ইসলামের দৃষ্টিতে শ্রমিকের মর্যাদা

ফারহানা শরমীন জেনী

“শ্রমিকের ঘাম শুকানোর আগে শ্রমিকের ন্যায্য মজুরি দাও” এই হাদিস হতে আমরা শ্রমিকের মর্যাদা ও অধিকার সম্পর্কে পূর্ণ ধারণা পেয়ে থাকি।
মানুষ বেঁচে থাকার, পরিবারের যাবতীয় দায়দায়িত্ব পালন ও সমাজের কল্যাণে ও সৃষ্টিজীবের উপকার সাধনের জন্য যে কাজ করে তাই হলো শ্রম। অর্থাৎ জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত বেঁচে থাকার এবং লক্ষ্য অর্জনের জন্য যে কাজ তাই শ্রম। আর যিনি শ্রম দান করেন তিনি হলেন শ্রমিক। কিন্তু আমাদের মাঝে অর্থনৈতিক পরিভাষায় শ্রমিক সম্পর্কে যে ধারণা তা হলো দিনমজুর, খেটে খাওয়া মানুষ, গৃহ পরিচারিকা, পরিবহন শ্রমিক, দাসী, কুলি-মজুর এরা। কিন্তু আল্লাহ পৃথিবীতে প্রত্যেককেই শ্রমিক হিসাবে পাঠিয়েছেন। মানুষ তার চেষ্টা ও অধ্যবসায় দ্বারা নিজ নিজ কর্ম খুঁজে নিয়েছেন। বুখারী ও মুসলিম শরীফের নিম্নোক্ত হাদীস থেকে শ্রমিকের মর্যাদা ও অধিকার সম্পর্কে আমরা জানতে পারিঃ

হযরত আবু হোরায়রা (রাঃ) হতে বর্ণিত তিনি বলেন রাসূল আল্লাহ বলেছেন, তোমাদের চাকর চাকরানী ও দাস-দাসীরা প্রকৃতপক্ষে তোমাদের ভাই। তাদেরকে আল্লাহ তা’আলা তোমাদের অধীনস্হ করেছেন। সুতরাং আল্লাহ যার ভাইকে তার অধীন করে দিয়েছেন সে তার ভাইকে যেন তাই খাওয়ায় যা সে নিজে খায় এবং তাকে তাই পরিধান করতে দেয় যা সে নিজে পরিধান করে। আর তার সাধ্যের বাইরে তার উপর কোন কাজ যেন চাপিয়ে না দেওয়া হয় এবং দিলেও তা সমাধান করার ব্যাপারে সাহায্য করা প্রয়োজন। (বুখারী, মুসলিম)

উল্লেখ্য, আল্লাহ একমাত্র মানুষ কেই তার দাস বানিয়েছেন। অতএব মানুষ দাস-দাসী শব্দটি তার অধীনস্হ কারো ক্ষেত্রে প্রয়োগ করবে পারবে না বরং এটি ব্যবহারের একচ্ছত্র অধিকার শুধুমাত্র আল্লাহ তায়ালার।

একই প্রসঙ্গে আল্লাহ তা’আলা সূরা কাসাস এর ২৭ নম্বর আয়াতে বলেনঃ আমি তোমাদের ওপর কোনোরূপ কঠোরতা করতে চাইনা, কোন কঠিনসাধ্য কাজ চাপাতেও চাইনা। আল্লাহ চাহে তো তুমি আমাকে সদাচারী হিসাবে দেখতে পাবে। (২৮:২৭)

সূরা কাসাসের এই আয়াত থেকে আমরা স্পষ্ট বুঝতে পারছি যে আল্লাহ কারো উপর কঠিন কিংবা দুঃসাধ্য কাজ চাপিয়ে দেননি সুতরাং বান্দারও উচিত নয় তাদের ওপর কঠিন কাজ চাপিয়ে দেওয়া। মানুষ যদি তার অধীনস্থদের ওপর সদচারী হয় তবে আল্লাহ মানুষের উপর সদাচারী হবেন।

মানুষের উন্নতির মূল চালিকাশক্তি শ্রম। যে জাতি যত বেশি শ্রম দিবে সে জাতি তত বেশি উন্নত হবে। উন্নত দেশগুলোর উন্নতির একমাত্র সোপান হলো তারা সব শ্রেনীর কাজকে সমান মর্যাদা দান করে। উন্নত দেশগুলোর মতো আমাদের দেশে সেভাবে শ্রমের মর্যাদা দেওয়া হয় না। আল্লাহর দৃষ্টিতে সকল প্রকার শ্রমের সমান মর্যাদা অর্থাৎ সকল শ্রমিক সমান মর্যাদার অধিকারী। শ্রমকে যথাযথ মূল্যায়ন করা হলে সমাজের অগ্রগতি ত্বরান্বিত হয়। শ্রমের ব্যাপারে আল্লাহ পবিত্র আল কুরআনের নির্দেশ দিয়েছেন, “অতঃপর যখন নামাজ শেষ হবে, তখন তোমরা জমিনে ছড়িয়ে পর এবং রিযিক অন্বেষণ কর।” (সূরা জুমা-১০)

