ঐতিহাসিক উপন্যাসঃ ইয়ুকি একটি মেয়ের নাম

আরশাদ উল্লাহ

পর্বঃ০৩

বাঞ্জাই শব্দটির মানে “জাপানের জয়।”

বাংকার প্রতিটি বাড়িতে তৈরি কারা আছে। ওকিনাওয়াতে ফিরে যাবার আগে ইয়ুকির বাবাও ঘরের পাশে বড় একটি বাংকার করেছিল। সাইয়োরিদের বাড়িতেও অনুরূপ একটি বাংকার রয়েছে। চলমান মহাযুদ্ধের ভয়াবহতা থেকে আত্মরক্ষার সহজ একটি পন্থা।বিমান হামলা হলে পরিবারের সবাই দৌড়ে গিয়ে এই বাংকারে মাথা গুঁজে। 

সাইয়োরি তার মাকে বলল, “বাংকার দিয়ে কি হবে মা। বাবা মারা গেলেন, ইয়ুকির মা ও বাবা দু’জনেই মারা গেলেন। একদিন হয় তো আমরা সাবাই মরে যাব, তাই না ইয়ূকি?”

নয় বৎসর বয়সের শিশুটির মুখে অভিমান ও হতাশার সুর।

ইয়ুকি বলল, “আমি ভাবছি আমাদের বেঁচে থাকলেই বা কি হবে আর মরে গেলেই বা কি হবে। আমার মনে হয় প্রাণের ভয়ে এখানে সেখানে পালিয়ে বেড়ানোর চেয়ে আমাদের মৃত্যু হলেই  সব সমাধান হয়ে যাবে। নয় কি?” 

সাইয়োরি অস্ফুট স্বরে বলল, “তাহলে চল আমরা দু’জনে একসাথে মরে যাই!” 

“মরি কি করে বল, মরার কোন পথ কি জানা আছে তোর?” প্রতিউত্তরে ইয়ুকি বলল।

“শোন! আমার মাথায় একটা বুদ্ধি এসেছে”, সাইয়োরি বলল। “যখন সাইরেন বেজে উঠবে এবং যুদ্ধবিমানের আওয়াজ শুনতে পাব – তখন আমরা বাংকারে না গিয়ে ঘরের সামনে দাঁড়িয়ে থাকব। আগুনে বোমা ফেললে আমরা দু’জন একসাথে মরে যাব!” 

ইয়ুকি বলল, এমন সুন্দর ধারণা কি করে তোর মাথায় এল। ঠিক আছে আমরা মরলে এই গ্রামেই মরব।

তারপর সাইয়োরি এবং ইয়ুকি একত্রে মৃত্যু বরণ করার প্রতিজ্ঞা করল।

সাইয়োরির মা রাতে নানাহ চিন্তা ভাবনায় ঘুমাতে পারছিল না। সাইয়োরির ও ইয়ুকির অস্বাভাবিক কথাগুলি শোনে রেগে গিয়ে বলল, “এমন ধরণের অলক্ষণে কথা বলবি না। যা নাকি আমার চিন্তার কারণ হয়, বুঝলি?

সাইয়োরি বলল, “মা আমাদের তো কেউ নেই। আমাদের ঘরে খাবারও নেই। এসব কথা যখন ভাবি তখন ভাল লাগে না গো – মা!”   

“আমার কথা শোন তোরা, যুদ্ধ শেষ হয়েছে। আজ সন্ধ্যায় সম্রাট শোওয়া সেকথা রেডিওতে ঘোষণা করেছেন।” 

সাইয়োরি তার মায়ের কথাগুলি শুনে কিছুক্ষণ ভেবে বলল। “তা হলে আমাদের এখন কি করতে হবে মা, বাজারে চাল, আটা কিনতে পাওয়া যাবে কি?

“তা জানি না। তবে যুদ্ধে জাপান হেরে গেছে। এখন কি হয় কে জানে। হয়তো বা পরিস্থিতি ধীরে ধীরে ভাল হবে নতুবা আরো খারাপ হবে!” 

