ঐতিহাসিক উপন্যাসঃইয়ুকি একটি মেয়ের নাম

আরশাদ উল্লাহ

পর্বঃ০৪

 সেদিন রাতে ইয়ুকি তানাকা সানের ঘরে রইল। তার এই ছোট্ট জীবনে এমন বিভৎস কিছু দেখবে ভাবতেও পারে নি। সকালে উঠে সে বমি করল। তানাকার স্ত্রী তার কপালে হাত রেখে বললেন, “জ্বরে তোমার গা পুড়ে যাচ্ছে। তুমি বিছানায় শুয়ে থাক।”

বৃদ্ধ তানাকা ডাক্তার আনার জন্য বের হয়ে গেলেন। কিছুক্ষণ পরে গ্রামের ডাক্তার এসে ইয়ুকিকে দেখল। তানাকা বললেন, “মেয়েটির মা বাবা কেউ জীবিত নেই ডাক্তার সাহেব, দুনিয়াতে তার আপন বলতে কেউ নেই। আপনি দয়াকরে তার চিকিৎসা করে সুস্থ করুণ। ডাক্তার সামান্য ঔষধ দিয়ে বললেন, “আশা করছি এই ঔষধে সেরে উঠবে। ভয় ও আতঙ্ক থেকে তার এই অবস্থা হয়েছে। সে আজ সারা দিন ঘুমালে কিছুটা সুস্থ হবে আশা করছি।”

ঘুম থেকে উঠার পর তানাকার স্ত্রী ইয়ুকিকে কিছু জাও রেঁধে এনে অতি স্নেহে চামচ দিয়ে খাইয়ে সামান্য ঔষধ খেতে দিলেন। ইয়ুকি কোন কথা না বলে একটি টেবলেট পানি দিয়ে খেয়ে আবার শুয়ে রইল। সারাদিন সে ঘুমাল। বিকালে ডাক্তারটি আবার এসে তাকে দেখে বললেন, “জ্বর কমেছে। এখন আর কোন চিন্তার কারণ নেই!”  

দু’দিন পরে ইয়ুকি সুস্থ হয়ে উঠে বসল। এখন তার জ্বর নেই। যে মানসিক আঘাত এই হতভাগিনী এতীম শিশুটি পেয়েছে তা থেকে সে সম্পূর্ণ সুস্থ হল না। এখন সে চুপচাপ নিরালায় বসে কাঁদে। তানাকা ও তার স্ত্রী মেয়েটির জন্য যতটুকু সম্ভব করছেন।  

ইতিমধ্যে সাইয়ুরি ও তার মায়ের হত্যাকাননেই!কে নিয়ে এই বাড়িতেই থাকবেন। তিনি ইয়ুকির মাথায় হাত বুলিয়ে বললেন, “আমাদের যা হবার হবে। তুমি আমাদের সাথেই থাক। আমাদের সন্তান যুদ্ধে নিহত হয়েছে। ভবিষ্যৎ বলতে আমাদের কিছুই নেই!”

হিরোসিমা ও নাগাসাকি নগরী দু’টি ধংশ হওয়ার পরে সারা জাপানে খাদ্যাভাব প্রকট আকার ধারণ করেছে। অনেকের হাতে টাকা আছে। কিন্তু বাজার থেকে চাউল আটা এসব আগেই উধাও হয়ে গেছে। টাকা দিয়েও খাদ্য পাওয়া যায় না। তানাকা পরিবারে খাদ্যের ঘাটতির কারণে এই বৃদ্ধ তানাকা ও তার স্ত্রীর ভাবনা আরো বেড়ে গেল। নয় বৎসর বয়সি ইয়ুকিও অনুভব করতে পারল যে পরিবারটির তিন বেলার খাদ্য ঘরে নেই। ইয়ুকি ভাবতে লাগল যে সে নিজেও পরিবারটির একটি বোঝা হয়ে আছে। 

একদিন ইয়ুকি তাদের বলল, “আমি চলে যাব।”

বৃদ্ধা তানাকা বললেন, “কোথায় যাবে তুমি, যাবার কোন স্থান আছে কি তোমার?”

