ঐতিহাসিক উপন্যাসঃ ইয়ুকি একটি মেয়ের নাম

আরশাদ উল্লাহ

পর্ব-দুই

জাপানে ফিরার সময় কজিমা সান আমার স্ত্রীর সাথে সারা পথ তার অতীত জীবনের কথা বলেছেন।

ফিরে আসার কয়েক দিন পর সে বলল, ‘তুমি তো জান না এই কজিমা সানের জীবন কাহিনী কত করুণ এবং মর্মস্পর্শি। তাঁর শৈশবের কাহিনী শুনলে তুমি তাকে নিয়ে একটি বই লিখতে পারবে। তার জীবন কাহিনী বড় হৃদয়বিদারক!’ 

কয়েক দিন পরে এক অবসর মুহূর্তে আমার স্ত্রী কজিমা সানের জীবন কাহিনী খুলে বলেছে।  

জাপানের দক্ষিণে কিউশিও অঞ্চলে কাগশিমা বিভাগের অন্তর্গত সমুদ্র তীরে অবস্থিত একটি সুন্দর গ্রাম-বন্দর রয়েছে, নাম ‘হিয়োসি গ্রাম-বন্দর’। সেই গ্রামের সাইতো পরিবারটিকে নিয়ে এই কাহিনী রচিত হয়েছে। তার ছিল তিন জনের সংসার। স্ত্রী আকিকো ও তাদের নয় বৎসর বয়সের কন্যা ইয়ুকি। ইয়ুকির বাবা সাইতো সান জাপান ইম্পেরিয়াল সেনাবাহিনীর একজন সৈনিক। 

জাপানের দক্ষিণে অবস্থিত কাগশিমা প্রিফেকচার সুস্বাদু মিষ্টি আলুর জন্য বিখ্যাত। সেই গ্রামে ওকিনাওয়া থেকে এক বৎসর পূর্বে সাইতো সান এসে একটি ঘর ভাড়া নিয়ে তার স্ত্রী ও তার মেয়ে ইয়ূকিকে রেখে ওকিনাওয়া ফিরে যায়। ওকিনাওয়া আক্রান্ত হওয়ার পূর্বে সাইতো তার পরিবারটি হিয়োসি গ্রামে তাদের নিরাপত্তার জন্য রেখে গিয়েছিলেন।  তারপর পাঁচ মাসের মাথায় ইয়ুকির মা একটি চিঠি পেয়ে চিৎকার করে কান্না শুরু করলেন। সেদিন সে ইয়ুকিকে বুকে চেপে ধরে অনেক্ষণ কেঁদেছিল। ইয়ুকিকে বলল, “তোর বাবা আর বেঁচে নেই, ওকিনাওয়া যুদ্ধক্ষেত্রে মারা গেছে!”

তার কিছুদিন পরে টাউন কাউন্সিল অফিস থেকে মহিলাকে কিছু টাকা ও একটি সার্টিফিকেট দিল। সার্টিফিকেটে ইয়ূকির বাবা সাইতো সানের একটি ছবি রয়েছে। ইয়ুকি তখন তৃতীয় শ্রেনীর ছাত্রী। কিন্তু ওকিনাওয়া আক্রান্ত হওয়ার পরে তার স্কুলটি বন্ধ করে দেয়। 

সেই গ্রামের অনেকে তাদের স্বজনের মৃত্য সংবাদ পেয়েছে। ইদানিং মৃত্যু সংবাদ এই গ্রামের লোকদের নিকট একটি সাধারণ ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। পাড়া প্রতিবেশীরা এসে ইয়ুকির মাকে সান্তনা দিয়ে বলেছে, “তোমার স্বামী দেশের স্বার্থে প্রাণ দিয়েছেন, তা তো বড় গর্বের কথা। কেঁদে কোন লাভ নেই। এখন আমাদের দেশ জাপান যেন যুদ্ধে জয়লাভ করে সেই প্রার্থনা কর।”

দুই বৎসর পূর্বে দক্ষিণ পাড়ার আদাচি সান গোয়াডাল সলোমনের কেন্যানাল দ্বীপে মৃত্যু বরণ করেছে। তার বৌ বেশ সুন্দরী, কোন সন্তানাদি নেই, অল্প বয়স, স্বামী বিয়ের ছ’মাস পরে যুদ্ধে গেল, আর ফিরে এলনা। আদাচির বউ এখন সেনা বাহিনীর স্বার্থে কাজ করছে। এই কথাটা ইয়ুকির মাকে বলল দক্ষিণ পাড়ার পঞ্চাশ বৎসর বয়সি বিধবা সুজুকির মা।

