আহলান সাহলান মাহে রমজান

   আজ (গতকাল) থেকে শুরু হয়েছে রহমত, বরকত ও নাজাতের মাস মাহে রমজান।

এবারের রমজান সম্পূর্নই একটি ভিন্ন আঙ্গিকের রোজা। আজ থেকে চৌদ্দশত বছর আগে প্রথম যখন সাওমের নির্দেশ আসলো যে রমজান মাস পূর্ণ একমাস রোজা রাখার সেই রমজান  ছিল খুব কঠিন একটি রমজান। গৃহযুদ্ধের ফলে অর্থনৈতিক অবস্থা ছিল বিধ্বস্ত উপরন্তু কুরাইশদের অসহযোগিতা। আর এবার এক অদৃশ্য অণুজীব করোনাকে পাঠিয়েছেন আল্লাহ তায়ালা এক পরীক্ষা হিসেবে। আজান ভেসে আসছে ঠিকই কিন্তু বলা হচ্ছে আজানে তোমরা বাড়িতে নামাজ পড়ো এটা বিশেষ অবস্থায় উত্তম। সুতরাং কতটা বিপর্যয়ে আছি আমরা। আমরা আমাদের ঘরগুলোকে আসুন মসজিদে পরিণত করি।

আল্লাহ সূরাহ বাকারায় রমজানের সাওম সম্পর্কে আয়াত নাজিল করেছেন যাতে করে আমরা আল্লাহর প্রতি সচেতন হতে পারি।

সূরা আল-বাক্বারাহ’র নিচের ১৮৩ নম্বর আয়াতে আল্লাহ تعالى আমাদেরকে সিয়াম অর্থাৎ রোজা রাখার নির্দেশ দিয়েছেন এবং কেন আমরা রোজা রাখি, রোজা রেখে কী লাভ, তা শিখিয়েছেন!

“তোমরা যারা বিশ্বাস করেছ, শোনো, তোমাদের উপর রোজা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে, যে রকম তোমাদের পূর্বপুরুষদের উপর করা হয়েছিল। যাতে করে তোমরা আল্লাহর প্রতি সচেতন হও। [আল-বাক্বারাহ ১৮৩]

এখানে আল্লাহর প্রতি সচেতন হও বলতে তার প্রতি ঈমান আনা তার কিতাবের পূর্ণ জ্ঞান অর্জন করে তাকওয়া অবলম্বন বোঝানো হয়েছে। তাকওয়া অর্থ ভীতি। যেমন আমাদের চাকরি ক্ষেত্রে যেরুপ ভয় করি প্রধানকে বা বসকে সেইরুপ যিনি আমাদের পৃথিবীতে পাঠিয়েছেন এবং আবার জবাবদিহি করে পুরষ্কৃত করার জন্য তার কাছে ফিরিয়ে নিবেন এর প্রতি পূর্ণ বিশ্বাস হলো ঈমান এবং ভয় সহকারে নির্দেশনা অনুসরণ হলো তাকওয়া। রমজান শব্দটির মূল ধাতু “রমজ” যার অর্থ পুড়িয়ে ফেলা সুতরাং রোজা রেখে যে নিষেধাজ্ঞা আছে তা মেনে চললে আমাদের বদভ্যাস দূর হয় অর্থাৎ খারাপ আমল পুড়িয়ে বা নিজের নফস কে পুড়িয়ে খাঁটি সোনায় রুপান্তর করা হয়। এজন্য রমজান হলো ট্রেনিংয়ের মাস।

