সাংবাদিক

ইয়াসমীন রাব্বানী লিলি

সকালে স্কুলে গিয়ে চোখ কপালে!! এমন ধাক্কা খেলাম!! কি ব্যাপার কেউ কি দাওয়াত করেছিলো! উদ্ভট পারফিউমের তীব্র গন্ধ। নিম্মি কি ব্যাপার? এক গাল হাসি ছড়িয়ে বত্রিশটা দাঁত বের করে আমার সামনে নিম্মি দাড়ালো।

ঐ হাসির মানে আমি এখনো উদ্ধার করতে পারিনি।জোর পায়ে রুমের দিকে চলে এলাম।

ভাইস প্রিন্সিপাল ম্যাডামকে ডাকলাম। লাভলী একটু শুনে যাও। লাভলী মুখের হাসি অনেক কষ্ট করে সামলে নিয়ে চেয়ারে বসলো।

লাভলী আমার রুমেই বসেন।
লাভলী ব্যাপার কি বলতো? নিম্মি এ রকম সাজ দিয়েছে কেনো??

— আপা, আজ পত্রিকা অফিস থেকে সাংবাদিক আসবে। আপনি বলেছিলেন জামা কাপড় গুছিয়ে পরতে।আমি এসে দেখি নিম্মি এই সাজ দিয়ে গেটে বসে আছে। বেঞ্চগুলো পর্যন্ত পরিষ্কার করেনি।

– কেন, আজ কি ওর ইন্টারভিউ নিতে আসছে কেউ??

— আপা আমি বলতে পারবো না।ওকে ডেকে জিজ্ঞেস করুন।

– বেল চাপলাম। লজ্জায় লজ্জাবতী লতার মত হাত দুটো কচলাচ্ছে।
— নিম্মি কি হলো? এমন সেজেছো কেনো?

– কই! এত সাজিনাইতো।আমার ঘরে কি সাজোনে কিছু আছে। ননদের কাছে গিয়া কইলাম,হেই সাজাইয়া দিছে।

শত হইলো তো আমাগো স্কুল! অনেক নাম ডাক।টেলিভিশনে যদি দেখায়, বা পেপার ছবি ছাপায়! তখন কত মানুষ দেখবো।আমি গতকাইলই সব কয়টা স্কুলে গিয়া খরব দিছি।আমাগো স্কুলের বড় ম্যাডামের কত নাম ডাক। পেপার অফিস থাইকা ইন্টারভিউ নিতে আসবো।

আমাগো এলাকার হাই স্কুলে ছেলে মেয়েদের নিয়া টেলিভিশনে সাংবাদিক আইসা লেখা ধুলা গান বাজনার সুটিং কইরা নিসে। আমরা দেখছি।

আমি বাকরুদ্ধ হয়ে পড়েছি। নিম্মি কি বলছে এ সব!

পত্রিকা থেকে সাংবাদিক আসবেন।সাথে ফটোগ্রাফার আসবেন। আমার সাক্ষাৎকার নেবেন।

আমি বললাম -নিম্মি তুমি জায়গায় গিয়ে বসো।ওনারা এলে আমার রুমে নিয়ে আসবে। সালাম দেবে।আদপের সাথে কথা বলবে।

– আমি ম্যাডাম আপনার মত করে বলবো! আপনার মত কইরা বলতে গেল যদি নষ্ট হইয়া যায়! একটু মিশাল হইবো।জানে তো আমাগো মত মানুষ এত সুন্দর কইরা কথা বল্লে আশেপাশে মানুষ হাসবো।স্বামী স্কুলে আসা বন্ধ কইরা দিবো।কইবো যা যেইখানে থাইক্কা ককিলের মত কুহু ডাকে কতা কইতাসছোস সেই খানে যা।

আপনে তো জানেন না আমাগো ভাষা ভিন্ন। ব্যাবতে একই রকম কতা কই।শুনেন হেই দিন হইছে–

– থামো তুমি, গেটে বসো।এখানে তোমার কাজ নাই।
ধমক খেয়ে ধাতস্থ হলো।

আমি ব্যাস্ত হয়ে পড়লাম।আধা ঘন্টা খানিক পর একটা মেয়ে ও সাথে পচিস ছাব্বিশ বছরের একটি ছেলে এসে আমার রুমে বসলো। আমাকে খুব সম্মান দিলো।

ম্যাম আমি সাবরিনা। ও আমার ভাই সায়েম।আমরা আগে আর কে মিশন রোডে থাকতাম। ওখানে ভাড়া বেশি।তাই এ এলাকায় আসলাম। আমরা দুজনই পত্রিকায় চাকরি করি।

আমি নিজেই গরগর করে নিজের ঢোল পিটাতে আরম্ভ করলাম। এর ভিতর নিম্মি অহেতুক দুবার এসে জানান দিয়ে গেছে। ওকে ডাকা হচ্ছে না।ওর তর সইছেনা।

নিম্মি এবার নিজেই বলতে লাগলো,- আফা ভাইয়া এ স্কুলে আমি সাত বছর চাকরি করি।আগে মায়ে করতো।মা পেটে আলসার হইছিলো।তারপর ক্যান্সার হইয়া মইরা গেলো।আমার বিয়া হইছে।
স্বামী বদের হাড়ি।আর একটা বিয়া করছে।

আমার একটা বাচ্চা আছে।
মা চইলা যাবার পর এই চাকরিটা আমি করি।(মনভোলানো হাসির রোল।)

মেয়েটা শুধু ঘড়ি দেখছে।এক সময় বলেই ফেলল – ম্যাম আর একদিন আপনার সাথে আলাপ করবো।মাসের প্রথম।তাছাড়া এখান থেকে অফিসে যেতে কতটা সময় লাগবে জানিনা।

আমরা এ বিল্ডিংয়ের তিন তলায় উঠেছি।
আমি জানতে চাইলাম – তোমরা কোন পত্রিকার আছো!

– যে নাম বললো, আজতো এ পত্রিকার সাংবাদিক আসার কথা না!! নিজেকে সামলে নিয়ে বললাম- একদিন সময় হাতে নিয়ে এসো।তোমাদের সাথে কথা বলে শান্তি পেলাম।

গেট থেকে বের হবার সময় নিম্মির কন্ঠ শুনতে পেলাম।আফা আমার ইন্টারভিউটা দেখাইয়েন।
ওরা হন্তদন্ত হয়ে বেরিয়ে গেলো।

আমি মোবাইলটা হাতে নিয়ে ফোন করলাম– কে বর্ষা বলছো !! না আমি তিথী।

,- হ্যা আপু! আমরা আপনার স্কুলের কাছে এসে গেছি। আর পাঁচ মিনিট সময় লাগবে।।।।

 

লেখকঃ সাহিত্যিক ও  প্রতিষ্ঠাতা প্রিন্সিপ্যাল , ক্রিসেনথেমাম স্কুল

আরও পড়ুন

উত্তর দিন

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রচার করা হবে না.