Ads

দুনিয়ার জীবনে আখিরাতের প্রস্তুতি যেভাবে নেয়া দরকার

।। ড. মোহাঃ ইয়ামিন হোসেন ।।

একজন প্রকৃত মুমিন মুসলিমের জীবনে দুনিয়া ও আখিরাতের মধ্যে সঠিক ভারসাম্য রক্ষা করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। হাদিস ও আল কোরআনের আলোকে একজন মুমিনের করণীয় সম্বন্ধে আলোচনা করা হলো।

দুনিয়ার জীবনের গুরুত্ব

আল কোরআনে এবং হাদিসে দুনিয়ার জীবনের গুরুত্বকে সম্পূর্ণ অস্বীকার করা হয়নি। বরং এর সঠিক ব্যবহার ও  এর প্রতি দৃষ্টিভঙ্গির উপর জোর দেওয়া হয়েছে। আল কোরআনে বলা হয়েছে:

“তোমরা দুনিয়া থেকে তোমাদের অংশ ভুলে যেও না। আর দুনিয়ায় যেমন আল্লাহ তোমার প্রতি দান করেছেন, তেমনি তোমরাও দান কর।” (সূরা আল-কাসাস, ২৮:৭৭)

এই আয়াতে দুনিয়ার জীবনের প্রতি নজর দেওয়া এবং সঠিকভাবে এর ব্যবহার করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

হাদিসে রাসুলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেন, “একজন মুমিনের শক্তিশালী হওয়া দুর্বল থাকার চেয়ে উত্তম এবং আল্লাহর কাছে বেশি প্রিয়।” (সহিহ মুসলিম)

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন,“শক্তিশালী মুমিন দুর্বল মুমিনের চেয়ে অধিক উত্তম এবং আল্লাহর নিকট অধিক প্রিয়। আর সবকিছুতেই কল্যাণ রয়েছে। সুতরাং যাতে তোমার কল্যাণ রয়েছে তা অর্জনে আগ্রহী হও এবং আল্লাহর সাহায্য কামনা কর। দুর্বলতা প্রদর্শন করো না। তবে যদি তোমার কোন কাজে কিছু ক্ষতি সাধিত হয়, তখন তুমি এভাবে বলো না যে, “যদি আমি কাজটি এভাবে করতাম তা হলে আমার এই এই হত।” বরং বল, “আল্লাহ এটাই তকদীরে রেখেছিলেন। আর তিনি যা চান তা-ই করেন।” কেননা ‘যদি’ শব্দটি শয়তানের কাজের পথকে উন্মুক্ত করে দেয়।” (মুসলিম, মিশকাত হা/৫২৯৮)।

আখিরাতের জীবনের প্রস্তুতি

আখিরাতের জীবনের প্রস্তুতি নেওয়া একজন মুমিনের প্রধান কর্তব্য। আল কোরআন ও হাদিসে আখিরাতের গুরুত্ব বারবার উল্লেখ করা হয়েছে।

আল কোরআনে বলা হয়েছে,

“যে ব্যক্তি আখিরাতের শস্য চায়, আমরা তার শস্য বাড়িয়ে দেব। আর যে ব্যক্তি দুনিয়ার শস্য চায়, আমরা তাকে তাতে কিছু দিই, কিন্তু আখিরাতে তার কোনো অংশ নেই।” (সূরা আশ-শূরা, ৪২:২০)

এই আয়াতে আখিরাতের শস্য বা ফল লাভের জন্য প্রচেষ্টা করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

সন্তানকে মুমিন হিসেবে গড়ে তুলতে করণীয়

হাদিসে এসেছে,

রাসুলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেন, “দুনিয়া হল মুমিনের জন্য একটি কারাগার এবং কাফিরের জন্য একটি জান্নাত।” (সহিহ মুসলিম)

সঠিক ভারসাম্য

দুনিয়া এবং আখিরাতের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করার জন্য মুমিনের করণীয় সম্পর্কে হাদিস ও আল কোরআনের নির্দিষ্ট নির্দেশনা রয়েছে ।

আল কোরআনে উল্লেখ আছে,

“হে ঈমানদারগণ! তোমরা ধৈর্য ধারণ কর এবং ধৈর্যের প্রতিযোগিতায় অবতীর্ণ হও এবং সীমান্ত রক্ষা কর এবং আল্লাহকে ভয় কর, যাতে তোমরা সফল হতে পার।” (সূরা আলে ইমরান, ৩:২০০)

সহিহ হাদিসে উল্লেখ রয়েছে

রাসুলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেন, “তোমরা এই দুনিয়ায় এমন জীবনযাপন কর যেন তোমরা একজন ভ্রমণকারী বা পথিক।” (সহিহ বুখারি)

দুনিয়ার জীবন নিয়ে আমরা অনেক ব্যস্ত থাকি, কিন্তু পরকালের স্থায়ী জীবনের প্রস্তুতির বিষয়ে অনেক সময় বেখেয়ালি হয়ে যাই। একজন প্রকৃত মুমিন মুসলিমের কী করা উচিত তা নিয়ে হাদিস ও আল-কোরআনের আলোকে বিস্তারিত আলোচনা নিচে দেওয়া হলো-

১. আল্লাহর প্রতি পূর্ণ আস্থা ও তাওয়াক্কুল (বিশ্বাস ও নির্ভরতা)

কোরআনে বলা হয়েছে:

“যারা বলে, ‘আমাদের পালনকর্তা আল্লাহ,’ তারপর স্থির থাকে, তাদের কাছে ফেরেশতারা অবতীর্ণ হন এবং বলেন, ‘তোমরা ভয় করো না এবং দুঃখিত হয়ো না এবং সেই জান্নাতের সুসংবাদ গ্রহণ কর যা তোমাদের ওয়াদা দেওয়া হয়েছিল।'” (সূরা ফুস্সিলাত, আয়াত ৩০)

