স্রষ্টা, কোরআন পুরুষতান্ত্রিক নয়

নারীমুক্তির পথ |৩|

সা জি দ

কলেজ থেকে ফেরার সময় জান্নাত শান্তিকে বলল,
—’আচ্ছা শান্তি! আমি কোরআন হাদীসের যে বিষয়গুলোর কথা বললাম সেগুলো তো কোরআনেরই আয়াত সেগুলো দিয়েই কিভাবে বিভ্রান্ত করতে পারে?’
—একটি প্রসিদ্ধ কথা আছে ‘অল্প বিদ্যা ভয়ঙ্কর।’
—যেমন!
—প্রথমত, শুধু তরজমাহ পড়ে অনেক কিছুই তুই বুঝতে পারবি না। তার সাথে তোকে ‘শানে নূযুল, তাফসির’ পড়া লাগবে। আর নয়তো তোকে বিভ্রান্ত করার জন্য কোরআনের এক আয়াতকেই যথেষ্ট করা যাবে। যেমন, ‘নারীরা তোমাদের শষ্যক্ষেত্র।’
—আচ্ছা তাহলে আমি যদি কোরআন বুঝতে চাই, তাহলে কোন তরজমাটা পড়লে ভালো হবে?
—তুই ‘মারেফুল কোরআন’ পড়তে পারিস।
—আচ্ছা অনুবাদক, সংগ্রাহক, বর্ণনাকারী, সিরাত রচনাকারী এগুলো সব পুরুষই কেন, নারীরা হতে পারে না?
—কেন নয়! সর্বোচ্চ হাদীস বর্ণনাকারীদের দ্বিতীয়জন হযরত আয়েশা রাদিআল্লাহু আনহা। তাছাড়া হাফসা রাদিআল্লাহু আনহা সহ আরো অনেক নারী সাহাবীরা হাদীস বর্ণনা করেছেন। সীরাত লিখেছেন অনেকেই।
—কিন্তু তাদের সংখ্যা তো খুবই সীমিত!
—দেখ! আমরা বিজ্ঞানের থিওরীগুলো পড়ি, যা আমাদের উপকার করে। ইউনিভার্সিটি অফ অক্সফোর্ড সেরা ১০জন বিজ্ঞানীর একটি লিস্ট তৈরি করেছে। তারা হলেন :-
স্যার আইজাক নিউটন, লুইস পাস্তুর, গ্যালিলিও, মেরি কুরি,আলবার্ট আইনস্টাইন, চার্লস ডারউইন, অটো হান, নিকোলা তেসলা, জেমস ক্লার্ক ম্যাক্সওয়েল, অ্যারিস্টটল। শুধুমাত্র মেরি কুরি ব্যতীত এই লিস্টে কোন নারী নেই। এজন্য কি তুই বলতে পারিস ‘তারা ভুল বর্ণনা করেছে?’
—না।
—তাহলে তারা পুরুষ হয়ে জ্ঞান অর্জন করেছে, বর্ণনা করেছে, এটাও তাদের কোন দোষ হতে পারে না।
—আচ্ছা দেখ! কোরআনে যখন আল্লাহর কথা বর্ণনা করা হয়েছে, তখন ‘আমি’র জায়গায় ‘আমরা’ বলা হয়েছে। আবার দেখা যাচ্ছে সেখানে ‘আমরা’ শব্দটা ব্যবহার হচ্ছে ‘পুরুষবাচক’ এটা কি স্রষ্টার পুরুষ হওয়ার প্রমাণ না?
—বলা হচ্ছে কোরআন নাজিল হয়েছে আরবি ভাষায়। অর্থাৎ আরবদের ভাষায়। সুতরাং ওই ভাষায়ই ব্যবহার হবে, যা যা এ্যারাবিয়ানরা ব্যবহার করে। না হলে তারা কোরআন বুঝতে সক্ষম হতো না। এখন দেখা যায়, এ্যারাবিয়ানরা যখন সম্মানিত কোন ব্যক্তি বিষয় কথা বলে তখন তারা ‘তুমি’র জায়গায় ‘তোমরা এবং ‘আমি’র জায়গায় ‘আমরা’ ব্যবহার করে। এবং সেটা ‘পুরুষবাচক’ করে। সুতরাং যেহেতু আরবি ভাষায় কোরআন নাজিল হয়েছে, তাই এরকমই নাজিল হয়েছে।