“আদাচির অল্পবয়স্কা সুন্দরী স্ত্রী এখন সেনা বাহিনীর স্বার্থে কাজ করছে, এর মানে কি?” ইয়ুকির মা জানতে চাইল।

জবাবে সুজুকির মা বলল, “সেনা বাহিনীর জোয়ান পোলারা প্রাণপণ যুদ্ধ করছে, দেশের জন্য প্রাণ দিচ্ছে। তারা তো তরুণ বয়সে তাদের জীবন পণ রেখে যুদ্ধ করে যাচ্ছে। জাপানের সার্থ  রক্ষা জন্য। সম্রাটের জয়ের জন্য তাদের এই আত্মত্যাগ। তাদের ভোগ বিলাসের জন্য সুন্দরী কম বয়সী বিধবা বউ অর্থাৎ যারা অল্প বয়সে তাদের স্বামী হারিয়েছে, তাদেরকে এজ়েন্টরা তাদের ডিউটি কি তা বুঝিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। তারা আমাকে বলেছে, “আমাদের জোয়ানদের জন্য তোমার মত অল্পবয়স্কা মহিলার প্রয়োজন। তাছাড়া তোমার স্বামী যখন মারা গেছে সে তো আর কখনো ফিরবে না। তোমার এত সুন্দর রূপ-যৌবন আমাদের জোয়ানদের জন্য বিলিয়ে দিলে মন্দ কি?”

তাই বলে তাদের কথায় রাজি হয়ে আদাচির বউ চলে গেল? ইয়ুকির মা জিজ্ঞাসা করল।

“চলে যাবেনা তো ঘরে বসে থেকে লাভ কি বলতো শুনি? তার বয়স মাত্র কুড়ি। এদিকে জোয়ানরা যুদ্ধ ক্ষেত্রে প্রাণ দিচ্ছে। জোয়ান মহিলারদের কি তাদের জন্য কিছুই করার নেই?”   

চমকে উঠল ইয়ুকির মা। বুড়ির কথা শোনে তার গলা শুকিয়ে গেল। কুৎসিত এক আতঙ্কের ছায়া দেখতে পেল ইয়ুকির মা। ঢোক গিলে বলল, “আপনি আমাকে এসব কথা শোনাচ্ছেন কেন?”

ইয়ুকির মায়ের প্রশ্ন শুনে খিক খিক করে হাসল সুজুকির মা। তারপর বলল, “তোমাকে বলছিলাম এই জন্য যে তোমার বয়স তো কম। সমস্যা শুধু তোমার এই মেয়েটি…!?”

বুড়ির কথা শেষ করার পূর্বেই ইয়ুকির মা বলল, “তাহলে আপনিও এজেন্টদের পক্ষে কাজ করছেন?”

“না, না, কাজ করি কথাটা ঠিক নয়। আমি শুধু তোমাকে আদাচির বউয়ের কথাটা বললাম। ভাল মন্দ এখন তুমি চিন্তা করে দেখ!”

এবার ইয়ূকির মা রেগে গিয়ে বলল, “ কিছুতেই না। আপনি আর আমার কাছে আসবেন না। আমার ইয়ুকিকে নিয়ে আমি জনম কাটিয়ে দিতে পারব। মনে রাখবেন যে আদাচির বউয়ের মত নারী আমি নই!”

সুজুকির মা উঠে দাঁড়িয়ে বলল, “এত রাগ দেখাও কেন? ভালমত চিন্তা করে দেখ। সেটাও কিন্তু একটি কাজ। তাছাড়া তুমি মাসোহারাও পাবে!”

এবার ইয়ুকির মা ভীষণ রেগে গেল। সে তাকে বলল, “এখান থেকে এক্ষুণি যান আপনি। দাঁড়িয়ে আছেন কেন – চলে যান বলছি!”

সুজুকির মায়ের কথাগুলি রাতে ঘুমাবার পূর্ব পর্যন্ত ইয়ুকির মায়ের কানে তখন মেশিন গানের ঠাঃ ঠাঃ ঠাঃ ঠাঃ শব্দের মত বাজতেছিল। রাগে এবং স্বামীর মৃতুর শোকে রাতে সে কিছুই খেলো না।নির্ঘুম রাত্রি কাটিয়ে সকালে উঠে ইয়ুকিকে বুকে চেপে ধরে বলল, “ইয়ুকি কাল আমি শহরে যাব, সঙ্গে যাবি?”