২. নামাজ কায়েম করা

নামাজ মুসলমানদের অন্যতম প্রধান ইবাদত। আল্লাহ বলেন:

“নামাজ কায়েম করো, জাকাত দাও, এবং যারা রুকু করে তাদের সাথে রুকু করো।” (সূরা বাকারা, আয়াত ৪৩)

৩. জাকাত প্রদান ও দান-খয়রাত করা

জাকাত প্রদান মুসলিমদের জন্য বাধ্যতামূলক, যা তাদের সম্পদ পরিশুদ্ধ করে। আল্লাহ বলেন:

“আর তোমরা সালাত কায়েম কর এবং জাকাত প্রদান কর।” (সূরা আন-নুর, আয়াত ৫৬)

প্রতিদিনের কাজগুলো যেভাবে সাদাকায়ে জারিয়া হবে

৪. সৎকর্ম ও খারাপ কাজ থেকে বিরত থাকা

মুমিনদের সৎকর্ম করা ও খারাপ কাজ থেকে বিরত থাকার আদেশ দেওয়া হয়েছে। আল্লাহ বলেন:

“নিশ্চয় যারা মুমিন এবং সৎকর্ম করে, তাদের জন্য রয়েছে জান্নাতের উদ্যান, যেখানে থাকবে নিরন্তর স্রোতধারা।” (সূরা বুরূজ, আয়াত ১১)

৫. ধৈর্য ধারণ ও আল্লাহর ওপর ভরসা রাখা

কোরআনে বলা হয়েছে:

“নিশ্চয়ই আল্লাহ ধৈর্যশীলদের সাথে আছেন।” (সূরা বাকারা, আয়াত ১৫৩)

৬. কোরআন ও সুন্নাহ অনুসরণ করা

মুসলিমদের উচিত কোরআন ও নবী মুহাম্মদ (সা.)-এর সুন্নাহ অনুসরণ করা। আল্লাহ বলেন:

“তোমাদের জন্য আল্লাহর রাসূলের মধ্যে রয়েছে উত্তম আদর্শ।” (সূরা আল-আহযাব, আয়াত ২১)

৭. পরকালের চিন্তা ও প্রস্তুতি গ্রহণ

কোরআনে বলা হয়েছে,

“আর তুমি তোমার পরকালের জন্য কী প্রস্তুতি নিয়েছো তা চিন্তা করো।” (সূরা হাশর, আয়াত ১৮)

৮. তাওবা করা ও আল্লাহর নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করা

হাদিসে বর্ণিত আছে যে নবী মুহাম্মদ (সা.) বলেছেন, “প্রত্যেক মানুষ পাপী, আর সর্বোত্তম পাপী সেই ব্যক্তি যে তাওবা করে।” (তিরমিজি)

৯. নেক কাজ করা ও খারাপ কাজ থেকে বিরত থাকা

কোরআনে বলা হয়েছে,

“যারা মুমিন এবং সৎকর্ম করে, তাদের জন্য জান্নাত রয়েছে, যেখানে থাকবে নিরন্তর স্রোতধারা।” (সূরা বুরূজ, আয়াত ১১)

এই বিষয়গুলো একজন মুমিন মুসলিমের জীবনে অপরিহার্য। দুনিয়ার জীবনকে সঠিকভাবে পরিচালনা করে এবং পরকালের জীবনের প্রস্তুতি নিয়ে আমাদের কাজ করা উচিত। এই কর্মগুলো একজন মুমিন মুসলিমকে দুনিয়া ও আখিরাতের জীবনে সফল হতে সাহায্য করবে। আল্লাহ আমাদের সবাইকে সঠিক পথ প্রদর্শন করুন। আমিন।

লেখকঃ প্রাবন্ধিক এবং অধ্যাপক, ফিশারীজ বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় 

…………………………………………………………………………………………………………………………

মহীয়সীর প্রিয় পাঠক ! সামাজিক পারিবারিক নানা বিষয়ে লেখা আর্টিকেল ,আত্মউন্নয়নমূলক অসাধারণ লেখা, গল্প  ও কবিতা  পড়তে মহীয়সীর ফেসবুক পেজ মহীয়সী / Mohioshi  তে লাইক দিয়ে মহীয়সীর সাথে সংযুক্ত থাকুন। আর হা মহীয়সীর সম্মানিত প্রিয় লেখক! আপনি আপনার পছন্দের লেখা পাঠাতে পারেন আমাদের ই-মেইলে-  [email protected]  ও  [email protected] ; মনে রাখবেন,”জ্ঞানীর কলমের কালি শহীদের রক্তের চেয়েও উত্তম ।” মহীয়সীর লেখক ও পাঠকদের মেলবন্ধনের জন্য রয়েছে  আমাদের ফেসবুক গ্রুপ মহীয়সী লেখক ও পাঠক ফোরাম ; আজই আপনিও যুক্ত হয়ে যান এই গ্রুপে ।  আসুন  ইসলামী মূূল্যবোধে বিশ্বাসী প্রজন্ম গঠনের মাধ্যমে সুস্থ,সুন্দর পরিবার ও সমাজ গঠনে ভূমিকা রাখি । আল্লাহ বলেছেন, “তোমরা সৎ কাজে প্রতিযোগিতার মাধ্যমে এগিয়ে চলো ।” (সূরা বাকারা-১৪৮) । আসুন আমরা বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চার মাধ্যমে সমাজে অবদান রাখতে সচেষ্ট হই । আল্লাহ আমাদের সমস্ত নেক আমল কবুল করুন, আমিন ।

ফেসবুকে লেখক  মোঃ ইয়ামিন হোসেন 

আরও পড়ুন