ঘু+বিষ=?

আব্দুল জব্বার
জামিল সাহেবের সংসারটা ভালোই চলছিল। স্বল্প বেতনের চাকুরিতেই সংসারের সকল চাহিদা পূরণ হতো। চাল, ডাল, নুন, মরিচ, আলু, আটা এমন কি বউয়ের শাড়ি -চুড়ি, কসমেটিকস, নিজের এবং স্ত্রীর পোশাক কিংবা শখ আহলাদের সকল কিছুই কমবেশি পূরণ হতো- বেশ অনায়েসেই।
একটি ছেলে একটি মেয়ে নিয়ে সুখী পরিবার। ছেলে মেয়েরা বড় হতে লাগলো, সাথে সংসার খরচটাও পাল্লা দিতে থাকল সমানভাবে, কিন্ত আয়ের গতিটা সেই পরে রইল একই স্হানে।
স্ত্রী -পুত্র -কন্যা সবাই সংসারের কর্তার ওপর খুবই অসন্তুষ্ট হতে থাকে। মাঝে মাঝেই আগুন জ্বলে ওঠে কারণে কিংবা অকারণে।

স্ত্রীর অভিযোগ- “এভাবে সংসার চালানো যায় না। পাশের ফ্লাটের মালেক ভাই, সামান্য একটা পদে চাকুরী করে টিভি. ফ্রিজ.এসি…., দামী দামী শাড়ি-চুড়ি অলংকার নিত্য নিত্য বানায়, দৈনিক পোলাও মাংশ খায়, অথচ তুমি একজন অফিসার হয়েও -থাকতো পরে বিলাসিতা, থাকতো পরে পোলাও মাংশ, ডাল -ভাতই জোটে না , আবার …..। আমি আর তোমার এই ভাঙ্গা মচকা সংসারে থাকতে চাই না।
” ভাঙ্গা সংসারে পড়ে আছো কেন, যাও! যেখানে খুশী চলে যাও -ঠেকাচ্ছে কে? ”
” আজ বিশ বছর ধরে পড়ে আছি তোমার সংসারে … কী দিয়েছ আমায়?
-অনেক কিছুই দিয়েছি .. ছেলে দিয়েছি, মেয়ে দিয়েছি …হা.হা.হা…..
“হেয়ালি রাখো তো। ”

স্ত্রীর কন্ঠে ধমকের স্বরে দাবীর কথা প্রকাশ পায়, আবার বলে -“আগে তুমি বলো, এখন থেকে আমার কথা রাখবে? ”

ছোট্ট ছেলের বায়না -“আব্বু আমাকে নতুন মডেলের স্কিন টাচ্ দামী মোবাইল ফোন কিনে দিতে হবে……। ”
মেয়ের দাবি -‘আমাকে একটা ল্যাপটপ কিনে দাও…..।”
ছেলে, মেয়ে, আর স্ত্রীর দাও আর দাও আবদার। জামিল সাহেব বিরক্ত হয়ে এবার বলেন -‘আমাকে কী করতে হবে? ”
স্ত্রীর সোজাসাপটা জবাব -‘ মালেক ভাইয়ের মতো…….!”
-“ঘুষ খেতে হবে, অবৈধ ভাবে টাকা উপার্জন করতে হবে, এই তো! ”
স্ত্রী রাজিয়া, উৎফুল্ল মুডে জবাব দেয় -“এইতো সাহেব, পথে এসেছো! ”

জামিল সাহেব আর কতদিন নিজেকে নিজের মতো করে রাখবে? যে সংসারে চারজন সদস্যের মধ্যে তিন জনই তার বিপক্ষে, সেখানে একা নীতিবান হয়ে সংসারে অশান্তি জিইয়ে রেখে লাভ কী! তাইতো সিদ্ধান্ত নেয় ‘ঘুষ ‘ এখন থেকে খাবে।পরকাল? তখন যা হয় তাই হবে। তাইতো দৃঢ়তার সাথে বলে – ‘ঠিক আছে, আজ থেকে তোমাদের কথাই থাকবে! ”
এ কথা শোনা মাত্রই আনন্দের বন্যা বয়ে যেতে থাকে।
জামিল সাহেব যেদিন থেকে বিবেকটাকে জলাঞ্জলি দিয়েছেন, সেদিন থেকেই সংসারের চাকা উল্টো দিকে গড়িয়ে চলছে।
প্রতিদিন নিত্যনতুন খাওয়ার আইটেম, চলাফেরার স্টাইল, পোশাক পরিচ্ছেদ, বেশভূষা ইত্যাদি সবকিছুতেই একটা বিরাট চেন্জ এসেছে।শুধুমাত্র জামিল সাহেব হয়ে গেছেন যন্ত্রমানব! কথা নেই, গতি নেই, উদ্দাম নেই -নেই সেই আগের মতো দাপট। এখন তার গতি রিমুটের অপেক্ষায় …

এভাবে কিছুদিন চলতে থাকে। একদিন টয়লেটে লক্ষ্য করলেন, পায়খানার প্যানের মধ্যে সাদা সাদা কাগজের বান্ডেলের মতো দেখা যাচ্ছে! আরো একটু বেশি পানি ঢেলে দিলেন। একি! টাকা! পাঁচশো টাকা আর হাজার টাকার নোট! কিন্ত এখানে এতো টাকা আসবে কেন! স্বপ্ন দেখছে না তো?

