জীববৈচিত্র সংরক্ষণে ইসলামের নির্দেশনা

জি.মোস্তফা

খুব সাধারণ ভাষায় বোঝাতে হলে এই পৃথিবীতে অনেক রকম প্রাণীর বাস, একেই জীববৈচিত্র্য বলে। আর বিজ্ঞানের ভাষায় বলতে গেলে জীববৈচিত্র্য (Biodiversity) হল উদ্ভিদ, প্রাণী ও অণুজীবসহ পৃথিবীর গোটা জীবসম্ভার, তাদের অন্তর্গত জিন ও সেগুলির সমন্বয়ে গঠিত বাস্তুতন্ত্র।

আমেরিকান জীববিজ্ঞানী ই.এ.নরসে এবং তার সহযোগীদের সূত্র অনুযায়ী, জীববৈচিত্র্য হলো জল, স্থলসহ সকল জায়গায় সকল পরিবেশে থাকা সকল ধরনের জীব এবং উদ্ভিদের বৈচিত্র। পৃথিবীর ১০ বিলিয়ন ভাগের একভাগ অংশতেই ৫০ মিলিয়ন প্রজাতির বিভিন্ন জীব-জন্তু এবং উদ্ভিদের বসবাস। বাংলাদেশেও বৃক্ষ প্রজাতি এবং প্রাণীকূলের সবিশেষ বৈচিত্র্য লক্ষ্য করা যায়। কিন্তু ক্রমবর্ধমান নৈরাজ্যের চাপে অনেক গাছপালা, লতাগুল্ম এবং প্রাণী বৈচিত্র্য আজ বিলুপ্ত হওয়ার পথে। কিছু প্রজাতি ইতোমধ্যে আবার বিলুপ্ত হয়েও গেছে। কোনো কারণে হঠাৎ করে কোন প্রজাতি বিলুপ্ত হয়ে গেলে প্রাকৃতিক বাস্তুসংস্থানে এক বিশাল ফাঁকা স্থানের সৃষ্টি হয়। যার জন্য অনেক সমস্যার সৃষ্টি হয়,পরিবেশ তার ভারসাম্য হারিয়ে ফেলে। পৃথিবী ইতোমধ্যে পাঁচবার বড় ধরনের জীববৈচিত্র্যের বিলুপ্তির মুখোমুখি হয়েছে। এর মধ্যে একটি হলো ডাইনোসরের বিলুপ্তি। আগের তুলনায় বর্তমানের জীববৈচিত্র্যের বিলুপ্তির হারের প্রকৃতি অনেকাংশেই ভিন্ন। কোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগ নয়, বরং মানবসৃষ্ট কারণে জীববৈচিত্র্য ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে। এই ক্ষতিগ্রস্থ হওয়ার হার এতটাই বেশি যে, নতুন প্রজাতির উন্মেষে যে সময়টুকু প্রয়োজন, সেটাই তারা পাচ্ছে না। ফলে, প্রকৃতিতে যে শূন্যস্থান তৈরি হচ্ছে, তা আর পূরণ করা হয়ে উঠছে না।