“যাবো মা। আমাকে একা ফেলে তুমি কোথাও যেও না”।   

পরের দিন সকালে একটি পল্ট্রি ফার্মে ইয়ুকির মায়ের কাজ হলো। বাসে করে প্রতিদিন কাজে গেলে তার পোষাবে না। তাই সাইকেলে দশ কিলোমিটার পথ যাবে মনস্থ করল। সকালে ইয়ুকিকে কোন প্রকারে বুঝিয়ে ঘরে রেখে প্রতিদিন কাজে যায় ইয়ুকির মা। 

তারপর কয়েক মাস বেশ ভালই যাচ্ছিল মা ও মেয়ের। প্রথম মাসের বেতন হাতে নিয়ে ঘরে ফিরে এসে ইয়ুকিকে বলল, “এখন আর আমাদের কোন চিন্তা করতে হবেনা ইয়ুকি। নিয়মিত কাজ করলে আমাদের ভাত কাপড়ের কোন অভাব হবে না।”  

ইয়ুকি বলল, “আমাদের স্কুল কখন খুলবে মা?”

মেয়ের এই প্রশ্নের কি জবাব দিবে সে ভেবে পাচ্ছিলনা। কিছুক্ষণ চিন্তা করে বলল, “এই তো আর মাস খানেক পরে সব ঠিক হয়ে যাবে। যুদ্ধ কি আর চীরদিন থাকবে?”

কথাটা বলে আবার নতুন ভাবনায় পড়ল ইয়ুকির মা। মনে মনে ভাবছে, যুদ্ধ থামলে কি আর না থামলেও বা কি – ইয়ুকির বাবা তো আর ফিরে আসবে না। তাছাড়া দেশে যে অভাব দেখা দিয়েছে এখন ভাবতেও খারাপ লাগে। আজকাল বাজারে নিত্য প্রয়োজনীয় খাবার পর্যন্ত পাওয়া যায় না। হাতে টাকা থাকলে কি হবে, যদি বাজারে আটা চাউল পাওয়া না যায়? ফার্মের একজন মহিলা বলেছে যে তিন দিন আগে দূরের শহরগুলি থেকে ব্যবসায়ীরা এসে বাজারে সব আলু, গম, চাউল কিনে নিয়ে বন্দরে জাহাজ বোঝাই করে নিয়ে গেছে। আবার অনেকে বলেছে যে ওসাকা এবং টোকিও থেকে পাইকাররা এসে সব কিনে নিয়ে যায়।  এই সব নানা ভাবনায় ইয়ুকির মায়ের মনে ভয় জনিত এক আতংক দেখা দিল। মাঝে মাঝে সে ইয়ুকিকে জড়িয়ে শুধু কাঁদে।

তুমি কাঁদো কেন মা? ইয়ুকি জিজ্ঞাসা করে।

না, কৈ কাঁদিনি তো?

না, তুমি লুকিয়ে লুকিয়ে কাঁদো আমি দেখেছি মা।

সামান্য কাঁদলে আর কী দোষ ইয়ুকি? তুই কিছু মনে করিস নে। মাঝেমাঝে তোর বাবার কথা যখন মনে পড়ে তখন আমার কেন জানি কান্না আসে। 

‘আচ্ছা মা’, ইয়ুকি বলল, ‘আমি শুধু ভাবছি বাবার লাশটা নিয়ে আসছে না কেন? পূর্ব পাড়ার সাইয়োরির বাবার লাশ এনে দিয়ে গেল সেদিন। তার বাবার লাশ পুড়িয়ে ছাইগুলি ঘরে এনে রেখেছে। উনচল্লিশ দিন পরে ছাই গুলি কবরে রাখবে সাইয়োরি আমাকে বলেছে।

মেয়ের এই প্রশ্নের কি উত্তর দিবে কিছু খুঁজে পেলোনা ইয়ুকির মা। কিছুক্ষণ পরে বলল, ‘যুদ্ধ শেষ হলে একদিন নিশ্চয়ই তোর বাবার লাশ নিয়ে আসবে!’ তারপর প্রসংগ পাল্টিয়ে বলল, সাইয়োরি যখন তার বাবার লাশের কথা বলছিল, তখন সে খুব কেঁদেছে, তাই না ইয়ুকি?

ইয়ুকি বলল, “কি যে বল তুমি। সাইয়োরি খুব কেঁদেছে। কাল যখন তুমি কাজে গেলে তখন সাইয়োরি ও আমি স্কুলের কাছে যে বড় বার্চ গাছটা আছে, সেই গাছটির শিখরের উপরে দু’জনে বসে অনেক্ষণ কেঁদেছি!”  