“তা হলে আমেরিকার সৈন্যরা আমাদের গ্রামে বোমা ফেলবে না?” 

“হয়তো না, তবুও অনেক ভয়ের কারণ আছে!” 

‘কিসের ভয় মা?’ 

‘খাদ্যাভাব। আমেরিকার বোমাতে আর মরণের সম্ভাবনা নেই। তবে উপোস করতে হবে। দুর্ভিক্ষ হতে পারে!” 

মা শহরে গেলে খাবার কিনতে পারবে না?’ সাইয়োরি জিজ্ঞাসা  করল।

“শহরে খাবার থাকলে তো কিন্‌ব। সে যাই হোক, এখন তোরা ঘুমিয়ে নে, অনেক রাত হয়েছে!”

কিন্তু মায়ের কথা শোনে সাইয়োরি শান্ত হল না। বলল, ‘মা আমাদের বাড়ির পিছনের জমি থেকে মিষ্টি আলু তুলে নিয়ে গেছে। আমার মনে হয় মাটির নিচে যৎসামান্য হলেও আলু পাওয়া যাবে। আমরা সকালে কোদাল নিয়ে মাটি খোঁড়ে আলু পাই কিনা দেখব কি?’ 

সাইয়োরির মা বিরক্ত হয়ে বলল, সে ভাবনা কাল ভাবা যাবে।এখন তোরা ঘুমিয়ে নে!

সকালে সাইয়োরি ও ইয়ূকি একসঙ্গে বাড়ির অনতি দূরে একটি জমিতে আলু খুঁজতে গেল। সাপ্তাহ খানেক আগে এই জমির আলু তোলার কাজ শেষ হয়েছে। সেই জমিতে এই শিশু দু’টি কোদাল দিয়ে মাটি খুঁড়তে লাগল। কিন্তু আলু নেই। উঠানো আলু গাছ গুলির স্তূপে ছোট ছোট কিছু আলু রয়েছে। সেগুলি সংগ্রহ করে দু’জনে ঘরের সামনে গিয়ে দেখে দরজার সামনে দু’জন আমেরিকার সৈন্য দাঁড়িয়েছে আছে। ঘরের দরজা ভিতর থেকে আটকানো রয়েছে। ভয় এবং বিস্ময়ে সাইয়োরি চিৎকার করে মা, মা বলে ডাক দিল। ইয়ুকি বিদেশী সৈন্য দেখে ভয়ে কান্না শুরু করল।

সৈন্য দু’জন তাদের ঠোঁটে আঙ্গুল রেখে চুপ থাকার জন্য ইঙ্গিত করল। কিন্তু সাইয়ুরির কান্না থামল না। সে মা মা বলে তখন চিৎকার করতেই লাগল। বিরক্ত হয়ে একটি সৈনিক তার গালে থাপ্পড় মেরে থামিয়ে দিল। ইয়ুকি তা দেখে ভয়ে মাটির উপর চুপ করে বসে রইল। ইত্যবসরে ঘরের ভিতরে থেকে একজন সৈন্য বের হয়ে এল। তারপর দ্বিতীয় জন প্রবেশ করেল। সে বের হয়ে আসার পরে তৃতীয় জন ঘরে প্রবেশ করল। মাত্র পনর বিশ মিনিটের মধ্যে সাইয়োরির মাকে পরপর তিন জন আমেরিকান সৈন্য ধর্ষণ করল।  

সৈন্যগুলি সাইয়ুরি ও ইয়ুকিকে উঠানে থামিয়ে রেখেছিল। যাতে তারা ঘরে ঢুকতে না পারে। তারপরে তিনজন সৈন্য তাদের দু’জনকে ছেড়ে দিয়ে বন্দরের দিকে দ্রূত হেঁটে চলে গেল।  

