ঐতিহাসিক উপন্যাসঃ ইয়ুকি একটি মেয়ের নাম

আরশাদ উল্লাহ

ভূমিকা

এই কাহিনীর সাথে দ্বিতীয় মহা যুদ্ধের সম্পর্ক রয়েছে। ওকিনাওয়াকে দখল করার জন্য যে ভয়াবহ যুদ্ধ আমেরিকা এবং জাপানী সেনাবাহিনীর মধ্যে সংঘটিত হয়েছিল তার উপর কিছু আলোকপাত করার প্রয়োজন বোধ করছি। দক্ষিণ প্রশান্ত মহাসাগরের যে সকল দ্বীপ যুদ্ধের প্রথম দিকে জাপান দখল করে নিয়েছিল, পরে যুদ্ধের গতি জাপানের প্রতিকুলে চলে যাওয়ার পর অধিকৃত এলাকাগুলি থেকে একের পর এক দ্বীপ আমেরিকার প্রচন্ড চাপের কারণে ছেড়ে দিয়ে পিছু হটে আসে জাপানের ইম্পেরীয়াল সেনা বাহিনী। তারপর ওকিনাওয়া দ্বীপটিকে দখলে রাখার জন্য জাপান প্রচন্ড যুদ্ধে লিপ্ত হয়। তাছাড়া ওকিনাওয়া জাপানের একটি দ্বীপ তাই এই দ্বীপটিকে দখলে রাখার জন্য যে পরিমাণ রক্ত উভয় পক্ষ দিয়েছে – তার তুলনা শুধু লেলিনগ্রাডের যুদ্ধে হিটলারের বাহিনীর সাথে লড়ে তৎকালিন সোভিয়েট রাশিয়াযে পরিমাণ রক্ত দিয়েছিল, তার সমতুল্য বলে ইতিহাসে লিখা আছে। যদিও ওকিনাওয়া যুদ্ধের উপরে আমার এই লিখা নয়, তবে দ্বিতীয় যুদ্ধের সাথে এই কাহিনীর কিছুটা সম্পর্ক রয়েছে বিধায় সে যুদ্ধের কথা ভূমিকাতে সামান্য বর্ণনা করেছি।

১৯৪৫ সালের এপ্রিল মাসের প্রথম সাপ্তাহে আমেরিকা ওকিনাওয়া আক্রমন করে। কথিত আছে যে দ্বিতীয় মহাযুদ্ধ চলাকালিন সময়ে ওকিনাওয়া যুদ্ধ ছিল বিশ্বব্যাপি মহাযুদ্ধ চলাকালিন সময়ে সংঘটিত আরেকটি রক্তাক্ত মহাযুদ্ধ। এই যুদ্ধে ২৫০,০০০ লোক নিহত হয়।তন্মধ্যে ১৫০,০০০ ওকিনাওয়ার মোট লোকসংখ্যার তিন ভাগের এক ভাগ। ওকিনাওয়া যুদ্ধ শেষ হওয়া পর্যন্ত অবশিষ্ট লোক সংখ্যার এক তৃতীয়াংশ অথবা তারও অর্ধেক লোক মৃত্যু বরণ করেছে বলে ইতিহাসে লিখা আছে।

প্রথম দিকে আমেরিকার শেষ সৈন্যটিকে হত্যা করার মনোবৃত্তি নিয়ে জাপানীরা যুদ্ধ শুরু করেছিল এবং যুদ্ধের গতি প্রথমে তাদের অনুকুলেই ছিল। তারপর একলক্ষ সৈন্য মৃত্যু বরণ করার পরে জাপানের সেনা বাহিনী আত্মসমর্পন করে। সেই সময়ে জাপানের একজন জেনারেল নাম ‘অসিমা’, তিনি তাঁর অধিনস্ত ১০,০০০ সৈন্য নিয়ে আত্মসমর্পণ করেছিল।জাপানের দক্ষিণ অঞ্চল কিওশিও অঞ্চল থেকে ওকিনাওয়ার দূরত্ত হল ৩৭০ মাইল। সে যাই হোক, ওকিনাওয়ার সেই ভয়াবহ যুদ্ধে জাপানের কমান্ডার M. OSHIMA এবং আমেরিকার কমান্ডার জেনারেল B. BUCKNER মৃত্যু বরণ করেন। যুদ্ধে আমেরিকা ওকিনাওয়া দখল করে নিলেও তাদের পক্ষের সৈন্যদের হতাহতের সঙ্খ্যা জাপানের চেয়ে খুব একটা কম ছিল না।ওকিনাওয়াতে জাপানীদের পরাভূত করে যখন আমেরিকা দ্বীপটিতে অবতরণ করেছিল – তখন দ্বীপটির সেনা সঙ্খ্যা কয়েক শত ছিল মাত্র।