১৯৬০ এর দশকের গোড়া থেকে, আইইউসিএন হাজার হাজার প্রজাতির বিলুপ্তির ঝুঁকি গণনা করে বৈশ্বিক জীববৈচিত্র্যের স্থিতি অনুমান করে চলেছে। আইইউসিএন নিয়মিতভাবে বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চল এবং নির্বাচিত দেশগুলোর হুমকি প্রজাতির লাল তালিকা তৈরি করে। উদ্বেগজনক বিষয় হচ্ছে, বাংলাদেশের সর্বশেষ ৩৯০ প্রজাতির প্রাণী হুমকিস্বরূপ হিসেবে রেড লিস্ট (আইইউসিএন, বাংলাদেশ ২০১৫) তালিকাবদ্ধ করেছে, মূল্যায়ন করা হয়েছে ১,৬১৯ প্রজাতির প্রায় ২৫ শতাংশ। ২০০০ সালের আগের আইইউসিএন রেড তালিকা থেকে, আমরা গত ১০০ বছরে বাংলাদেশ থেকে ১৩ প্রজাতির বন্যপ্রাণী হারিয়েছি। এর পনেরো বছর পর, বাংলাদেশের সর্বশেষ লাল তালিকাটি আমাদের মধ্যে আশঙ্কা সৃষ্টি করে এ কারণে যে, আরও ১৮ টি প্রজাতি আঞ্চলিক বিলুপ্তির তালিকায় যুক্ত হয়েছে। ১৬০ বাংলাদেশি জীববিজ্ঞানীর সমন্বিত এই বিস্তৃত অনুশীলনটি পর্যাপ্ত তথ্যের অভাবে আরও ২৭৮ টি প্রাণী প্রজাতির মূল্যায়ন করতে সক্ষম হয়নি। আইইউসিএন অনুসারে, দেশে প্রায় ১০% উদ্ভিদ ইতোমধ্যে বিলুপ্তপ্রায়। এর কিছু এখনও বিশ্বের অন্যান্য অংশে রয়েছে, তবে দেশীয় প্রজাতিগুলো নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে। ১৭ টি প্রজাতির মেরুদন্ডী প্রাণী হারিয়ে গিয়েছে এবং স্তন্যপায়ী প্রাণীর মধ্যে ৭৯৯ টি প্রজাতি বিলুপ্ত। চরম জলবায়ু সংক্রান্ত ঘটনা, আবাসস্থল হ্রাস, বন উজারকরণ ইত্যাদির ফলে বাংলাদেশের জীববৈচিত্র্য হুমকির মুখে পড়েছে। আইইউসিএন আরো বলেছে, ২০৫০ সালের মধ্যে ৩০% জীববৈচিত্র্য বিলুপ্ত হয়ে যাবে।

জীববৈচিত্র্য হ্রাসের জন্য অনেকগুলো হুমকি রয়েছে, যার মধ্যে কিছু প্রত্যক্ষ এবং গতিশীল এবং অন্যগুলো পরোক্ষ। হুমকিগুলোর মধ্যে রয়েছে, দ্রুত ও অপরিকল্পিত নগরায়ন, শিল্পায়ন, বন ও জলাভূমিকে কৃষিক্ষেত্রে রূপান্তর বা ভূমি ব্যবহারের অন্যান্য রূপ, দুর্লভ প্রাকৃতিক সম্পদের উপর নৈরাজ্যের চাপ, বায়ু এবং পানি দূষণের বিভাজন, জলবিদ্যুৎ ব্যবস্থার পরিবর্তন, প্রাকৃতিক সম্পদের অতিরিক্ত সংগ্রহ। সেই সাথে রাসায়নিক সার ও কীটনাশকের অতিরিক্ত ব্যবহার করে খাদ্য শস্য উৎপাদন বৃদ্ধি, জীববৈচিত্র্য সমৃদ্ধ অঞ্চল বা প্রাকৃতিক বনাঞ্চলের উন্নয়নের জন্য বরাদ্দ হস্তক্ষেপ, জীববৈচিত্র্য সমৃদ্ধ অঞ্চলে অনিয়ন্ত্রিত পর্যটন (যেমন পার্বত্য চট্টগ্রাম পাহাড়ি অঞ্চল, কক্সবাজার এবং সেন্ট মার্টিন দ্বীপ), জলবায়ু পরিবর্তন ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য।

এবারে আসি জীববৈচিত্র্যের গুরুত্ব প্রসঙ্গে। মানুষ তথা সমগ্র জীবজগতের কাছে জীববৈচিত্র্যের গুরুত্ব অপরিসীম।যেমন-

এক. বাস্তুতান্ত্রিক মূল্য : বাস্তুতান্ত্রিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে জীববৈচিত্র্য বিশেষ ভূমিকা পালন করে। একই বাস্তুতন্ত্রের বিভিন্ন জনগোষ্ঠী পরস্পর নির্ভরশীল হয়ে বসবাস করে। তাই প্রজাতির বৈচিত্র্য যত বাড়বে বা প্রজাতির সংখ্যা যত বাড়বে, সেই বাস্তুতন্ত্রের ভারসাম্য তথা স্থিতিশীলতা তত বাড়বে।
বাস্তুতন্ত্রের যেকোনো একটি উদ্ভিদ বা প্রাণী প্রজাতির বিলুপ্ত হওয়ার অর্থ, সংশ্লিষ্ট উদ্ভিদ বা প্রাণী প্রজাতির সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত খাদ্য শৃঙ্খলে বিঘ্ন ঘটা। তাই বাস্তুতন্ত্রের সার্বিক ভারসাম্য রক্ষায় জীববৈচিত্রের গুরুত্ব অনবদ্য।

