ছেলেপক্ষ বনাম মেয়েপক্ষ

ড. উম্মে বুশরা সুমনা

‘আপনার মেয়ে তো খাটো, গায়ের রঙও ফর্সা নয়। শুধু আমরা বলেই মেনে নিয়েছিলাম। তার উপর তো রান্না বান্নাও তেমন পারে না। আপনারা ওকে কিছু না শিখিয়েই পাঠিয়েছেন। আমার ছেলেকে তো এক গ্লাস পানি পর্যন্ত ঢেলে খাওয়ায় না।’ আছিয়ার শাশুড়ি রোকেয়া বেগমের কথায় আছিয়ার মা ঢোক গিললেন।

ছেলেপক্ষকে সব সময় উঁচুতেই রাখতে হয়। এটা এ সমাজের রীতি। ছেলেপক্ষরা ধরেই নিয়েছে যে মেয়েপক্ষ নিচু শ্রেণী। মেয়ে পক্ষকে দু একটা কথা বলাই যায়, অপমানিত করাই যায়। তাই আছিয়ার মা কিছু বলতে যেয়েও থেমে গেলেন। মেয়ের সংসারে অশান্তি বাড়ানো ঠিক হবে না ভেবে বললেন, ‘ও তো পড়াশুনা নিয়েই ব্যস্ত ছিল, তাই রান্না বান্না তেমন পারে না। দেখবেন আস্তে আস্তে সব পারবে।’

রোকেয়া বেগম ঝাঁঝের সাথে বললেন, ‘কী এমন পড়িয়েছেন? বিসিএস পরীক্ষায় তো পাসও করতে পারল না? একটা ভালো চাকরিও তো জোগাড় করতে পারল না।’

আছিয়ার মা স্বপ্না আক্তার কী বলবেন ভেবে পাচ্ছেন না। যেটাই বলুক না কেন, আছিয়ার শাশুড়ি রোকেয়া বেগম সেটা পায়ের নিচে দলিত করবেন, কারণ তিনি যে ছেলের মা। স্বপ্না আক্তার শান্ত গলায় বললেন, ‘এখনো তো বিসিএস এর বয়স আছে, আপা। এত হতাশ হচ্ছেন কেন? প্রথমবারেই তো আর কেউ চান্স পায় না। এবারে অভিজ্ঞতা হলো, পরেরবার ঠিকই পারবে, দেখবেন।’

রোকেয়া বেগম হাত নেড়ে বললেন, ‘তা আর কিভাবে পারবে? মেয়ে তো আপনার প্রেগন্যান্ট, জানেন না? এরপর তো বাচ্চা-কাচ্চা নিয়েই অস্থির হয়ে থাকবে। পড়াশুনার পাট একেবারেই চুকলো। এযুগের মেয়ে, বিয়ের দুইমাস বাদেই যে কিভাবে প্রেগন্যান্ট হয়, কোনো আক্কেলজ্ঞানও নাই। আমার তো সেই যুগেও বিয়ের তিন বছর পর বাচ্চা হয়েছিল। আপনারাও তো কিছুই শেখান নি, দেখছি!’

স্বপ্না বেগম হকচকিয়ে যান। থতমত খেয়ে বললেন, ‘তাই নাকি? আছিয়া তো আমাকে কিছুই বলে নি। মেয়েটা আমার ছোট বেলা থেকেই খুব লাজুক আর চাপা স্বভাবের। নিজের ভিতরের কষ্ট সে কাউকে দেখায় না, একা একাই নীরবে সহ্য করে। তাই হয়ত আমার সাথেও শেয়ার করে নি যদি আমি চিন্তা করি। কিন্তু দেখছেন, আপনাকে সে ঠিকই আপন করে নিয়েছে। আপনার সাথে শেয়ার করেছে।’

রোকেয়া বেগম বিরক্ত হয়ে বললেন, ‘আরে না, আমাকে বলে নাই। সকালে উঠে দেখি গড়বড় করে বমি করছে। তারপর কথা বের করলাম। দুই মাস হলো প্রেগন্যান্ট, বোকার হদ্দ কোথাকার, কিছুই টের পায় নি।’

