পোকা-মাকড়

দয়াময় পাল

মাকড়। সাঁওতাল ছেলে। যেদিন প্রথম দেখেছিলাম সেটা ছিল শীতকাল। কনকনে ঠান্ডাতেও আধ ল্যাংটা। গায়ে জামা নেই। ছেঁড়া হাফ প্যান্টটা কোমরে সুতলি দড়ি দিয়ে কোনও রকমে বাঁধা। গায়ের রং যেমন কালো, ততোধিক কালো মাকড়ের দুটো চোখ। মুখ তেমন গম্ভীর। আমিও গম্ভীর মুখে শুধোলাম, অ্যাই তোর নাম কী রে? মাকড় উত্তর দিল— মাকড়। নামের পর পদবি জানতে চাইব কী, মাকড় শুনে কেন জানি না খুব হাসতে শুরু করলাম। তাতে মাকড় রেগে গিয়ে আমাকে বলল, তুই পোকা বটে। তুহার নাম পোকা। তারপরই অবশ্য ফিচেল হেসে বলল— মাকড়ের বন্ধু পোকা। পোকা-মাকড়। সেই দিনই বন্ধুত্ব হল।

মাকড় সাঁওতাল হলেও স্পষ্ট বাংলা বলতে পারে। কিন্তু হরফ চিনত অলচিকি। মানে বাংলা বলতে পারলেও অক্ষর জানা ছিল না। সাঁওতালি পড়তে পারে। পরের দিন মাকড়ের জন্য গাছ থেকে ক’টা পাকা বকুল ফল পাড়লাম। সেগুলো পকেটে পুরে গুটি গুটি মাঠে গেলাম। যেখানে ওর মা ধান কাটে। আজও খালি গায়ে আধ ল্যাংটা। জমির আলে বসে এক মনে মাটি খুঁড়ছিল। যেন ওই অকাজের জন্যই কেউ ওকে নিয়োগ করেছে। আমাকে দেখেই দৌড়ে এল। বকুল ফল দিতে খুব খুশি। বলল— পোকা তুকে কী দিব? কিছুক্ষণ ভেবে বলল— আজ আমার ভাগের পান্তা, পেঁয়াজ, লঙ্কাটা তুই খেয়ে লে। আমি বড় অবাক হলাম। ওর সারা দিনের খাবারটুকু আমাকে দিচ্ছে বলে নয়। এইটুকু বয়সে কাঁচা লঙ্কা খায় শুনে। বলেও ফেললাম। মাকড় বলল— খেতে তো হবেক। জিভটা না জ্বললে ভাত খাব ক্যামনে? তখন বুঝিনি, এখন বুঝি, তরকারি না থাকলে শুধু ভাত খেতে কাঁচা লঙ্কা লাগে বৈকি। যাই হোক ওর মায়ের কাছে নিয়ে গিয়ে বলল— মা দ্যাখ ই আমার বন্ধু পোকা। সেদিন ওদের ভাগ থেকে একটু পান্তা খেলাম। আজ মাকড়ের মুখ গম্ভীর না। বিভুঁয়ে এসে বন্ধু পোকাকে পেয়ে বেশ খুশি। কালো চোখ দুটো যেন আরও চকচক করছে।