অনাহার আর অর্ধাহারে সাইয়োরির মা অতিশয় দুর্বল হয়ে পড়েছিল। চিৎকার করার শক্তিও তখন তার ছিল না। সে বেহুস হয়ে বিছানায় পড়ে রইল। এদিকে শিশু দু’টি ঘরে প্রবেশ করে মহীলার এমন অবস্থা দেখে প্রথমে মনে করেছিল যে সৈন্যগুলি সাইয়োরির মাকে হত্যা করে চলে গেছে। সাইয়োরি মায়ের কানের কাছে মুখ নিয়ে ‘মা’ বলে ডাক দিল। কিন্তু তার মা কোন জবাব দিল না। তারপর আবার মা মা বলে ডাক দেওয়ার পরে সাইয়োরির মা চোখ মেলে দেখল। কিন্তু কোন কথা বলতে পারল না। 

এবার ইয়ুকি ডাক দিল, “খালা, আমরা আলু নিয়ে এসেছি আপনি উঠেন!”

সাইয়োরির মা হাত তুলে কোনপ্রকারে ইঙ্গিত করে বলল, “তোরা বাইরে গিয়ে কিছুক্ষণ অপেক্ষা কর। আমি ডাক দিলে ঘরে প্রবেশ করবি!” 

বোবার মতো মেয়ে দু’টি কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে ব্যাপার কি বোঝার চেষ্টা করল। তারপর দু’জন  ঘরের বাইরে গিয়ে দাঁড়িয়ে রইল। 

প্রায় দশ মিনিট পরে সাইয়োরির মা ডাক দেওয়ায় পুনরায় তারা ঘরে প্রবেশ করল। ইতিমধ্যে সাইয়োরির মা কাপড় বদলিয়ে বিছানাতে অর্ধশায়ীত অবস্থায় শুয়ে রয়েছে। বেশ কিছুক্ষণ নিশ্চুপ থেকে প্রথমে সাইয়োরি জিজ্ঞসা করল, “মা লোকগুলি কি তোমায় মেরেছে?” 

“হ্যাঁ, মেরেছে। সাইয়োরির মা সংক্ষিপ্ত উত্তর দিল।

কিন্তু তারা কেন তোমায় মারল আমাদেরকে খুলে বল?

সাইয়ুরির মা মেয়ের প্রশ্নের কোন উত্তর না দিয়ে ক্ষিণ কন্ঠে বলল, “সকালে তোরা কিছুই খাস্‌ নি। আমার সারা শরীর ব্যথা করছে। তোরা আলুগুলি কুচিকুচি করে কেটে ঘরে যে সামান্য চাউল রয়েছে – সেগুলির সাথে মিশিয়ে সিদ্ধ করে ফেল! 

সেদিন সাইয়োরির মা সারাদিন কিছু খায়নি। সে সন্ধ্যায় বিছানা থেকে উঠে চারিদিকে ভালমত তাকিয়ে দেখল। তখন তার মনে সন্দেহ আরো বেড়ে গেল। বাড়ির দক্ষিণ পাশ দিয়ে যে রাস্তাটি গিয়েছে, সেখানে লোকজন ফিস্‌ফিস্‌ করে নিম্ন স্বরে কথা বলছে। সাইয়োরির মা বুঝতে পারল যে এরা আমেরিকার সৈন্য ছাড়া আর কেউ নয়। ইতিমধ্যে গ্রাম-বন্দরটিতে একটি গান বোট নোঙ্গর করেছে। সে কথা পাড়ার কিছু লোক বলাবলি করছে। সাইয়োরির মা মনে করল যে একবার যেহেতু তিন জন এসে তার উপর বলাৎকার করেছে, একথা তাদের কাছ থেকে শোনে অন্যান্য অ্যামেরিকার হায়েনা গুলিও আসবে। তাই সাইয়োরির মা সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলল। কি ব্যাপারে এমন সিদ্ধান্ত নিল সেকথা শিশু দু’টিকে কিছুই বুঝতে দিল না। কিন্তু মুহূর্তের মধ্যে আবার মনোবল হারিয়ে তার সারা শরীর কাঁপতে লাগল। অনাহার আর অর্ধাহার আর হতাশা তাকে দুর্বল করে ফেলল।     

