জীবন ও সফলতা

ডাঃ জোবায়ের আহমেদ

২০০৬ সালের মধ্য সেপ্টেম্বরে বুয়েটের পুরকৌশল বিভাগে আমার জীবনে অনুকরণীয় অনন্য অসাধারণ মানুষ প্রফেসর ড.দেলোয়ার হোসেন কাকার অফিসে আমি ও তিনি মুখোমুখি হলাম।ইতিমধ্যে পরিবারের দায়িত্ব তুলে নিয়েছি কাঁধে।তখন আমি মেডিকেল তৃতীয় বর্ষে উঠলাম।

দেলোয়ার কাকা আমাকে একটা প্রশ্ন করলেন।
জীবনে সুখী হতে চাও?
আমি মাথা নাড়লাম।
তিনি বললেন,দুইটা জিনিস মাথায় ও হৃদয়ে গেঁথে নাও আজ।

১)নিজের জীবনকে কখনো অন্যের সাথে তুলনা করবে না।

২)কখনো কারো কাছে কিছু প্রত্যাশা করবে না।
এমনকি যাদের জন্য তোমার অনেক অবদান থাকবে তাদের থেকেও না।আমি সেদিনের শিক্ষা মাথায় ঢুকিয়ে নিয়েছিলাম।
তাই আজ আমি সুখী মানুষ।সুখ আমি সত্যি অনুভব করি।।

আমাদের যাপিত জীবনে আমাদের অনেক দায়িত্ব পালন করতে হয়।আমাদের মধ্যবিত্ত পারিবারিক কাঠামোতে বড় সন্তানদের দায়িত্বটা আরো বেশি।দায়িত্ব পালন সবাই করেনা।করতে পারে না।অনেকেই দায়িত্ব এড়িয়ে যায়।

যারা দায়িত্ব এড়াতে শিখেননি,তারা মাঝে মাঝে নানা রকমের অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়ে যান,যা তাদের ভেতরটা দুমড়ে মুচড়ে দেয়।যাদের জন্য নিজেকে বিলিয়ে দেওয়া নিজের দিকে না তাকিয়ে,তারা যদি কষ্টের কারণ হয়,তখন ব্যাথার মাত্রা তীব্র হয়।
কিন্ত আপনি যদি তাদের নিকট কোন প্রত্যাশা না রেখেই দায়িত্ব পালনের তৃপ্তি অনুভব করেন,কারো জীবন আলোকিত হয়ে উঠার একমাত্র কারণ আপনি হয়ে থাকেন,তবে সেই আত্মতুষ্টির তুলনা কিছুর সাথেই হতে পারে না।।

দ্বিতীয়ত, আমাদের প্রত্যেকের জীবনের গল্প আলাদা আলাদা।এক জীবনে সবাই সমান সুযোগ পায়না।জীবনের চলার পথ ও গতিপথ ভিন্ন ভিন্ন।আপনার অনন্য জীবন কখনোই অন্য কারো সাথে তুলনীয় হতে পারে না।

জীবনে সফলতার সংজ্ঞা ভিন্ন জনের কাছে ভিন্ন রকম।কেউ জীবনে টাকা উপার্জন ও তা জমিয়ে রাখাকেই সফল জীবন ভাবে।
আবার অন্যজন নিজের কথা না ভেবে পরার্থে সেই টাকা বিলিয়ে দিয়ে সুখ পান।

কেউ বড় চাকুরীকে জীবনের সফলতা ভাবেন।আবার অনেকে বড় চাকুরী ছেড়ে দিয়ে নিজের মত কাজ করে সুখী হন।কেউ এমন চাকুরী যেখানে দুইহাতে অবৈধ ইনকামের সুযোগ থাকে,তাকে সফলতা ভাবেন।আবার অনেকে এক সিগনেচারে কোটি টাকা ইনকামের সুযোগ থাকার পরেও নিজের বিবেক বিক্রি করতে অনিচ্ছুক থেকে আত্মতৃপ্তি পান।

এমন অনেক মানুষকে আমি চিনি যাদের অনেক বড় বড় ডিগ্রি আছে কিন্ত তাদের ভাইবোন মূর্খ।তারা জৌলুশভরা জীবন যাপন করলেও তাদের স্বজন ফকিরি জীবন যাপন করেন।বড় ডিগ্রি ওয়ালা মানুষরা স্বজনদের প্রতি দায়িত্বহীন আচরণ ও তাদের অসহায়ত্বকে তাদের সফলতা ভাবেন।আবার এমন মানুষ দেখেছি যাদের যোগ্যতা থাকার পরেও তারা নিজে একা অনেকদূর না এগিয়ে অন্যদের জীবনে এগিয়ে দেন।
এটাই তাদের সফলতা।

কেউ বাবা মায়ের জন্য অপরিসীম মায়া বিলিয়ে তাদের দোয়া অর্জনকে সফল জীবন মানে।আবার অনেকের বাবা মায়ের আশ্রয় অনাদর ও অবহেলায় বৃদ্ধাশ্রমে।

জীবনকে যদি অন্যের জন্য কল্যাণ কামনার চোখে দেখা যায়,স্বার্থপরতার উর্ধ্বে উঠে চারপাশে মায়া বিলিয়ে দেওয়া যায়,তবে সেই জীবনের চেয়ে সফল জীবন আর কিছুতেই হয় না।

আজ আপনি যদি কারো কষ্ট লাগব করেন,কারো বিপদের দিনে আপনার হৃদয় আর্দ্র হয়,আগামীকাল আপনি যদি ঘোর অমানিশায় ডুবে যেতে থাকেন,তখন নিশ্চিতভাবে এমন কিছু মানুষ আপনার জন্য আলো নিয়ে এগিয়ে আসবে যাদের কাছে আপনার কোন প্রত্যাশা ছিলো না।এমনকি তাদের আপনি চিনতেনও না।

আমি আমার জীবনের বিভিন্ন ঝড়-ঝঞ্ঝায় এমন মানুষের ভালবাসা ও মায়া পেয়েছি।।সেইজন্যই বলছি,যার জন্যই যা করবেন,প্রত্যাশাহীন ভাবেই করবেন।এতে আত্মিক সুখ পাবেন।
পাশাপাশি যাদের জন্য আপনার ত্যাগ আছে,তারা আপনার জন্য কিছু না করলেও এমন অনেক মানুষ আপনার জন্য এগিয়ে আসবে মায়াভরা হৃদয় নিয়ে যা দেখে আপনি সুখ অনুভব করবেন নিশ্চিতভাবে।

লেখকঃ কলামিস্ট, ডাক্তার ও সমাজসেবী

আরও পড়ুন