মিউজিক থেরাপিঃ গান যখন মহৌষধ

চিকিৎসাব্যবস্থা বলতে আমরা সাধারণত কি বুঝি।
অসুখ হলে চিকিৎসকের কাছে যাওয়া এবং
তিনি পরীক্ষা নিরিক্ষার মাধ্যমে রোগ নির্ণয় করে আমাদেরকে প্রয়োজনীয় ঔষধের নির্দেশনা দিবেন।
এটিই তো।

তবে এর বাইরেও চিকিৎসা বিজ্ঞানের অসংখ্য পদ্ধতি রয়েছে।
এই যেমন অনেক সময়েই চিকিৎসক ঔষধ নির্দেশনার বাইরেও তার রোগীকে প্রয়োজনীয় শরীরচর্চা বা খাদ্যাভ্যাস পরিবর্তনের পরামর্শ দিয়ে থাকেন।
এটিও কিন্তু ঔষধ গ্রহনের মতোই জরুরি।

আচ্ছা,ঔষধের পরিবর্তে যদি কেউ মিউজিক ব্যবহার করেন মানে সোজা বাংলায় গান।
তাহলে কি রোগী সুস্থ হবে ?
অনেকে নিশ্চয়ই এটা শুনলে হাসাহাসি করবেন বা ভাববেন কি সব বাজে বকছে।

উপরের প্রশ্নটির উত্তর হচ্ছে হ্যাঁ।
গান/সুর শোনা অথবা বাজানো এ উভয়ের মাধ্যমেও রোগীকে সারিয়ে তোলা সম্ভব।
তাও আবার কোনোরূপ পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া ছাড়াই।

আর চিকিৎসা বিজ্ঞানের এই বিস্ময়কর উদ্ভাবনের নামই হচ্ছে মিউজিক থেরাপি।
যেখানে গানই আপনাকে আরোগ্য করে তুলবে।

সর্বপ্রথম ১৭৮৯ সালে কলম্বিয়ার এক ম্যাগাজিনে এই বিষয়টি তুলে ধরে।
এরপর ১৮০০ সালে প্রথমবারের মতো এর পরীক্ষামূলক প্রয়োগ হয়।
১৯৪০ সালে গ্যাস্টন মিউজিক থেরাপিকে পেশা হিসেবে এবং এ বিষয়ে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার উদ্যোগ গ্রহণ করেন।
তার এ অগ্রণী ভূমিকার জন্য তাকে মিউজিক থেরাপির জনক বলা হয়।
বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রে প্রায় ৮০০০ সনদপ্রাপ্ত মিউজিক থেরাপিস্ট রয়েছেন।

যাইহোক এবার শুরুর দিকটায় আসি,
প্রথম বিশ্বযুদ্ধ এবং দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরবর্তী সময়ে অগণিত সৈন্য মানসিকভাবে ভেঙে পড়ে এবং দিন দিন তাদের মানসিক অবস্থার অবনতি ঘটতে থাকে।
ওই সময়ে ঔষধব্যবস্থাও তাদেরকে ঠিকঠাকভাবে সারিয়ে তুলতে পারেনি।
যুদ্ধক্ষেত্রে কাটানো দুঃসময়গুলো তাদের মাথায় স্থায়ীভাবে গেঁথে যায়।
ঠিক সেই সময়ে মিউজিক থেরাপিই সবচেয়ে বেশি কাজে দিয়েছে।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর আমেরিকার সৈন্যদেরকেও মিউজিক থেরাপি ব্যবহারের মাধ্যমে মানসিকভাবে
উত্তরোণ করা সম্ভব হয়েছিল।

স্বাভাবিকভাবে চিন্তা করতে গেলেও
আমরা ব্যক্তিজীবনে অন্তত এটুকু বুঝতে পারি যে,
কিছু কিছু গান বা সুর আসলেই আমাদের মন ভালো করে দিতে সক্ষম;
আবার কিছু গান আমাদের অতীতকে মনে করিয়ে দেয়।

মূলত মস্তিষ্কের বিভিন্ন অংশ আমাদের বিভিন্ন অনুভূতির সঞ্চার করে।
আর একটা মিউজিক মস্তিষ্কের মধ্যকার প্রায় প্রতিটি অংশেই পৌঁছায়।
যার বদৌলতে ওইসব অনুভূতির কেন্দ্রগুলো সাড়া দেয় এবং আমাদের মধ্যে ওই নির্দিষ্ট মিউজিক অনুযায়ী নির্দিষ্ট অনুভূতির বহিঃপ্রকাশ ঘটে।

মিউজিক থেরাপি ব্যবহার করে উদ্বিগ্নতা,দুঃশ্চিন্তা,
বিষন্নতা ইত্যাদি দূর করা হয়।
এছাড়াও পূনর্বাসন,মানসিক শক্তির জোগান,ব্যাথানাশক,শ্বসনের হার এবং আলঝেইমার্স সহ আরও বেশকিছু মানসিক রোগের ক্ষেত্রে এটি ব্যবহার করা হয়।

তবে মিউজিক থেরাপিতে সাধারণত
শান্ত/ধীরগতির গান বা সুর’ই ব্যবহার করা হয়।

গবেষণায় দেখা গেছে,ধীরগতির মিউজিক রক্তচাপ নিম্ন করে এবং দীর্ঘসময় যাবৎ শুনলে মাংসপেশিকে শিথিল করে।
এছাড়াও উচ্চ এবং নিম্ন সুর তথা কম্পনের মিউজিক হৃৎস্পন্দনকে বাড়ানো বা কমানোর সক্ষমতা রাখে।

এছাড়া মিউজিকের প্রভাবে এন্ডোরফিন হরমোন নিঃসৃত হয়।
যেটি মস্তিষ্কে আনন্দ/উৎফুল্লতার সৃষ্টি করে।
এটি একইসাথে ব্যাথানাশক হিসেবেও কাজ করে।

কর্টিসল হরমোন উদ্বিগ্নতা এবং দুশ্চিন্তা বাড়াতে সহায়তা করে।
তবে যখন ধীরগতির মিউজিক শুনি তখন কর্টিসলের লেভেল কম থাকে।
তাই আমাদের মধ্যকার দুশ্চিন্তা এবং বিষন্নতাগুলো কমে যায়।

আমাদের পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশেই বর্তমান সময়ে মিউজিক থেরাপি বহুল প্রচলিত।

মিউজিক থেরাপি নিয়ে অসংখ্য বই রয়েছে।
অনেকগুলি সিনেমাও হয়েছে।
তার মধ্যে ২০১১ সালে জিম কোহলবার্গের
‘The Music Never Stopped’ সিনেমাটি বেশ সাড়া ফেলেছিল।

জার্মান কবি Berthold Auerbach দারুণ একটা কথা বলেছেন,
“Music Washes away from the soul
the dust of everyday life”

 

লেখকঃঃ হাসিবুর রহমান ভাসান,  মেডিকেল স্টুডেন্, কবি ও সাহিত্যিক।

আরও পড়ুন