সমাজে কোন কাজ তুচ্ছ নয়। আমরা একজন আরেকজনের উপর নির্ভরশীল। বর্তমান বিশ্বে অনুজীব করোনার আক্রমণ কে কেন্দ্র করে গোটা পৃথিবী অবরুদ্ধ। একজন গৃহপরিচারিকা, নাপিত, মুচি, দর্জি, ড্রাইভার যে কত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে তা আমরা পদে পদে উপলব্ধি করছি। শ্রমিকের শ্রম অনুযায়ী ছুটি সেভাবে ভোগ করতে পারেনা এজন্য আল্লাহ সুবহানাল্লাহ তায়ালা তাদের ছুটির বন্দোবস্ত করলেন। শ্রমবিমুখ আমরা এতে পুরোদমে সচল হলাম। আসলে কোন কাজ ঘৃণার নয়। যে কোন কাজকে অসম্মানজনক মনে করা অত্যন্ত হীন মানসিকতার পরিচয়। আমি যেদিন থেকে জেনেছি পরিবারের জন্য খাদ্য প্রস্তুত করা গুনাহর কাফফারা বা সাদকায়ে জারিয়াহ, সেদিন থেকে রান্নার কাজটা নিজে করার চেষ্টা করি। যার ফলে পরিবারের মধ্যেও সন্তুষ্টির সুবাতাস বইতে থাকে। শ্রম দ্বারা অর্জিত খাদ্য সর্বোৎকৃষ্ট খাদ্য হিসাবে ইসলাম ধর্মে আখ্যায়িত করা হয়েছে। মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সাঃ) বলেছেন, ” ইবাদতের পর হালাল রুজি অর্জন করা একটি ফরজ ইবাদত! ”

এছাড়াও সূরা মুলক এর ১৫ নম্বর আয়াতে আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেছেন, “তিনি তোমাদের জন্যে পৃথিবীকে সুগম করেছেন, অতএব, তোমরা তার কাঁধে বিচরণ কর এবং তাঁর দেয়া রিযিক আহার কর। তাঁরই কাছে পুনরুজ্জীবন হবে।” (৬৭:১৫)

আমাদের প্রিয় নবী (সা.) শ্রমকে ভালোবাসতেন। তিনি নিজ হাতে জুতা মেরামত করেছেন, কাপড়ে তালি লাগিয়েছেন, মাঠে মেষ চরায়েছেন, ব্যবসা পরিচালনাও করেছেন, যুদ্ধে নিজ হাতে পরিখা খনন করেছেন, মুসাফির কর্তৃক বিছানায় রেখে যাওয়া কাপড় ধৌত করে মানবতা ও শ্রমের মর্যাদা সর্বোচ্চ স্থানে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। শ্রমিকের মর্যাদা সম্পর্কে মহানবী (সা.) বলেন, “শ্রমজীবী আল্লাহর বন্ধু।” (বায়হাকী)

কুরআন-হাদিস, ইসলামের ইতিহাস পড়লে জানা যায়, নবী-রাসূলগণ শ্রমিকদের কত মর্যাদা দিয়েছেন! যুগে যুগে ইসলামের নবী রাসূলগন নিজে শ্রমিক হয়ে শ্রমের মর্যাদা প্রতিষ্ঠা করেছেন।
সাহাবীর হাতে কালো দাগ পড়ে যায়। রাসূলুল্লাহ (সা.) তাঁর হাত দেখে বললেন, “তোমার হাতের মধ্যে কি কিছু লিখে রেখেছ ? সাহাবী বললেন, হে আল্লাহর রাসূল (সা.) এগুলো কালো দাগ ছাড়া আর কিছুই নয়। আমি আমার পরিবার-পরিজনের ভরণ-পোষণের জন্য পাথুরে জমিতে কোদাল চালাতে গিয়ে হাতে এ কালো দাগগুলো পড়েছে। নবীজী (সা.) এ কথা শুনে ওই সাহাবীর হাতের মধ্যে আলতো করে গভীর মমতা ও মর্যাদার সাথে চুমু খেলেন। এভাবে অসংখ্য কর্ম ও ঘটনার মাধ্যমে হযরত মুহাম্মদ (সা.) পৃথিবীতে শ্রমের মর্যাদা প্রতিষ্ঠিত করে গেছেন।

ইসলামী র্আদশের কাছে মনিব-গোলাম, বড়-ছোট, আমীর-গরীবÑ সবাই সমান। ইসলামী সমাজে কর্মভেদে আলাদাভাবে মর্যাদার একক অধিকারী হওয়ার সুযোগ নেই। অধীনস্তরা ও ইনসাফের দাবি করার অধিকার রাখে।ইসলাম ধর্মে শ্রমিকের মর্যাদা ও অধিকারের ওপর অধিক গুরুত্ব দেয়া হয়েছে।