কিছুক্ষণ পরে সে উঠে বসল। তারপর রান্না ঘরে গিয়ে দেখল সাইয়োরি ও ইয়ূকি মিষ্টি আলুগুলি কুচিকুচি করে কেটে রেখেছে। মহিলা সামান্য চাউল ধুয়ে এনে আলু আর চাউল একত্রে সিদ্ধ করার জন্য চূলায় বসাল। তারপর মহিলা অস্থির ভাবে পায়চারী করতে লাগল। রান্না হওয়ার পরে সয়সস্‌ মিশিয়ে শিশু দু’টিকে নিয়ে সামান্য খেল। সাইয়োরি বলল, ‘মা খেতে ভালই লাগল। কাল দু’জনে আবার আলু তুলতে যাব!

মেয়ের কথা শোনে সে কিছু মন্তব্য করল না। ফ্লোরে তাতামি ম্যাটের উপর বিছানা করে মহিলা বসে বাহিরে কোন গুঞ্জন শোনা যায় কিনা কান পেতে রেখেছে। ইতিমধ্যে সাইয়ুরি ও ইয়ুকি এসে বিছানার উপরে বসেছে।

মহীলার মনের ভিতরে যে সন্দেহ ঘুরপাক করছে তা এতক্ষণে আতঙ্কে পরিণত হল। 

সে বিছানা থেকে উঠে আবার রান্নাঘরে গিয়ে দু’টি কিচেন নাইফ এনে বিছানার নিচে লুকিয়ে রাখল। পাশের বাড়িতে আশি বৎসর বয়সের একজন বৃদ্ধ তার স্ত্রীকে নিয়ে থাকেন, নাম তানাকা। তাদের দু’টি ছেলে যুদ্ধে গিয়ে আজোবধি ফিরে নি। তারা বেঁচে আছে কি নেই তাও তারা জানে না। সাইয়োরি ও ইয়ুকিকে নিয়ে মহিলা তাদের দেখতে গেল। সেই সময়ে আশেপাশে কোন লোক আছে কিনা তাও বুঝার চেষ্টা করল। কিন্তু সে তখন কাউকে দেখতে পায় নি। তখন দ্রুত ঘর থেকে বের হল সাইয়োরির মা। তারপর তানাকা সানের দরজায় গিয়ে টোকা দেওয়ার পরে বুড়ো এসে দরজা খুলে বলল, “কে সাইয়োরির মা না কি?” 

হ্যাঁ দাদা, আমি সাইয়োরীর মা। আমাদের ভয় লাগছে বলে আপনাদের সাথে কথা বলতে এলাম। আমেরিকার আর্মি গুলি আসে-পাশে ঘুরাঘুরি করছে।

“হ্যাঁ, আমরাও তাদের দেখেছি।কন্তু আমাদের করার তো কিছু নেই। কোথায় আমাদের সেনাবাহিনী, কোথায় পুলিশ, তারা এখন আমাদের গ্রামেও আসে না। আমাদের রক্ষা করবে কে? আমাদের ভাগ্যে যে কি আছে কিছুই বুঝতে পারছি না!” বৃদ্ধ তানাকা বললেন। 

তারপর তিনি সাইয়োরির মাকে বললেন, যদি কেউ আসে আমাদের খবর দিবে। আমরা ঘর থেকে বের হয়ে তোমাদের নিকট যাব।  

সেদিন রাত দশটা পর্যন্ত তানাকা সানের ঘরে বসে কথা বলে সাইয়োরির মা শিশু দুটিকে নিয়ে ঘরে ফিরে আসল। 

সাইয়ুরির মা বলল, “ইয়ুকি, সাইয়োরি, তোমরা আমাকে গান গেয়ে শোনাও!” 