কি বললি, তুই আমার আগোচরে কেঁদেছিস সে কথা ভাবতেও আমার খারাপ লাগে। এখন আমার নিকট প্রতিজ্ঞা কর ইয়ুকি, তুই আর কোন দিন আমার অগোচরে কাঁদবি না। এই বলে মেয়েকে জড়িয়ে ধরে নিজের অজান্তেই কিছুক্ষণ কাঁদল ইয়ুকির মা।

ইয়ুকি মায়ের কান্না দেখে বলল, “মা, তুমি আমার নিকট প্রতিজ্ঞা কর যে আর তুমি আমার সামনে কাঁদবে না!”

“ঠিক আছে, আর আমি তোর সামনে কাঁদব না, প্রতিজ্ঞা করলাম!” 

মাস খানেক পরে সবাই লক্ষ করল যে আজ কাল আমেরিকার যুদ্ধবিমানগুলো হিয়োসি গ্রামের উপর দিয়ে বিকট আওয়াজ করে উড়ে যায়। সাপ্তাহখানেক পূর্বেও এলাকার লোক অ্যামেরিকার বিমান জাপানের মূল ভূখন্ডের উপরে উড়তে দেখনি।  

একদিন ইয়ুকি বলল, যুদ্ধবিমান দেখলে আমার বড় ভয় লাগে মা। 

পাগল নাকি, ইয়ুকির মা মেয়েকে শান্তনা দিয়ে বলল, গ্রামের উপর দিয়ে গেলে কি হয়। সেগুলি তো আর আমাদের গ্রামে বোমা ফেলবে না।

“সত্যি বলছ মা?” 

অবশ্যই সত্যি বলছি, তারা গ্রামে বোমা ফেলে পাবলিক মারবে কেন? এরা সম্ভবতঃ আমাদের জাপানী সেনা বাহিনীর ঘাটি গুলোর উপর হামলা করতে আসে। 

তা হলে আমাদের কি হবে মা? আতঙ্কিত কন্ঠে ইয়ুকি জানতে চাইল।

এখন কী আর হবে। যখন আমাদের সেনাবাহিনীর ঘাটিগুলোতে বোমা ফেলতে যাবে তখন আমাদের সেনা বাহিনী সেগুলোকে একটার পর একটা করে গুলি করে ফেলে দিবে। তাছাড়া আমাদের সেনাবাহিনী অনেক সাহসী এবং শক্তিশালী। শত্রুপক্ষের কোন যুদ্ধ বিমান তাদের ক্ষতি করতে পারবে না।

মায়ের শান্তনার কথা শোনে ইয়ুকি দীর্ঘনিশ্বাস নিল। কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল, “তা হলে আমার বাবাকে তারা কি করে হত্যা করল বলো আমাকে?”

এবার মেয়ের এই প্রশ্ন শোনে সমস্যায় পড়ল ইয়ুকির মা।

“মা কিছু বলছ না কেন? আমার বাবাকে তারা কি করে হত্যা করল?” ইয়ুকি ফুঁপিয়ে কেঁদে বলল।

‘এখন বল, বাবার চিঠি কেন আসেনা? বাবার লাশ নিয়ে আসছেনা কেন? ইয়ুকি দু’হাতে মায়ের কাঁধে ধরে ঝাকুনি দিয়ে বলল, বল মা বাবার লাশ কেন নিয়ে আসছে না কেন তারা?

ইয়ুকির মা সেদিন মেয়ের এই শক্ত প্রশ্নের কোন উত্তর দিতে পারল না। নীরবে কাঁদল কিছুক্ষণ। 

১৯৪৫ সালের জুলাই মাসে পল্ট্রি ফার্মটির উপর আগুনে বোমা ফেলল আমেরিকার যুদ্ধ বিমান। ধাউ ধাউ করে পল্ট্রি ফার্মটি নিমেষে জ্বলে ছাই হয়ে গেল। দুই হাজার মুরগী আর সাত জন কর্মচারী সেখানে মারা গেল। তাদের মধ্যে ইয়ুকির মা একজন।

ইয়ুকিকে স্থানীয় ভলেন্টিয়ার এসে জিপে উঠিয়ে নিয়ে গেল। চিৎকার করতে করতে ইয়ুকি ফার্মের কাছে গেল। দমকল বাহিনী ততক্ষণে আগুন নিভিয়েছে। পোড়া গন্ধে  ফার্মটির কাছেও ঘন্টাখানেক কেউ যেতে পারেনি। 