দুই.অর্থনৈতিক মূল্য : মানুষ তার খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান, ওষুধপত্র প্রভৃতির জন্য সরাসরি প্রকৃতির ওপর নির্ভর শীল। জীববৈচিত্র্যের জন্যই মানুষ তার ক্রমবর্ধমান খাদ্য চাহিদা প্রকৃতি থেকে মেটাতে সক্ষম হয়।
মানুষ বৈচিত্রময় উদ্ভিদ প্রজাতি থেকে কেবল খাদ্যসামগ্রী পায় তাই নয়; ওষুধ, কাঠ, কাগজ, তন্তু, রবার, আঠা, রজন, ট্যানিন, ফুলফল ইত্যাদিও পায়। তেমনই বৈচিত্রময় প্রাণী প্রজাতি থেকে মাছ মাংস, দুগ্ধ সামগ্রী, চামড়া, পালক, উল, লাক্ষা, মধু ইত্যাদি সংগ্রহ করে। আবার, বিভিন্ন জীবাণুর নিয়ন্ত্রিত ব্যবহারের মাধ্যমেও বিভিন্ন শিল্পসমগ্রী উৎপাদন করা যায়। এককথায় খাদ্য ও স্বাস্থ্য রক্ষার জন্য মানুষ জীববৈচিত্রের ওপর প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে নির্ভরশীল।

তিন. পরিবেশ রক্ষায় জীববৈচিত্র্য : পরিবেশ দূষণ রোধ করতে জীবমন্ডলের (biosphere) সার্বিক সংরক্ষণ ও কার্যকারিতা বজায় রাখার কারণে জীববৈচিত্র্য আবশ্যক। পরিবেশে অক্সিজেনের সরবরাহ বজায় রাখতে, বৃষ্টিপাত ঘটাতে উদ্ভিদের ভূমিকা অপরিহার্য। বর্তমানে সবুজ উদ্ভিদের ধ্বংস হওয়া বিশ্ব উষ্ণায়নের প্রধান কারণ।

চার. জিন ভান্ডার হিসেবে জীববৈচিত্র্য : জীববৈচিত্র্য হল প্রকৃতপক্ষে বিপুল সংখ্যক জিনের ভান্ডার (gene pool)। বিভিন্ন জীবের এই জিন ভান্ডার মানুষের কাছে এক অমূল্য সম্পদ। এই জিন ভান্ডারে অসংখ্য উত্তম গুণসম্পন্ন জিন রয়েছে, জৈবপ্রযুক্তির মাধ্যমে যা সংগ্রহ করে অর্থনৈতিক গুরুত্ব সম্পন্ন উদ্ভিদ ও প্রাণীতে স্থানান্তরিত করে পছন্দসই গুণসম্পন্ন উচ্চ ফলনশীল ট্রান্সজেনিক উদ্ভিদ ও প্রাণী তৈরি করা সম্ভব হয়েছে। এর দ্বারা মানব জাতির ক্রমবর্ধমান খাদ্য চাহিদা পূরণ করা সম্ভব হচ্ছে।

পাঁচ. নান্দনিক ও শিক্ষাগত মূল্য : যেকোনো দেশের জীববৈচিত্র্য সেই দেশের সম্পদ। বিভিন্ন প্রজাতির জীব, প্রকৃতিকে বৈচিত্র্যময় ও সুন্দর করে তোলে। এই সম্পদের নমুনা চিড়িয়াখানা, মিউজিয়াম, বোটানিক্যাল গার্ডেনে সংরক্ষণের মাধ্যমে তাদের সাথে সাধারণ মানুষের পরিচয় ঘটানো হয়। ফলে নান্দনিক সৌন্দর্য ও শিক্ষাগত মূল্য বৃদ্ধি পায়। এই নান্দনিকতা নন্দনতত্ত্বের অন্তর্গত।আর নন্দনতত্ত্ব হলো আখলাকের অন্তর্গত।যা অতীব জরুরি বিষয়।