জাপানের হাতছাড়া হয়ে গেল ওকিনাওয়া দ্বীপ। সেই যুদ্ধের সময়ে জাপানের একজন সাধারণ সৈনিক মৃত্যুবরণ করেছিল। তার নাম ‘সুনিচি সাতো।’ সে ওকিনাওয়ার বাসিন্দা ছিল। ওকিনাওয়া আক্রান্ত হওয়ার পূর্বক্ষণে সাতো তার স্ত্রী ও নয় বৎসর বয়সের কন্যা ইয়ুকিকে কাগোসিমা প্রিফেকচারে অবস্থিত ‘হিয়োশি’ গ্রামে একটি ভাড়া করা ঘরে রেখে ওকিনাওয়াতে ফিরে গিয়েছিল।জাপানের ইম্পেরিয়াল সেনাবাহিনীর আর্মি সাতো ওকিনাওয়াতে যুদ্ধে নিহত হয়। তার একমাত্র মেয়েটির নাম ইয়ুকি। কিন্তু মাস খানেক পরে হতভাগী ইয়ুকির মা আকিকো সাতো বিমান হামলায় একটি ফ্যাক্টরীতে মৃত্যু বরণ করে।এই কাহিনীর প্রধান চরিত্র নয় বৎসর বয়সের মেয়ে ‘ইয়ুকি’’। যুদ্ধে ধ্বংশ প্রাপ্ত জাপানে তার জীবন সংগ্রামের নির্মম কাহিনীটি – আমার এই বই লিখার মূল উৎস।

লেখক

এক

সেই দিনটি ছিল ১৯৮০ সালের অক্টোবর মাসের প্রথমার্ধের একটি দিন।তখন শরতকাল। গ্রীষ্মের পরে প্রকৃতি তার রূপ ধীরে ধীরে পরিবর্তন করছে। সেপ্টেম্বর মাস থেকে অবশ্য শরতকাল শুরু হয়। আগষ্টের অসহ্যগরমের তাপদাহ থেকে মুক্তী পাওয়ার জন্য জাপানীরা শরতের আগমনকে পরমানন্দে ঋতুটিকে স্বাগত জানায়।তারপর শুরু হয় কৃষকদের ধান কাটার মৌসুম। ধীরে ধীরে গাছের পাতার রূপ বদলে গিয়ে লাল বর্ণ ধারণ করে। তাছাড়াও শরতের ফুলগুলি দেখলে সহজে উপলদ্ধি করা যায় যে ঋতু পরিবর্তন হয়েছে। বিশেষ করে কস্‌মস্‌ ফুল এখানে শরতের বার্তা বাহীকা। তারপরে বৃক্ষগুলির পাতার রঙ্ বদলের নয়নাভিরাম দৃশ্যাবলি মন কেড়ে নেয়।আর আবহাওয়া পরিবর্তিত হয়ে না গরম না ঠান্ডা ভাবের কারণে এই সময়ে এক স্বর্গীয় অনুভূতি উপলদ্ধি করা যায়। জাপানের এই রূপসী শরতকাল ও প্রকৃতির এই পরিবর্তন দেখে – কোন সুন্দরী রমণীর অলঙ্কার ও শাড়ী পরিবর্তনের মতই মনে হয়।