আমি মাকড়কে বললাম— তোদের বাড়ি কোথায়?
ও বলল— দুমকা।
কিন্তু এখানে কোথায় থাকিস?
— চল ইখানে আমাদের বাসায় লিয়ে যাই। বাসায় আমার গুলতি আছে বটেক। তুকে দিখাব। চল…
দু’জনে আল পথ ধরে হাঁটতে শুরু করলাম।
—আচ্ছা মাকড়, আমি তো সাঁওতালি বলতে পারি না। তুই বাংলা বলিস কী করে?
— তু কি আমার দ্যাশে গেছিস?
— না, যাইনি…
— তাহলে তু পারবিক লাই।
— দেশ তো একটাই। ভারত। দেশের মধ্যে আবার দেশ! তা তোদের দেশ কেমন রে?
— ও তো রুখা দ্যাশ। চাষ নাই। ইর লেগে মেয়ে-মরদ সব তুদের দ্যাশে আসে।
— তাহলে তোদের দেশে গাছ নেই?
— গাছ থাকবেক লাই ক্যানে রে। তু বুকা আছিস বটেক… গাছ আছে, চাষ লাই…
এ আবার কেমন দেশ। গাছ আছে অথচ চাষ নেই! মাথায় ঢুকছে না। পায়ে পায়ে হাঁটি আর কল্পনার জাল বুনি। হঠাৎ মাকড় চেঁচিয়ে বলল, উ দ্যাখ। চালকলটার পাশে আম গাছটার নীচে খড়ের ছাউনিটা আমাদের বাসা। দূর থেকে দেখে ছোটখাটো খড়ের পালুই মনে হল। কাছে গিয়ে দেখলাম, মাকড়দের বাসাটাকে কুঁড়ে ঘরও বলা যাবে না। দু’দিক থেকে বাঁশ দিয়ে তাঁবুর মতো করা হয়েছে। তাঁবুতে পলিথিন থাকে। এখানে ছাউনি হিসেবে রয়েছে খড়। আর নীচে মাটির উপর মোটা করে খড় পাতা। ওটাই ওদের বিছানা। ওদের বাসায় ছাউনির গায়ে ছোট্ট একটা ফাঁক রয়েছে। এক রকম হাঁটু মুড়ে ভিতরে ঢুকতে হয়। আমরা ছোট মানুষ হওয়ায় কিছুটা হেঁট হয়েই ভিতরে ঢুকলাম। অন্ধকার। জানলা বলতে কিছু নেই। তবে এই শীতের দিনেও বেশ গরম। আমি কিছু দেখতে না পেলেও মাকড় যেন ভিতরের সব জিনিস দেখতে পাচ্ছে। এক কোণ থেকে হাতে কিছু একটা নিয়ে বলল, পোকা ইদিকে আয়। ওর সঙ্গে বেরিয়ে এলাম বাসার বাইরে। দেখি, ওর হাতে গুলতি। আমি বললাম, আমাকে গুলতি চালানো শিখিয়ে দিবি? শুনে তো মাকড় হেসে প্রায় লুটিয়ে পড়ল। হাসি সামলে দেখাতে শুরু করল কী ভাবে গুলতি ধরতে হয়। ছোট্ট গোল পাথর দিয়ে কী ভাবে নিশানা ঠিক করতে হয়। ওর কথা মতো কয়েকবার চেষ্টার পর আমি নিশানা করতে না পারলেও গুলতি ধরা শিখলাম। হঠাৎ মাকড় বলে বসল— তুকে গুলতি শিখালাম। তু আমাকে লিখাপড়া শেখা। মনে মনে ভাবছি, এ আবার কেমন কথা। আমরা তো স্কুলেই যেতে চাই না। মাকড়কে বোঝাতে শুরু করলাম। পড়াশোনা কতটা কষ্টের। পড়া মুখস্থ না হলেই মারধর জোটে। বাবা-মা জোর না করলে আমি ইস্কুলে যেতাম না। আমারও ইচ্ছে করে সারাদিন তোর মতো খেলতে…
মাকড় বলল ওদের গাঁয়ে স্কুল নেই। তাই ছেলেদের পড়াশোনাও নেই। মাঝে মধ্যে মিশনের লোকেরা এসে খেতে দেওয়ার কথা বলে দু’এক জন ছেলেকে নিয়ে যায়। শুনেছে নিয়ে গিয়ে তাদের লেখাপড়া শেখায়। মাকড়ও চলে যেতে চায়। কিন্তু মায়ের জন্য মন কেমন করে। তাই যেতে পারে না। তবে অনেক বুঝিয়েও ব্যর্থ হলাম। ও পড়াশোনা করবেই।