এ মাস আসার একমাস পুর্ব থেকে মনের মধ্যে শান্তির সুবাতাস বইতে থাকে। যে যতই অসুস্থ থাকুক সে যেন আনন্দে সুস্থ হয়ে ওঠে। এই মাস মুমিনের গুনাহ মাফ করানোর মাস।এই মাস ইবাদতের জন্য বোনাস অফারের মাস। সুতরাং বেশি বেশি আমলের মাধ্যমে আমাদের বোনাস অর্জনের মাস। এই মাসে বড় বড় ইবলিস কে আটকিয়ে রাখা হয়।এজন্য মানুষের মধ্যেএকটু পরিবর্তন আসে। আল্লাহ্‌ রাব্বুল আলামিন এ মাসে রিযিককে প্রশস্ত করে দেন।কিন্তু সেহরি থেকে ইফতার পর্যন্ত আমি শুধুই পানাহার ত্যাগ করে দুনিয়াদারিতে ব্যাস্ত থাকলে কি চলবে? রোজা ভঙ্গের কারণগুলো সম্পর্কে আমাদের সঠিক জ্ঞান থাকলে আমাদের রোজা পরিপূর্ণ হবে এবং ট্রেনিং সফল হবে। এজন্য নিশ্চয় মুসলিম হিসাবে উপরোক্ত প্রশ্নের উত্তর হওয়া উচিত “না”।আমরা দুনিয়াতে কে কতক্ষন জিবিত থাকব বলতে পারিনা। আমরা যে রমজান পাচ্ছি সেটাকেই মনে করতে হবে বোনাস নেকি অর্জনের শেষ সুযোগ। তাই আসুন এই রমজানেই গড়ে তুলি আল্লাহর সাথে সর্বোত্তম সম্পর্ক। এই সম্পর্ক গড়ে তোলার জন্য দরকার একটি রুটিন। সাহরিতে আমাদের উঠতেই হয়। এক ঘন্টা আগে উঠুন। তাহাজ্জুদ আদায় করে অর্থ সহ সহি পদ্ধতিতে কোরআন, তাজবিহ তাহলিল করুন।আল্লাহ তায়ালা রাত্রে শেষ আসমানে নেমে আসেন আর খুঁজতে থাকেন সাহায্য প্রার্থি কে কে আছেন, আমরা যেহেতু বাংলা ভাষী সেহেতু আরবী উচ্চারনে আমাদের কিছু ভুল থাকবে। এই জন্য রমজানে তালিমূল কুরআন কোর্স করার চেষ্টা করতে হবে। এই মাসে কোরআন খতমের খুব চেষ্টা করতে হবে। আসলে কোরআন আল্লাহর চিঠি।চিঠিতে কি লেখা আছে না বুঝলে কি হয়। দিনের বেলা কিছুটা সময় হাদীস ও ইসলামি গ্রন্থ পড়া প্রয়োজন। ইসলমি গ্রন্থের মধ্যে সিরাত বিষয়ক গ্রন্থ বেশি পড়া জরুরী। কারণ নবী রাসুলগণের  জীবন ও কর্ম আমাদের আদর্শ।

এছাড়া এ মাসে দৈনন্দিন জীবনের প্রয়োজনিয় দোয়া যেমন ঘুমানো,জাগা,খাওয়ার শুরুতে ও শেষে, গোসল, বাথরুমে ঢোকা ও বের হওয়া,বাড়িতে ঢোকা ও বের হওয়া,যানবাহনে ওঠা ও নামার দোয়া মুখস্ত করার চেষ্টা করতে হবে। এ মাসে আল্লাহর ওয়াস্তে বেশি বেশি দান সাদকাহ করতে হবে। ইফতারীর আগ মুহূর্ত কে দোয়া কবুলের সময় বলে আমরা হাদিস থেকে জানতে পারি এজন্য ইফতারীর আগে বেশি বেশি আমলের মাধ্যমে নাজাত চাইতে হবে।
গীবত এমন একটি ব্যাধি যা আমাদের আচারের মতো স্বাদ যুক্ত করে দেয় গল্প বা আলাপচারিতায়।
গিবত থেকে বিরত থাকতে হবে।গিবত আমাদের সমস্ত আমলকে নষ্ট করে দেয়।

মসজিদে এবার তারাবীহ বন্ধ। কিন্তু আমরা ঘরে সূরাহ তারাবীহ পড়তে পারি! তারাবীহ থেকে বঞ্চিত হবেন না। এ সময় সার্বক্ষনিক কিছু আমল আছে এগুলো করার জন্য শক্ত নিয়ত করতে হবে। প্রথম দশক সার্বক্ষনিক কালেমা পড়তে হবে।দ্বীতিয় দশক আস্তাগফিরুল্লাহ, শেষ দশকে আল্লাহুম্মা আজিরনা মিনান্নার পড়তে হবে।

আল্লাহ এই মাসে সকল রাতের চাইতে উত্তম এক রাত দিয়েছেন এবং কুরআনকে গাইড লাইন হিসেবে নাজিল করেছেন। আমরা সাধারনত মনে করি সাতাশে রাত শবে কদর এর রাত। সব সময় তা হয়না। আল্লাহ্‌ শেষ দশকে বেজোড় রাত গুলোতে শবে- কদর তালাশ করতে বলেছেন। এজন্য শেষে বেজোড় প্রতিটা রাতে আরো বেশি করে আল্লাহর সান্নিধ্য পাওয়ার চেষ্টা করতে হবে। সর্বোপরি রমজান হউক আত্মশুদ্ধি ও পবিত্রতা অর্জনের মাস!শেষ দশকের বেজোড় দিনগুলোর জিকির হলো “আল্লাহুমা আফুয়্যুন তুহিব্বুল আফওয়া ফা ফু আন্নি। “

আল্লাহ আমার এই লেখার ভুল ভ্রান্তি মাফ করে দেন যেন এবং আমাদের সবাইকে ফজিলত পূর্ন  এই মাসকে পুরোপুরিভাবে কাজে লাগানোর তৌফিক দেন। আল্লাহ যেনসমস্ত বিপদগ্রস্থ মুসলিম উম্মাহকে বিপদ মুক্ত করেনএই মাসের উছিলায়।সকল উম্মতের আমলের অছিলায়। আমিন।

ফারহানা শরমীন জেনী
প্রভাষক, কমেলা হক ডিগ্রী কলেজ, বিনোদপুর, রাজশাহী ও এডমিন, মহীয়সী।

আরও পড়ুন