আমি তখন টোকিওর একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের ডক্টরেট প্রোগ্রামের ছাত্র।আমার এক শিক্ষক আমাকে এডভাইস করেছিলেন নিয়মিত জগিং করাতে। তিনি বলেছিলেন যে লিখাপড়ার অতিরীক্ত চাপ মোকাবেলা করার জন্য তোমার বডি ফিট্‌নেসেরও দরকার আছে। বলাই বাহুল্য যে আমার বাসা থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ে যাওয়া আসা করতে পাঁচ ঘন্টা লেগে যায়। প্রথমে বাসে করে ছয় কিলোমিটার দূরের একটি রেলষ্টেশনে গিয়ে এক ঘন্টা ট্রেনে করে টোকিওর ‘ইকেবুকুরো’ ষ্টেশনে গিয়ে আবার ভিন্নট্রেনে করে আরেক লাইনে আধা ঘন্টা পরে একটি ষ্টেশনে নেমে পনের মিনিট পায়ে হেঁটে ইউনিভার্সিটির মেইন ক্যাম্পাসে গিয়ে ক্লাশ করে বাসায় ফিরতে আমার রাত আটটা বেজে যায়। অর্থাৎ দৈনিক পাঁচ ঘন্টা আমাকে ট্রেনেই কাটাতে হয়। সে কারণে সম্ভবত আমার টীচার আমার দেহে আরো তাগদ বৃদ্ধির প্রয়োজনীয়তা বোধ করে জগিং করার উপদেশ দিয়েছিলেন।

শিক্ষকের উপদেশ মত অতিরীক্ত লেখাপড়ার চাপকে মোকাবিলা করার জন্য শরীরের ফিটনেস্‌ ঠিক রাখার জন্য প্রতিদিন সকাল ছয়টায় উঠে তিন কিলোমিটার দৌড়াই।ঝড়বৃষ্টি এবং তুষারপাতের সময়েও আমি দৌড়াই। মনে হয় সেই কারণেই কজিমা সানের সাথে আমার প্রথম দেখা হয়েছিল। মহিলার পুরা নাম ‘ইয়ুকি কজিমা’, বয়স পঞ্চাশের কোঠায়।তিনি প্রতি শরতকালে রাস্তার ঝরা পাতা পরীষ্কার করার কাজ করেন। তাঁর সঙ্গে অবশ্য তাঁর সমবয়সী এবং তার চেয়ে বেশী বয়সের অসমবয়সী আরো পাঁচ ছয় জন মহিলাও রয়েছেন।

অক্টোবরের প্রথমার্ধে কোন একটি দিনের সকালে যখন জগিং করছিলাম তখন এই মহিলা আমাকে ‘অহাইও গোজাইমাসু (সুপ্রভাত) বললেন। যদিও দৌঁড়ের মাঝখানে কেউ ডাক দিলে তৎক্ষণাৎ থামা যায় না, তবুও তার অবস্থান থেকে চার পাঁচ মিটার সামনে গিয়ে অনিচ্ছা সত্তেও থেমে গিয়ে পিছু ফিরে তাকালাম।

মহিলাও সামান্য এগিয়ে এসে বললেন, ‘কোথায় থাক?’

অনতিদূরে আমার বাসস্থান দেখিয়ে বললাম, ‘ঐ ফুল গাছটির নিকটে যে ঘরটি রয়েছে সেটা আমার বাসা।’

তাই নাকি! ঐটা তোমার বাসা, একদিন তোমার বাসায় যাব।

বললাম, আবশ্যই রোববারে আসবেন। তাহলে আমাকে বাসায় পাবেন।

আচ্ছা, তাই হবে।

সেদিন আর কোন কথা না বাড়িয়ে দৌড়াতে লাগলাম।

আমার বাসাটি জাপানের সাইতামা বিভাগের অন্তর্গত হাতোইয়ামা শহরের উত্তর প্রান্তে এক আবাসিক এলাকায় অবস্থিত। ডজন কয়েক পাহাড়ের মাথা বুল্ডজার দিয়ে কেটে সমান করে ১৯৭৫ সালের দিকে এই সুন্দর আবাসিক এলাকাটি তৈরী করা হয়েছে। এই আবাসিক এলাকাটি একটি অত্যাধুনিক আবাসিক এলাকা। এলাকাটির ভিতরে যত রাস্তা রয়েছে তার প্রায় সবগুলি রাস্তা সোজা এবং প্রশস্ত।দু’পাশে রয়েছে সারি সারি দু’তলা ঘর।প্রত্যেকটি ঘরের সামনে সুন্দর বাগান ও গাড়ি রাখার স্থান রয়েছে। সমতল ভূমি থেকে আবাসিক এলাকাটি প্রায় বিশ থেকে ত্রিশ মিটার অপরে অবস্থিত। এই আবাসিক এলাকাটির ফুটপাতের পাশে অনেক ম্যাপল বৃক্ষ রয়েছে।শুনেছি আবাসিক এলাকাটি তৈরী করার সময়ে সবগুলি বৃক্ষ আমেরিকা থেকে কিনে এনে রোপণকরেছে।