ছয়.নৈতিক মূল্য : প্রত্যেক জীবের এই পৃথিবীতে বেঁচে থাকার পূর্ণ অধিকার আছে।
ইসলাম প্রত্যেক জীবের প্রতি যথাযথ ভালোবাসা ও মমতা প্রদর্শন করতে নির্দেশ দিয়েছে,এবং তাদের বেঁচে থাকার অধিকার নিশ্চিত করেছে। ১৯৮২ সালে রাষ্ট্রপুঞ্জের বিশ্বপ্রকৃতির ঘোষণাপত্রে এই চিন্তাধারা স্বীকৃতি পেয়েছে। তাই আমাদের প্রত্যেকের কর্তব্য প্রতিটি প্রজাতির জীবকে বাঁচিয়ে রাখা। এর জন্য দরকার প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ এবং জীববৈচিত্র্যের সংরক্ষণ ও গুরুত্ব সম্বন্ধে মানুষজনকে সচেতন করা।

প্রাণিজগতের প্রতি ইসলামের দৃষ্টিভঙ্গি প্রয়োজনে ব্যবহারের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। এগুলোকে প্রকৃতি ও পৃথিবীর সৌন্দর্যের প্রতীক হিসেবে চিহ্নিত করেছে ইসলাম।
পবিত্র কোরআন মাজিদে বর্ণিত হয়েছে-

“তিনি চতুষ্পদ জন্তু সৃষ্টি করেছেন। তোমাদের জন্য তাতে শীত নিবারক উপকরণ ও বহু উপকার রয়েছে। এবং তা থেকে তোমরা আহার করে থাকো।” (সুরা : নাহল, আয়াত : ৫)

এটা সত্য যে মানুষই এই পৃথিবীতে মুখ্য। তবে জড়জগৎ, জীবজগৎ ও উদ্ভিদজগৎও এই পৃথিবীর উপাদান। জড়জগৎ প্রাণহীন। উদ্ভিদজগতেও আছে ন্যূনতম প্রাণের স্পন্দন। পশুপাখির মধ্যে প্রাণের উপস্থিতির পাশাপাশি রয়েছে আহার-বিহার, বিচরণ ও সন্তানধারণের ক্ষমতা। এসব গুণ-বৈশিষ্ট্য আছে মানুষেরও। এরই সঙ্গে মানুষের আছে বিবেক ও বোধশক্তি, জ্ঞান অর্জনের যোগ্যতা এবং সত্য-মিথ্যা পরখ করার ক্ষমতা। এ গুণেই মানুষ শ্রেষ্ঠ জীবের আসনে সমাসীন হয়েছে। ইসলাম মনে করে, এ পৃথিবীতে মানুষের পরেই প্রাণিজগতের স্থান।

প্রাণিজগেক পৃথক জাতিসত্তার স্বীকৃতি দিয়ে কোরআন বলছে : ‘পৃথিবীতে বিচরণশীল যত প্রাণি আছে, আর যত পাখি দুই ডানা মেলে উড়ে বেড়ায়, তারা সবাই তোমাদের মতো একেক জাতি।’ (সুরা : আনআম, আয়াত : ৩৮)

পবিত্র কোরআনে বিক্ষিপ্তভাবে প্রায় ২০০ আয়াতে প্রাণিজগতের প্রসঙ্গ এসেছে। এমনকি পৃথকভাবে বিভিন্ন প্রাণীর নামে ছয়টি সুরার নামকরণ করা হয়েছে। যেমন—সুরা বাকারা (গাভি), সুরা আনআম (উট, গরু, বকরি), সুরা নাহল (মৌমাছি), সুরা নামল (পিপীলিকা), সুরা আনকাবুত (মাকড়সা), সুরা ফিল (হাতি) ইত্যাদি। এসব নামকরণ থেকে প্রাণিজগতের প্রতি ইসলামের দৃষ্টিভঙ্গি সুস্পষ্ট ফুটে ওঠে। ইসলামি দৃষ্টিভঙ্গি মতে, পশুপাখির প্রতি নম্রতা প্রদর্শন ইবাদতের পর্যায়ভুক্ত। পশুপাখিকে কষ্ট দেওয়া গোনাহের কাজ।

রসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘একবার এক পিপাসার্ত কুকুর কূপের পাশে ঘোরাঘুরি করছিলো। পিপাসায় তার প্রাণ বের হওয়ার উপক্রম হয়ে গিয়েছিলো। হঠাৎ বনি ইসরাইলের এক ব্যভিচারী নারী তা দেখতে পায়। সে নিজের পায়ের মোজা খুলে কুকুরটিকে পানি পান করায়। এ কারণে তার অতীত পাপ ক্ষমা করে দেওয়া হয়।’ (বুখারি, হাদিস : ৩৪৬৭)।

অন্য হাদিসে এসেছে,

‘একজন নারী একটি বিড়াল বেঁধে রেখেছিলো। সে তাকে খাবার দিতো না, আবার ভূখণ্ডে বিচরণ করে খাবার সংগ্রহের সুযোগও দিতো না। এ কারণে তাকে জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হয়।’ (বুখারি, হাদিস : ৩৩১৮)

পশুপাখি মানবতার কল্যাণে নিয়োজিত। কুদরতিভাবে আল্লাহ এগুলো মানুষের করায়ত্ত করেছেন। এরা করুণার পাত্র। ইসলামি দৃষ্টিতে, যথাসম্ভব পশুপাখির সঙ্গে দয়াশীল আচরণ করতে হবে। হাদিসে এসেছে : ‘যেকোনো প্রাণীর ওপর দয়া করার মধ্যেও সওয়াব আছে।’ (বুখারি, হাদিস : ৬০০৯)
তাই পশুপাখির সঙ্গে যথেচ্ছ ব্যবহার করা যাবে না। পশুপাখিকে অহেতুক নিশানা বানানো ইসলামে নিষিদ্ধ। আল্লাহর জমিনে তাদের অবাধ বিচরণের সুযোগ দেওয়া উচিত। রসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি অহেতুক কোনো চড়ুই পাখি হত্যা করে, কিয়ামতের দিন পাখিটি আল্লাহর কাছে এই বলে নালিশ করবে যে, হে আল্লাহ, অমুক ব্যক্তি আমাকে অহেতুক হত্যা করেছে।’ (নাসায়ি, ইবনে হিব্বান)

যে প্রাণি প্রতিপালন করা হয়, সেগুলোর সুস্থতা ও খাবারদাবারের ব্যাপারে সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বন করা ওয়াজিব। মহানবি (সা.) বলেছেন, ‘এসব বাকশক্তিহীন প্রাণীর ব্যাপারে আল্লাহকে ভয় করো। সুস্থ অবস্থায় এগুলোতে আরোহণ করো, সুস্থ অবস্থায় আহার করো।’ (আবু দাউদ, হাদিস : ২৫৪৮)
আল্লাহ পৃথিবীতে অনেক কন্তু জানোয়ার সৃষ্টি করেছেন।জীববৈচিত্র আল্লাহ তায়ালার নিদর্শনের অন্তর্গত (আয়াতুল্লাহ)।পাহাড়ি ও বনাঞ্চলের হাতি,বাঘ,সিংহ,বানর,হনুমান প্রভৃতি হিংস্র অহিংস্র সকল প্রাণিই বিশেষ সৌন্দর্য বর্ধন করে।সমুদ্র এবং বিস্তীর্ণ ভূভাগে এরূপ অনেক প্রাণি রয়েছে।সেগুলোকে কষ্ট দেওয়া এবং নিধন করা বৈধ নয়।

