Ads

কুরআন পাঠে আমার বাবার একাগ্রতা ।। ৩য় ও শেষ পর্ব

।। মূল: শায়েখ ওয়ালীদ বাসাইউনি ।।

।। অনুবাদ: ফাহমিনা হাসানাত ।।

গত পর্বে আমরা আলোচনা করেছিলাম কুরআন পাঠে আমার বন্ধুর বাবার একাগ্রতাকে কেন্দ্র করে কুরআন পাঠের প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে। এই বৃদ্ধ লোকটি আমাকে টাইম ম্যানেজমেন্ট সম্পর্কে ভাবতে শিখিয়েছে। আমি ভেবে দেখলাম জীবনে কত সুযোগ আমি মিস করেছি, আমার সময়কে আরো কত সুন্দর ভাবে কাজে লাগাতে পারতাম যা মৃত্যুর সময় এবং পুনরুত্থান দিবসে আমার উপকারে আসতো।

আমাদের সবার হাতেই দিনে ২৪ ঘন্টা সময় থাকে, কিন্তু আমরা ভিন্ন হয়ে যাই এই সময়কে কাজে লাগানো প্রক্রিয়ায়। সময়কে সর্বোত্তম এবং সঠিকভাবে পরিচালনা করতে হলে জীবনের লক্ষ্য এবং অগ্রাধিকারকে আগে বুঝতে হবে। আর এই বিষয়গুলো যদি আপনার কাছে অস্পষ্ট হয়, তবে সময় নষ্ট হবেই।

এই মানুষটি তার শৈশব থেকেই জানতেন যে কুরআন তার জীবনে কতটা গুরুত্বপূর্ণ, তাই তিনি তার জীবনের লক্ষ্য অর্জনে মনোনিবেশ করতে পেরেছিলেন।

আপনি কি জানেন যদি আপনি প্রতিদিন পাঁচ ওয়াক্ত নামাজের আগে বা পরে চার পৃষ্ঠা কুরআন পড়েন, আপনি প্রতি মাসে পুরো কুরআন খতম করতে পারবেন, অর্থাৎ প্রতিদিন আপনি বিশ পৃষ্ঠা কুরআন পড়ছেন। যাদের নিয়মিত কুরআন তেলাওয়াতের অভ্যাস আছে তাদের জন্য এতে আধা ঘন্টার বেশি সময় লাগার কথা নয়।

প্রতি রাতে কমপক্ষে ১০ টি আয়াত পড়ুন। যদি আপনি কুরআন পড়তে না পারেন তবে এর তেলাওয়াত শুনুন, আরবি পড়তে না পারলে ইংরেজিতে বা আপনার নিজের ভাষায় কুরআনের অনুবাদ পড়ুন। আপনার মূল লক্ষ্য যেন হয় কুরআনের সাথে লেগে থাকা।

কুরআন পাঠে আমার বাবার একাগ্রতা ।। পর্ব : ১

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ যে ব্যক্তি রাতের সালাতে দশটি আয়াত তিলাওয়াত করবে, তার নাম গাফিলদের তালিকায় লিপিবদ্ধ করা হবে না। আর যে ব্যক্তি (রাতের) সালাতে এক শত আয়াত পাঠ করবে, তার নাম অনুুগত বান্দাদের তালিকায় লিপিবদ্ধ করা হবে। আর যে ব্যক্তি সালাতে দাঁড়িয়ে এক হাজার আয়াত তিলাওয়াত করবে, তাকে অফুরন্ত পুরস্কার প্রাপ্তদের তালিকায় লিপিবদ্ধ করা হবে।[১]

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, “তোমরা কুরআন পাঠ কর। কেননা, কিয়ামতের দিন কুরআন, তার পাঠকের জন্য সুপারিশকারী হিসাবে আগমন করবে।”[২]

