হে মানুষ ভেবেছো কি একটু তোমার সৃষ্টি নিয়ে

হে মানুষ ! ভেবেছো কি একটু তোমার সৃস্টি নিয়ে ?

কুরআনের প্রত্যেকটি আয়াতই মানুষের হেদায়েত নির্দেশ করে।কিন্ত কিছু কিছু আয়াত অনেক বেশি ইমোশনাল এবং কলিজায় গেঁথে যাওয়ার মতো।তার মধ্যে এই আয়াতত্রয় অন্যতম।

يَا أَيُّهَا الْإِنْسَانُ مَا غَرَّكَ بِرَبِّكَ الْكَرِيمِ الَّذِي خَلَقَكَ فَسَوَّاكَ فَعَدَلَكَ فِي أَيِّ صُورَةٍ مَا شَاءَ رَكَّبَكَ

হে মানুষ ! কিসে তোমাকে তোমার মহান প্রতিপালক সম্বন্ধে বিভ্রান্ত করিল ? যিনি তোমাকে সৃষ্টি করিয়াছেন, অতঃপর তোমাকে সুঠাম করিয়াছেন এবং সুসমঞ্জস করিয়াছেন।যেই আকৃতিতে চাহিয়াছেন, তিনি তোমাকে গঠন করিয়াছেন।
(সূরা ইনফিতারঃ৬-৮))

আল্লাহপাক মানুষকে সমস্ত সৃস্টির মধ্যে সুন্দরতম ও ভারসাম্যপূর্ণ করে তৈরী করেছেন।তাকে শুধু একটি দেহকাঠামোই দান করেননি বরং উন্নত পর্যায়ের জ্ঞান,চিন্তা-বুদ্ধি,উপলব্ধি ও বিবেক দিয়েছেন।এসব কিছু অন্য কোন প্রাণীরই দেওয়া হয়নি।

অংগ প্রতংগসমুহের আকার ও অবস্থান মানুষের কাজের সাথে সংগতি রেখে সাজানো হয়েছে।চোখ, কান, নাক,মুখমন্ডল, জিহ্বা অর্থাৎ যা কিছু ইন্দ্রিয়জাত সবগুলি প্রায় কাছাকাছি।ফলে চোখের দেখা,কানের শোনা,মুখের কথা বা স্বাদ বুঝার জন্য অন্য প্রাণীদের মতো অংগ সন্চালনের প্রয়োজন পড়েনা।

আপনি আপনার শরীরের দিকে তাকিয়ে দেখুন,সব অবাক করা অদ্ভুত বিষয় খুঁজে পাবেন।

লম্বালম্বিভাবে কাটা হলে দেখা যাবে মানুষের দেহ দ্বিপার্শীয়ভাবে এক প্রতিসম।সমান সমান অংগ ডান ও বামে বিভক্ত।চোখ কান নাকের ছিদ্রসহ হার্টের অলিন্দ পর্যন্ত।জোড়া জোড়া অংগের কোন একটা বিকল হলে যেনো আরেকটির সাহায্যে বান্দা কাজ চালাতে পারে।এটা সব প্রাণতোষ কমন।খাদ্য হজমের জন্য ক্ষুদ্রান্ত ২৩ ফুট লম্বা যা বডির উচ্চতারও প্রায় ৫ গুণ।এটি প্রত্যহ মানবদেহ খাদ্য সামগ্রীসহ ৬-১২ লিটার পানি গ্রহন করে।এর চোষণ এলাকা ২৭০০ বর্গফুট যা একটা টেনিস কোর্টের সমান।

আমাদের চোখের দৃষ্টিশক্তির বিস্তৃতি কতখানি ?অনুমান করাও দুষ্কর।সামনে যা কিছু নজরে আসে সবই সে বাক্সে পুরে নেয়।এক দৃশ্যের উপর আরেক দৃশ্য কিন্ত কোনটাই বিলুপ্ত হয়ে যার না।এমনকি পন্চাশ বছর আগেও সে যা দেখেছে তাও সে সযত্নে সংরক্ষন করেছে।চোখের পাতা মোড়ান হয়েছে আইল্যাস দিয়ে, প্রতি মিনিটে সে ১৩ বার মিটমিট করছে যা বছরে ৬২ লক্ষ বার।প্রতিবারই সে চোখে জমা পানি সরিয়ে দিয়ে চোখের সতেজ রাখে।চোখের কর্নিয়া পুরো দেহের একমাত্র জীবন্ত টিস্যু যাতে কোন রক্তনালী নেই।বিশ্বাস হবেনা হয়তো যে চোখ খোলা রেখে হাঁচি দেয়া অসম্ভব।

কেউ কি জানে আমাদের খাদ্যদ্রব্য পরিপাকের জন্য পাকস্থলিতে যে হাইড্রোক্লোরিক এসিড নির্গত হয় তা জিংক ধাতুকেও গলিয়ে দিতে পারে। এত দ্রুত পাকস্থলির ঝিল্লি পরিবর্তন হয় যে এসিড তা ঝলসে দেবার সময় পায়না।

আমাদের ফুসফুসে তিন মিলিয়ন অধিক ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র রক্তনালী রয়েছে যে তা বিছিয়ে দিলে ২৪০০ কিমি. রাস্তা হতে পারে।পুরো শরীরে যতো রক্তনালী আছে তার দৈর্ঘ কমপক্ষে শত কিমি. এর কম নয়।আশ্চর্য হলো দিনের শুরুতে স্খল নিদ্রাভঙ্গ হয় তখন আপনার উচ্চতা নিদ্রা থাকার সময়ের চেয়ে ৩ সেমি. বেশি।