কেন মহিলা তাদের গান গাওয়ার কথা বলল তার কারণ হল – যদি হায়েনা গুলি আবার আসে তখন শিশু দু’টির গলার আওয়াজ শুনলে হয়তো তারা ঘরের ভিতরে আসবে না। তাছাড়া এক অজানা ভয় এসে মহিলাকে আরো দুর্বল করে ফেলেছে। সর্বক্ষণ তার মনে হচ্ছিল যেন সৈন্য গুলি আবার আসবে। আতংকে কাহিল হয়ে পড়ল মহিলা। 

গান গাওয়ার কথা বলাতে শিশু দু’টি খুশি হয়ে গান গাইতে লাগল। আজ থেকে আর পাঁচ দিন পরে শরতকালের আবর্তন হবে। শিশু দু’টি প্রথমে একটি শরতকালের গান গাইল।

ইয়োইয়াকে কোইয়াকে হিগাকুরেতে

ইয়ামানো অতেরানো কানেগানারু

অতেতে ৎচুনাইদে মিনা কায়েরু

কারাছু তো ইশ্‌শনি কায়েরিমাশো।

কদোমোগা কায়েৎচুতা আতোকারা ওয়া

মারুই অঅকিনা অৎচুকি ছামা

কতোরি গা ইয়ুমে অ মিরুতকিনি

ছরানি ওয়া কিরাকিরা কিন্‌ নো হশি।

বাংলাঃ

দিন গেল চলে তুষার পড়ে পড়ে

পর্বতের মন্দিরের – ঘণ্টা বাজে

হাতে-হাত ধরে সবাই ফিরবে ঘরে

কাকদের সাথে সবাই ফিরবে ঘরে।

সব শিশু ঘরে ফিরে আসার পরে

গোলাকার বড় চাঁদ জাগে আকাশে,

যখন সপ্ন দেখে-ছোট পাখিরা 

আকাশেতে ঝলমলে স্বর্ণ তারা।

গান শেষ হওয়ার পরে সাইয়ুরি বলল, ‘আরো গান গাইব কি মা?’ 

‘হ্যাঁ, গেয়ে যা তোরা!’ সংক্ষিপ্ত জবাব দিল সাইয়ুরির মা। 

তাহলে শীত কালের ঐ গানটি গাইব কি? তারপর মহিলার কোন উত্তরে অপেক্ষা না করেই দু’জনে শীত কালের শিশুদের সেই গানটি গাইতে লাগল। 

ইয়ুকি ইয়া কন্‌কো আরারে ইয়া কনকো 

ফুত্তে ওয়া ফুত্তে ওয়া জুনজুন ৎচুমরু

ইয়ামা মো নোহারা মো ওয়াতাবোসি কাবুরি

কারে কি নকোরাজু হানা গা ছাকু।

ইয়ুকিইয়া কন্‌কো আরারেইয়া কন্‌কো 

ফুত্তে ম ফুত্তে ম মাদাফুরি ইয়ামানু 

ইনু ওয়া ইয়রোকবি নিওয়া কাকে মাওয়ারি

নেকো ওয়া কতাৎচু দে মারুকু নারু।

বাংলাঃ

তুষার পড়ে হিংটিং শিলাবৃষ্টি টংটং

পড়ছে তো পড়ছে পলকে তুষার ঢাকা

পর্বত আর মাঠ যেন পরেছে তুলার টোপি

পত্রহিন গাছের ডালে ফুটেছে তুষার ফুল।

তুষার পড়ে হিংটিং শিলাবৃষ্টি টংটং

পড়ছে তো পড়ছে অবিরাম পড়ছে

কুকুরটি বড় খুশি বাগানে ঘুরেফিরে

বিড়ালটি গোলাকার উনানের কাছে।।

গান গাইতে গাইতে ক্লান্ত হয়ে সবাই ঘুমিয়ে পড়ল। ভোর চারটার দিকে দরজায় কেউ এসে যেন টোকা দিল। সাইয়োরির মা তখন সবকিছু ভুলে ক্ষণিক ঘুমিয়েছিল। দরজায় টোকার শব্দ শোনে তড়িৎ গতিতে উঠে বিছানায় বসে রইল। বারবার টোকার শব্দ শোনে শঙ্কিত এই মহিলা চিৎকার করে বলল, “সাইয়োরি, ইয়ুকি, তোরা উঠে দেখ দরজায় কে টোকা দিচ্ছে। মহিলার ডাকে সাইয়োরি ও ইয়ুকি এক সংগে উঠে বসল। 