স্বপ্না বেগম মৃদু হেসে বললেন, ‘প্রথম বাচ্চার সময় মেয়েদের বুঝে উঠতেই সময় চলে যায়, পরবর্তীতে দেখবেন আস্তে আস্তে সব বুঝে যাবে। ওর ছোট ভাই বোন গুলোকে তো ঐ মানুষ করেছে। দেখবেন ও পারবে, আপনি অত চিন্তা করবেন না।’

রোকেয়া বেগম বিষাদ মুখে বললেন, ‘ভেবে ছিলাম বউ এনে সুখ করব, তা আর কপালে নাই। এখন দেখি আরো ঝামেলা, দুই দিন পর পর বউ এর বাপের বাড়ির লোকজন আসতেই আছে।

এখন তো বউ অসুস্থ, এই অছিলায় আরো কতজন যে দেখতে আসবে, কে জানে? আমি এগুলো আর সামাল দিতে পারি না।’

স্বপ্না বেগমকে এভাবে অপমানিত হতে হবে তা তিনি ভাবতেও পান নি। বিয়ে বিদায়ের তিনমাস পর তিনি প্রথম এলেন। গতমাসে একগাদা খাবার রান্না করে আছিয়ার ভাই রেজাকে পাঠিয়েছিলেন। দুইমাসে মাত্র দুইজন এসেছে, তাই তিনি এত কথা বলছেন। স্বপ্না বেগম রেগে গেলেন। বহু কষ্টে রাগটা দমন করে বললেন, ‘ঠিক আছে আপা, মেয়েকে তো একবারেই দিয়ে দিয়েছি। আপনারা বিরক্ত হলে আর আসব না।’

রোকেয়া বেগম জিভ কেটে বললেন, ‘না, আমি অসুস্থ তো, তাই এমন করে বললাম আর কী!’

স্বপ্না বেগমকে ডাইনিং এ নিয়ে চেয়ারে বসতে দিলেন। ডাইনিং এর শোকেসটা আছিয়ার বিয়ের সময় তারা দিয়েছিলেন। খুব সুন্দর করে কাঁচের জিনিসপত্র সাজিয়ে রেখেছে। আছিয়ার মা সেদিকে তাকিয়ে বললেন, ‘বাহ! শোকেসটা তো খুব সুন্দর করে সাজানো হয়েছে, বেশ ভালোই দেখাচ্ছে।’

রোকেয়া বেগম ঠোঁট উল্টিয়ে বললেন, ‘ভালো না ছাই! সেগুন কাঠ তো আর দেন নি, দিয়েছেন তো সস্তা মেহগনি কাঠের ফার্নিচার। আমাদের এত সুন্দর ফ্ল্যাটে আপনাদের দেওয়া একটা ফার্নিচারও মানাচ্ছে না। খাটটার কী বাজে ডিজাইন! আর সোফা সেটটা তো ভালো করে রঙই করে নি। সস্তা কাঠ আর সস্তা মিস্ত্রী দিয়ে করিয়েছেন বোধ হয়।’

স্বপ্না বেগম জীবনে এত অপমানিত আর কারো দ্বারা হন নি। তার চোখ ফেটে পানি আসছে। কিন্তু তিনি নিজেকে সামলে নিলেন। তার সামনে দশ পদের নাস্তা। রোকেয়া বেগম শাড়ির আঁচল ঘুড়িয়ে নাচের ভঙ্গিতে বললেন, ‘খান, সবগুলোই কিন্তু একটু একটু করে মুখে দিতে হবে। দেখেন, আমার রান্না খেয়ে দেখেন। গত মাসে যে রেজাকে দিয়ে খাবার পাঠালেন না, আমার ছেলে ফারুক তো একটা খাবারও মুখে দিতে পারে নি। মায়ের হাতের রান্না ছাড়া ও আবার কারো রান্না খেতে পারে না।’

স্বপ্না বেগম অপমানে নীল হয়ে গেলেন। রোকেয়া বেগমের খোঁটায় তার মুখ তিতা হয়ে গেছে। তিনি কোনো মতে খাবার খেয়ে বিদায় নিলেন। একটা সিএনজি ঠিক করে উঠে পড়লেন। সিএনজি তে বসেই বোরকার ওড়না চেপে হু হু করে কাঁদতে লাগলেন।

সময় গড়ায়। স্বপ্না বেগম আর আছিয়ার শ্বশুর বাড়িতে যান না। মেয়ে ফোনে কান্না কাটি করে, তাই মাঝে মাঝে বাধ্য হয়ে যান। গেলেই আছিয়ার শাশুড়ি বুঝিয়ে দেন যে তিনি ছেলের মা, ছেলে মানুষ করতে কষ্ট হয়েছে, ছেলে তার রুই কাতলা মাছ, সেই তুলনায় আছিয়া কিছুই নয়, আছিয়ার বাবার নিচু চাকরি নিয়েও কটাক্ষ করেন, আরো কত কী!