ভলেন্টিয়াররা ইয়ুকিকে নিয়ে লাশ সনাক্ত করতে চেষ্টা করতে লাগল। কিন্তু কোন লাশই কেউ সনাক্ত করতে পারল না। ইয়ুকি এতদিন তার বাবার লাশ নিয়ে আসছেনা কেন সেকথা বার বার তার মাকে জিজ্ঞাসা করেছিল। কিন্তু তার ভাগ্য যে তার সাথে এমন নিষ্ঠুরভাবে প্রতারণা করবে সেকথা এই অবুজ শিশুটি কখনো ভাবে নি। বাবার লাশ তো দূরের কথা, আজ হতভাগী এই মেয়েটি তার জীবনে প্রথম এমন এক চিরন্তন সত্যকে আবিষ্কার করল যা সে কোনদিন ভাবতেও পারেনি। কী দুর্ভাগ্য আজ ইয়ুকি তার নিজের মায়ের পোড়া লাশটাও সনাক্ত করতে পারল না। বোবার মতো বসে রইল। তার মুখের কথাও বন্ধ হয়ে গেল। ভলেন্টিয়াররা তাকে অনেক কিছু জিজ্ঞাসা করল, কিন্তু ইয়ুকি তাদের কোন প্রশ্নের উত্তর দিল না। সেদিন রাতে সে ভলেন্টিয়ার ক্যাম্পে রইল। রাতের খাবারও তাকে কেউ খাওয়াতে পারল না। সে যেন সত্ত্বাহীন নির্বাক বোবা হয়ে গেছে। 

সকালে ঘুম থেকে উঠে ইয়ুকি প্রথম কথা বলল, আমি এখন ঘরে ফিরে যাব। দয়াকরে আমাকে আপনারা ঘরে দিয়ে আসেন। 

সেদিন ভলেন্টিয়ার সবাই বসে মিটিং করল। এতিম ইয়ুকিকে তার ঘরে দিয়ে আসা আদৌ সংগত হবে কিনা সে ব্যাপারে তারা কথা বলল। কয়েক মাস আগেও শিশুদের রাখার নির্দিষ্ট স্থান ছিল। কিন্তু বোমায় একত্রে বেশী শিশু মারা যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে বলে শিশুদের আর সেখানে রাখছে না। 

ইয়ুকি আবার বলল, দয়াকরে আপনারা আমাকে আমার ঘরে দিয়ে আসেন!

ঘরে তুমি একা থাকতে পারবে তো? একজন ভলেন্টিয়ার জিজ্ঞসা করল।

হ্যাঁ, একলা আমি থাকতে পারব। রাতে আমি পাশের বাড়ির খালার ঘরে গিয়ে ঘুমাবো। 

ভলেন্টিয়ার বিলম্ব না করে ইয়ুকিকে তার ঘরে দিয়ে গেল। তারা পাশের বাড়ির মহিলাকে বলল, “ইয়ুকির প্রতি একটু নজর রাখবেন। আমরা প্রতিদিন তার খাবার নিয়ে আসব!”  

এইভাবে সপ্তাহখানেক গেল। এদিকে পরিস্থিতির দ্রুত পরিবর্তন হচ্ছিল। ইয়ুকি সারাদিন মা মা বলে কাঁদে রাতে তার পড়শি খালার বাড়িতে গিয়ে ঘুমায়। এদিকে যুদ্ধের প্রচন্ডতা দিনের পর দিন বাড়ছেই। স্বেচ্ছাসেবী ভলেন্টিয়ারদের মনোবল ধীরে ধীরে ভেঙ্গে গেল। তারা এতদিন এদিক সেদিক থেকে খাবার সংগ্রহ করে অনাথ শিশুটিকে দিয়েছে। এখন মনোবল হারিয়ে তারা বিভিন্ন দিকে চলে গেছে। ভলেন্টিয়ার এখন আর ইয়ুকির খাবার নিয়ে প্রতিদিন আসে না। 

পাশের বাড়ির খালার ছেলেটি ‘কামিকাজে’ বিমান যোদ্ধা ছিল। আজ একটি চিঠি এল তাঁর কাছে। তাতে লিখা আছে, “দেশের স্বার্থে আপনার ছেলে বীরের মতো প্রাণ দিয়েছে। তার এই আত্মত্যাগ কখনো বৃথা যাবে না।”

চিঠি পড়ে বুকফাটা কান্না এসে মহিলাকে স্তব্ধ করে দিল। মহিলা পাথরের মতো কিছুক্ষণ বসে রইলেন। ইয়ুকি এসে জিজ্ঞাসা করল, “কি হয়েছে খালা, তুমি চুপ করে আছ কেন?” 