এক রোববারে কজিমা সান বাসায় এলেন। তার হাতে অনেকগুলি পোটলা।সেগুলিতে কেইক, বিস্কিট থেকে হরেক রকমের পটেটো চিপ্‌স্‌ এবং ছোট ছোট কয়েকটি খেলনাও রয়েছে। মহিলাকে আমার স্ত্রী ঘরে ডেকে এনে বসাল।ইতিমধ্যে আমাদের তিন বৎসরের কন্যা ও দুই বৎসর বয়সের পুত্র তাকে ঘিরে বসেছে। তিনি তার হাতের পোটলা ও ব্যাগ থেকে খেলনা ও বিস্কিটের পেকেটগুলি তাদের সামনে খুলে রাখলেন।এসব জিনিষ দেখে আমার স্ত্রী বলল, ‘এত কিছু আনার কী প্রয়োজন ছিল, তাদের অনেক খেলনা আছে!’

কজিমা সান মৃদু হেসে সোফায় বসলেন। তারপর আমাদের সন্তানদ্বয়ের মাথায় হাত বুলিয়ে বললেন, ‘শিশুদের জন্য কিছু না কিছু আনতে হয়!’

ইতিমধ্যে আমার স্ত্রী চা করে এনেছে। এক কাপ সবুজ চা খেয়ে মহীলা বললেন, এখন আমি যাই। সামনের রোববারে আবার আসব। তারপর সামনের রোববারের পরেও তিনি প্রায় প্রত্যেক রোববারে বাসায় আসতে লাগলেন। আর যতবার তিনি এসেছেন, ততবারই বিস্কিট কেইক ইত্যাদি হাতে নিয়ে এসেছেন।

মহীলা একদিন আমাকে বললেন, তোমরা একদিন আমার বাড়িতে আসো। আমার স্বামীর সাথে পরিচয় করিয়ে দিব।

মাস খানেক পরে একদিন কজিমা সানের বাসাতে গেলাম। তার স্বামী আমাদের খুব সমাদর করলেন। ভদ্রলোক একজন চাকুরিজীবি, টোকিওতে কাজ করেন। তাদের বাড়িটা বেশ সুন্দর। গাড়ী বাগান সবই আছে। তাদের একমাত্র কন্যার বয়স ত্রিশের কোঠায়, সে টোকিওতে একটি কাপড়ের দোকানের সেল্‌স ম্যানেজার। পাঁচ বৎসর পূর্বে তার তালাক হয়েছে। এখন সে তার একটি পুত্র সন্তান সহকারে মা-বাবার সাথে থাকে।

তার পরের সাপ্তাহে কজিমা সান যখন আমাদের বাসায় আসলেন তখন সুযোগ পেয়ে বললাম, ‘আপনার বাড়িটি খুবই সুন্দর, আপনার স্বামী এবং মেয়ে রোজগার করেন। আপনি কেন রাস্তার পাতা পরিষ্কার করেন?’

আমার এই প্রশ্ন শোনে হাসলেন কজিমা সান। বললেন, সারাদিন ঘরে বসে থাকতে ভাল লাগে না আমার। এই কাজ সাপ্তাহে তিন দিন করি বলে আমার স্বাস্থ্য ভাল থাকে।কাজ না করে ঘরে বসে থাকলে তো মোটা হয়ে যাব। তিনি আরো বললেন যে টাউন কাউন্সিল অফিস তাদেরকে টেম্পরারী কর্মচারী হিসাবে নিয়োগ করেছে। এই সীজনেই বেশী কাজ থাকে। অন্যান্য সীজনে তো ঘরেই থাকেন। কিন্তু ঘরে বসে থাকা তিনি পছন্দ করেন না। এই কাজ করলে তাঁর শরীরও ভাল থাকে আর হাত খরচের কিছু পয়সা রোজগার করেন।

তিনি মৃদু হেসে বললেন, ‘সে পয়সা দিয়ে নিজের পছন্দ মতো প্রয়োজনীয় কিছু কেনাকাটা করি।’

জিজ্ঞাসা করলাম, ‘টাকা পয়সা ব্যাংকে জমা করেন কি?’