ইত্যবসরে তোষকের নিচে রাখা কিচেন নাইফটি হাতে নিয়ে সাইয়ুরির মা শক্ত ভাবে উঠে দাঁড়াল। মহিলা বুঝতে পারল যে আগে যারা এসে তার সর্বনাশ করে গিয়েছিল, সম্ভবতঃ তারাই আবার এসেছে। তাই নাইফটি কাপড়ের নিচে লুকিয়ে রেখে নির্বাক দাঁড়িয়ে রইল। সাইয়ুরি এতকিছু চিন্তা না করে “কে দরজায় টোকা দেয়” বলে এগিয়ে গিয়ে দরজা খুলে দিল। তারপর দু’জন বিদেশী সৈন্য ঘরে ঢুকে প্রথমে মহিলার হাত ধরে টান দিয়ে তাকে বাইরে নেওয়ার চেষ্টা করল। সম্ভবতঃ সৈন্যগুলি মহিলাকে তোলে নিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনা নিয়ে এসেছে। ঠিক সেই সময়ে মুহূর্ত বিলম্ব না করে কাপড়ের নিচে লুকানো চাকু দিয়ে যে সৈন্যটি সাইয়ুরির মাকে টেনে বের করার চেষ্টা করছিল, সেই সৈন্যটির পেটে সজোরে চাকুটি বসিয়ে দিল। বাইরে একজন সৈন্য দাঁড়িয়েছিল। সব মিলে তারা তিন জন। যে সৈন্যটির পেটে চাকু মেরেছে সে ‘আও’ শব্দ করে মেঝের উপরে লুটিয়ে পড়ল। তখন তার পাশের দাঁড়ানো সৈন্যটি বিলম্ব না করে পিস্তল দিয়ে সাইয়ুরি ও তার মাকে একটি করে দু’টি গুলি করল। ইয়ুকি তাদের দেখে ভয় পেয়ে আগেই কিচেন রুমে গিয়ে লুকিয়েছিল। তখন তাকে সৈন্যগুলি দেখে নি। আহত কিংবা মৃত সৈন্যটিকে অন্য দু’জন সৈন্য ধরাধরি করে বের করে নিয়ে গেল। তখন সাইয়ুরি ও তার মায়ের রক্তাক্ত দেহ ফ্লোরের উপরে পড়ে আছে। 

সম্ভবতঃ পাঁচ মিনিট কিচেন রুমে থেকে সৈন্যগুলি চলে যাওয়ার পরে ইয়ুকি কাঁপতে কাঁপতে  বের হয়ে এসে দু’জনকে মৃত অবস্থায় দেখে চিৎকার করতে লাগল। তখন ঘরের বিছানা রক্তে লাল হয়ে গেছে। এতটুকু শিশু এমন অবস্থা দেখে কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে পড়ল। তখন তার কি করা উচিৎ কিছুই বুঝতে না পেরে চিৎকার করতে করতে তানাকা সানের বাড়িতে দৌড়ে গেল। ইতিমধ্যে গুলির আওয়াজ শোনে বৃদ্ধ তানাকা ও তার স্ত্রী বের হয়ে ঘরের দরজার সামনে দাঁড়িয়েছিলেন। এই সময়ে ইয়ূকি কাঁদতে কাঁদতে তাদের কাছে গিয়ে সব কিছু খুলে বলল।

তানাকা সান ও তার স্ত্রী দ্রুত এসে সাইয়োরি ও তার মায়ের মৃত দেহ দু’টি দেখে নিরবে কাঁদতে লাগলেন। তার স্ত্রীও চিৎকার করে ‘এ কি হলরে’ বলে কাঁদতে লাগলেন। কিছুক্ষণ পরে এ খবর গ্রামের সবাইকে জানাবার জন্য বুড়ো তানাকা ঘর থেকে বের হয়ে গেলেন।

