উপকার করি অপকার নয়

এম আর রাসেল 

ইসলামিক আদর্শ যারা ব্যক্তিজীবনে অনুসরণ করতে চান তাদের অনেকের মধ্যেই একটা একরোখা ভাব প্রায়শই চোখে পড়ে। ইসলামী জ্ঞানের আমি পণ্ডিত নই। এই ব্যপারে গভীরতর কোন আলোচনার মাঝেও আমি যাব না। চলতে ফিরতে চোখে পড়া কিছু ঘটনার প্রেক্ষিতে উদিত ভাবনার দাবি পূরণ করতেই লিখতে বসা।

একজন মুসলিম হিসেবে ব্যক্তিজীবনে ইসলামের নির্দেশনা মানার নিমিত্তেই ইসলামী জ্ঞান অর্জন করি। পাশাপাশি সময় পেলে অন্য জ্ঞানের মোহাফেজখানাতেও উঁকি দেই। সাধারণ শিক্ষায় শিক্ষিত হওয়ার ফলে ধর্মীয় জ্ঞানের অভাব পূরণে নিজেকেই নিয়োজিত করেছি। সেই জানা কিছু বিষয় ভাগাভাগি করতে চাই।

যাই হোক, আজকের যে বিষয়টি নিয়ে বলতে চাই তা হল ইসলামী ভাবধারার বিপরীত মতাদর্শের লোকদের রচনা পাঠ করতে নিষেধ আছে কি?

ইসলাম ধর্ম আল্লাহ মনোনীত একটি পরিপূর্ণ জীবনবিধান। পৃথিবীর বুকে চলার জন্য যাবতীয় সকল নির্দেশনা আল্লাহ রাব্বুল আলামীন কুরআনে লিপিবদ্ধ করেছেন। এর পাশাপাশি রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এর মাধ্যমে ব্যবহারিক প্রয়োগ করিয়ে দেখিয়েছেন। একজন মুসলিমের জন্য এই দুই গ্রন্থ পাঠের মধ্যেই রয়েছে জীবন চলার প্রকৃত রশদ। কিন্তু দুঃখের বিষয় হল এই গ্রন্থদ্বয় পাঠে মুসলিমদের মাঝে এক অদ্ভূত ধরণের নির্লিপ্ততা চোখে পড়ে। প্রকৃত জ্ঞানের অভাবে অনেক সময় আমরা ইসলামকে প্রায় বিতর্কের জায়গায় নামিয়ে ফেলি।

যুগ যুগ ধরে পৃথিবীতে দুই ধারার মানুষ ছিল, এখনও আছে এবং ভবিষ্যতেও থাকবে এটাই স্বতঃসিদ্ধ সত্য কথা। একদল বিশ্বাসী আরেক দল অবিশ্বাসী। এখন অবিশ্বাসী মানুষ হলেই যে তার সাথে খারাপ আচরণ করতে হবে এমনটা কি আমাদের ধর্মে কোথাও বলা আছে। বরং, রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এর জীবন পাঠ করলে দেখা যায় বিধর্মীদের প্রতি ভাল আচরণ প্রদর্শনের অনেক নজির রয়েছে। তাদের কৃত কর্মকে নিজের বিশ্বাসের সাথে না মিলিয়ে তাদের সাথে ভাল ব্যবহার প্রদর্শন করার শিক্ষাও আমরা দেখতে পাই। তাদের জন্য হিদায়াতের দোয়া করার শিক্ষাও কি আমরা পাই না? তায়েফের ঘটনা এ ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় উদাহরণ নয় কি?

এখন যারা ইসলামের আলোর সন্ধান পেয়েও অন্ধকারে থাকতেই পছন্দ করে তাদের জন্য আমাদের দুঃখ প্রকাশ করা ছাড়া আর কিইবা করার থাকতে পারে? এখন কথা হল এইসব অবিশ্বাসী লোকদের লেখা বিভিন্ন বই পড়লে বা তাদেরকে কোট করে কোন কথা বললেই বিশ্বাসী দল ব্যাপক রূষ্ট হয়ে পড়েন। অনেকে আবার বলে থাকেন দুর্জন বিদ্ধান হলেও পরিত্যাজ্য।

