ব্যভিচারিণী ও একজন পবিত্র সখিনা

ড. উম্মে বুশরা সুমনা

সাব্বিরের সাথে ফেসবুকে পরিচয় হয়েছিল অনামিকার।চ্যাট বক্সে সারাদিন সাব্বির অনামিকাকে ভালোবাসার গল্প শুনাত, কী সুন্দরকাব্য,কী সুন্দর শব্দ চয়ন,অনামিকাবিভোর হয়ে যেত। কী যে যাদু ছিল সেই মেসেজগুলোতে!

এভাবে ম্যাসেঞ্জারে মেসেজ আদান-প্রদান করতে করতেই কিভাবে যেন এক মাস চলে যায়। অনামিকা সদ্য এসএসসি পাশ করেছে। এখনো কলেজে ভর্তি হয় নি। সারাদিন কোনো কাজ নাই তাই মোবাইলে ফেসবুক আর ম্যাসেঞ্জার নিয়েই পড়ে থাকে। আর সাব্বির ঢাকা ইউনিভার্সিটিতে পড়ে। ফেসবুক আইডিতে সাব্বিরের ঢাকা ইউনিভার্সিটির ম্যাথের ছাত্র হিসেবে পরিচয় দেওয়া আছে। অনামিকার সাথে বন্ধুত্বটা যেদিন প্রেমে গড়াল, সেদিন সাব্বির ফেসবুকে রিলেশনশীপ স্ট্যাটাস সিঙ্গেল থেকে ইন অ্যা রিলেশনশীপ লিখেছিল। চমৎকার একটা স্ট্যাটাস দিয়েছিল। অনামিকার প্রথম প্রেম, স্বপ্নের মতো মনে হয়েছিল। সাব্বির প্রচন্ড হ্যান্ডসাম, চমৎকার স্ট্যাটাস দেয়। অনামিকারও ঢাবিতে পড়ার খুব শখ। সে গণিতে খুব কাঁচা, তাই সাব্বিরকে তার ব্রিলিয়ান্ট স্টুডেন্ট হিসেবে আরো ভালো লাগে। এখন তারা প্রায়ই ভিডিও কলে কথা বলে।

সাব্বির ফোন দিয়ে বলল, ‘বেবী,তোমাকে খুব দেখতে ইচ্ছে করছে। প্লীজচলে এসো আমার সেমিস্টার ফাইনাল পরীক্ষা আজই শেষ হলো। খুব রিল্যাক্স লাগছে, মাথাটা হালকা হালকা লাগছে। প্রজাপতির মতো তোমার সাথে ঘুরতে ইচ্ছে করছে। প্লীজ কাল টিএসসিতে এসো, প্লীজ, প্লীজ।’

সাব্বিরের আর্তিমাখা কণ্ঠে অনামিকার ভিতরটা তোলপাড় করে উঠল। সে কখনো একা ঘরের বাহিরে যায়নি। মাকে কখনো ফাঁকি দেয়নি।অ্যান্ড্রয়েড সেটটা তার বাবা কিনে দিয়েছিলেন।এসএসসিতে এ প্লাস পাওয়ার পর তার বাবা এটা শর্ত পূরণ করতে কিনে দিতে বাধ্য হয়েছিলেন। অনামিকার বাবা সামান্য কর্মচারী, তার নিজের মোবাইলের কয়েকটা বাটন কাজ করে না। অনামিকার মা এই দামি সেট দেখে তার বাবার সাথে চি্ৎকার-চেঁচামেচি করেছিলেন।

ছা পোষা কেরানি বাবা সেদিন মিনমিন করে বলেছিলেন ‘মেয়েটা এ প্লাস পেল। মেয়েটা এত করে চাইল, তাই একটা উপহার দিলাম। একটা সামান্য মোবাইলের জন্য এত চেঁচিও না তো!’