তানাকার স্ত্রী প্রতিবেশী এক মহিলাকে বললেন, “সন্ধ্যায় তারা তিন জন আমাদের ঘরে গিয়েছিল। সাইয়োরির মা শত্রু সৈন্য দেখে ভয় পাচ্ছে বলেছিল। তখন তাদেরকে আমাদের ঘরে থাকতে বললে হয় তো এই হত্যা যজ্ঞটি সংঘটিত হত না।”

ইয়ুকি বলল, “আমি এই গ্রাম ছেড়ে অন্য কোথাও চলে যাব।” সে বেদম কাঁদছিল আর বলছিল, “আমার ভয় লাগছে, রাতে শত্রু সৈন্যরা এসে আমাকে মেরে ফেলবে, এখন আমি কার সাথে থাকব!”

অনেক রাত জেগে সেদিন সাইয়ুরির সাথে গান গেয়েছিল ইয়ুকি। শিশুদের মৌসুমি গান। তার কয়েক ঘন্টা পর সাইয়োরি ও তার মাকে শত্রু সৈন্য মেরে ফেলল। এসব কথা ভেবে এই শিশু ইয়ুকি ব্যাকুল হয়ে কাঁদছিল। এত দিন যুদ্ধ হচ্ছে, যুদ্ধ হচ্ছে, এমন কথা সে সবার মুখে শুনেছে। কিন্তু যুদ্ধ যে এই গ্রামে এসে ঘরে প্রবেশ করে মানুষ হত্যা করে যুদ্ধের আসল রূপটি যে কি – তা তাকে দেখাবে – সে কথা তো ইয়ুকি স্বপ্নেও ভাবে নি। সে জানে যুদ্ধ পুরুষেরা করে। যুদ্ধ ক্ষেত্রে শত্রুর গুলি খেয়ে পুরুষেরা মৃত্যু বরণ করে। কিন্তু শত্রু সৈন্য যে ঘরে ঢুকে শিশু ও মহিলা হত্যা করবে – এই চরম সত্য কথাটি শিশু ইয়ুকির অপ্রত্যাশিত এক করুণ অভিজ্ঞতা।  

তানাকার স্ত্রী তাকে শান্তনা দিয়ে বললেন, “আমারা তো বেঁচে আছি – মা। তুমি আমাদের সাথে থাকবে। থাকা খাওয়ার চিন্তা তোমাকে চিন্তা করতে হবে না, ইয়ুকি!”   

ঘন্টা খানেকের মধ্যে আট দশ জন পুরুষ ও মহিলা এসে সাইরিদের ঘরের সামনে সমবেত হল। তারা সবাই লাশের সৎকার করার ব্যাপারে আলোচনা করল। ইতিমধ্যে পুলিশ এসে পড়ল। তারা ইয়ুকি ও তানাকা সানের সাথে প্রয়োজনীয় কথা বলে কোন প্রকার মন্তব্য না করে চলে গেল। গ্রাম্য বন্দরে আমেরিকার যুদ্ধ জাহাজ। সময়ের পরাক্রমশালী জাপান এখন পারাজীত যুদ্ধ-বিদ্ধস্ত একটি ভয়াবহ চিতাসাল। এমন এক চরম অবস্থায় জাপানের জনসাধারণ সাহায্যের জন্য কোথায় গিয়ে কার নিকট নালিশ করবে তা বুঝতে পারছে না। গ্রামে যারা আছে তাদের অধিকাংশ বৃদ্ধ। বয়স ষাটের উপরে। মন্দির থেকে পুরোহিত এসে অতিসাধারণ ভাবে মৃতদেহ গুলি সৎ্কারের ব্যবস্থা করার জন্য বললেন।  

চলবে

আগের পর্বঃ

ঐতিহাসিক উপন্যাসঃ ইয়ুকি একটি মেয়ের নাম

লেখকঃ জাপান প্রবাসী কবি ও সাহিত্যিক

আরও পড়ুন

উত্তর দিন

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রচার করা হবে না.