জবাবে বললেন, ‘না, না, যা আমি রোজগার করি তা সবই আমি খরচ করি।’

মহিলার মুখের নির্মল হাসি এবং তাঁর সরল সহজ ব্যবহারে অল্প সময়ের মধ্যে তাকে আমরা আপনজনভাবতে লাগলাম। একদিন বললাম, ‘যেদিন কাজ না থাকে সেদিনও আপনি বাসায় আসবেন। আপনাকে আমার মায়ের মতো লাগে।আমার মায়ের জীবন খুবই সাধারণ। আপনার হাসির সাথে আমার মায়ের হাসির মিল রয়েছে!’

আমার কথা শেষ হতে না হতেই মহিলা আমার হাত ধরে বললেন, ‘তুমি আমার পুত্র সন্তানের মত, যখন প্রয়োজন মনে কর আমাকে ডাকবে। আমি তোমাদের জন্য যদ্দুর পারি সাধ্যমত করব।’

বললাম, ‘আপনার কথা শোনে আমরা খুব খুশি হয়েছি। আমাদের প্রয়োজনে আসবেন কেন? যেদিন আপনার আসতে মন চায় নির্দ্বিধায় আমাদের বাসায় আসবেন!’

আমাদের এলাকাটিকে তখন হাতোইয়ামা নিউটাউন নামে পরিচিত। একদিন আমার স্ত্রী বলল, ‘কজিমা সানের বাসা আমাদের এই আবাসিক এলাকায় নয়। সেটা ভীন্ন আভাসিক এলাকা।’

‘ভীন্ন এলাকা হবে কোন কারণে? এই আবাসিক এলাকা থেকে কজিমা সানের বাসা মাত্র আধা কিলোমিটারের কম হবে। বুঝাই যায়না যে সেটা ভীন্ন এলাকা। আর ভীন্ন এলাকা হলে দোষ কি?’

সে বলল, ‘ঐ এলাকাটি ভীন্ন কোম্পানী তৈরী করেছে। আমাদের এলাকাটি “জাপান সিন্তোসি” নামে একটি কোম্পানী করেছে।’

বললাম, ‘তফাৎ তো শুধু এই টুকুই। তাতে কি হল?’

কিন্তু সে আপত্তি করে বলল, ‘না, তুমি বুঝ না।কজিমা সানের ঐ এলাকা থেকে আমাদের এলাকায় অভিজাত লোকেরা বেশী থাকে। তাছাড়া এখানের বাড়িগুলি সে এলাকার বাড়ি গুলির চেয়ে অনেক বেশী দাম এবং যাতায়াত ব্যবস্থাও সে এলাকা থেকে এই এলাকায় অনেক ভাল। তাছাড়া সেই এলাকার লোকেরা তো আমাদের আবাসিক এলাকায় হেঁটে এসে বাসে করে রেল ষ্টেশনে যায়।’

বুঝতে পারলাম কজিমা সানের আবাসিক এলাকা একটি ভীন্ন আবাসিক এলাকা। তাঁর আবাসিক এলাকাটির নাম হল “হাতোইয়ামা দাঞ্চি বা হাতোইয়ামাআবাসিক এলাকা।

কজিমা সানের আবাসিক এলাকাটি এই আবাসিক এলাকার পূর্বে তৈরী করা হয়েছে।ব্যতিক্রম শুধু যাতায়াত ব্যবস্থা। বাস চলাচল ব্যবস্থা সেখানে নেই। সেখান থেকে টোকিও যেতে হলে এই আবাসিক এলাকায় হেঁটে এসে বাসে উঠতে হয়।