আমি বন্দরে যাব, ইয়ুকি বলল।

“সেখানে গেলে কি তোমাকে কেউ খাবার দিবে? এখন শরতকাল। শীতল বায়ু দিনের পর দিন বাড়ছে। না, এমন অবস্থায় আমরা তোমাকে কোথাও যেতে দিব না। আমরা যা খাই তা তুমি খাবে। অচেনা অজানা স্থানে গিয়ে উপোস করে মরবে কেন তুমি?” 

ইয়ুকি বলল, আমি এখন সব বুঝি। আপনাদের ঘরেতো খোরাক বলতে কিছুই নেই। এমন ভাবে আপনারা কতদিন চলবেন বলুন?

মহিলা তার কথা শোনে রেগে গিয়ে বললেন, “ইঁচড়ে পাকার মতো কথা বলবে না, ইয়ুকি! আমাদের যা হবে তোমারও তাই হবে। আমরা সবাই বিপদে আছি। সামনে হয়তো মহাবিপদ আসবে। সম্ভাব্য বিপদকে মোকাবেলার জন্য আমাদের সাথে একাত্ম হয়ে মানসিক প্রস্তুতি নাও!”

তারপর ইয়ুকি সেদিন আর কোন কথা বলল না। চুপ করে দাঁড়িয়ে রইল। 

পরের দিন বৃদ্ধা তানাকা বাসে করে ইয়ুকিকে নিয়ে শহরে গেল। শহরে কিছু দোকানপাট যা এখনো টিকে রয়েছে সেগুলির প্রায় সব দোকান বন্ধ এবং দোকানের শাটার ফেলানো। বাকী সব দোকান বোমা মেরে পুড়িয়ে দিয়েছে। বৃদ্ধা যে দোকানটিকে উদ্দেশ্য করে শহরে এসেছে সেই দোকানটি পুড়ে নি। তিনি দোকানের কাছে গিয়ে দেখলেন দোকানটি ভিতর থেকে বন্ধ। মহিলা দরজার কড়া নাড়ল। কিছুক্ষণ পড়ে একজন মহিলা দরজা খুলে দিয়ে বলল, “আরে, তানাকা সান, এত দূরে কি ভাবে তোমরা এলে? ভিতরে এসে বস!” 

তানাকা সান ইয়ুকিকে নিয়ে ঘরের ভিতরে গিয়ে বসে বিলম্ব না করে বললেন, “আমার কাছে কিছু স্বর্ণ আছে। তার বিনিময়ে আমি কিছু চাউল আর আটা চাই!” তারপর তিনি প্রতিউত্তরের সময় না দিয়ে বললেন, “যদি তোমাদের ঘরে না থাকে তা হলে তোমার জানাশোনা কারো দোকান থেকে কিনে এনে দাও। ঘরে বর্তমানে কোন খোরাক নেই!”

তানাকা এবং এই দোকানের মালিক কিমুরা সান একসময় জুনিয়ার হাই স্কুলের সহপাঠী ছিলেন। আগে প্রায়ই তানাকা সান শহরে এসে কিমুরার সাথে গল্প করতেন। সেই সুবাদে মহিলা আজ বড় আশা নিয়ে এখানে খাদ্যের সন্ধানে এসেছেন।

কিমুরা বললেন, “পাগল নাকি, সোনা আর টাকা দিয়ে এখন খাবার পাওয়া যায় না। বাজার থেকে অনেক আগেই খাবার উধাও হয়ে গেছে!” 

তানাকা বললেন, “যেমন ভাবেই হোক আমাদের জন্য কিছু চাউলের ব্যবস্থা করে দাও!”