উত্তুরে হাওয়া বইতে শুরু করলে ঘুড়ি ওড়ানোর জন্য মন কেমন করে। গত বছরের কেনা আধ ভাঙা লাটাইটা আছে। তবে সুতো ইঁদুরে কেটে দিয়েছে। অবশ্য ইঁদুরে না কাটলেও আগের বছরের সুতোয় ঘুড়ি ওড়ানো যায় না। ভাঙা লাটাই নিয়ে গেলাম মাকড়ের কাছে। মাকড়ের ঘুড়ি নেই, লাটাই নেই। কখনও ঘুড়িও ওড়ায়নি। লাটাই দেখে খুব উৎসাহী। কাঁচা কঞ্চি কেটে সেটাকে ছিলে লাটাইটাকে কোনও রকমে ব্যবহারযোগ্য করল মাকড়। তারপর পুরোনো খবরের কাগজ কেটে ঘুড়ি বানালাম আমরা। মায়ের সেলাই বাক্স থেকে এক রিল সুতোও চুরি করে আনলাম। তখন অধিকাংশ জমিতে ধান কাটা হয়ে গেছে। ফাঁকা মাঠে ঘুড়ি ওড়াতে গেলাম। আমি লাটাই ধরে দাঁড়িয়ে। মাকড় সুতোতে টান দিয়ে ঘুড়ি নিয়ে দৌড়ল ঢালাই দিতে। তখন আমাদের জুতো পরার বালাই নেই। এবড়ো খেবড়ো জমিতে দৌড়তে গিয়ে মাকড়ের পা কাটল। শুরুতেই বিপত্তি। রক্ত বেরোচ্ছে। আমি দু’হাত দিয়ে চেপে ধরলাম। রক্ত বন্ধ হচ্ছে না দেখে এক দৌড়ে কালো আঞ্জা গাছ কয়েকটা ছিঁড়ে নিয়ে এসে তার রস লাগিয়ে দিলাম। আস্তে আস্তে রক্ত বন্ধ হল।

ধান কাটা একরকম শেষ। মাঠ ফাঁকা। ধান ঝাড়াইয়ের পর গোলায় তুলেছে চাষি। আজ মাঠে মাকড় আসেনি। মনটা খারাপ হল। হাঁটতে হাঁটতে গেলাম সেই আম গাছের নীচে ওদের বাসায়। না, এখানেও নেই। এ বার গেলাম ওদের মুনিবের (জমির মালিক) বাড়ি। সেখানে তখন হিসেব নিকেশ চলছে। মুনিষ বিদাইয়ের পালা। গোবর দিয়ে নিকানো উঠোনে সার দিয়ে বসে মুনিষরা। আর একটা মোড়ায় পায়ের উপর পা তুলে বসে মুনিব। খাতা দেখে একে একে নাম ডাকছেন আর এক এক মুনিষ এগিয়ে গিয়ে পাওনা চাল আর টাকা বুঝে নিচ্ছেন। মাকড়ের মা উঠোনে বসে। পাশে মায়ের গায়ে হেলান দিয়ে বসে মাকড়। খড় জাতীয় কিছু একটা চিবাচ্ছে। আমি ডাকতেই লাফিয়ে উঠল। বলল, তুহার সঙে আর খেলা হবেক লাই। মাঠে কাজ লাই। মুনিব টেকা দিয়ে দিছে। কালই চলে যাবক। মা বলেচে আমিও পড়ালিকা করব। আমি কোনও কথা বলতে পারিনি। দৌড়ে বাড়ি এসেছিলাম। ব্যাগ থেকে পেন্সিলটা নিয়ে আবার দৌড়। মাকড়ের মুনিবের বাড়িতে গিয়ে ওকে দিয়েছিলাম পেন্সিলটা। কোনও কথা বলিনি। আবার দৌড়ে বাড়ি ফিরে সেদিন কেঁদেছি। আর দেখা হয়নি। মাকড় হয়তো লেখাপড়া করে বড় হয়েছে। অনেক বড়।

