অশ্রু

নাসিমা খান

যৌবনের গলি পথে মুখ তুলে তাকিয়েছিলাম মাত্র ।চৌদ্দ বছরের আধ ফোঁটা ফুলটা বিশাল এক হেসেলে এনে উঠালেন আতিক সাহেব ।আমি সদ্য ফোঁটা এক শিউলীবালা, ভীতরে একেবারেই অপরিপক্ক, বাইরের পক্কতা শুধু বাড়ন্ত রক্ত মাংশ মাত্র,সে না বোঝে উঁকি ঝুকি, না বোঝে চলন-বলন ।
আতিক সাহেব বিপত্নীক ।তার সংসারে ছিল প্রথম স্ত্রীর তিন পুত্র এবং বিধবা ভাবী ও তার দুই সন্তান ।ছোট্টবেলা থেকে মেয়েরা শুনে আসে-তুই বউ হবি, জোয়ান তাজা একজন স্বামী হবে, লাল টুকটুকে শাড়ী পড়ে স্বামীর বাড়ী যাবি, খুব মজা হবে ।সবই হোল, কিন্তু বউ হতে পারলাম না ,স্বামীর বাড়ী গেলাম কিন্তু স্বামী পেলাম না ।স্বামীর বুকের চওড়া ছাতির নীচে নিজেকে সমর্পণ করতে পারলাম না, না ঘর, না ঘরণী ।এ জ্বালা মুখ ফুঁটে না বলতে পারার দুঃখ আমাকে জ্বলন্ত উনুনের কাঠখড়ের মত অনাবরত ভস্ম করে নিঃশ্ব করলো , চোখের পানিতে তার দাম দিলাম জীবন ভরে ।
বাসর রাতে তিনি বললেন,-বড় ভাবী মুরুব্বী, তাকে মান্য করবে । সন্তানদের দেখা শুনা করবে ।আমার দিকে না তাকালেও চলবে ।
আমি সভয়ে বললাম,-মা বলে দিয়েছেন স্বামীর সেবা যত্ন করতে ।তিনি বিদ্রুপাত্মক হাসি হাসলেন । আমি যত বড় নির্বোধ হই না কেন, তার সে হাসির অর্থ যে আমার প্রতি উপেক্ষা প্রকাশ পেয়েছে এ টুকু ভালো করেই বুঝেছিলাম সেদিন ।
উনি ঠোঁটে বক্র হাসি তুলে বললেন-উনার কথা উনি বলেছেন, এখানে আমি যা বলবো, তাই করবে ।

আতিক সাহেব লম্বা চওড়া দীর্ঘ দেহী ।দেখতে সুন্দর । উনার উপযুক্ত ছিলাম না । না বয়সে ,না চেহারেতে ।উপযুক্ত ছিলেন তার বিধবা ভাবী ।যেমন সুশ্রী,তেমনি মেধাবী । আতিকের কোট পরিয়ে দেওয়া, তার চা করা,রাতে ডাইনিং এ খাবার নিয়ে বসে থাকা, মিষ্টি গলায় গুণ গুণ করে গান গাওয়া, হাসির তোড়ে দেবরের গায়ে আছড়ে পড়া, এগুলো ছিল ওদের দুজনের প্রতিদিনের রুটিন ।
গভীর রাতে আতিক আমার ঘরে ঢুকতেন । নেশা গ্রস্থ মানুষের মতো আমাকে বুকের কাছে টেনে নিয়ে বলতেন,-আমার সোনা বউ, লক্ষীবৌ, অনেক সুখ দেব তোমাকে ।
সুখের আশায় নয়, একটু খানি ভালোবাসার আশায় তার পথ চেয়ে বসে থাকতাম । তার স্পর্শ পাওয়ার লোভ ছিলো খুব ।দেহ, মন দুই সত্তার তাড়নায় আমি তিন কন্যার জননী হয়ে গেলাম , পাঁচ বছরের ভেতরে ।আতিক একদিন বললেন,

-আমি আবার বিয়ে করতে চাই ।
আমার বয়স তখন বিশ পেরিয়েছে ।বুকের অনেক কথা তখন মুখে এসে উঠেছে ।বললাম,

-আমি তো আপনার কোন ব্যাপারে হস্তক্ষেপ করি না । কিন্তু এবার করবো । আপনি বিয়ে করতে পারবেন না ।
-সেলিনা তো অন্তঃসত্ত্বা হয়ে গেছে ।

আতিক বললেন ।বিধবা ভাবীর নাম সেলিনা ।
তার অন্তঃসত্ত্বার খবর আমাকে বিচলিত করলো না ।বিয়ের দিন থেকেই তো দেখলাম, ওই ভাবীর সাথে তিনি সময় কাটান ।সমাজে স্বীকৃত সতীন নয় । কিন্তু আমার ভিতরে-বাইরে , সব খানে সে সতীন থেকেও বেশি হুল ফুঁটিয়ে আসছিলো ।বেদনার্ত হৃদয়টা এক ধরনের প্রতিশোধের আশায় উদগ্রীব ছিল ।আজ তা পরিপূর্ণতায় রুপ নিলো ।মন পাখিটা হিংস্র পশু শিকার সামনে নিয়ে যেমন আনন্দে লাফালাফি করে তেমনি আনন্দে মত্ত হয়ে উঠলো ।
আতিক আমার স্বাভাবিক, শান্ত মুখটা দেখে বললেন,