বিশ্ববিদ্যালয়ে এখন আমার পড়াশোনার যুদ্ধ চলছে। কখন যে পড়াশোনার পাঠ শেষ হবে বলতে পারি না।

একমাত্র রোববার ছাড়া আমার কোন ছুটি নেই। আশা আর হতাশার মিশ্রীত দ্বন্ধে আমার দিনগুলি অতিবাহিত হচ্ছিল।

কজিমা সান বাসায় থাকলে ভাল লাগে। মহিলা আমার মায়ের মত সহজ সরল।তাছাড়াও আমার নির্বোধ সন্তানদ্বয় তাকে দেখলে খুশীতে লাফালাফি করতে থাকে। এই ভাবে কি করে যে আমার বৎসরগুলি অতিক্রান্ত হচ্ছে সে দিকে আমার কোন খেয়াল নেই।চার বৎসরের মাথায় আমার পড়াশোনার পাঠ শেষ হল। তারপর ১৯৮৬ সালে দেশে ফিরেগিয়ে আমার মাকে জাপানে নিয়ে আসি। কজিমা সানের চেয়ে আমার মায়ে বয়স বেশী। চার মাস তিনি জাপানে ছিলেন। প্রত্যেকদিন কজিমা সান এসে মায়ের কাছে বসে থাকেন। দু’জনের ধূমপানের অভ্যাস আছে। কেহ কারো কথা বুঝেনা বটে – কিন্তু দেখলে মনে হত যে তাঁদের আলাপ সালাপ ভালই চলছে।তাঁরা পরম তৃপ্তিতে ধূমপান ও চা খাচ্ছেন।

তারপর চার মাসের বেশী মাকে জাপানে রাখতে পারলাম না। তিনি বললেন, ‘এ দেশ সুন্দর দেশ বটে। কিন্তু মানুষগুলি দেখলে মনে হয় প্রাণহীন রবট। সবাই নিজ নিজ কাজেকর্মে ব্যস্ত, দেখলে মনে হয় নিজেদের সমলাতেই তারা সর্বক্ষণ নিজেদের নিয়োজীত রেখেছে। পাড়া প্রতিবেশীদের প্রতি তাদের কোন খেয়াল আছে বলে মনে হয় না। এটা জীবনের কোন মানে হতে পারে না!’

তারপর আমাকে লক্ষ করে বললেন, ‘তুমি আমাকে দেশে নিয়ে যাও, আমাদের দেশের মাছ ভাত এদেশের খাবারের চেয়ে অনেক বেশী স্বাদ!’ এ ধরণের কথা মা আমাকে দেখলেই বলতেন।তাই একদিন মাকে নিয়ে দেশে রেখে এলাম।

জাপানে এসে দেখি কজিমা সান মন খারাপ করে বসে আছেন। আমাকে একদিন বললেন, ‘তোমার মাকে দেখতে বড় ইচ্ছা হয়।তুমি যখন দেশে যাবে তখন আমাকেও একবার সঙ্গে নিয়ে যাবে!’

বললাম, ‘যদি যেতে চান অবশ্যই নিয়ে যাব। আপনি গেলে মা অনেক খুশি হবেন।’

প্রায় বৎসর খানেক পরে আমি যখন দেশে ঈদ উপলক্ষে যাচ্ছি – তখন কজিমা সানকেও সঙ্গে নিলাম।তাকে আমার গ্রামের বাড়িতে নিয়ে মায়ের কাছে রাখলাম। দেশে যাওয়ার সময়ে কজিমা সানের স্বামী তাঁকে আমাদের বাসায় এনে বলেছিলেন,”হয় তো তাকে আপনার একটি ভারী বোঝার মতই লাগবে। তবুও দয়া করে একটু নজর রাখবেন।সে কিন্তু লেখাপড়া কিছুই জানে না!”

বললাম, ‘তাতে আমার কিছু অসুবিধা হবে না। আপনি নিশ্চিন্ত থাকুন। তাঁর ভাল মন্দ সব আমি দেখব!’