মা মুখ ঝামটা দিয়েছিলেন। টানাটানির সংসারে বাবা টাকা ধার করে মেয়ের শখ মিটিয়েছিলেন। অনামিকার ফেসবুক আইডি খুলে দিয়েছিল তার এক বান্ধবী। তারপর সেলফি, পিক আপলোড, লাইভ ভিডিও, ম্যাসেঞ্জার সবই সে শিখিয়ে দিয়েছিল। কেউ অ্যাড ফ্রেন্ড দিলে অনামিকা সাথে সাথেই অ্যাক্সেপ্ট করত। বন্ধুর সংখ্যা, লাইকেরপরিমাণ বাড়লে তার খুব ভালো লাগত। সাব্বিরের মতো ব্রিলিয়্যান্ট ছাত্র যখন তাকে ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট পাঠিয়েছিল, সে সাথে সাথেই অ্যাক্সেপ্ট করেছিল। তারপর হাই, হ্যালোর ধাপ পেড়িয়ে খুব কাছের একজন হয়ে গেল। অনেকে বলে ভার্চুয়াল দুনিয়ার বিশ্বাস নেই। কিন্তু সাব্বিরের চেহারা, শিক্ষা, পোষাক, আচরণ দূর থেকে খুবই বিশ্বাসযোগ্য মনে হয়েছিল।

অনামিকা পরেরদিন বান্ধবীর বাসায় যাওয়ার কথা বলে বের হলো। সারাটা দিন প্রজাপতির মতো দুইজনে ঘুরে বেড়ালো। দিন শেষে তারা একটা হোটেলে খেতে গেল। হোটেলের নিচে খাবারের দোকান আর উপরে আবাসিকের ব্যবস্থা ছিল।

সাব্বির বলেছিল, ‘এখানে অনেক গরম আর অনেক ভিড়। আমরা উপরে এসি রূমে বসে আরাম করে খাবো। চলো, উপরে চলো।’

অনামিকা সাতপাঁচ না ভেবেই মাথা নেড়ে হ্যাঁ বলেছিল। সাব্বির অনেক ভালো ছেলে। তার টিউশনির টাকা থেকে অনামিকার জন্য অনেক গিফট কিনেছিল। এরকম একজন ছেলেকে না বলা যায় না। সে হ্যামিলনের বাশিওয়ালার ইঁদুরের মতো মোহাচ্ছন্ন হয়ে পিছু পিছু হাঁটা দিয়েছিল। তারপরের ঘটনা সে আর মনে করতে চায় না। পরেরদিন কারা যেন রাস্তা থেকে উঠিয়ে তাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পৌঁছে দিয়েছিল। এখন সে হসপিটালের ওয়ান স্টপ ক্রাইসিস সেন্টারে বেডে শুয়ে আছে। রিপোর্টার তার সাক্ষাৎকার নিল। এখন তারা পাশের বেডের মেয়েটার সাক্ষাৎকার নিচ্ছে। অনামিকা কান খাড়া করে শুনতে লাগল।

‘মুই গ্রামের গরিব কৃষক মোতালিব আলীর মাইয়া, মোর নাম সখিনা। মোক পাড়ার ম্যালা চ্যাংড়া  জ্বালাইত।দোকানত গ্যালে পর দোকানদারও জিনিস দেওনের নাম কইরা হাত ধরত, মুই ঝটকা দিয়ে হাতছাড়ায় নেতাম।

আব্বা সুদের জালে আইটক্যা গ্যাছে।এত্ত গুলো ভাই বোন মোর।ক্ষুধার কষ্টে কাঁনত,মাতবর এর পোলা থাইকা জাউলার পোলা সবাই মোককিনবার চাইত। হামরা গরিব।তাই হামাক হগগলে সস্তা ভাবত।

আড়ালে পাইলেই হাতে ট্যাকা গুইজা দিত। রাতে বাঁশ ঝাড়ে আইবার কইত।আমি ট্যাকাত ছ্যাপ মাইরা পায়ের তলায় থুইয়া পিষতামআর গজরাইতাম।

লাজ শরমের মাথা খাইয়া আব্বারে নিজের বিয়ার কথা কইতাম। আব্বা বড় শ্বাসফেলাইত আরকইত, ‘মারে,ট্যাকা কই পামু,বিয়াত যে ম্যালা ট্যাকা দেওনলাগে!’