হযরত আবুবকর (রাঃ) বলেন, রাসূল (সা.) বলেছেন, “ক্ষমতার বলে অধীন চাকর-চাকরানী বা দাস-দাসীর প্রতি মন্দ আচরণকারী বেহেশতে প্রবেশ করতে পারবে না।” (ইবনে মাজাহ) তিনি আরো বলেন, “কেউ তার অধীন ব্যক্তিকে অন্যায়ভাবে এক দোররা মারলেও কেয়ামতের দিন তার থেকে এর বদলা নেয়া হবে।”

ওমর ইবনে হুরাইস (রাঃ) হতে বর্ণিত নবী করিম (সা.) বলেছেন, “তোমরা তোমাদের কর্মচারীদের থেকে যতটা হালকা কাজ নিবে তোমাদের আমলনামায় ততটা পুরস্কার ও নেকী লেখা হবে।

শ্রমিকদের ন্যায্য না মজুরি দিয়ে, তাদের ঠকিয়ে শিল্পপতিরা গড়ে তোলে একাধিক শিল্প-ব্যবসা প্রতিষ্ঠান। কারখানায় তাদের কোনো অংশিদারিত্ব থাকে না। এ ব্যাপারে মহানবী (সা.) বলেছেন, “মজুরকে তার কাজ হতে অংশ দান কর, কারণ আল্লাহর মজুরকে বঞ্চিত করা যায় না।” (মুসনাদে আহমাদ)

মাসের পর মাস চলে যায় শ্রমিকরা বেতন পায় না। বেতনের দাবিতে শ্রমিককে মালিকের বিরুদ্ধে আন্দোলন করতে হয়। শ্রমিকের বেতন-ভাতার ব্যাপারে বিশ্বনবী (সা.) বলেছেন, “শ্রমিকের ঘাম শুকানোর আগেই তাদের প্রাপ্য মজুরি পরিশোধ কর।” এক্ষেত্রে হযরত আবু হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিত, রাসূল (সাঃ) বলেনঃ আল্লাহ তাআলা বলেছেন কিয়ামতের দিন তিন ব্যক্তির সাথে আমার ঝগড়া হবে ১. ওই ব্যক্তি যে আমার নামে কোন চুক্তি করে তা ভঙ্গ করেছে। ২. সেই ব্যক্তি যে কোন মানুষকে বিক্রি করে তার মূল্য ভক্ষণ করেছে। ৩. সেই ব্যক্তি যে মজুরের দ্বারা কাজ পুরোপুরি করিয়ে নিয়েছে কিন্তু তার পারিশ্রমিক দেয়নি। (বুখারী)
শ্রমজীবী মানুষ বা কোনো শ্রমিক অবসর নেয়ার পর তার বাকি জীবন চলার জন্য অর্থনৈতিক সুবিধা বা পেনশনের ব্যবস্থা থাকা প্রয়োজন। এ ব্যাপারেও ইসলাম নীরব নয়। হযরত ওমর (রাঃ) বলেছেন, “যৌবনকালে যে ব্যক্তি শ্রম দিয়ে রাষ্ট্র ও জনগণের খেদমত করেছেন বৃদ্ধকালে সরকার তার হাতে ভিক্ষার ঝুলি তুলে দিতে পারে না।”

১৮৮৬ সালের ১ মে আমেরিকার শিকাগো শহরের ‘হে’ মার্কেটে অধিকার বঞ্চিত শ্রমিকরা ৮ ঘণ্টা কাজসহ বিভিন্ন দাবিতে সংগঠিত হয়ে আন্দোলন শুরু করে। বিক্ষোভ সমাবেশে নিরীহ শ্রমিকদের ওপর গুলী চালায় পুলিশ। নিহত হন অনেক শ্রমিক। শ্রমজীবী মানুষের আপসহীন মনোভাব ও আত্মত্যাগের ফলে মালিক পক্ষ শ্রমিকদের দাবি অনুযায়ী, ৮ ঘণ্টা কাজের স্বীকৃতি দিতে বাধ্য হয়। ১ মে শ্রমিক আন্দোলনের প্রতীকে পরিণত হয়। হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর হাদিস, শ্রমিকদের সাধ্যের অতীত কাজে কখনো খাটাবে না। এই হাদিস মেনে চললে এবং কুরআনের নির্দেশাবলি মেনে চললে আর কোন শ্রমিক আন্দোলন হওয়ার কথা নয়।

আমরা আমাদের পরিবার থেকেই শুরু করি শ্রমের মর্যাদা দেয়া।যে যার অধীন্স্তদের ন্যায্য অধিকার দিয়ে দেয়ার সংকল্প করি।আল্লাহ আমাদের সমস্ত ভুল ত্রুটি আল্লাহ ক্ষমা করে দিন।

লেখকঃ কবি, সাহিত্যিক ও  প্রভাষক, কমেলা হক ডিগ্রী কলেজ,বিনোদপুর রাজশাহী।

তথ্যসূত্রঃইন্টারনেট
গ্রন্থঃকুরআন হাদিস সঞ্চয়ন।

 

আরও পড়ুন