আল্লাহ সুবহানুহু ওয়া তায়ালা বলেন,
وَاللَّهُ خَلَقَ كُلَّ دَابَّةٍ مِّن مَّاءٍ ۖ فَمِنْهُم مَّن يَمْشِي عَلَىٰ بَطْنِهِ وَمِنْهُم مَّن يَمْشِي عَلَىٰ رِجْلَيْنِ وَمِنْهُم مَّن يَمْشِي عَلَىٰ أَرْبَعٍ ۚ يَخْلُقُ اللَّهُ مَا يَشَاءُ ۚ إِنَّ اللَّهَ عَلَىٰ كُلِّ شَيْءٍ قَدِيرٌ
“আল্লাহ ভূমিতে বিচরণকারী প্রতিটি জীব সৃষ্টি করেছেন পানি দ্বারা। তার মধ্যে কতক এমন, যারা পেটে ভর করে চলে, কতক এমন, যারা দু ‘পায়ে ভর করে চলে এবং কতক এমন, যারা চার পায়ে ভর করে চলে। আল্লাহ যা চান তাই সৃষ্টি করেন। নিশ্চয়ই আল্লাহ সববিষয়ে সক্ষম।”
(সূরা নূর,আয়াতঃ৪৫)

আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘প্রাণিকুল সৃষ্টির (অন্যতম) কারণ হলো, এগুলোতে তোমরা আরোহণ করে থাকো আর এগুলো সৌন্দর্যের প্রতীক। ’ (সূরা নাহল, আয়াত: ৮)

প্রাণিজগতকে পৃথক জাতিসত্তার স্বীকৃতি দিয়ে কোরআনে বলা হয়েছে, ‘পৃথিবীতে বিচরণশীল যতো প্রাণী আছে আর যতো পাখি দুই ডানা মেলে উড়ে বেড়ায়, তারা সবাই তোমাদের মতো একেক জাতি।
’ (সুরা আনআম, আয়াত: ৩৮)

প্রাণিজগত সতত মানবতার কল্যাণে নিয়োজিত। আল্লাহ তাআলা কুদরতিভাবে এগুলোকে মানুষের করায়ত্ত করে রেখেছেন।
প্রাণিরা অবশ্যই করুণা ও মমতা পাওয়ার যোগ্য। ইসলাম পশু-পাখির সঙ্গে যথাসম্ভব দয়াশীল আচরণ করার শিক্ষা দেয়।
পশু-পাখির যথেচ্ছ ব্যবহারে নিষেধ করে। ইসলামে পশু-পাখির অঙ্গহানি করা নিষিদ্ধ।

আবদুল্লাহ ইবনে ওমর (রা.) থেকে বর্ণিত, ‘রসূলুল্লাহ (সা.) ওই ব্যক্তিকে অভিশাপ দিয়েছেন, যে প্রাণীদের অঙ্গচ্ছেদ করে। ’ (বুখারি, হাদিস নং : ৫১৯৫)
পশু-পাখিকে আল্লাহর জমিনে অবাধ বিচরণের সুযোগ দিতে হবে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি অহেতুক কোনো চড়ুই পাখি মেরে ফেলল, কিয়ামতের দিন পাখিটি আল্লাহর কাছে এই বলে নালিশ করবে যে হে আল্লাহ, অমুক ব্যক্তি আমাকে অহেতুক হত্যা করেছে। ’ (নাসায়ি, ইবনে হিব্বান)
প্রাণি প্রতিপালন করলে, সেগুলোর সুস্থতা ও খাবারদাবারের ব্যাপারে সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বন করা ওয়াজিব বা অত্যাবশকীয়। মহানবি (সা.) বলেছেন, ‘এসব বাক্শক্তিহীন প্রাণীর ব্যাপারে আল্লাহকে ভয় করো। সুস্থ অবস্থায় এগুলোতে আরোহণ করো, সুস্থ অবস্থায় আহার করো। ’ (আবু দাউদ, হাদিস নং : ২৫৪৮)

অগণিত প্রাণির মধ্যে ইসলাম সীমিত কিছু পশু-পাখি খাদ্য হিসেবে গ্রহণের অনুমতি দিয়েছে। কিন্তু সেগুলো জবাই করার ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ অনুকম্পা প্রদর্শনের নির্দেশ দিয়েছে। রাসুল (সা.) ইরশাদ করেছেন, ‘যখন তোমরা জবাই করবে, সর্বোত্তম পন্থায় করবে। জবাইয়ের বস্তু ভালোভাবে ধার দিয়ে নেবে, আর পশুটির প্রাণ স্বাভাবিকভাবে বের হওয়ার সুযোগ দেবে। ’ (মুসলিম, হাদিস নং : ১৯৫৫)