হেই রাতে বেগ পাইল।ছোট ভাইটারে ঠেলা দিনু।উডে না,ঘুমে কাইত।রাগ কইরা একলাই বাঁশ ঝাড়ত গেনু। মাতবরের পোলায় মোর সব্বনাশ করল।’

এটুকু বলেই সখিনা কাঁদতে লাগল। অনামিকা সখিনার দিকে তাকাল। মেয়েটা তারই বয়সী, অশিক্ষিত। কিন্তু ভালো-মন্দের জ্ঞান আছে, তার মতো এতটা বোকা সে নয়। ক্ষুধায় কষ্ট পেয়েছে, তবু কখনো কারো প্রলোভনে রাজি হয় নি। আর সে! মিথ্যা প্রেমের ফাঁদে নিজেই জড়িয়ে গিয়েছিল, তাই আজ তার এই পরিণতি।

পরেরদিন পেপারে অনামিকার খবরটা ছাপাল। নার্স পেপারটা রেখে গেল। সখিনা উৎসাহী হয়ে বলল, ‘আফা, মোর খবরটা ছাপায় নাই। মাতবরের পোলার নামটা ছাপায় নাই? ওর শাস্তি হবার নয়?’

নার্স মাথা নেড়ে বললেন, ‘না, শুধু অনামিকার খবরটা ছাপিয়েছে। সবার খবর ছাপালে তো পেপার ভরে যাবে।’

প্রতিদিন পেপার আসলে সখিনা আগ্রহ ভরে তা উল্টে পাল্টে দেখে। তার খবরটা খোঁজে। বিয়ের প্রলোভন দেখিয়ে এক নারীকে ধর্ষণকরেছে এক পুরুষ। পরবর্তীতে বিয়ে করতে রাজি না হওয়ায় সেই নারী ধর্ষণের মামলা করেছে। সখিনা অনেকক্ষণ চিন্তা করে মনে মনে বলে, ‘জোর করে তো অকাম করে নাই, তাইলে এটা ধর্ষণ হয় কেমনে? প্রেম করছে, বিয়ার আশা দেখাইছে, তারপর এক ঐ ব্যাটা যদি বিয়া করত তাইলে তো আর মামলা হইত না।’

দুইদিন পর আরেকটা খবর দেখে সে আরো অবাক হলো। ঢাকার একজন বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক পরীক্ষায় বেশি নম্বর দেবার লোভ দেখিয়ে ভার্সিটি পড়ুয়া ছাত্রীদের তার নিজের ফ্ল্যাটে নিয়ে যেয়ে ধর্ষণ করে আসছিল। পরবর্তীতেএক ছাত্রী রাজি না হওয়ায় তা পেপারে আসে। সখিনা মনে মনে ভাবে, এত বড় বড় শিক্ষিত মাইয়ারা কেমনে মাস্টারের সাথে অকাম করবার রাজি হয়। এটা কেমনে ধর্ষণ হয়? জাইন্যা বুইঝ্যা মাস্টারের ঘরেত যায়া অকাম করছে মাইয়াগুলায়। পাস করনের লাইগ্যা কেউ এমন করে?

পরেরদিন আবার সে আগ্রহ ভরে তার খবরটা খোঁজে। যদি মাতবরের পোলার নামটা উঠে। সবাই জানুক, ওর সাজা হোক। বুক ফুলিয়ে এহনো ঘুইর‍্যা বেড়াচ্ছে। মাতবর তাঁর আব্বাকে বিশ হাজার টাকা দিয়া সাধতাছে যাতে মামলা না করা হয়। পেপারওয়ালাদেরও মনে হয় টাকা দেছে না হলে তার খবরটা ছাপায় না ক্যান? সখিনা দীর্ঘশ্বাস ফেলে আর পাতা উল্টিয়ে দেখে।

এক কোনায় একটা ধর্ষণের খবর দেখে চমকে উঠে। একটা জুয়েলার্সের মালিকের ছেলে আর তার বন্ধুরা নাকি তাদের দুই বান্ধবীকে ধর্ষণ করেছে। আবার সেটা ড্রাইভারকে দিয়ে ভিডিও করেছে। জন্মদিনের পার্টির পর রাতের বেলায় মেয়েবন্ধু দুইজনকে হোটেলে নিয়ে গিয়ে ধর্ষণ করেছে। সখিনা বিড়বিড় করে, তোরা জানিস না এই সব রংবাজ পোলাগুলা খাচ্চর, এদের সাথে ঘুরতে বাহির হইছস ক্যা? পার্টি থাইক্যা সোজা বাড়িত যাবি তা হোটেলে গেছস ক্যা? তগো ইচ্ছা না থাকলে কেউ নিয়া যাইতে পারে? পোলাগুলা যেমন বদমাইশ তোরাও তেমন খাচ্চর। ভিডিও কইর‍্যা ফাঁস হওনের পর এখন মামলা করস?’