যে কোনো ভালো কাজে ধারাবাহিকতা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। দেশে কিংবা বা বিদেশ, তরুণ কিংবা বৃদ্ধ, সুস্থ কিংবা অসুস্থ – সব অবস্থাতেই এই মানুষটি তার কুরআন পাঠের অভ্যাস বজায় রেখেছিলেন। আল্লাহ যখন আমাদেরকে কোন ভাল কাজে অঙ্গীকারবদ্ধ হতে দেখেন, তিনি আমাদের সাহায্য করেন, আমাদের পথ দেখান এবং আমাদের কাছ থেকে তা কবুল করেন। কাজেই যুবক-যুবতী বা বৃদ্ধরা এখন এমন কিছু ভালো কাজ শুরু করুন যা আপনি প্রতিদিন ধারাবাহিকতার সাথে করবেন। আপনি প্রতিদিন যা করেন তার উপর আপনার মৃত্যু হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি। ‘হুসনুল খাতিমা’ – সুন্দর মৃত্যু অর্থাৎ ভালো কাজের উপর আপনার মৃত্যুর জন্য এটি খুব গুরুত্বপূর্ণ যে আপনি যেন প্রতিদিন ভালো কাজ করেন।

নিশ্চিত করুন যে আপনি ছোটবেলা থেকেই এই অভ্যাসটি আপনার বাচ্চাদের মধ্যে রোপন করেছেন, হতে পারে তা কুরআন তেলাওয়াত, জিকির আযকার, বিতরের নামাজ, দান-সাদকা বা ভালো কিছু বই পড়া বা দয়ার কাজ করা।

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, “আল্লাহর কাছে সর্বাধিক প্রিয় আমল হলো, যা সদাসর্বদা নিয়মিত করা হয় যদিও তা অল্প হয়।”[৩]

ভালো কাজে কিভাবে ধারাবাহিকতা বজায় রাখবেন?

* আপনার পছন্দমত কিছু ভালো কাজ বেছে নিন এবং এর তাৎপর্য বোঝার চেষ্টা করুন।

* এটিকে আপনার প্রতিদিনের সময়সূচীর অংশ করুন। অন্য কথায় আপনাকে অবশ্যই এর জন্য সময় নির্ধারণ করতে হবে।

* প্রথমদিকে নিজেকে মনে করিয়ে দেওয়ার জন্য নোট লিখে রাখতে পারেন, বা আপনার ফোনে এলার্ম দিতে পারেন। এমনকি আপনি অন্য কারো সাথেও কাজ করতে পারেন যতক্ষণ না আপনি এই অভ্যাস গড়ে তুলেন।

আরও পড়ুন-কুরআন পাঠে আমার বাবার একাগ্রতা ।। দ্বিতীয় পর্ব

* নিজের উপর অতিরিক্ত বোঝা চাপবেন না, প্রথম দিকে ধারাবাহিকভাবে অল্প কিছু ভালো কাজের অভ্যাস করলেই চলবে।

* ইসলামের একটি আকর্ষণীয় ধারণা হল “কাজা” – ইবাদতের অনুপস্থিত কাজকে পুষিয়ে নেওয়া, হোক তা বাধ্যতামূলক কিংবা ওয়াজিব। এটি আপনাকে আপনার ইবাদতে ধারাবাহিক হতে সাহায্য করবে। ইবাদতে বা যে কোনও ভালো কাজে এক বা তার বেশি সময় অনুপস্থিত হওয়ার অর্থ এই নয় যে আপনি আবার প্রথম থেকে শুরু করবেন বা কাজটি ছেড়ে দিবেন, আপনার কাছে সর্বদা দ্বিতীয় সুযোগ রয়েছে।

* বিনীত হোন এবং আল্লাহর কাছে সাহায্য প্রার্থনা করুন, তিনি আপনার অন্তরকে উন্মোচিত করবেন ইন শা আল্লাহ।

রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ আল্লাহ্ তা’আলা ঘোষণা করেন, আমি সেরূপই, যেরূপ বান্দা আমার প্রতি ধারণা রাখে। আমি তার সঙ্গে থাকি যখন সে আমাকে স্মরণ করে। যদি সে মনে মনে আমাকে স্মরণ করে; আমিও তাকে নিজে স্মরণ করি। আর যদি সে লোক-সমাবেশে আমাকে স্মরণ করে, তবে আমিও তাদের চেয়ে উত্তম সমাবেশে তাকে স্মরণ করি। যদি সে আমার দিকে এক বিঘত অগ্রসর হয়, তবে আমি তার দিকে এক হাত অগ্রসর হই, যদি সে আমার দিকে এক বাহু অগ্রসর হয়; আমি তার দিকে দু’ বাহু অগ্রসর হই। আর সে যদি আমার দিকে হেঁটে অগ্রসর হয়, আমি তার দিকে দৌড়ে অগ্রসর হই।[৪]