মানুষের শরীরে যে হাঁড় রয়েছে তার ধারন ক্ষমতার ধারনা আছে কি?একটি ছোট আকারের ম্যাচবাক্সের সমান হাঁডের উপর ৯ টন ওজনের গাড়ী অনায়াসে যেতে পারবে।আমাদের কিডনি নামক ছাকনিতে রয়েছে এক মিলিয়ন ফিল্টার যা প্রতি মিনিটে ১.৩ লি.রক্ত ছাঁকে। কিডনির ছাকনিতে কতো রং বেরংয়ের পানীয় পড়ে কিন্ত সবই বেরিয়ে যায় প্রশ্রাব হয়ে।মাত্র আধ ঘন্টায় আমাদের শরীর থেকে যে তাপ নি:সরন হয় তাতে আধা গ্যালন পানি সিদ্ধ করা যায়।আমাদের জিহ্বায় স্বাদ আস্বাদনের জন্য দশ হাজারেরও বেশি টেস্ট বাড রয়েছে।

খাদ্য পরিপাকের বিষয়টা তো আরো বিস্ময়কর।আপনি শক্ত বা ভেজা যাই খান সেটা চর্ব,লেহ্য,চুষ্য ও পেয় এর বাইরে নয়।সবকিছু একই পথে পরিপাকের কারখানার প্রবেশ করে।কিছু দেহে এনার্জিতে রুপান্তর হয়,কিছু অবশেষ হয়ে বেরিয়ে যায়।জগতে সামান্য তুলা থেকে এক টুকরা কাপড় বানাতে শত বিঘা জমি লাগে,কোটি কোটি টাকার মুলধনি যন্ত্রপাতি লাগে,হাজার হাজার লোকের কর্ম সংস্থান লাগে,লাগে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি অথচ আপনি খাবার খেয়ে ঘুমিয়ে পড়লেন আল্লাহর কুদরত নিরবে নিভৃতে এই বিশাল কাজটি সম্পন্ন করে দেন, বান্দার পক্ষে তা টেরও করতে পারেনা।

মানুষের মস্তিষ্কের কথা তো আরো আশ্চর্যের।এতে রয়েছে ৮৬ বিলিয়ন স্নায়ুকোষ।শরীরে যে কোন সংবাদ মস্তিষ্কে পৌছাতে এবং সেখান থেকে রেসপন্স নিতে নার্ভ ইমপাল্স ঘন্টায় ২৫০ কিমি.গতিতে চলে।আর তার ধারনক্ষমতা অসীম, ১০,০০০ টেরাবাইটেরও বেশি।বিজ্ঞানীরা হিসেব করেছেন-শুধু ব্রিটেনের ৯০০ বছরের ইতিহাস কম্পিউটার ধরতে ৯০ টেরাবাইট জায়গা নিবে।মস্তিষ্কের নিউরন জীবনব্যাপী বৃদ্ধি পায়,এর শিশুকাল বার্ধক্য বলে কিছু নেই।

ও পৃথিবীর বুদ্ধিমান জ্ঞানীরা !পারবে কি একটা কান বানিয়ে দেখাতে? যে কান শুনতে পায়? পারবে এরকম একটা চোখ বানিয়ে দেখাতে যে চোখ ৫৭৬ মেগাপিক্সেল ক্ষমতা সম্পন্ন জীবন্ত বায়োনিক চোখ! পারবে এমন একটা মস্তিষ্ক বানিয়ে দেখাতে? যে মস্তিষ্কে ৮৬ বিলিয়ন নিউরন রয়েছে। যে মস্তিষ্কের সামনে সমস্ত সুপার কম্পিউটারও নস্যি! পারবে এমন একটা নাক বানিয়ে দেখাতে? যে নাকের দুপাশে রয়েছে দুটো আলাদা আলাদা প্লেট। যার কারণে আমরা দূর্গন্ধ ও সুগন্ধ অনুভব করি।ক্ষুদ্র একটা দাঁত বানাও তো যার উপর দিয়ে শক্তিমান ভারবাহী বস্ত চলবে কিন্ত দাঁত অক্ষত রইবে।জানি,পারবেনা।সম্মিলিত চেষ্টারেও না।

পৃথিবীর সবচেয়ে জটিল কারখানা থেকে লক্ষ কোটি গুণ জটিল এই মানবদেহ। এতো চমৎকার সব মেকানিজমে যিনি আপনাকে আমাকে বানালেন, কেনো আমরা তাঁর থেকে এতো দূরে এই অন্ধকার পাপের সমুদ্রে হাবুডুবু খাচ্ছি? কেনো আমরা তাঁর কৃতজ্ঞতায় মাথানত করছি না? কেনো তাঁর অসংখ্য নেয়ামত রাজি ভোগ করার পরও তাকে ভুলে গিয়ে পাপে পথে প্রতিযোগিতা করছি৷ কোন জিনিস আমাদের তাঁর মতো ভালোবাসার একজন মাবুদ থেকে দূরে সরিয়ে দিচ্ছে?

তথ্য সুত্র:
১)লেখকের গ্রন্থ “আল কুরআনে মানুষ প্রসংগ”
২)ফ্যাক্টস এবাউট হিউম্যান বডি-রিডার্স ডাইজেস্ট

৩) মো: আরিফ আবদুল্লাহ,

লেখকঃ জামান শামস, কবি ও সাহিত্যিক।

 

 

আরও পড়ুন