দুর্জন বিদ্ধান হলে অবশ্যই পরিত্যাজ্য হবে। তবে তার সৃষ্টিকর্মও পরিত্যাগ করতে হবে এমনটা কোথাও বলা আছে কি? একজন পাঠকের কাজ হল মৌমাছির মত সকল ফুল থেকে রস সংগ্রহ করে মধুর মত উপাদেয় কিছু তৈরি করা। বিপরীত মতাদর্শের প্রতি সম্মান প্রদর্শন মূলত ইসলামের সৌন্দর্য প্রকাশের অন্যতম একটি মাধ্যম।

বিশ্বাসী মানুষের কর্মকান্ড কখনও কখনও এই সৌন্দর্যকে প্রশ্নবিদ্ধ করে ফেলে। এমনটা কখনই কাম্য নয়। এ ব্যাপারে আবদুল্লাহ মাহমুদ নজীবের “বাইশ জানুয়ারি” প্রবন্ধটি সবাই পড়ে দেখতে পারেন। একটা সমাধান পাবেন আশা করছি। সেখান থেকে কিছু বিষয় তুলে ধরছি।

জাহিলী যুগের মেটাফেজিক্যাল কবি খ্যাত উমাইয়া ইবন আবিসসালত ছিলেন একজন অমুসলিম, কিন্তু নবীজী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তার কবিতা খুব পছন্দ করতেন। কবি সম্পর্কে নবিজি ( সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন, ‘তার কবিতা ঈমান এনেছে,আর তার অন্তর কুফরি করেছে।’

কি সুন্দর বচন তাই না-ভেবে দেখেছেন কি কখনও? আরেকটি ঘটনা। আবু হুরায়রা (রা) কে এসে শয়তান শিখিয়ে দিল- ‘তুমি যদি রাতে আয়তুল কুরসি পড়ে ঘুমাও, তোমার ঘরের জিনিসপত্র আল্লাহর জিম্মায় থাকবে।’ সকালে উঠে আবু হুরায়রা (রা) নবিজি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) কে ঘটনাটি জানালেল। নবিজি ( সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) যথারীতি অল্প কথায় একটি মন্তব্য করলেন- ‘সে অনেক বড় মিথ্যুক, তবে এই কথাটি সত্য বলেছে।’

আবার কুরআনের যত প্রাচীন কাব্যগ্রন্থ আছে তথা তাফসীর আছে, তার মধ্যে প্রায় সব গ্রন্থেই ইমরাউল কাউস উদ্ধৃত হয়েছে। এই ইমরাউল কাউস জাহিলী যুগের কবিগুরু ছিলেন। অশালীন শব্দ প্রয়োগেও তিনি ছিলেন বেশ সিদ্ধহস্ত। কিন্তু বিভিন্ন বিভিন্ন রচনায় এই ইমরাউল কাউসকে ফ্রিকোয়েন্ট কোটিং করেছেন আমাদের পূর্ববর্তী আলেম রা।

অন্যদিকে ইসলামের স্বর্ণযুগে বিভিন্ন মনীষী গ্রীক সাহিত্য থেকেও অনেক কিছুর অনুবাদ করেছিলেন। জ্ঞান চর্চায় এমন ভারসাম্যপূর্ণ অবস্থান সৃষ্টির নজির খুঁজলে হয়ত আরও অনেক পাওয়া যাবে। অহেতুক এই সব নিয়ে তর্ক করে আমরা কেন ইসলামের সৌন্দর্যকে কলুষিত করে ফেলছি একবারও ভেবে দেখেছেন কি?

পরিশেষে, প্রিয় লেখক আবদুল্লাহ মাহমুদ নজীবের একটি আপ্তবাক্য দিয়েই ইতি টানছি।

‘জ্ঞানচর্চায় ও আলাপে এ ধরণের ভারসাম্য পূর্ণ অবস্থান যখন থাকে না, তখন চিন্তার হঠকারিতা সৃষ্টি হয়, গঠনমূলক বিতর্কের পরিবেশ নষ্ট হয়ে নিরর্থক ও অর্থহীন বিশৃঙ্খলা তৈরি হয়, যা দিনশেষে কোনোপক্ষের জন্যই উপকার বয়ে আনে না।’

ভেবে দেখুন আপনি উপকার করছেন না অপকার।

 

আরও পড়ুন