এখন বলবি তাহলে এরকম ভাষায় কেন কেরআন নাজিল হলো!
একটা ধর্মগ্রন্থের তো সে ভাষায়ই হওয়া উচিৎ যা যুগশ্রেষ্ঠ। আর তখনকার যুগে ভাষা সাহিত্যে সর্বোচ্চ এগিয়ে ছিলো আরবি ভাষা। কবি সাহিত্যকদের ছড়াছড়ি ছিলো তখন আরবে৷ তারা কবিতার আসর জমাতো। কবিতার শেষ অক্ষর থেকে শুরু করতো কবিতা। সুতরাং আরবি ভাষায় নাজিল হওয়াটা তখন সবচেয়ে উত্তম ছিলো।

আরেকটা বিষয় শোন! পুরুষের একবচন শব্দ হলো ‘রজুলুন’ অর্থ একজন পুরুষ। আর বহুবচন হলো ‘রিজালুন’ অর্থ তিন বা ততোধিক পুরুষ। আরবি লোগাত অনুযায়ী এই ‘রিজালুন’ পুরুষবাচক শব্দটি আরবি সাহিত্যে ‘স্ত্রীবাচক’ হয়ে ব্যবহৃত হয়। এখন তুই বল, এতে কি তারা নারী হয়ে গেল? হলো না।সে পুরুষই রইলো। ঠিক এমনই এখানে পুরুষবাচক শব্দ ব্যবহার হলেই তিনি পুরুষ হবেন, এটা প্রমাণ হয় না।
—সূরা জীনের ৪নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে ‘তিনি কোন স্ত্রী গ্রহণ করেননি, তার কোন সন্তানও নেই।’ এখানে তো বলা হলো না ‘তার কোন স্বামীও নেই’ এর দ্বারা কি বুঝা যায় না তিনি পুরুষই?
—হিন্দুধর্মানুযায়ী ভগবান শিব এবং পার্বতীর সন্তান হলো গনেশ। খৃষ্টধর্মানুযায়ী স্রষ্টা এবং মরয়মের সন্তান যিশুখ্রিস্ট। আল্লাহ তায়ালা এটাকে ভুল প্রমাণ করার জন্য বলেছেন ‘তিনি স্ত্রী গ্রহণ করেননি, এবং তার কোন সন্তানও নেই’ এটা দিয়ে বুঝানো হচ্ছে ‘হিন্দু, খ্রিস্টান ধর্মাবলম্বীরা যেই স্রষ্টাপুত্রের কথা বলে, এটা ভুল।’
—আচ্ছা তাহলে তুই বলছিস স্রষ্টার কোন লিঙ্গ নেই, তিনি হিজড়া?
—ধর! তুই একজন উদ্ভাবক তুই একটা জিনিস আবিষ্কার করলি। যেটা দেখতে বিড়ালের মতো। তাহলে কি বলা যাবে ‘তুই বিড়াল?’
—না।
—যিনি লিঙ্গের আবিষ্কারক, তার জন্য কেন লিঙ্গ লাগবে? আর যদি হিজড়ার কথা বলিস, তাহলে এটা তোর ভুল ধারণা, কারণ হিজড়ার লিঙ্গ আছে। তারা তৃতীয় লিঙ্গের অধিকারী। কিন্তু স্রষ্টার কোন লিঙ্গই নেই। সুতরাং কোরআনকে, স্রষ্টাকে পুরুষতান্ত্রীক বলা যায় না। এরকম আরো অনেককিছু জানতে পারবি, কোরআন শরিফ অধ্যায়ন করলে।

আগের পর্ব-নারীমুক্তির পথ |২|- বউ মানে দাসী আর আর পেটানো নয়

লেখকঃ কলামিস্ট ও সাহিত্যিক

আরও পড়ুন