কিছুক্ষণ ভেবে কিমুড়া সান তানাকার কানের কাছে মুখ নিয়ে বলল, “চাউলের আড়তদারের কাছে সম্ভবতঃ চাউল ও আটা থাকবে। আমি একদিন গিয়ে কুড়ি কেজি চাউল কিনতে চেয়েছিলাম। কিন্তু বুড়ো আবে সান মাত্র দশ কেজি দিয়ে বলেছিল যে তার কাছে বেশী চাউল নেই। আমার মনে হয় তার কাছে আরো চাউল মজুদ আছে। অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে সে সত্য গোপণ করছে। মনে হয় সোনা দেখালে বুড়ো চাউল দিতেও পাড়ে। তবে টাকা দেখালে ‘নাই’ বলবে কোন সন্দেহ নেই। এখন চল আমরা তার দোকানে যাই!”

ইয়ুকি সহ তিনজন হেঁটে গিয়ে আবে সানের দোকানে গেল। আবে তাদের দেখেই প্রথমে চাউল আটা নেই বলে ঘোষণা করলেন। 

কিন্তু কিমুড়া তার কথা বিশ্বাস করল না। তার কানের কাছে মুখ নিয়ে বলল, ‘মহিলা আমার সহপাঠী। গ্রাম থেকে এসেছে। চাউল নেই বলবেন না। স্বর্ণ নিয়ে এসেছে, স্বর্ণের বদলে চাউল আটা কিনবে। 

এ কথা শোনে বৃদ্ধ আবে সান তার ইমিটেশন দাঁত দেখিয়ে মৃদু হাসল। তারপর বলল, “স্বর্ণ আনলেও দশ কেজির বেশী দিতে পারব না। এখন আমি দশ কেজি আটা আর দশ কেজি চাউল দিতে পারব!” 

একথা শোনে তানাকা সান অতি দুঃখের মধ্যেও মৃদু হাসলেন। পোটলার ভিতর থেকে কিছু স্বর্ণ বের করে বুড়ো আবের সামনে রেখে বললেন, “টাকার যে মূল্য নেই – সেকথা ভেবেই আমি সামান্য স্বর্ণ যা আমার নিকট ছিল তা নিয়ে বড় আশা করে এসেছি!”

বুড়ো আবে বলল, এই স্বর্ণে আরো বেশী চাউল ও আটা আপনি কিনতে পারেন। কিন্তু আজ দশ কেজি করে মোট বিশ কেজি চাউল আর আটা নিয়ে যান। আরেক দিন  আসলে উদৃত স্বর্ণের বিনিময়ে আরো দশ কেজি করে চাউল ও আটা দিব। 

তানাকা সান তার প্রস্তাবে রাজী হলেন। সেদিন তারা চাউল ও আটা নিয়ে বাসে করে সন্ধ্যার পরে ঘরে ফিরল। হাতে চাউল ও আটা দেখে বৃদ্ধ তানাকা বেশ খুশি হলেন। বললেন, “মনে করেছিলাম খালি হাতে ফিরবে। আজ থেকে আর উপোস করতে হবে না। তিনি ইয়ুকির মাথায় হাত বুলিয়ে বললেন, “খাদ্যের জন্য তোমার কোন চিন্তা করতে হবে না ইয়ুকি!”  

সেদিন রাতে ভাল মতো খেল ইয়ুকি। কিন্তু তার মনে হল এ গ্রামে তার থাকার কোন মানে নেই। তাকেও কিছু রোজগার করতে হবে। একদিন ইয়ুকি তানাকা সানকে বলল, “আমি নিজেও রোজগার করতে চাই। আপনারা বৃদ্ধ মানুষ। এই ভাবে আর কত দিন থাকা যায়। আমার মনে হচ্ছে আমি আপনাদের বোজা ছাড়া আর কিছু নই!”  

বুড়ো তানাকা বলল, “তোমাকে সে ভাবনা করতে হবে না। আমরা তোমার মতো একটি শিশুকে একা কোথাও যেতে দিব না!” 