মহিলা কোন উত্তর না দিয়ে ইয়ুকিকে বুকে চেপে ধরে কাঁদতে লাগলেন।    

ভলেন্টিয়াররা এখন ইয়ুকির খাবার নিয়ে আসে না। একদিন খালা বললেন, “ইয়িকি তুমি এখন অন্য কারো বাড়িতে থাক, আমি আগামীকাল গ্রাম ছেড়ে অন্যত্র আমার মায়ের নিকট চলে যাব। যদি তুমি আমার সাথে যেতে চাও, তোমাকে আমি সঙ্গে নিয়ে যাব। কারণ এ গ্রামে থাকতে আমার আর ভাল লাগছে না।”

খালার প্রস্তাবে ইয়ুকি সঙ্গে যেতে রাজী হল না। বলল, খালা আমি সাইয়োরিদের বাড়িতে চলে যাব। মহিলা বললেন, “ভালমত চিন্তা করে দেখ সাইয়োরিদের বাড়িতে তোমাকে থাকতে দিবে কি না!” 

“থাকতে যদি না দেয় তাহলে আমাদের ঘরে আমি একলাই থাকব। খালা আমার জন্য আপনি কোন চিন্তা করবেন না!” 

‘ঠিক আছে, তাহলে তাই করো!’

পরের দিন পূর্ব পাড়ার সাইয়োরিদের বাড়িতে গেল ইয়ুকি। সাইয়োরির মা বললেন, “আমাদের সাথে থাকতে চাও তো থাক। কিন্তু আমাদের ঘরে দু’দিন যাবত খাবার মতো কিছু নেই। বলতে গেলে আমরা উপোস করছি। আলুর লতা সয়স্‌ দিয়ে সিদ্ধ করে খাচ্ছি।” 

ইয়ুকি বলল, “কি বললেন খালা আপনাদের ঘরে খাবার নেই?” না, নেই!

সে তৎক্ষণাৎ সাইয়োরির হাত ধরে বলল, “সাইয়োরি তুমি আমার সাথে চল। আমাদের ঘরে কিছু চাউল ও আটা আছে। সেগুলি তোমাদের ঘরে নিয়ে আসব। রান্না করে আজ রাতে সবাই মিলে খাব!”

সাইয়োরি যেতে রাজি হল। এই দু’টি শিশু তাদের কঠিন জীবনের মূল্যবোধ কতটুকু তখন  বুঝতে পাড়ল কেউ তা জানল না। তবে তারা তাদের জীবন সংগ্রামে নেমে দৌড়ে পশ্চিম পাড়ায় ইয়ুকিদের ঘরে এসে খুঁজে সের পাঁচেক চাউল ও সের তিনেক আটা পেল। এগুলি দেখিয়ে ইয়ুকি সাইয়োরিকে বলল, “মা প্রথম মাসের বেতন পেয়ে এগুলি কিনে এনেছিলেন!” তারপর ভাগাভাগি করে দু’জনে দু’বারের মাথায় এসে সেগুলি সাইয়োরিদের ঘরে নিয়ে গেল। 

সাইয়োরির মা সেগুলি দেখে অবাক হয়ে বললেন, “ইয়ুকি এত খাদ্য তোমাদের ঘরে ছিল?”

হ্যাঁ ছিল। মা প্রথম মাসের বেতন পেয়ে এগুলি কিনে এনে বলেছিলেন যে বাজার থেকে নাকি খাদ্যদ্রব্য উধাও হতে যাচ্ছে। তাই কিছু বেশী কিনে এনেছিলেন!”  

তোমার বুদ্ধির প্রশংসা করি মা। তোমার মা সত্যি কথাই বলেছিলেন। আমাদের হাতে টাকা আছে, কিন্তু বাজারে আলু পর্যন্ত পাওয়া যায় না।     

সে রাতে সাইয়োরি ও ইয়ুকি একসাথে বিছানায় শোয়ে দু’জনে কন্ঠ মিলিয়ে একটি গান গাইল।

 

তরিইয়ান্‌জে ‌তরিয়ান্‌জে   

ককো ওয়া দকো নো হছোমিচি য্যা

তেনিন-সামা নো হছোমিচি য্যা

চিইতো তো অসিতে কুদাশানোছে

গইয়ু নো নাই মনো তোঅশা ছেনু

কনো ক’নো নানাৎচু নো অইওয়াইনি- 

অ ফুদা অ অসামে নি মাইরিমাৎচু; 

ইকিওয়া ইয়োই ইয়োই, কায়েরিওয়া কোওয়াই! 

