বাতাসে দীর্ঘশ্বাস

নাজমা বেগম নাজু

গুলিবিদ্ধ এক যুবককে এনেছে টহলরত শান্তিরক্ষী মিলিটারি।গুলিটা সরাসরি বুকেই লেগেছে- অবস্হা সংকটাপন্ন। খবর পেয়েই সবাই ছুটে যাই বাংলাদেশ লেবেল টু হাসপাতালের ইমার্জেন্সি এন্ড ক্যাজুয়ালটিতে। বুকের ঠিক মাঝ বরাবর হৃদপিন্ড ফুটো করে পিঠের দিক দিয়ে বেরিয়ে গেছে গুলি।হাসপাতালে আনার আগেই মারা গেছে মারাত্মক আহত এই রোগি।ভাইটাল সাইন কোনটাই নেই, চোখের মনি সম্প্রসারিত, তার পরেও তাৎক্ষণিক সি পি আর ( cardio pulmonary resuscitation) স্টার্ট করা হয়। সে মৃতদেহ হয়ে গেছে অনেক আগেই–। মৃত নিশ্চিত জেনেও জীবন ফিরিয়ে আনার মরণপণ প্রচেষ্টা। বুকের ভেতরটা মোচড় দিয়ে উঠে। আমরা চিকিৎসকেরাই জেনেশুনে মিথ্যে আশায় বুক বেঁধে আছি, ওর কাছের মানুষ- আপনজনদের আর দোষ কোথায়?

জানতে পারি হতভাগ্য এই যুবক ছিলেন এক মটর বাইক ড্রাইভার। এটার মালিকও তিনিই।এই কাগাবান্দরো শহরেই ভাড়ায় যাত্রীসেবা দিতেন তিনি। সেদিনও তাই করছিলেন। পরিচিত এক বন্ধুজনকে তার গন্তব্যে পৌঁছাতে রাস্তায় নেমেছিলেন।মাঝপথে তাদের পথ রোধ করে দাঁড়ায় স্হানীয় আর্মড গ্রুপের সদস্যরা।কোন কথাবার্তা ছাড়াই খুন; কাছে থেকে সরাসরি তার বুকে গুলি করে।নিমেষেই ধুলোয় লুটিয়ে নিথর হয় তার প্রানময় দেহ।সশস্ত্র দৃর্বৃত্তরা তার বাইকটি ছিনিয়ে নিয়ে দ্রুত স্হান ত্যাগ করে।

ঘটনায় হতবাক হয়ে যায় সহযাত্রী বন্ধুটি তার। এদিকে গুলির শব্দ পেয়ে নিমেষকালীন সময়ের ব্যবধানেই পৌঁছে যায় জাতিসংঘের টহলরত শান্তিরক্ষীর ট্যাংক বহর। কিন্তু কার্যত তখন আর কিছুই করার ছিল না। তারা রক্তাক্ত বাইক চালকসহ সহযাত্রীকে উদ্ধার করে ব্যানমেডে নিয়ে আসে।কিছু করার ছিল না আমাদেরও।তারপরেও সিপি আর দিতে থাকি আর মিথ্যে আশায় চোখ রাখি মনিটরে।মিথ্যে আশায় ভর করা এই অসাধ্য সাধন প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ বিফলে যায়। মৃতেরা কখনোই ফেরে না। আমরাও ফেরাতে পারি না তাকে। প্রানময় এক তারুণ্য অল্প কিছু সময়ের ব্যবধানে নিথর মৃতদেহ হয়ে যায়।কি নির্মম নিষ্ঠুর এক জনগোষ্ঠীর মাঝে যে এসে পৌঁছেছি!