 একদিন ইয়ুকি হাঁটতে হাঁটতে তার যে ঘরটি আছে সেখানে গেল। দরজা যেভাবে সে বন্ধ করে গিয়েছিল তা সে ভাবেই আছে। কিন্তু এ পাড়ায় কোন লোকজন নেই। ঘরে ঢুকে সে প্রথমে ঘরের কোণা থেকে একটি টিনের পট খুঁজে বেড় করল। তারপর শীতের কাপড়গুলি গুছিয়ে নিয়ে তানাকা সানের বাড়িতে ফিরে গেল।  

প্রায় দু’সপ্তাহ পরে একদিন সকালে এই হিয়োসি গ্রামে ভিন্ন গ্রাম থেকে পনের জনের একটি গ্রুপ আসল। বৃদ্ধ তানাকা ঘর থেকে বের হয়ে তাদের কাছে গিয়ে তারা কোথায় যাবে জিজ্ঞাসা করলেন।

সে গ্রুপটির একজন উত্তর দিল, “এখন থেকে এই এলাকার লোক না খেয়ে মরবে। কাজ নেই টাকাও নেই। দিনের পর দিন অবস্থা তো জটিল থেকে জটিলতর হচ্ছে। আমরা এখানে না খেয়ে মরতে চাই না।

তা বুঝলাম, তানাকা সান বললেন, এখন কোথায় গেলে আপনারা বাঁচতে পারবেন মনে করছেন? 

তাদের অন্য একজন লোক উত্তর দিল, ‘আমরা আওমরি বিভাগে কাজ করতে যাব!’ 

বুড়ো বললেন, ‘আওমরি তো দু’হাজার কিলোমিটার দূরে – জাপানের ‘তহকু’ এলাকায় অবস্থিত। সেখানে গিয়ে আপনারা কি কাজ করবেন?’ 

লোকটি বলল, ‘সেখানে ধনী গৃহস্থ রয়েছে। শরতের প্রারম্ভে ধান কাটার মৌসুম। সেখানে গেলে আমরা কাজ পাব আশা করছি। তাছাড়া এই যুদ্ধে সে এলাকার  ক্ষতি কম হয়েছে। সেখানে খাদ্যের তেমন ঘাটতি নেই শুনেছি!’ 

বুড়ো তানাকার পিছে পিছে ইয়ুকিও হেঁটে এসে দাঁড়িয়ে এই লোকগুলির কথা শোনছিল। সে হঠাৎ বলল, “আমি আপনাদের সাথে আওমরি যেতে চাই। আপনারা কি দয়াকরে আমাকে সঙ্গে নিবেন?” 

এত ছোট মেয়েটির কন্ঠে এমন প্রশ্ন তারা হয়তো প্রত্যাশা করেনি। তানাকা বিরক্ত বোধ করলেন। ইয়ুকির কথা শোনে একজন বলল, “তুমি তো অনেক ছোট মেয়ে আমাদের সাথে গিয়ে আওমরিতে কি কাজ করবে?” 

“কেন, গৃহস্থের বাড়িতে ‘মেইডের’ কাজ করব। টাকা না দিক খাবার তো দিবে?”  

লোকগুলি তার কথা শোনে বিস্মিত হল। তানাকা সানকে একজন জিজ্ঞাসা করল, “এই মেয়েটি কি হয় আপনার?”

বৃদ্ধ বললেন, “সে এই গ্রামের মেয়ে। মা বাবা সবাইকে হারিয়েছে। কিন্তু অতি কষ্টের সংসারে তাকে আমরা আশ্রয় দিয়েছি। কিন্তু মেয়েটি বড় জেদি। এখন বলছে যে সে আপনাদের সাথে আওমরি কাজ করতে যাবে!” 

বুড়ো ইয়ুকিকে ধমক দিয়ে বললেন, “ইয়ুকি তোমাকে আমরা আমাদের সঙ্গে রাখতে চাই। এই মহাসংকটের দিনে তোমাকে আমরা কোথাও যেতে দিব না। তাছাড়া তুমি এখন ছোট মেয়ে।  এই গ্রাম ছেড়ে তোমার অন্য কোথাও যাওয়া ঠিক হবে না। চল, এখন ঘরে ফিরে যাই!”