এক ডিসেম্বর মাসে কজিমা সান, আমার স্ত্রী ও আমাদের সন্তানদেরসঙ্গে নিয়ে আমরা পাঁচজন রওয়ানা দিলাম।তখন শীতকাল। দেশে গিয়ে আমার মাকে দেখে কজিমা সান বুকে জড়িয়ে ধরলেন।এঁরা দু’জন একে অন্যের ভাষা না বুঝলেও দেখে যেন মনে হয় একে অন্যের ভাষা বুঝতে তাঁদের কোন প্রকার অসুবিধা হচ্ছেনা!

সেবার আমরা তিন সাপ্তাহ দেশে ছিলাম। আমাদের গ্রামটির পূর্ব দিক দিয়ে কুমিল্লা ব্রাম্মনবাড়ীয়া সি এন্ড বি রোড রয়েছে। একদিন কজিমা সান সন্ধ্যায় হেঁটেহেঁটে সেই রাস্তার উপরে গিয়ে দাঁড়ালেন। সেখান থেকে ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যের আগরতলা বিমান বন্দরের লাইটগুলি দেখা যায়।কজিমা সান সেই লাইট দেখে জিজ্ঞাসা করলেন, ‘ঐটা আবার কি?’

বললাম, ‘ভারতের অন্তর্গত একটি বিমান বন্দর।’

‘ভারত এত কাছে?’ মহীলা বিস্মিত হয়ে বললেন।সম্ভবতঃ তিনি মনে করেছিলেন বাংলাদেশ থেকে ভারত অনেক দূরে অবস্থিত।

তাঁকে বুঝিয়ে বললাম, ‘এখান থেকে সীমানা মাত্র দশ কিলোমিটার। আর বিমান বন্দরটি এখান থেকে প্রায় ত্রিশ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত।’

বললেন, ‘আমাকে সীমানা দেখাতে নিয়ে যাবে?’

অবশ্যই নিয়ে যাব!

‘আগামি কাল আমাকে নিয়ে যাবে তো?’

‘হ্যাঁ, নিয়ে যাব!’

সীমানা দেখাতে আমি নিজে না গিয়ে আমার ভাতিজাকে রিক্সায় করে তাঁকে নিয়ে যাবার জন্য বললাম। মাস খানেক আগে জাপানের একজন বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র আমাদের বাড়িতে থেকে গ্রামীন ব্যাংকের উপরে তার মাষ্টারস্‌ ডিগ্রীর থিসিস করছে। তার নাম ইয়ামামতো, সেও সঙ্গে গেল।

আমার ভাতিজা মাসুদ তাদের নিয়ে কসবা রেল ষ্টেশনের কাছে গেল। তাকে আমি বলেছিলাম যে কোন অবস্থায় যেন বর্ডার লাইন পার হয়ে পূর্ব দিকে না যায়। কারণ, কসবা রেল ষ্টেশনের কয়েক মিটার পূর্বে ত্রিপুরা রাজ্যের বর্ডার। তাই তাকে সেদিকে খেয়াল রাখতে বলেছিলাম!

কথামত পরের দিন তারা তিন জন রিক্সাতে করে কসবা গেল – বিকাল চারটার দিকে। তারপ্র যখন সন্ধ্যা আটটা বেজে যাওয়ার পরেও তারা ফিরল না তখন চিন্তা করতে লাগলাম।তাদের ফিরে আসার পথের দিকে চেয়ে হাঁটতে হাঁটতে একসময় সি এন্ড বি রাস্তা পর্যন্ত গেলাম। ঠিক সাড়ে আটটায় দেখলাম তারা ফিরে আসছে।

মাসুদকে জিজ্ঞাসা করলাম, ‘তাদের কোন অসুবিধা হয়নি তো, এত দেরী হল কেন?’

‘না, তেমন কোন অসুবিধা হয়নি।তবে একেবারে যে কিছু হয়নি তা বললে ভুল হবে।

জিজ্ঞাসা করলাম, ‘তার মানে কি?’

হাসল সে, তারপর বলল, ‘কজিমা সান বর্ডার ক্রস করে প্রায় এক কিলোমিটার বর্ডার লাইনের পূর্বে চলে গিয়েছিলেন!’

‘তুই নিষেধ করলি না?’

মাসুদ বলল, ‘আমি অনেক ভাবে বুঝিয়েছি, কিন্তু মহিলা আমার কথা শোনলেন না!’