৩০ বছর হয়ে গেছে। মাকড়ের কথা আর মনে পড়ে না। আমি কিছুটা পড়াশোনা করে কলকাতা শহরে ছোটখাটো একটা চাকরি নিয়ে গ্রাম ছেড়ে চলে এসেছি। আর পাঁচটা বাঙালির মতো নিজের উন্নতি, নিজের পরিবার নিয়ে ভাবছি। সোমবার, সপ্তাহের প্রথম দিন। খাওয়া দাওয়া সেরে অফিস যাচ্ছি। শিয়ালদহ ফ্লাইওভারে বাস দাঁড়িয়ে দীর্ঘক্ষণ। অফিসে দেরি করে ঢুকলে মাইনে কাটবে, সঙ্গে বসের মুখ ঝামটা। বাস থেকে নেমে দু’এক জনকে জিজ্ঞাসা করলাম, কী হয়েছে? যেটুকু জানলাম তা হল, পুরুলিয়ার সাঁওতাল পরগনার লোকেরা নিজেদের দাবিতে আন্দোলনে নেমেছিল। পুলিশ সেই আন্দোলনে লাঠি চালিয়েছে। তারই প্রতিবাদে কলকাতায় এসেছে মিছিল করতে। মনে মনে ভাবলাম, শালা যেখানে যা হবে সব কলকাতায় এসে জুটবে। নাহ, কোনও বাস নড়ছে না। হাঁটা শুরু করলাম। গলদঘর্ম হয়ে অফিসে পৌঁছতেই বসের ঝাড়। মেজাজটা খিঁচড়ে গেল। কোনও রকমে কাজ সেরে ভাড়া ঘরে ফিরলাম। হাত-মুখ ধুয়ে ৬ ফুট বাই ৪ ফুটের তক্তাটায় বসলাম। একে বসের বকুনি, তার উপর দেরির জন্য হাফ বেলার টাকা কাটবে। সব হল শালা ওই সাঁওতালগুলোর জন্য। যাক গে যা হবার হয়েছে।
টিভি খুলে দু-একটা চ্যানেল ঘুরিয়ে খবর দেখতে বসলাম। ব্রেকিং নিউজ। সাঁওতাল আন্দোলনকারীদের উপর পুলিশি লাঠিচার্জের প্রতিবাদে এ বছর সরকারের দেওয়া শান্তি পুরস্কার ফিরিয়ে দিলেন মাকড় মুর্মু। মাকড় নামটা এক ঝটকায় ফিরিয়ে দিল সেই ছোটবেলার গ্রামের দিনগুলোতে। এ কি সেই মাকড়? মাকড় কি মুর্মু ছিল? পদবিটা তো জানা হয়নি তখন! অ্যাঙ্কর একটানা বলে চলেছেন। জানতে পারলাম, মাকড় পড়াশোনা করে বড় চাকরির অফার ফিরিয়ে ঝাড়খণ্ড লাগোয়া পুরুলিয়ার একটা গ্রামে স্কুল খুলেছে। প্রত্যন্ত এলাকার ছেলেমেয়েদের পড়াশোনার পাশাপাশি তাদের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করছে। সচেতনতা বাড়িয়ে বাল্যবিবাহ রুখে দিয়েছে। আরও অনেক কিছু…..। অ্যাঙ্করের গলা —আমাদের প্রতিনিধি এখন পৌঁছে গিয়েছেন মাকড় মুর্মুর বাড়িতে। আমরা সরাসরি তাঁর প্রতিক্রিয়া শুনে নেব। টিভিতে যাকে দেখাচ্ছে, তার সঙ্গে সেই মাকড়ের মিল এবং অমিল দুটোই রয়েছে। গায়ের রং কালো। চোখ দুটো ততোধিক কালো। মাথার চুল কোঁকড়ানো। হাড় জিরজিরে সেই চেহারাটা এখন বেশ সুঠাম। বাংলায় কথা বলছে কেটে কেটে। অলচিকিতে পঠনপাঠন, আদিবাসী এলাকার উন্নয়ন, স্বাস্থ্য-শিক্ষায় জোর এমন একাধিক দাবিতে আন্দোলন করছে সাঁওতালরা। এ তো ওদের ন্যায্য দাবি। মাকড় ওদের আন্দোলনকে সমর্থন জানিয়ে পুরস্কার ফিরিয়েছে। পড়াশোনা করে বড় চাকরির অফার ছেড়ে গ্রামের ওই গরিব মানুষগুলোর জন্য লড়াই করছে। আর আমি সামান্য হাফবেলা বেতনের জন্য আন্দোলনকারীদের গালি দিলাম!
মাকড়, আজ তোর কথা বড় মনে পড়ছে। সেই ছোটবেলায় রেগে গিয়ে তুই আমাকে পোকা বলেছিলি। হ্যাঁ রে মাকড়, আমি পোকা। এ সমাজের লক্ষ লক্ষ স্বার্থান্বেষী পোকাগুলোর মতো আমিও একটা পোকা। তোর মতো মাকড় হতে পারলাম কই….!

লেখকঃ সহ-সম্পাদক, এই সময় ।‘এই সময়’ ভারতের জনপ্রিয় ইংরেজি সংবাদপত্র টাইমস অব ইন্ডিয়ার  টাইমস গ্রুপের একটি বাংলা সংবাদপত্র

(গল্পটি এই সময়ে পূর্ব প্রকাশিত)

আরও পড়ুন

উত্তর দিন

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রচার করা হবে না.