কিন্তু এই গ্রামে থাকলে বিদেশি সৈন্যরা এসে আমাকে মেরে ফেলবে। এখানে আমি থাকতে চাই না! ইয়ুকি দৃঢ় কন্ঠে বলল। 

তানাকা সান ইয়ুকির কথা শুনে কয়েক মিনিট চিন্তা করলেন। বুঝতে পারলেন যে ইয়ুকি এখনো ট্রমাতে ভোগছে।

তিনি লোকগুলিকে বললেন, “তার বাবা ও মাকে আমি চিনতাম। তারা এখন মৃত। এখন এই গ্রামের লোক জন ভয়ে অন্যত্র চলে গেছে। আমরা বয়ষ্ক লোক, আমরা কোথায় যাব। আর গেলেও শক্ত কাজ করার শক্তি আমাদের নেই। তবে আমি আশা করছি পরিস্থিতি এখন থেকে ভালর দিকে যাবে। জাপান পরাজীত। দেশ এখন আমেরিকার নিয়ন্ত্রণে। আশা করছি আমাদের সম্রাট আমেরিকার সাথে একটা সমঝোতায় পৌছবেন!” 

আপনার ধারণা ঠিক হতেও পারে। একজন লোক বলল, “কিন্তু আমরা এখানে থাকলে না খেয়ে মরব। আমরা বাঁচতে চাই। না খেয়ে মরতে চাই না!” 

সঙ্গে সঙ্গে সবাইকে বিস্মিত করে ইয়ুকিও বলল, “আমিও বাঁচতে চাই। দয়াকরে আপনারা আমাকে সঙ্গে নিয়ে যান!”

সেদিন তানাকা সান ইয়ুকিকে তাদের সাথে যেতে দিলেন না। তিনি তাকে বললেন, “আমাদের জন্য তোমার মায়া হয় না? আমরা তো উপোস করছি না। তোমার এত চিন্তা কিসের?”

ঘরে ফিরে রেডিওটা অন্‌ করলেন তানাকা সান, প্রধান মন্ত্রী হিদেকি তজো এখনো যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার পক্ষে কথা বলছেন। অথচ হিরোসিমা ও নাগাসাকি সম্পুর্ণ বিধ্বস্ত নগরী।  সেখানে দু’লক্ষ লোক এটম বোমায় প্রাণ দিয়েছে। পশু পাখি কিছুই জীবিত নেই। কিন্তু প্রধান মন্ত্রী জেনারেল হিদেকী তজো তার মন পরিবর্তন করছেন না। জাপানে প্রধান ভূখন্ডে আমেরিকার সেনা বাহিনী যাতে প্রবেশ না করতে পারে সে জন্য তিনি বার চৌদ্দ বৎসরের শিশুদের এবং মহিলাদের সহ বৃদ্ধ পুরুষদেরকে বাঁশের তৈরী বর্শা ও তীর ধনুক দিয়ে কামিকাজে সৈনিকদের মতো যুদ্ধ চালিয়ে যাবার জন্য প্রেরণা দিয়ে যাচ্ছেন। তিনি তার ভাষণে বলেছেন যে জাপানীরা এখনো ১২০% শক্তী প্রদর্শন করেনি। তা ছাড়া তিনি বললেন যে এখনো জাপানের যা শক্তি রয়েছে তা দিয়ে শত্রুকে পরাস্ত করা সম্ভব। সুতরাং আত্মসমর্পণের কোন প্রশ্নই উঠে না। 

কিন্তু ১৯৪৫ সালের ১৩ আগষ্ট সম্রাট হিরোহিত যুদ্ধ শেষ হয়েছে বলে তাঁর ভাষণে ঘোষণা করার পরে প্রধান মন্ত্রী হিদেকি তজো কোন প্রকার মন্তব্য করা থেকে বিরত থাকেন। 

