ইসলামের দৃষ্টিতে ভালোবাসা

দিল আফরোজ রিমা

ভালোবাসা ছাড়া মানব জীবন অচল। রাব্বুল আলামীনই ভালোবাসার প্রকৃত উৎস। আমরা তার কাছ থেকেই ভালোবাসা নামক অনুভূতিটি পেয়েছি। তিনি খুব ভালবেসে আমাদের সৃষ্টি করেছেন। আর আমরাও তাকে ভালোবাসি। সিজদায় অবনত হয়ে তার কাছে শ্রদ্ধা আর ভালোবাসা নিবেদন করি। রাসুলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেন – আল্লাহ বলেন, তোমাদের মধ্যে যারা একে অন্যকে ভালোবাসবে আমার জন্য তাদের জন্য কিয়ামতের দিন আলোকিত আসন রাখা হবে।
(তিরমিজি)

ফেব্রুয়ারী মাসের ১৪ তারিখে ভালোবাসা দিবস পালন করা হয়। মেয়েরা লাল শাড়ি পড়ে বাইরে গিয়ে যার যার কাঙ্ক্ষিত মানুষের সাথে দেখা করে, পার্কে ঘুরে বেড়ায়, ফুল বিনিময় করে। এভাবে ভালোবাসা দিবস পালন হয়। এই ভালোবাসা দিবসে অনেক অপ্রীতিকর ঘটনাও ঘটে থাকে। অনেকে ভালোবাসা বিনিময় করতে গিয়ে কোন নারী পাচারকারীর হাতে গিয়ে পরে। খবরের কাগজই সেসব ঘটনার স্বাক্ষী।

আমি বলতে চাই এই ভালোবাসা দিবস পালন করা ইসলামে নেই। নাজায়েজ। ইসলামের নিয়ম – – দু’জন সাবালক ছেলে মেয়ের বিবাহ বৈধ। কিন্তু বিবাহের আগে তাদের দেখা হওয়া, কথা বলা, মেলামেশা করা বৈধ নয়। সম্পূর্ণ অবৈধ। আর সে অবৈকেই গ্রহণ করে আজকের দিনে ভালোবাসা দিবস পালন করা হয়। একটি দিনের মধ্যে কি ভালোবাসা আটকে থাকতে পারে? এটা ভালবাসাই নয়। ভালোবাসা এক পবিত্র মহান বন্ধনের নাম। সন্তান বেড়ে উঠে মায়ের ভালোবাসার ছোয়ায়। জীবন সায়াহ্নে সেই মা বাবাই নির্ভরশীল হয়ে পড়েন সন্তানের ভালবাসার উপর। স্ত্রীর আকৃতিম ভালোবাসায় পুরুষ গর্বিত হয়। স্বামীর ভালোবাসা পেয়ে ধন্য হয় নারী। একে অন্যের ভালবাসায় গড়ে উঠে সংসার, সমাজ, দেশ এক কথায় সারা পৃথিবীর এত নিয়ামত দিয়েছেন মহান আল্লাহ তায়ালা তার বান্দাদের ভালোবেসে। মালিকের ভালোবাসা পেয়ে কর্মচারী আন্তরিক ভাবে কাজে মন দেয়। আর শ্রমিকের ভালবাসা মালিককে করে তুলে মানবিক গুনে উদ্ভাসিত।
আমাদের নবী (সাঃ) বলেছেন, তোমরা ততক্ষণ জান্নাতে প্রবেশ করতে পারবে না, যতক্ষণ না তোমাদের মধ্যে বিশ্বাস বা ঈমান আসবে এবং একে অপরের জন্য ভালবাসা থাকবে। (সহীহ – মুসলিম)।

