একটি ভৌতিক সন্ধ্যা

শাহীন আক্তার স্বাতী

জাপানে এখন শরৎ ঋতু বিদায় নেবার প্রস্তুতি নিচ্ছে। চলছে পাতা ঝরার মৌসুম। বাহারী রঙের শুকনো পাতা যেনো প্রকৃতিকে নতুন রুপে সাজিয়ে যাচ্ছে। চোখ ধাঁধানো প্রকৃতির এমন রুপ দেখতে দেখতে রেলস্টেশন থেকে প্রতিদিন প্রায় পনের মিনিট পাহাড়ি ঢাল বেয়ে পৌঁছাই বাচ্চাদের হোইকুয়েনে। যথারীতি আজও ব্যতিক্রম হলো না। এখন বেলা বেশ ছোট। সাড়ে চারটায় সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসে। হোইকুয়েন থেকে বের হতেই বাচ্চাদের আবদার চকলেটের। চকলেট না নিয়ে বাড়ি ফিরবে না। কি আর করা, বাচ্চাদের আবদার মেটাতে রওনা হলাম কনভেনিয়েন্স স্টোর সেভেন ইলাভেনে। চব্বিশ ঘন্টা সেবা দিতে জাপানের কনভেনিয়েন্স স্টোরের জুড়ি নেই। সেভেন ইলাভেনে পৌঁছার পর দু ভাইবোন নিজেদের পছন্দমত চকলেট কিনলো। আমিও বাচ্চাদের জন্য কিছু খাবার কিনে বাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা হলাম। কিছু দূর যাবার পর কেনো জানি যে রাস্তা দিয়ে বাড়ির দিকে যাই, সে রাস্তা বাদ দিয়ে অন্য একটা রাস্তায় হাঁটতে শুরু করলাম। রাস্তার ঠিক বিপরীত দিকে একটা পরিত্যাক্ত গীর্জা আছে। সেখানে বাচ্চাদের খেলার জন্য স্লাইড আর সুইং আছে কিন্তু কোনদিন কাউকে এখানে খেলা করতে দেখিনি। আজ হঠাৎ দেখলাম দুটি মেয়ে আর একটি ছেলে বয়স ছয়/সাত হবে খুব আনন্দ নিয়ে সেখানে খেলা করছে। মেয়ে দুটি দেখতে অবিকল এক রকম। যমজ বোন। ছেলেটি খুব সম্ভবত ভাই । ওদের খেলতে দেখে আমার বাচ্চারা সেদিকে খেলার জন্য ছুটে গেলো। আমিও কেনো জানি নিষেধ করলাম না। সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসছে । সেদিকে আমার খেয়াল নেই। আমি অবচেতন মনে বাচ্চাদের নিয়ে সেই পরিত্যক্ত গীর্জার সামনে গেলাম। আমার মেয়ে দৌড়ে স্লাইডের উপর উঠে গেলো। ছেলেটি আর মেয়েটি একটি বল নিয়ে খেলছে। আর আরেকজন মেয়ে চুপচাপ দাঁড়িয়ে খেলা দেখছে। আমার ছেলে খুব চাচ্ছে ওদের সাথে খেলতে কিন্তু ওরা যেনো আমার ছেলের দিকে ফিরেই তাকাচ্ছে না। আমার ছেলে কত কথা বলছে কিন্তু ওরা আপন মনে খেলেই যাচ্ছে। দূর থেকে পরিচিত কন্ঠ শুনতে পেয়ে দেখি হোইকুয়েনের রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে প্রিন্সিপাল এনসো সেনসেই আমার ছেলেমেয়েকে ডাকছে। তিনি বারবার বাসায় ফিরে যেতে বলছেন।
আমি তখন বাচ্চাদের নিয়ে সেখান থেকে বের হয়ে বাড়ির দিকে পা বাড়ালাম কিন্তু বাড়ির পথ যেদিকে আমি সেদিকে না গিয়ে বাচ্চাদের নিয়ে অন্য পথে হাঁটতে শুরু করলাম। একদম তিন সন্ধ্যা । আমার অচেনা পথ কেবল আমাকে উঁচু পাহাড়ের দিকে নিয়ে যাচ্ছে । আমার মেয়ে আমাকে জিজ্ঞেস করল এ পথে কি বাসায় পৌঁছানো যাবে? আমার মনে খটকা লাগলো। থমকে দাঁড়ালাম। আমিতো ভুল পথে যাচ্ছি। আমারতো পেছনের পথে যাবার কথা। হঠাৎ সেই তিন ভাইবোন যারা গীর্জার সামনে খেলছিলো তারা এসে দাঁড়ালো সামনে। তিনজনেরই দুচোখ রক্ত বর্ণ এবং দাঁতগুলো ভয়ঙ্কর! আমাদের দিকে তাকিয়ে বললো, চকলেট না দিয়ে কোথায় যাচ্ছ ? আমাদের দিকে হাত বাড়িয়ে এগিয়ে আসলো। ভয়ে তখন আমাদের অবস্থা কাহিল! মনে পড়ল, আমাদের সাথে অনেকগুলো চকলেট আছে। সঙ্গে সঙ্গে  চকলেট ভরা পলিথিনের ব্যাগটি ওদের দিকে ছুড়ে দিয়ে মা ছেলেমেয়ে মিলে দৌড় দিলাম। দৌড়াতে দৌড়াতে আবারও হোইকুয়েনের সামনে এসে দাঁড়ালাম। এনসো সেনসেই তখনও সেখানে দাঁড়িয়ে। আমাকে হাঁপাতে দেখে চিন্তিত হয়ে জিজ্ঞেস করলেন, “তোমরা এখনও বাসায় যাওনি? ওদিকে কোথায় গিয়েছিলে? আর পুরাতন গীর্জায় কেউ প্রবেশ করে না। ওটা ভূতুড়ে।” তিনি জানালেন আমার ছেলেকে দূর থেকে দেখেছেন অদৃশ্য কারো সাথে কথা বলছে। তখনই বাড়িতে ফিরে যাবার জন্য অনুরোধ করেছেন। তখন নিরুপায় হয়ে সব খুলে বললাম। সবকিছু শোনার পর এনসো সেনসেই যা বললো, তাতে আমাদের পায়ের নিচে মাটি ফাঁক হয়ে গেলো।