বুড়ো তানাকা সবই বুঝতে পেরেছিলেন। এখন আমেরিকার রণতরী এই গ্রামের বন্দরে নোঙ্গর করেছে। তারা যা ইচ্ছা তাই করছে। তারা সাইয়োরি ও তার মাকে তাদের ঘরের ভিতর হত্যা করেছে। তারপর অনেকে এই গ্রাম ছেড়ে পালিয়ে গেছে। এখন এই গ্রামে যে কয়টি ঘরে লোক রয়েছে তারা বৃদ্ধ অথবা বৃদ্ধা। এখানের পুলিশ সব কিছু লক্ষ করছে। তারা কিছু করতেও পারছে না বলতেও পারছে না। কিছু বলতে গেলে আমেরিকার সৈন্যরা টিট্‌কারি দিয়ে বিদ্রুপ করে পুলিশদের অপমাণ করে।  

প্রথম যে কয়জন লোক জাহাজে করে আওমরির উদ্দেশে রওয়ানা দিয়ে গেছে। তার কয়েক দিন পরেও আট দশজনের একটি গ্রুপ গ্রামের উপর দিয়ে জাহাজে করে আওমরি গিয়েছে। যে জাহাজে তারা যাচ্ছে সে জাহাজটি ছোট আকৃতির। জাপান সাগরের উপর দিয়ে জাহাজটি আসা যাওয়া করে। আবার কিছু লোক উত্তরের তোহকু অঞ্চল থেকে চাউল এনে গোপনে এই এলাকায় বিক্রয় করে। উত্তর জাপানে কাজ করার জন্য এখন লোকজন যাচ্ছে। সে এলাকা থেকে খাদ্য এনে এই এলাকায় চড়া দামে বিক্রয় করছে। 

একদিন ইয়ুকি তানাকা সানকে জেদ করে বলল, “আপনারা আমাকে দয়াকরে যেতে দিন। এখানে থাকতে আমার ভয় লাগে। আমেরিকার সৈন্যরা আমাকে মেরে ফেলবে। তারা কেন সাইয়ুরি ও তার মা কে হত্যা করল বলুন? আমি এই গ্রামে থেকে মরতে চাই না। আমাকে আপনারা যেতে দিন!” 

তানাকা সান তার কথা শোনে বিরক্ত বোধ করলেন। কিন্তু সে ভাব না দেখিয়ে বললেন, “আওমরি বিভাগে যেতে অনেক টাকা লাগে। এতো টাকা তুমি পাবে কোথায় শুনি?” 

ইয়ুকি বলল, “আমার কাছে টাকা আছে। আমার মায়ের কিছু টাকা আমার হাতে আছে। সে টাকাতে আমি আওমরি যেতে পারব!” 

বৃদ্ধা তানাকা বললেন, “পারো তো যাও, আমি আর তোমাকে বাধা দিব না!”

দু’দিন পরে ইয়ুকি একদল লোকের সাথে সন্ধ্যার পরে জাহাজে উঠে বসল। এত ছোট মেয়েটিকে দেখে জাহাজের লোকেরা অবাক হয়ে তাকে অনেক কিছু জিজ্ঞাসা করেছে।  তাদের একজন জানতে চাইল, তোমার নাম কি?

ইয়ুকি।

তোমার হাতে টাকা আছে?

-আছে।

কত টাকা আছে?

ইয়ুকি তার ছোট টিনের পটের ভিতর থেকে টাকা বের করে দেখাল। জাহাজের লোকটি তার টাকাগুলি গুণে দেখল। তারপর বলল, অনেক টাকা তোমার। আওমরি যেতে তোমার সাত থেকে আটদিন সময় লাগবে। জ়াহাজ ভাড়া ও খাবারের টাকা সহ যত টাকা লাগবে তা এখন তোমাকে দিতে হবে। 

ইয়ুকি বলল, “এই টাকা থেকে যত টাকা লাগে গুণে নিন!”

চলবে

আগের পর্বঃ

ঐতিহাসিক উপন্যাসঃ ইয়ুকি একটি মেয়ের নাম

লেখকঃ জাপান প্রবাসী কবি ও সাহিত্যিক।

আরও পড়ুন

উত্তর দিন

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রচার করা হবে না.