জামিল সাহেব নিজের হাতের ওপর দাঁত দিয়ে কামুড় দিয়ে পরখ করলো। ইস্, কৈ স্বপ্ন নয় সত্যি! তাহলে …
উচ্চস্বরে স্ত্রীকে ডাকতে থাকে -কৈ গো, এদিকে একটু এসো তো?
স্ত্রী বিরক্ত ভরে চেঁচামেচি করতে করতে আসে – কৈ, কোথায় তুমি? কী হয়েছে?
টয়লেটের ভিতর থেকে জামিল সাহেব বলেন -এই তো এখানে।
-আরে, টয়লেটের মধ্যে মানে, কী হয়েছে তোমার!
-একটা কিছু তো হয়েছেই।
-সব সময় তোমার শুধুই হেয়ালি, আমি গেলাম।
-না না, যেও না! একটা অদ্ভূত জিনিস দেখবে, এসো!

জামিল সাহেব টয়লেটের দরজাটা খুলে -এখানে এসো, দেখবে…
-আমি, আমি টয়লেটে ….
জামিল সাহেব স্ত্রীকে একপ্রকার জোর করেই হাতখানা ধরে টেনে ভীতরে নিয়ে দেখায় -এই দেখো।
– একি! প্যানের মধ্যে এতো টাকা!
– নাও, নিয়ে নাও। তোমার না কাড়ি কাড়ি টাকার দরকার? নিয়ে নাও।
স্ত্রী, স্বামীর মুখের দিকে তাকায় – নেবো?
-হুম, নাও।
-তাই বলে পায়খানার মধ্যে থেকে….
— যাদের টাকার বেশি লোভ, তাদের আবার পায়খানা, নোংরা -ময়লাতে কী এসে যায়? নিয়ে নাও।

স্ত্রী চোখ বন্দ করে বাম হাতটা প্যানের মধ্যে ঢুকিয়ে দেয়। একি! টাকার বান্ডেলগুলো আসছে না কেন!

এবার টাকার লোভে ডান হাতটাও কাজে লাগায়। সত্যিকারের মতো এবার কয়েক বান্ডিল নোট হস্তগত হলো। কিন্তু হাতে, মুখে, গায়ে গতরে ওই ঘুষের টাকায় কেনা দামী খাবারের পচনশীল বর্য্যগুলো লেগে গেলো, এই আর কি!

জামিল সাহেবের স্ত্রী খুব ভালো করে কল ছেড়ে ধুয়ে নিয়ে, তাড়াতাড়ি ছাঁদে চলে গেলেন। ভেজা নোট গুলো শুকিয়ে নীচে নেমে এলেন। তারপর রুমে গিয়ে বিছানায় ছড়িয়ে দেন। তারপর একটা নোট হাতে নিয়ে নাকের কাছে নিয়ে টাকার গন্ধ শুকতে গিয়েই দুর্গন্ধে বমি করার উপক্রম হয়।

কিছুক্ষণ চিন্তা করে, তারপর দ্রুত বিছানা থেকে গিয়ে পারফিউমের ক্যানটা নিয়ে এসে স্প্রে করে দেয় টাকার ওপর।

জামিল সাহেব, ঘরে প্রবেশ করতেই স্ত্রী জিজ্ঞেস করে -আচ্ছা, সত্যিই কি তোমার পেট থেকে টাকা বের হলো, নাকি আমাকে ঠকানোর জন্য ঘুষের টাকা নিয়ে এসে…..?
-আরে নারে, আমি সত্যিই বলছি -ওটা পায়খানার সঙ্গেই ….
-চুপ চুপ! আস্তে বলো -কেউ শুনতে পারে!

এর পর থেকে জামিল সাহেব ঘুষের টাকায় বাজার সদাই কিনে খায় আর প্রতিদিন একবার করে টাকার বান্ডিল বের করেন!

স্ত্রী খুশীতে আটখানা হয়ে টয়লেটের পাশে দাড়িয়ে থাকেন বান্ডিলের অপেক্ষায়। আর জামিল সাহেব কষ্ট করেন…..

এভাবে ঘুষ খান আর বান্ডিলের ডিম পারেন -জামিল সাহেব!

একদিন হঠাৎ ব্যাতিক্রম একটা ঘটনা ঘটে গেলো। ঘুষের টাকা দিয়ে বাজার থেকে আনা বড় বড় শিং মাছ রান্না করে রাত্রে খান। সকালে টয়লেট করার সময় লক্ষ্য করেন –পশ্চাৎ দিকে কি যেন পিচ্ছিল এবং নড়াচড়া করছে। একটুখানি লক্ষ্য করতেই এক চিৎকার!

স্ত্রী দ্রুত বেগে টয়লেটের কাছে পৌছায়। ভীতরে কান্নাকাটি চলছেই।
-কী হলো, আজ এতো কষ্ট হচ্ছে কেন! তবে কী বান্ডিলের পরিমাণ বেশি হয়েছে?
– সর্বনাশ হয়ে গেছে! আমাকে বাচাও, আমি মরে গেলাম!

স্ত্রী, স্বামীর অবস্থা বেগতিক থেকে প্লাস্টিকের দরজাটার ছিটকিনি ভেঙ্গে ভিতরে ঢোকে।
জামিল সাহেবের জায়গা মতো শিংমাছের দুটো কাঁটা ফুটে মাছটা ঝুলতে থাকে।

কাল বিলম্ব না করে, সোজা এ্যাম্বুলেন্সে করে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়।

অপারেশনটা ভালো করেই করা হলো কিন্ত জামিল সাহেব জ্ঞান ফিরে একটাই বুলি আউরে চলেছে –
আর ঘুষ নেবো না
ঘুষেরটাকা খাবো না ……….!
জামিল সাহেব এভাবেই মাথা নষ্ট হয়ে ‘পাবনা মেন্টাল হাসপাতালে স্হায়ী রোগী হয়ে যান।

লেখকঃ সাহিত্যিক ও শিক্ষক

 

আরও পড়ুন

উত্তর দিন

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রচার করা হবে না.