ভালবাসা শুধু মাত্র একদিন বাইরে গিয়ে দেখানোর জন্য নয়। ভালবাসা পরস্পর বিশ্বাসের মাধ্যমে সৃষ্টি হয়। আর ভালবাসা দেখানোর ব্যাপার নয়। অনুভবের ব্যাপার। দুঃখের ব্যাপার হলো আজ অবৈধ নাজায়েজ প্রেম ভালবাসার কবলে পড়ে কত সম্ভাবনাময় ছেলেমেয়ের জীবন অন্ধকারে তলিয়ে যাচ্ছে তার কোন সঠিক পরিসংখ্যান নেই। তাছাড়া এর কু প্রভাব সমাজের উপরতো পরছেই।
আধুনিক ফ্যাসানেবল এই ভালোবাসার ক্ষিপ্রতাপে ঝলসে (এসিডে দগ্ধ হয়ে) যাওয়া মুখের বিচরণ যেমন প্রচুর তেমন একই ভালবাসার দমকা হাওয়ায় সঠিক জীবন থেকে ঝড়ে যাওয়া তরুণদের সংখ্যাও কম নয়।
মানুষের জীবনে ভালবাসা কোন রঙধনু নয় যে ক্ষনিক পরে মিলিয়ে যাবে, কোন অতিথি পাখিও নয় যে শীত শেষ গৃষ্মে নিজ দেশে ফিরে যাবে। বরং ভালবাসা জীবনের সুখ,পরস্পর বন্ধনের স্থিতি, সমাজ সভ্যতা প্রতিষ্ঠা ও নির্মান। সুন্দর জীবন ও চিন্তার সকল ক্ষেত্রে আনিবার্য প্রয়োজন এই ভালবাসার। একটি দিনে রঙ চং মাখিয়ে উদযাপনের নাম ভালোবাসা নয়। বরং সংকীর্ণতা।
মুসলমানদের জন্য ইসলাম একটি সম্পূর্ণ জীবন বিধান। আর সেই বিধান মেনে চলাই মুসলমানদের কর্তব্য।

২৭০ সালে সেন্ট ভ্যালেন্টাইন নামক একজন গীর্জার পার্দ্রী ও চিকিৎসক ছিলেন। খ্রীষ্টধর্ম প্রচারের অভিযোগে রোমের দ্বিতীয় ক্লাডিয়াসের আদেশে তাকে কারাবন্দী করা হয়। জেলে থেকে তিনি ছোট ছোট ছেলে মেয়েদের প্রচুর ভালোবাসার চিঠি পেতেন এবং জেল থেকেই তিনি কারারক্ষীর এক অন্ধ মেয়ের দৃষ্টি ফিরিয়ে আনেন তার চিকিৎসার মাধ্যমে। এতে তার জনপ্রিয়তা বৃদ্ধি পেলে ঈর্ষান্বিত হয়ে রোমের সম্রাট তাকে হত্যা করে। সেদিন ছিল ১৪ ই ফেব্রুয়ারী। মৃত্যুর পূর্বে তিনি সেই মেয়েটিকে একটি চিঠি লিখেন। সেখানে লিখা ছিল- From your valentine.
আমি ঘটনাটি বলে বুঝাতে চাই ভালোবাসা দিবসটি খ্রিস্টানদের অনুষ্ঠান। মুসলমানদের নয়।
আমরা সব সময়ই একে অপরকে ভালোবাসি। বিশ্বের দ্বিতীয় মুসলিম দেশ হিসেবে বাংলাদেশে এ দিবস কোন ভাবেই কাম্য নয়। আজকে যারা এগুলোর সাথে নিজেকে সংস্পৃক্ত করে সাময়িক আনন্দ পেতে চায় তারা আসলে ইসলামের হুকুম জানেনা। আল্লাহ যেমন দয়ালু তেমন কঠিন। তার হুকুম অমান্য করলে তিনি কঠিন থেকে কঠিন হতে পারেন। তার ফল হবে ভয়ংকর স্বাস্তি।
আসুন আমরা প্রকৃত ভালোবাসার বন্ধন গড়ে তুলি। আমরা প্রকৃত মুমিন হওয়ার চেষ্টা করি। সমাজের নাজায়েজ কাজ থেকে মুখ ফিরিয়ে নেই এবং নতুন প্রজন্মকে নির্ভুল ও সঠিক পথ দেখানোর চেষ্টা করি। আসুন আমরা আল্লাহর সাহায্য প্রার্থনা করি। আমিন।

আরও পড়ুন