‘সঙ্গে আর কে গিয়েছিল?’

‘ইয়ামামতো সান।’

ইয়ামামতো মাস খানেক হয়েছে আমাদের গ্রামে এসেছে। দু’একটা বাংলা কথা বলতে ও বুঝতে পারে।

সে আমাকে যা বলল তা হলোঃ

“মাসুদের কথা সে বুঝেছে কি না জানি না। কজিমা সান তার কথায় কর্ণপাত না করে বর্ডার লাইন পেরিয়ে সোঝা পূর্বদিকে হেঁটে যখন পঞ্চাশ মিটারের মত ভীতরে চলে গিয়েছেন, তখন আমি তাকে ফিরিয়ে আনার জন্য পিছু পিছু বর্ডার পেরিয়ে গেলাম। ইতিমধ্যে কজিমা সান একটি বাড়িতে প্রবেশ করে সে বাড়ীর এক মহিলার সাথে জাপানীতে কি যেন বলছিল।আর সে মহীলা শুধু হাসতেছিল।কয়েক মিনিট পরে একজন লোক এল, সে খুব সম্ভবতঃ সিক্রেট বর্ডার পুলিশ হবে। সে লোকটি কজিমা সানের পাসপোর্ট দেখতে চাইল।’

তারপর?

‘‘পুলিশ তাঁকে কি বলছে কজিমা সান কিছুই বুঝতে পারেন নি।সে তার ভাষাতেই কথা বলছিল।কিন্তু পুলিশটি তার কোন কথা না বুঝে যখন পুনরায় পাসপোর্ট চাইল তখন সে ‘পাসপোর্ট’ কথার অর্থ কি তা বুঝতে পেরে বলল, “পাসপোর্ট? সেটা তো আমি ঐ যে গ্রামে উল্লাহ্‌ সানের বাড়িতে রেখে এসেছি!”

সম্ভবতঃ পুলিশটি তার কথা কিছুই বুঝতে পারেনি। সে তাঁকে পশ্চিম দিকে হাতের আঙ্গুল উঠিয়ে বলল, “ঠিক আছে, এখন তুমি ঐ গ্রামে ফিরে যাও!”

ইয়ামামতো বলল, “মনে হয় তখন কজিমা সান বুঝতে পারলেন যে তিনি আইন ভঙ্গ করে ভারতের ভিতরে চলে এসেছেন।তারপর তিনি ঘর থেকে বের হয়ে আমাকে বললেন, চল ফিরে ফিরে যাই!”

জানতে চাইলাম, তোমাকে কিছু বলেনি?

ইয়ামামতো হেসেবলল, “পুলিশটি আমাকে সম্ভবতঃ তার সন্তান মনে করেছিল। সে আমাকে কিছুই জিজ্ঞাসা করেনি। তারপর আমরা পশ্চিম দিকে হাঁটতে লাগলাম। তখন সন্ধ্যা হয়েছে। মাসুদের নিকট পৌছার পর দেখি সন্ধ্যা সাতটা বাজে।”

ঠিক আছে, আর বলতে হবে না। আমি স্বস্তির নিঃশ্বাষ নিয়ে ইয়ামামতোকে থামালাম।তারপর নিরবে খুব হাসলাম।

তাকে বললাম, ‘বড় বাঁচা বেঁচে গেছ। এখন হাতমুখ ধুয়ে ডিনার খেতে যাও!’

জাপান একটি দ্বীপমালার দেশ বলে সে দেশের জনসাধারণ বর্ডার লাইন চিনে না। তাই অনেকে বর্ডার লাইন দেখতে কেমন তা দেখার আগ্রহ দেখায়।

বর্ডার লাইন কেমন দেখলেন? কজিমা সানকে জিজ্ঞাসা করার পর তিনি যা উত্তর দিলেন তা শোনে না হেসে থাকতে পারলাম না।

উত্তরে তিনি বললেন, “বর্ডার লাইনে তো কোন বাউন্ডারী ওয়াল দেখলাম না!”

(চলবে)

 

লেখকঃ জাপান প্রবাসী বাংলাদেশী কবি ও সাহিত্যিক

 

আরও পড়ুন

উত্তর দিন

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রচার করা হবে না.