সখিনা হাসপাতাল ছেড়ে বাড়ির পথে ট্রেনে রওনা দেয়। মাতবর হুমকি ধামকি দিয়ে সখিনার আব্বার মুখ বন্ধ করে দিয়েছে। বিশ হাজার টাকা দিতে চেয়েছিল। সেটাও দেয় নি। তার আর কোনো দিন বিয়েও হবে না। এরকম মেয়েকে কে বিয়ে করবে? এখন গ্রামের অসভ্য ছেলেরা অকাম করার জন্য তার পিছনে আরো ঘুরঘুর করবে। সখিনা কষ্টে লজ্জায় মুখ ঢাকে। এই রকম জীবনের কোনো মানে হয়? তার চেয়ে মরে যাওয়ায় ভালো। এই ট্রেনের নিচে গলাটা দিতে পারলে যেন সে এই অপমানিত আর লজ্জিত জীবন থেকে উদ্ধার পেত। তার আব্বা যেন মেয়ের মনের কথা বুঝতে পারে্ন। মেয়ের হাতটা খপ করে ধরে বলেন, ‘মারে, তুই কুনো পাপ করিস নাই। আল্লাহ্‌র কাছত হামরা মজলুম। তোর কুন ভয় নাই, লজ্জা নাই। মানষের কাছেত হামরা খারাপ হইলেও আল্লাহ্‌র কাছেত হামরা খারাপ নয়াই। হামরা মাতা উঁচা কইর‍্যা বাঁচুম।’

 

টিকাঃ আমাদের ধর্মে ব্যভিচারিণী ও ধর্ষিতা নারী দুই জন এর সাথে আচরণ দুই রকম।ব্যভিচারিণী শাস্তির যোগ্য ও ঘৃণিত আর ধর্ষিতানারী মজলুম, বিচার পাবার যোগ্য।

‘ব্যভিচারী ও ব্যভিচারিণী উভয়কে এক’শ ঘা করেবেত্রাঘাত কর। আল্লাহর বিধান কার্যকরী করবে এদের প্রতি দয়া যেন তোমাদেরঅভিভূত না করে। যদি তোমরা আল্লাহ ও পরকালে বিশ্বাসী হয়ে থাক। ঈমানদারদেরএকটি দল যেন এদের শাস্তি প্রত্যক্ষ করে।’(সূরা আন নূরঃ ২) এটা হচ্ছে অবিবাহিত পুরুষ-মহিলার ব্যভিচারের ইহকালীন শাস্তি। আর হাদিস থেকে জানা যায় যে বিবাহিতদেরব্যভিচারেরশাস্তিপ্রস্তরাঘাতেমৃত্যু।

ব্যভিচারি নারী আর ধর্ষিতা নারীর বিয়ের ক্ষেত্রে, ব্যভিচারি নারী ব্যভিচারি পুরুষকে বিয়ে করবে কিন্তু ধর্ষিতা নারীকে ঈমানদার পুরুষ বিয়ে করতে পারবে কারণ সে মজলুম আর নিষ্পাপ।এ প্রসঙ্গে আল্লাহ বলেন, ‘ব্যভিচারী পুরুষ ব্যভিচারিণী নারী ব্যতীত বিবাহ করে না এবংব্যভিচারিণী নারী ব্যভিচারী পুরুষ ব্যতীত বিবাহ করে না’(সূরা আন নূরঃ৩)

লেখকঃ সাহিত্যিক ও একটি প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের ফার্মেসী ডিপার্টমেন্টের সহকারী অধ্যাপক

 

আরও পড়ুন
২ মন্তব্য
  1. রিতু কুন্ডু বলেছেন

    ধন্যবাদ ম্যাডাম,এত সুন্দর করে উপস্থাপনের জন্য।

  2. রিতু কুন্ডু বলেছেন

    ধন্যবাদ ম্যাডাম এত সুন্দর করে বিষয়টি উপস্থাপনের জন্য।

উত্তর দিন

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রচার করা হবে না.