কোওয়াই নাগারা মো তরিইয়ান্‌চজে, তরিইয়ান্‌জে।

বাংলাঃ

এগিয়ে যাও – এগিয়ে যাও

কোথায় গিয়েছে সরু এ পথ    

এটা যে তেঞ্জিন মন্দিরের পথ।

দয়া করে যেতে দিন- যেতে দিন,

বিনা কাজে কেউ সেথা যেতে পারেনা। 

এই শিশুটির এখন সাত বৎসর- 

তাই তার উদ্‌যাপন করতে যাচ্ছি। 

যাওয়া বড় সহজ কিন্তু ফিরতে লাগে ভয়! 

ভয় যদি লাগেও এগিয়ে যাও এগিয়ে যাও। 

ইয়ুকি সাইয়োরির সাথে দিন কয়েক হেসে কেঁদে ভালই ছিল। ১৯৪৫ সালের ৬ তারিখ সোমবার আমেরিকা হিরোসিমাতে প্রথম আনবিক বোমা ফেলার পর একদিন হঠাৎ পঞ্চাশ যাট জনের মত কিছু লোক দৌড়ে হিয়োসি গ্রামে এসে বলল, “যদি জানে বাঁচতে চাও বাঙ্কারের ভিতরে থাক। আমেরিকানরা হিরোসিমাতে আনবিক বোমা ফেলেছে। চারিদিক দাউ দাউ করে জ্বলে যাচ্ছে। তোমরা ঘরের বাইরে বেশীক্ষণ থাকবে না। প্লেনের আওয়াজ বা সাইরেনের আওয়াজ শোনলেই বাংকারের ভিতরে বসে থাকবে!” 

এরা হল সেনা বাহিনীর বিচ্ছিন্ন একটি গ্রুপ কিংবা স্থানীয় ভলেন্টিয়ার। শহর থেকে গ্রামে এসে সবাইকে সাবধান করে দিতে এসেছে। চেহারা দেখলে মনে হয় যেন তারা নার্ভাস বোধ করছে। কয়েক রাত না ঘুমালে মানুষের যে চেহারা হয়, তাদের দেখতে ঠিক তেমন মনে হল।  

সাইয়োরির মা বলল, “আমাদের গ্রামও জ্বালিয়ে দিবে না কি! বলুন তো তাহলে আমরা কোথায় যাব?”

একটি অফিসার তার সামনে দাঁড়িয়ে বলল, “এই গ্রামে আক্রমণ করবে মনে হয়না। তবে আপনারা কোন প্লেনের শব্দ শোনলে বাংকারের ভিতরে চলে যাবেন!”

অফিসারটি কিছু দূরে যাওয়ার পর সাইয়োরির মা ডাক দিল, “এই যে শোনেন, আমার আরেকটি প্রশ্ন করার আছে!”

কি প্রশ্ন আপনার, বলুন!

জাপান কি যুদ্ধে হেরে যাবে মনে করেন?

অফিসারটি কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। সে হয়তো যথার্থ কি জবাব দিবে তা ভাবছিল। দু’পা এগিয়ে এসে অনুচ্চ স্বরে বলল, “মনে হয় না!”

তার কথা শেষ হওয়ার আগেই পাঁচ ছ’জন সৈনিক কাছে এসে বলল, “সার্জেন্ট আপনি মহিলাকে “মনে হয় না” বললেন কেন? এ ধরণের কথা পাবলিকের কাছে বলা অন্যায় নয় কি?” 

চিৎকার করে সৈন্যগুলি কথা বলাতে অন্যান্য সৈন্যরাও এগিয়ে এসে বলল,”কি হয়েছে?”

যে সৈন্যটি সার্জেন্টের সাথে কথা বলছিল সে জবাব দিল, “কিচ্ছু হয়নি; বল, বাঞ্জাই।

সবাই বলিষ্ঠ কন্ঠে বলল, “বাঞ্জাই”।

আবার বল, বাঞ্জাই!

সবাই একসাথে আবার বাঞ্জাই বলল।

থামছ কেন তোমরা বাঞ্জাই বলতে বলতে বন্দরের দিকে চল।

সৈন্য গুলি বাঞ্জাই ধ্বনি দিতে দিতে বন্দরের দিকে চলে গেল।

ইয়ুকি, সাইয়োরি ও তার মা নিরবে তাদের চলে যাওয়ার পথের দিকে চেয়ে রইল।

স্তব্ধতা ভেঙ্গে সাইওরির মা বলল, চল রেডিওটা অন্‌ করে খবর শুনি!