শেষে স্বপ্না বেগম মেয়েকে দেখতে যাওয়া একেবারেই ছেড়ে দেন। কষ্ট চেপে দূর থেকে দোআ করেন, ‘আল্লাহ্‌, আছিয়াকে তুমি পুত্র সন্তান দিও। মেয়ের মা হবার মতো লাঞ্চিত আর অপমানিত জীবন ওকে দিও না’

 

টিকাঃ ছেলে, বাঁকা হলেও সে তো সোনার আংটি। সবাই ছেলের মা হতে চায়। এ সমাজে মেয়ের যেমন মূল্য নাই, মেয়ের মায়েরও তেমনই মূল্য নাই। তাই যুগ যুগ ধরে কন্যা সন্তা্নের জন্ম হলেই বাবা-মা মুখ কালো করে ফেলত। আল্লাহ্‌ এদের বিদ্রূপ করে বলেছেন, ‘আর যখন তাদের কাউকে কন্যা-সন্তানের সুসংবাদ দেওয়া হয় তখন তার চেহারা কালো হয়ে যায় এবং অসহ্য মনস্তাপে ক্লিষ্ট হতে থাকে। তাকে শুনানো সুসংবাদের দুঃখে সে লোকদের কাছ থেকে চেহারা লুকিয়ে রাখে। সে ভাবে, অপমান সহ্য করে তাকে রাখবে, না মাটির নিচে পুঁতে ফেলবে। শুনে রাখ, তাদের ফয়সালা খুবই নিকৃষ্ট।’ (সূরা নাহল : ৫৮-৫৯)

কন্যা সন্তানের পিতা-মাতা হতে কেউ চায় না। এর জন্য দায়ী এই সমাজের নোংরা মানুষেরা যারা কন্যা পক্ষকে সম্মান করতে জানে না। অথচ ইসলামে মানুষের ব্যক্তিগত সম্মান নষ্ট করা তো দূরের কথা বরং তা রক্ষা করার জন্য নিকট ও দূর আত্মীয়সহ সকলের সাথে সদয় আচরণ করার নির্দেশ দেয়া হয়েছে।

পবিত্র কুরআনে বলা হয়েছে, ‘তোমরা আল্লাহর ইবাদাত করবে ও কোনো কিছুকে তাঁর সাথে শরীক করবে না এবং পিতা-মাতা, আত্মীয়-স্বজন, ইয়াতীম, অভাবগ্রস্ত, নিকট প্রতিবেশি, দূর প্রতিবেশি, সঙ্গী-সাথী, পথচারী এবং অধিকারভুক্ত দাস-দাসীদের প্রতি সদাচরণ করবে। আল্লাহ দাম্ভিক ও আত্মগর্বীকে পছন্দ করেন না।’ (সূরা নিসা : ৩৬)

ছেলের মায়েদের আত্মঅহঙ্কার যুগ যুগ ধরে এই সমাজ দ্বারা স্বীকৃত অথচ আল্লাহ্‌ এই অহমিকা স্পষ্ট নিষেধ করে দিয়েছেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, ‘তোমাদের কোনো ভাই যাতে করে অন্য মুসলিম ভাইকে ছোট না করে অর্থাৎ তার মান ও সম্মান ক্ষুণ্ন না করে। কেননা প্রত্যেক

মুসলিম এর প্রতি অন্য ভাই এর রক্ত, মাল ও সম্মানকে ক্ষুণ্ন করা হারাম করা হয়েছে।’ (সহীহ মুসলিম-৪/১৯৮৬, হাদীস-২৫৬৪)। আসুন আমরা অন্যকে সম্মান করতে শিখি।

লেখকঃ সাহিত্যিক ও একটি প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের ফার্মেসী ডিপার্টমেন্টর সহকারী অধ্যাপক

 

আরও পড়ুন

উত্তর দিন

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রচার করা হবে না.