প্রায় প্রত্যেকেই চব্বিশ ঘন্টার প্রতি মূহুর্ত অস্ত্র উঁচিয়ে ঘুরবে এবং যখন যাকে খুশি নির্দ্ধিধায় গুলি করবে।কি যে মারাত্মক এক অপসংস্কৃতিকে প্রজম্ম থেকে প্রজম্মাম্তরে ধারণ করছে এরা। প্রপ্ত বয়স্ক পুরুষ মানেই অস্ত্রধারী।নিজেকে রক্ষার দায়িত্ব হতে শুরু করে সমস্ত আইন কানুন বিচারের দায়িত্ব, শাস্তি– মৃত্যুদন্ড নিজরাই নিজেদের হাতে তুলে নিয়েছে।যেন সরকার বা রাষ্ট্রের কিছুই করণীয় নেই এক্ষেত্রে।

ইমার্জেন্সী এন্ড ক্যাজুয়ালটি ডিপার্টমেন্ট ছেড়ে বাইরে এসে দাঁড়াই।বিষন্ন এক সন্ধ্যা আনত মুখে আঁধার ঘেরা রাতের অপেক্ষারত।হারিয়ে গেছে আলোময় দিনের যত চিহ্ন।আমি অনুসন্ধানী চোখ মেলে চারদিকে দেখি। কেউই নেই। না- ওরা কেউই কোথাও নেই। যারা এই ডেড বডিটা এনেছিল, আমাদের ব্যস্ততার ফাঁকে সবাই যেন কোথায় হাওয়া হয়ে গেছে।মাথায় আকাশ ভেঙ্গে পড়ে আমার। নাম পরিচয় ঠিকানা বিহীন এই মৃতদেহ নিয়ে এখন কি করব আমি।আমি অবাক হই ওদের সাথে সাথে জাতিসংঘের পুলিশও উধাও।অথচ এটা ওদেরই দায়িত্ব– এই ডেডবডি সেন্ট্রাল আফ্রিকার পুলিশের কাছে হস্তান্তর করা।

আমি জাতিসংঘ পুলিশের চিফকে টেলিফোন করি — কেন চলে গেছে তারা? এখন এই ডেডবডির দায়িত্ব কে নেবে? তিনি দুঃখ প্রকাশ করে বলেন– আমি দেখছি।ব্যানমেডে এসে প্রথমেই তিনি বলেন– রাতটা এখানেই থাক, আগামীকাল ভোরেই তাকে নেয়ার ব্যবস্হা করব।তার এই প্রস্তাব প্রস্তাব প্রত্যাখান করি আমি।জাতিসংঘের নিয়ম নীতির আওতায় এটা কোথাও বলা নেই। স্হানীয় পুলিশের কাছে এক্ষুনি হস্তাতর করবে এই ডেডবডি। পুলিশিই তার আত্মীয় স্বজনদের খুঁজে বের করবে।না পেলে কাগাবাম্দরো হাসপাতালের মরচুয়ারিতে রাখবে এই ডেড বডি।

পাশের শান্তিরক্ষী ইউনিট থেকে এসকর্ট এবং লাশবাহী গাড়ি চেয়ে রিং করি।লাশ কফিনে মোড়ানো হতে শুরু করে গাড়িতে তোলা পর্যন্ত পুরোটা সময় ব্যানমেড সদস্যদের নিয়ে সরাসরি তদারকি করি।গাড়ি ব্যানমেড চত্বরের প্রধান ফটক পেরোলে রুমে ফিরে আসি।আকাশ জোড়া কালো মেঘের সবটুকু ঝুম বৃষ্টির ফোঁটা হয়ে মাটিতে নেমে আসে।কিছু পরেই তার তালে তাল মিলায় ঝড়ো বাতাসও। বৃষ্টি নয় যেন বিরামহীন বৃষ্টির ফোঁটা আমার হৃদয় প্রাঙ্গণ প্লবিত করে। বাতাস যেন ব্যর্থ আমার অসহায় মনের অস্হির আকুলতায় ।( চলবে)।

আগের পর্ব- বরিষ ধরা মাঝে শান্তির বাণী

লেখকঃ সাহিত্যিক ও জাতিসংঘের প্রথম কন্টিনজেন্ট নারী কমান্ডার

আরও পড়ুন

উত্তর দিন

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রচার করা হবে না.