ইমাম সুফিয়ান আল-সাওরি বলেন, “আমি ২০ বছর শেষ রাতের কিয়ামের (নামাজ) সাথে সংগ্রাম করেছি, কিন্তু আমি এখন ২০ বছরেরও বেশি সময় ধরে এটি উপভোগ করছি।”

وَٱلَّذِينَ جَٰهَدُواْ فِينَا لَنَهۡدِيَنَّهُمۡ سُبُلَنَاۚ وَإِنَّ ٱللَّهَ لَمَعَ ٱلۡمُحۡسِنِينَ

আর যারা আমার পথে সর্বাত্মক প্রচেষ্টা চালায়, তাদেরকে আমি অবশ্যই আমার পথে পরিচালিত করব। আর নিশ্চয় আল্লাহ সৎকর্মশীলদের সাথেই আছেন।[৫]

وَجَعَلۡنَا مِنۡهُمۡ أَئِمَّةً يَهۡدُونَ بِأَمۡرِنَا لَمَّا صَبَرُواْۖ وَكَانُواْ بِئَايَٰتِنَا يُوقِنُونَ

আর আমি তাদের মধ্য থেকে বহু নেতা করেছিলাম, তারা আমার আদেশানুযায়ী সৎপথ প্রদর্শন করত, যখন তারা ধৈর্যধারণ করেছিল। আর তারা আমার আয়াতসমূহের প্রতি দৃঢ় বিশ্বাস রাখত।[৬]

হজ্জ জীবনে একবার কিন্ত প্রভাব সারা জীবনের।। ষষ্ঠ পর্ব

আল্লাহ তা’আলা যেন কুরআনকে আমাদের হৃদয়ের বসন্ত করে দেন, দুনিয়া এবং আখিরাতে পথপ্রদর্শনের জন্য আলোকবর্তিকা করে দেন, এবং আমাদের অন্তরে কুরআনের প্রতি ভালবাসাকে বৃদ্ধি করে দেন, এবং এই ভালোবাসাকে কবুল করে নেন, আমিন ইয়া রব্বিল আলামিন।

||সমাপ্ত||

রেফারেন্স:

[১] আবু দাউদ:১৩৯৮

[২] সহীহ মুসলিম: ১৯১০

[৩] সহীহ বুখারী: ৬৪৬৪

[৪] সহিহ মুসলিম: ৭৪০৫

[৫] সূরা আল-আনকাবুত-২৯: আয়াত-৬৯

[৬] সূরা আস-সিজদা-৩২: আয়াত-২৪

#সিরিজ: যে গল্প মন ছুয়ে যায়

…………………………………………………………………………………………………………………………

মহীয়সীর প্রিয় পাঠক ! সামাজিক পারিবারিক নানা বিষয়ে লেখা আর্টিকেল ,আত্মউন্নয়নমূলক অসাধারণ লেখা, গল্প  ও কবিতা  পড়তে মহীয়সীর ফেসবুক পেজ মহীয়সী / Mohioshi  তে লাইক দিয়ে মহীয়সীর সাথে সংযুক্ত থাকুন। আর হা মহীয়সীর সম্মানিত প্রিয় লেখক! আপনি আপনার পছন্দের লেখা পাঠাতে পারেন আমাদের ই-মেইলে-  [email protected]  ও  [email protected] ; মনে রাখবেন,”জ্ঞানীর কলমের কালি শহীদের রক্তের চেয়েও উত্তম ।” মহীয়সীর লেখক ও পাঠকদের মেলবন্ধনের জন্য রয়েছে  আমাদের ফেসবুক গ্রুপ মহীয়সী লেখক ও পাঠক ফোরাম ; আজই আপনিও যুক্ত হয়ে যান এই গ্রুপে ।  আসুন  ইসলামী মূূল্যবোধে বিশ্বাসী প্রজন্ম গঠনের মাধ্যমে সুস্থ,সুন্দর পরিবার ও সমাজ গঠনে ভূমিকা রাখি । আল্লাহ বলেছেন, “তোমরা সৎ কাজে প্রতিযোগিতার মাধ্যমে এগিয়ে চলো ।” (সূরা বাকারা-১৪৮) । আসুন আমরা বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চার মাধ্যমে সমাজে অবদান রাখতে সচেষ্ট হই । আল্লাহ আমাদের সমস্ত নেক আমল কবুল করুন, আমিন ।

আরও পড়ুন