তাই ফিকহবিদগণ লিখেছেন, জবাই করার জন্য পশুদের টেনেহিঁচড়ে নিয়ে যাওয়া যাবে না। এক পশুর সামনে অন্য পশু জবাই করা যাবে না। পরিপূর্ণ নিস্তেজ হওয়ার আগে ছুরিকাঘাত কিংবা চামড়া সরানো যাবে না। এসব কাজ মাকরুহে তাহরিমি।

কোনো জীবন্ত পশু-পাখি আগুনে পোড়ানো ইসলামে নিষিদ্ধ। আবদুর রহমান বিন আবদুল্লাহ (রা.) তার পিতা থেকে বর্ণনা করেন যে, এক সফরে আমরা রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সঙ্গী ছিলাম। তিনি দেখতে পেলেন, আমরা একটি মৌমাছির বাসা জ্বালিয়ে দিয়েছি। মহানবি (সা.) বললেন, ‘কে এটি জ্বালিয়ে দিয়েছে?’ আমরা নিজেদের কথা বললাম। তিনি বলেন, ‘আগুনের স্রষ্টা ছাড়া কারো জন্য আগুন দিয়ে শাস্তি দেওয়া শোভা পায় না।”
(আবু দাউদ, ‍হাদিস নং : ২৬৭৫)

ফিকহবিদরা বলেন, “পিঁপড়া দংশন না করলে তাদের মেরে ফেলা মাকরুহ। আর এদের পানিতে নিক্ষেপ করা সর্বাবস্থায় নিষিদ্ধ। বিচ্ছুকেও আগুনে পুড়ে ফেলা মাকরুহ।” ‘ (ফতোয়ায়ে বাজ্জাজিয়া, ৬/৩৭০)

জীবিত থাকা অবস্থায় পশু-পাখির কোনো অঙ্গ কাটা যাবে না। নবি কারিম (সা.) বলেছেন, ‘‘জীবিত অবস্থায় যে প্রাণীর কোনো অংশ কাটা হয়, সেটা মৃত তথা হারাম হয়ে যাবে।”(তিরমিজি, হাদিস নং : ১৪৮০)

পশু-পাখির চেহারায় প্রহার করা, অঙ্কিত করা ও চিহ্ন ব্যবহার করে চেহারা বিকৃত করা ইসলামে নিষিদ্ধ। জাবের (রা.) থেকে বর্ণিত, ‘’রাসুল (সা.) চেহারায় প্রহার ও অঙ্কন করতে নিষেধ করেছেন।’’ (মুসলিম, হাদিস নং : ২১১৬)
ইমাম নববি (রহ.) লিখেছেন, ‘’যেকোনো প্রাণির চেহারায় আঘাত করা নিষিদ্ধ।’’

আল্লাহর সৃষ্টি ও প্রকৃতির সৌন্দর্য হিসেবে পশু-পাখির প্রতি ভালোবাসা থাকা চাই। এগুলোকে কোনো কারণে অশুভ মনে করা অজ্ঞতা ও কুসংস্কার। রসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘’কুলক্ষণ বলতে কিছু নেই। এমনকি পেঁচা বা সফর মাসেও কোনো কুলক্ষণ নেই।’’ (বুখারি)
অহেতুক পশু-পাখির পেছনে লেগে থাকা, অযথা এগুলোকে শিকার করা ইসলামে নিন্দনীয়।

সাইদ ইবনে জুবাইর (রা.) থেকে বর্ণিত, একবার ইবনে উমর (রা.) কোরাইশ গোত্রের একদল বাচ্চাকে দেখতে পেলেন যে তারা পাখি শিকার করছে। এটা দেখে ইবনে ওমর (রা.) তাদের সরিয়ে দেন এবং বলেন, ‘রসূলুল্লাহ (সা.) ওই ব্যক্তিকে অভিশাপ দিয়েছেন, যে কোনো প্রাণবিশিষ্ট বস্তুকে লক্ষ্যবস্তু বানায়। ‘ (মুসলিম, হাদিস নং : ১৯৫৮)