প্রায় দশ বছর আগের ঘটনা। পরিত্যক্ত সেই গীর্জার পাশে পুরোনো জনমানবহীন বাড়িটা পড়ে আছে, সেই বাড়িতে আওকি নামের এক মহিলা বাস করতেন। মহিলার সাথে দুটি যমজ মেয়ে আর একটি ছেলে থাকতো। সবাই জানতো ওরা সেই মহিলার সন্তান। একদিন হাঠাৎ করে পুলিশ সেই বাড়ি থেকে তিনটি শিশুর মৃতদেহ উদ্ধার করে। তাদের বিষ প্রয়োগে হত্যা করা হয়। এলাকায় চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়। গোয়েন্দা পুলিশের তত্বাবধানে পরে জানা যায় সেই মহিলাই ঐ তিন শিশুকে হত্যা করে প্রেমিকের সাথে পালিয়ে গেছে। শিশু তিনটি মহিলার স্বামীর প্রথম স্ত্রীর সন্তান ছিলো। দু বছর আগে একটি দুর্ঘটনায় তার স্বামীর মৃত্যু হয়। এরপর মহিলা অন্য একজনের সাথে সম্পর্কে জড়িয়ে পড়ে। সন্তানদের প্রতি দায়িত্ব এড়াতে এবং ঝামেলা মুক্ত হতে প্রেমিকের পরামর্শে খাবারের সাথে বিষ মিশিয়ে হত্যা করে শিশু তিনটিতে। জীবিত থাকতে প্রতিদিন বিকেলে তিন ভাইবোন মিলে গীর্জার পাশে খেলতে আসতো। লোকে বলে শরতের কোন এক শেষ বিকেলে শেষবারের মত ওরা এসেছিলো এখানে খেলতে। এরপর প্রতি বছর হ্যালুইন ডে তে ঐ গীর্জার পাশে বাচ্চাদের কলকাকলি শোনা যায়। অনেকে একা পথে কখনও কখনও ওদের ভৌতিক রুপ দেখতে পায়। যেমনটা আমরা পেয়েছি। সৎ মার ষড়যন্ত্রে প্রাণ হারানো শিশু তিনটির আত্মা আজও ভেসে বেড়ায় সন্ধ্যার বাতাসে। ওদের কান্নার শব্দে কখনও কখনও নিস্তব্ধ পথ থমকে দাঁড়ায়। পথিক ভয়ে দৌড়ে পালায় যেমনটি আমরা করেছি।

লেখকঃ সাহিত্যিক ও জাপান প্রবাসী বাংলাদেশী

আরও পড়ুন

উত্তর দিন

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রচার করা হবে না.