ভয়াতুর-রাত

সুমেরা জামান

সে রাতের সেহেরিতে আমি
কিছুই খেতে পারিনি। শুধু সাত বছরের মেয়েটির মুখে একটু দুধভাত তুলে দিয়ে বললাম যাও রোজার জন্য নিয়্যত কর ।
সারারাত বাতাসের বিভ্যৎস কান্নার শব্দে আতঙ্কিত আমি কিছুতেই স্বাভাবিক হতে পারছিলাম না। মনে হচ্ছিল ছোট্ট বাচ্চা কান্না করছে চারপাশে। বুকের ভেতর বেদনার হাহাকার।
আমার দোতালা বাসার জানালা দরজা সব বন্ধ তবু প্রচন্ড শব্দের ঝাঁকুনিতে প্রকম্পিত হচ্ছিল চারপাশ!
একবার বেলকুনি দরজা দিয়ে দেখার চেস্টা করলাম বাহিরটা। বাতাসের প্রচন্ড ঝাপটাতে আমি ভিজে গিয়ে ঘরে ঢুকলাম।

প্রায় রাত এগারোটা থেকে সকাল ছ’টা।রাতের নামাজে দাঁড়িয়ে এভাবে কবে কেঁদেছি ভুলেই গেছি!
মনে হলো এটাই হয়তো আমার জীবনের শেষ নামাজ। একটা পর একটা সূরা পড়ছি, দমবন্ধ হয়ে আসছিল , কণ্ঠও উচ্চারণের ক্ষমতা হারিয়ে ফেলেছিল। ভাবছিলাম কেয়ামত শুরু হয়ে গেছে! আমার সময় শেষ!

নামাজ শেষে দু’হাত তুলেছি দুঠোঁট শুধু বলছিলো, হে আল্লাহ্! ঝড় থামিয়ে দিন।
সকলের উপর রহম করুন। এছাড়া আর কিছুই বলতে পারছিলাম না।

সমুদ্র উপকুলের মানুষগুলো কথা ভাবতেই দুচোখ ভিজে গেল!

বাড়তেই থাকল ঝড়ের তীব্রতা আর বাতাসের বেগ। আমি একসময় হতাশ হয়ে ভাবতে লাগলাম দোয়া কবুলের দরজা বোধহয় বন্ধ হয়ে গেছে!
এই ঝড় হয়তো সবকিছুই ধ্বংস করে আমাদের কবরে পৌঁছে দিবে। এই রাত আর কখনও ভোর হবেনা। সকালে সুভ্রতা দেখবেনা, পাখিরা গায়বেনা, আজানের সুরের স্নিগ্ধতা ছড়িয়ে পড়বেনা পাড়ার পূর্বে পশ্চিম!
তবু জায়নামাজ থেকে উঠিনি।
বাচ্চাদের কপালে হাত রেখেছি বিদায়ী বিশ্বাস নিয়ে। আমার সেই সময়ের অনুভূতি কোনদিন ভুলতে পারবনা। লিখতে গিয়েও আমার হৃদস্পন্দন বেড়ে যাচ্ছে। হাই! কত ক্ষনস্থায়ী এই দুনিয়ার জীবন! শুধু একটা শক্ত বাতাসই যথেষ্ট সব শেষ করার জন্য!

সকালের দিকে একটু তন্দ্রাভাব ছিল তবে হাহাকারের শব্দ ঘুম ভেঙ্গেছে।
সেরাতে কেটে সকাল হয়েছিল বটে
তবে গ্রামবাসীর চোখে নেমে এসেছিল ভয়নক অন্ধকার।

হঠাৎ চিৎকারে ঘুম ভেঙ্গেছে।
ভাললাম নিরা কাকির রোজকের ক্যাচাল!
নাহ্ কান্নার তিব্রতা বাড়তে থাকলে
আমি দ্রুত কিচেন রুমে গিয়ে
কাঁচের জানালাটা দিয়ে বাহিরে বাঁশ বাগানের দিকে তাকালাম।
দেখি সারারাতের যুদ্ধে ক্লান্ত সেনারা ঠাঁয় দাঁড়িয়ে আছে ক্লান্তিহীন ভঙ্গিতে।
তবে পাতাদের দেখে মনে হলো মন খারাপে মাথা নিচু করে রেখেছে। আর বাগানজুড়ে ছড়িয়ে আছে কালচে সবুজাভ আভা।

গত বার ধানের দাম পায়নি বলে নিরা কাকী এবার ধান চাষ না করে গরু কিনতে চেয়েছিলেন। কিন্তু কাকা তাতে রাজী হয়নি। আর এবার সেই ধানই ডুবে গেল! এই নিরব হাহাকার দিয়ে দিনের শুরু।
রেজা কাকার
ধান ডুবে গেছে,
পিয়াসের বাবার পানের বরজ!
লোনের টাকাতে লিজ নেয়া পুকুর ভেসে গেছে গেদুর ভায়ের ,

গরু বিক্রির টাকা দিয়ে সদ্য মুদি দোকান দেওয়া মোড়ের দোকানীর টিনের চালটাই শুধু উড়ে যায়নি সাথে গেছে স্বপ্নগুলোও!

পাকা ভুট্টারা উল্টে পড়ে আছে গাছ সহ।
যেখানে ছিল হয়তো কারো খোকার পড়ার টাকা পাঠাবার আয়োজন!

ব্রয়লার মুরগীরা মুখ বুজে মরে গেছে,
কারো বাগানের আম ঝরে আছে মাটিতে কিন্তু কষ্ট বিছায়ে আছে বুকে!

আমরা জীবনে এমন কোন রাত আগে আসেনি। খুব ভয় পেয়েছি। এখনো স্বাভাবিক হতে পারিনি। বাহিরে ঝড় থেমেছে বটে বুকের ভেতরে এখনও চলছে আম্পান….
জোড়ে গাড়ী যাবার শাঁ শাঁ শব্দেও এখন আমি অতঙ্কিত হয়ে পড়ছি!

আরিবার দাঁতের ডাক্তার দেখাতে গেছিলাম গতকাল বিকেল। রাস্তার দুপাশে বিঘার পর বিঘা ধানক্ষেত বাতাসের ঝাপটাতে মাটিতে নুয়ে পড়ে আছে :'( :'(

হে আল্লাহ্ তুমি রহমতের চাদর দিয়ে ঢেকে দিও আমাদের।
দুর্ভিক্ষ থেকে রক্ষা করো…

আমাদের গ্রামে আম্পান
ভয়াতুর রাত, ২১শে মে ২০২০

লেখক:কবি, সাহিত্যিক,প্রাবন্ধিক ও রম্য লেখক

আরও পড়ুন