তাই আসুন, সব ধরনের প্রাণীর প্রতি সদয় ও স্নেহশীল হই। তাদের জন্য ভালোবাসা ও মমতা লালন করি এবং প্রকৃতির সৌন্দর্য রক্ষায় মনোযোগী হই।
শেষ নবি মুহাম্মদ (সা.) পশু-প্রাণির অধিকার রক্ষায় সোচ্চার ছিলেন। জীব-জন্তু ও পশু-পাখি সংরক্ষণ এবং তাদের অধিকারের ব্যাপারে নবি কারিম (সা.)-এর ব্যাপক দিকনির্দেশনা রয়েছে।

ইসলামের দৃষ্টিভঙ্গি হলো, পশু-পাখি ও জীব-জন্তু আল্লাহতায়ালার অনন্য দান ও নিয়ামত। আল্লাহতায়ালা মানুষের উপকার ও সুবিধার জন্য এসব সৃষ্টি করেছেন। তাই এসবের কোনো ক্ষতি করা চলবে না। এ প্রসঙ্গে পবিত্র কোরআনে কারিমে ইরশাদ হয়েছে, ‘নিশ্চয় আমি আদম-সন্তানকে মর্যাদা দান করেছি, আমি তাদেরকে স্থলে ও জলে চলাচলের বাহন দান করেছি; তাদের উত্তম জীবনোপকরণ প্রদান করেছি এবং তাদের অনেক সৃষ্ট বস্তুর ওপর শ্রেষ্ঠত্ব দান করেছি। ’ -সূরা বনি ইসরাইল: ৭০

ইসলাম জীব-জন্তু সংরক্ষণের নির্দেশ দিয়েছে। অযথা কোনো পশুকে হত্যা বা উচ্ছেদ করতে নিষেধ করেছে। নবি কারিম (সা.) জীব-জানোয়ারকে লক্ষ্য বানিয়ে তার দিকে তীর নিক্ষেপ করতে নিষেধ করেছেন। হাদিসে আছে, একদা ইবনে ওমর (রা.) কোরাইশের কিছু যুবকের কাছ দিয়ে যাচ্ছিলেন। তিনি লক্ষ্য করলেন, যুবকেরা পাখি ও মুরগিকে তাক করে (তীর নিক্ষেপ করে) লক্ষ্যবস্তুতে সঠিকভাবে আঘাত করার বিষয়ে প্রতিযোগিতা করছে। যখন তারা ইবনে ওমরকে দেখল, দৌড়ে পালাল। তখন ইবনে ওমর তাদের লক্ষ্য করে বললেন: ‘আল্লাহর রাসূল (সা.) যারা প্রাণীকে লক্ষ্যবস্তু বানায় তাদের অভিশাপ করেছেন। ’ –সহিহ মুসলিম
আয়িশা (রা.) বর্ণনা করেন, ‘আল্লাহর রসূল (সা.)-এর পাশ দিয়ে কোনো বিড়াল হেঁটে গেলে তিনি তাকে পানির পাত্র এগিয়ে দিতেন এবং বিড়াল তা থেকে পান করতো। ’ -(দারে কুতনি)
অন্য এক হাদিসে ইরশাদ হয়েছে, একদা নবি কারিম (সা.) একটি উটের পাশ দিয়ে হেঁটে যাচ্ছিলেন। তিনি লক্ষ্য করলেন, উটটির পেট পিঠের সঙ্গে লেগে গেছে। তখন নবি (সা.) বললেন, এই অবোধ পশুর ব্যাপারে আল্লাহকে ভয় করো। সবল অবস্থায় এর পিঠে আরোহণ করো এবং সবল অবস্থায় একে ভক্ষণ করো। ’ –সুনানে আবু দাউদ
হালাল যেসব পশুর গোশত খাওয়ার অনুমতি ইসলাম দিয়েছে, সেগুলো জবাই করার সময় পশুর সঙ্গে সদয় আচরণ ও দয়া প্রদর্শনের নির্দেশ ইসলাম দিয়েছে। ইসলাম বলেছে, এগুলোকে ধারালো অস্ত্র দিয়ে সুন্দরভাবে জবাই করতে হবে, যাতে তাদের কষ্ট কম হয়।(সংক্ষিপ্ত)

লেখকঃ কলাম লেখক

 

আরও পড়ুন