তারা ঘরে গিয়ে রেডিওটা অন্‌ করল। তখন প্রধানমন্ত্রী জেনারেল তজো হিদেকি ভাষণ দিচ্ছেন, “শত্রু আমাদেরকে আত্মসমর্পণ করার কথা বলছে। কিন্তু তাদেরকে বলছি যে বিজয় ছাড়া জাপান আর কিছু বুঝে না। এখন রাতের আকাশ দিয়ে যে সব সেনারা উড়ে যাচ্ছে সে গুলো আমাদের বীর সেনাবাহিনীর সদস্য তারা। সেগুলো যখন শত্রুর জাহাজের উপরে আঘাত হানবে তখন কাদার উপর ভারী কিছু পড়লে সেই কাদা যেমন চারিদিকে ছিটকে যায়, ঠিক তেমনি সেই শত্রুদের যুদ্ধ জাহাজ গুলিকে তারা ধ্বংশ করে ছিটকে দিবে এবং দিচ্ছেও। এখন জাপানের সামনে জয় ছাড়া অন্য কোন পথ খোলা নেই।”

উল্লেখ্য যে হিরোসিমা আনবিক বোমা দিয়ে ধ্বংস করার পরে কিংবা পূর্বক্ষণে আমেরিকা জাপানকে আত্মসমর্পণের কথা বলায় প্রথানমন্ত্রী জেনারেল হিদেকি তজো তার ভাষণে এই বক্তব্য রাখেন।  

ইতিহাস থেকে যতটুকু জানা গেছে তা হলো, ওকিনাওয়া হাতছাড়া হওয়ার পরে তজো আত্মঘাতি কামিকাজে বিমান হামলার সিদ্ধান্ত নেয়। তাতে ভাল ফল পাওয়া গিয়েছিল। তখন আমেরিকার অনেক যুদ্ধ জাহাজ কামিকাজে সৈন্যদের আত্মঘাতি বোমার হামলায় ডুবে যায়। এক কথায় বলা যায় যে আমেরিকার নৌবহরকে প্রায় থামিয়ে দিয়েছিল এই কামিকাজে জিরো ফোর্স। জেনারেল ম্যাকআর্থার তখন ফিলিপাইন থেকে যুদ্ধ পরিচালনা করছিলেন।  নৌবাহিনীর ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি দেখে ম্যাকআর্থার প্রেসিডেন্ট রুজভেল্টকে আনবিক বোমা দিয়ে আক্রমণ করার ব্যাপারে অনুমতি চেয়েছিলেন। তার পরেই হিরোসিমাতে আনবিক বোমা দিয়ে আঘাত করা হয়। 

আত্মসমর্পণের ব্যাপারে তজো হিদেকির ভাষণ শুনে তার তিন দিন পরে আমেরিকা দ্বিতীয়বার নাগাসাকিতে আবার আনবিক বোমা দিয়ে আঘাত করে। এর ফলে লাখো লাখো পাবলিক মৃত্যুবরণ করে। কেন পর পর দু’টি আনবিক বোমা দিয়ে হামলা করেছিল – তার আসল কারণ জানার জন্য উল্টোভাবে একটু ভেবে দেখলেই সবকিছু পরিষ্কার হয়ে যাবে। তা হল,  জাপান আত্মঘাতি হামলা করে আমেরিকার নৌবাহিনীর মেরুদন্ড প্রায় ভেংগে দিয়েছিল। সে কথা ম্যাকআর্থার ভালমত অনুধাবন করতে পেরেছিলেন। তাই তার হাতের শেষ তুরুপের কার্ড ‘আনবিক বোমা’ দিয়ে জাপানের উপর আঘাত করেছিল। নতুবা জাপানের মূল ভূখন্ডে অ্যামেরিকানদের পা রাখতে অনেক বেশি সময় লাগত। 

দু’টি আনবিক বোমা দিয়ে আঘাত করার পরে জাপান আত্মসমর্পণ করেছিল। সম্রাট শোওয়া (হিরোহিতো) বেতারে ঘোষণা করার পরে জাপানের জনসাধারণ জানতে পারল যে জাপান সত্যিই পরাজয় বরণ করেছে। 

চলবে

প্রথম পর্ব লিংকঃ

ঐতিহাসিক উপন্যাসঃ ইয়ুকি একটি মেয়ের নাম

লেখকঃজাপান প্রবাসী কবি ও সাহিত্যিক 

আরও পড়ুন

উত্তর দিন

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রচার করা হবে না.