইন্ডার ব্যবহার করা। সময় পেলেই  বেড়াতে যান বন্ধু-বান্ধবী, পরিবারের অন্য সদস্য বা আত্মীয়ের বাসায়  কিংবা বন্ধুদের সঙ্গে দু-এক দিনের ট্যুরে। আজকাল হয়তো মোবাইল ফোন ছাড়া আপনার দিনটি কল্পনাও করতে পারেন না। এ ক্ষেত্রে আপনার দায়িত্ব হলো ফোনে ঠিকমতো চার্জ দেয়া। না হলে বাইরে গিয়ে কথা বলতে বলতে ফোন বন্ধ হয়ে যাবে আর আপনার সারাটি দিন অ¯^স্তত কাটবে।  অপরিচিত কোন জায়গায় যাওয়ার আগে রাস্তাঘাট, পরিবহন, হোটেল-মোটেল, খাবার-দাবার সম্পর্কে ভালোভাবে জেনে নিন। প্রয়োজনে ঐ এলাকার ম্যাপ থেকে দেখে নিন আপনার গন্তব্যের স্থানটি ঠিক কোন জায়গায়।

মনে রাখবেন, জীবনে সাফল্যের প্রথম দরজাটির নাম লক্ষ্য কথায় আছে লক্ষ্য ছাড়া জীবন অনিশ্চিত। সফলতার জন্য প্রথমেই লক্ষ্য  স্থির করুন। আমরা জানি, দার্শনিক ইমারসন আত্মবিশ্বাসকে সাফল্যের প্রথম শর্ত মেনেছেন।  কেননা সাফল্য আসে আত্মবিশ্বাসের মাধ্যমে। একবার না পারিলে দেখ শতবার। চেষ্টায় সব হয়। হতে পারে কম বা বেশি। পথ চলতে বাঁধা আসবেই। নতুন পথে হাঁটতে হবে  আবারো। জীবন থেমে থাকে না আপনি কেন থামবেন। চেষ্টা চেষ্টা চেষ্টা- সুফল মিলবে শেষটায়। তবে চলতে হবে বুদ্ধি খাটিয়ে। তা না হলে পরিশ্রমটাই পন্ডশ্রমে বৃথা যাবে। অধরাই রয়ে যাবে সাফল্য। যতবার ব্যর্থ হবেন- ততবার কারণগুলো খুঁজে বের করতে হবে- কেন সফল হতে পারেননি বা কাক্সিখত সফলতা আসেনি। তারপর পরের বারের পরিকল্পনা সাজান। সাফল্য আসবেই।

ঘাবড়াবেন না, কোনকিছু অর্জন করার পথ কখনোই মসৃণ হয় না। তাই হতাশ হওয়ার কিছু নেই। আপনি যে কাজগুলো ভালভাবে করতে পারেন তার একটি তালিকা তৈরি করুন। এভাবে দুর্বলতা দূর করার জন্য ভুলগুলোও চিহ্নিত করুন। পরিস্থিতি যাই হোক না কেন- হারার আগেই হারবেন না। তাই ‘আমি পারব না’, ‘আমাকে দিয়ে হবে না’, ‘সম্ভব না’ ‘অনেকেই পারেনি’ ইত্যাকার নেতিবাচক ধারণা, মনপোষণ, কিংবা উদাহরণ থাকলেও এড়িয়ে চলুন। মনে রাখুন অসম্ভবকে সম্ভব করাই মানুষের চিরন্তন প্রয়াশ। আত্ম-প্রতিজ্ঞা থাকাটা খুব জরুরি- ‘আমি পারব’ এই প্রতিজ্ঞাই আপনাকে ‘আমাকে পারতেই হবে’ পর্যায়ে ঠেলে দিবে। আর আমাকে পারতেই হবে এমন দৃঢ় প্রত্যয় সফলতার এবং প্রচেষ্টার কাজকে অর্ধেক আগিয়ে দেয়।

লক্ষ্যে  পৌঁছতে হলে কষ্ট আপনাকে করতে হবেই। পাবলো পিকাসোর কথা অনুযায়ী নিজের কাক্সিখত স্থানে পৌঁছতে হলে সামনে একটি আদর্শকে প্রতিষ্ঠিত করা বেশ জরুরি। কাজের কোন বিকল্প নেই। মনে রাখা দরকার  কোনো কাজেরই সহজ, শর্টকাট বা  সংক্ষিপ্ত রাস্তা নেই।  ভেবে দেখুন খেলার আগে খেলোয়ারেরা কিভাবে একটু হাত-পা ছুঁড়ে নিজেদেরকে তৈরি করে নেয়, ঠিক  সেভাবে আপনাকেউ মানসিক ও শারিরীকভাবে লক্ষ্য অর্জনে কিছু প্রাক প্রস্তুতি নিতে হবে। কোন কাজে সফল হওয়ার সবচাইতে সোজা উপায় হচ্ছে সেটাকে নিয়ে বারবার পরীক্ষা করা, অনুসন্ধান করা। জীবনে সময় গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। সময়কে যথাযথভাবে ব্যবহার করলে অনেক অনেক বেশি কাজ করা যায়। সময়কে নস্ট করা মানে পরিকল্পনা ও ভবিষ্যত সম্ভাবনাকে হারানো। তাই সময় বা পরিকল্পনাকে বিনষ্ট করে এমন ক্ষেত্রে কারো অনুরোধও রাখবেন না। সময়ের সাথে কাজের গতি না মিললে কিন্তু সঠিক সময়ের মধ্যে কাজ সম্পূর্ণ করা সম্ভব হবে না।  ওয়ার্ক প্ল্যানিং খুব গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। প্রয়োজনের চেয়ে বেশি সময় নিয়ে কাজ করা, ঢিলেমি দেয়ার খেসারত কিন্তু সময় দিয়েই দিতে হয়। তাই আগের কাজ আগে পরের কাজ পরে করতে হবে।  সহজ কাজে কম সময় লাগিয়ে কঠিন কাজে বেশি সময় দিতে হবে। আবার কাজ করার আগে কাজ নিয়ে ভাবনার জন্যও সময় রাখতে হবে। সবার আগে নিজের কাকে মনযোগ দিন। স্বচ্ছন্দে সময় কাটান।

লেখকঃ সাংবাদিক, বিশ্লেষক ও উন্নয়ন গবেষক

ই-মেইলঃ [email protected]

 

আরও পড়ুন