-ওর কি হবে ?
বললাম,

-কত ওষূধ পত্র আছে নষ্ট করে ফেলেন ।
-নষ্ট করবো ?
-হ্যা, তাই ।
আতিক আমার ভেতর কি দেখেছিলেন জানি না । পরদিন ভাবীকে নিয়ে ডাক্তারের কাছে গেলেন ।পরাজিত ভাবীর দিকে তাকানো যাচ্ছিলো না ।
ঘরে ফিরে এসে সেলিনা ভাবীর হাসি ছিলো না, তার গুন গুন গান, উছলে ওঠা চঞ্চলতা সব গেল থেমে ।গুমরে গুমরে কাঁদতেন তিনি । খেতে দিতে গেলে ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে থাকতেন ।অল্পদিনেই বিছানা নিলেন ।মৃত্যুর আগে আমাকে ডেকে নিয়ে বললেন,-আমাকে বাঁচতে দিলি না মুখপুড়ি ।তোরও সুখ হবে না । ভাবীর মৃত্যুর পর আতিক আমার সঙ্গে কথা বন্ধ করলেন । মেয়েরা বড় হলো ।বড় দু’জনের বিয়েও দিলেন ।তবুও তার এই দীর্ঘ জীবনে আমার সাথে আর কোন সম্পর্ক রাখলেন না ।

ছোট মেয়েটা মেধাবী ছিল । ওকে আতিক সাহেব খুব পছন্দ করতেন ।ফারহানা আমারও খুব আদরের ছিলো ।ফারহানার মাধ্যমে আমাদের ভিতর সাংসারিক কথাবার্তা লেনদেন হতো ।ফারহানা আমার বেদনা বুঝতো ।লুকিয়ে লুকিয়ে আমি যখন কাঁদতাম তখন ফারহানা আড়াল থেকে দেখতো ।আমার মাথায় বিলি কেটে দিতো ।গা টিপে দিতো ।মুখে ভাত উঠিয়ে খাওয়াতো ।আমার সকল জ্বালার মাঝে সুখের ঝড়ো বাতাস ছিল ফারহানা ।
হঠাৎ করে আতিক সাহেব অসুস্থ হয়ে পড়লেন ।ফারহানার এম কম পরীক্ষা চলছিলো ।আমি রাগে যন্ত্রনায় আতিক সাহেবের কাছে যেতাম না । ওনার প্রথম পক্ষের ছেলেরা ওনাকে খান এ সবুর রোডের বাড়িতে নিয়ে গেল । আতিককে আহসান আহম্মেদ রোডের এই বাড়ী থেকে নিয়ে যাওয়াতে ফারহানাও নীরব হয়ে গেল । দু’তিন মাস অসুস্থ থাকার পর একদিন আতিক মারা গেলেন ।
তার মৃত্যুর পর জানতে পারলাম, আতিক তার স্থাবর-অস্থাবর সমস্ত সম্পত্তি তার প্রথম পক্ষের সন্তান এবং ভাবীর সন্তানদের নামে লিখে দিয়ে গেছেন ।দু’টো পাঁচতলা বাড়ী,একটা সিলভার ফ্যাক্টরী ও একটা চামড়ার দোকান । এছাড়া পঞ্চাশটি রিকশা, দু’টো প্রাইভেট কার, একটি ট্রাক সবই ওদের নামে ।
ওরা জানালো ফারহানার বিয়ে এবং মায়ের ভরণ-পোষোণের দায়িত্ব তারা পালন করবে ।ফারহানা প্রতিবাদ করলো না, অভিমানী মা আমার একটা ইংরেজি মিডিয়াম স্কুলে পড়ানোর কাজ নিলো ।সৎ ভাইয়েরা তার বিয়ের জন্য পিড়াপিড়ি করাতে আমাকে নিয়ে একটি ভাড়া বাসাতে উঠে এলো ।আমার কানে কানে বললো ,-তোমার সব অশ্রু আমি মুছে দেব, মা ।

ফারহানা আমার অশ্রু মুছতে পারিনি ।এম কম এর রেজাল্ট জানতে আযম খান কমার্স কলেজের সিঁড়ি দিয়ে নামবার সময়, হঠাৎই পড়ে গেলো ।বাসায় ধরা ধরি করে আনা হল । ও আর ভালো হল না। ধীরে ধীরে ওর বাম পাশ অবোশ হয়ে শুকিয়ে যেতে লাগলো ।
সতিনের ছেলেরা ওকে ভেলরও নিয়ে গেল ।কিছুতেই আর কিছু হলো না ।ফারহানা চলে যাবার সময় বলে গেলো,-মা গো তোমার চোখের পানি, মুছাতে পারলাম না ।এখন সেলিনা ভাবীর কথা মনে পড়ে ।তার কথায় সত্যি হলো ।আমার সুখ হলো না ।
কিন্তু আমার দোষটা কি ছিলো?

লেখকঃ কবি ও সাহিত্যিক

আরও পড়ুন

উত্তর দিন

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রচার করা হবে না.