ঐতিহাসিক উপন্যাসঃ ইয়ুকি একটি মেয়ের নাম। পর্বঃপাঁচ

আরশাদ উল্লাহ

সাত আট দিনের মধ্যে জাপান সাগরের দীর্ঘ পথ অতিক্রম করে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে আওমরি বিভাগে ইয়ুকির জাহাজ পৌছতে পারল না। পথে খারাপ আবহাওয়া ও তাইফুনের জন্য জাহাজ বিভিন্ন বন্দরে নোঙ্গর করেছে। ইয়ুকির মনে হল কমপক্ষে বার দিনে তার জাহাজ আওমরি বিভাগের ‘কদোমারি গ্রাম-বন্দরে’ গিয়ে নোঙ্গর করছে।
ইয়ুকি এবং তার সঙ্গের লোকজন জাহাজ থেকে নেমে নিকটবর্তি একটি ছোট দোকানের সামনে গিয়ে দাঁড়াল।অর্থনৈতিক পরিস্থিতি এখানে নিভু নিভু পিদিমের আলো। দক্ষিণ জাপানের বিধ্বস্থ অঞ্চল থেকে কিছু লোক এখানে খাদ্যের সংস্থানে আসে। অনেকে চাউল কিনে দক্ষিণাঞ্চলে নিয়ে উচ্চ মূল্যে বিক্রয় করে। তখন সেপ্টেম্বর শেষ সপ্তাহ। আগষ্টের যন্ত্রণাদায়ক তাপদাহ থেকে প্রকৃতি এখন শরতে পদার্পণ করবে। ধীরে ধীরে কমে যাচ্ছে তাপের প্রভাব। কতিপয় বৃক্ষের পাতাগুলির রঙ পরিবর্তিত হয়ে লাল বর্ণ ধারণ করবে। এখানে অধিকাংশ ম্যাপল জাতীয় বৃক্ষের পাতা লাল বর্ণ ধারণ করেছে। আওমরি জাপানের উত্তরে হোক্কাইদোর নিকটে বিধায় এখানে শীতের প্রভাব মেরু অঞ্চল থেকে বেশ আগে এসে পড়ে। ইয়ুকি শীতের শীতল বায়ু চলতি সালের প্রথম উপলদ্ধি করেছে। দক্ষিণাঞ্চলের লোকেরা এমন শীতল ভাব আরো পরে উপলদ্ধি করবে। শরতকাল জাপানের প্রকৃতির আরেক নান্দনিক নয়নাভিরাম দৃশ্য। এখানে প্রকৃতির পরিবর্তন ছোট বড় সবার নিকট সুস্পষ্ট। এ দৃশ্য সবাই অনুভব করে এবং চোখে দেখে ঋতু পরিবর্তনের আভাষ পায়। বাংলাদেশের শীতকালে ঘন কুয়াশা পড়ে। জাপানের শীতকালে কুয়াশা কম। আকাশ পরিষ্কার। ব্যতিক্রম শুধু আকাশের ঘন-নীল রঙ। কারণ, শরতকালে জাপানের আকাশ অধিক নীল বর্ণ ধারণ করে। সেই জন্য আকাশের তারাগুলির ঔজ্জ্বল্য বেড়ে যায়। অন্যদিকে বাংলাদেশের আকাশ শরতে ততটা পরিষ্কার নয়। কিছুটা ধূসর আকাশের মত দেখায়। তবে হ্যাঁ, বাংলাদেশের আকাশের তারাগুলির সংখ্যা যেন জাপানের আকাশের দৃশ্যমান তারাগুলির চেয়ে কয়েক গুণ বেশী। জাপানের সাথে বাংলাদেশের আকাশের তারা তুলনা করা সম্ভব নয়। ভাদ্র আশ্বিন মাসে বাংলার প্রকৃতি অপূর্ব সুন্দর রূপ ধারণ করে। নদীগুলিতে পালতোলা নৌকা এবং গ্রামগুলিকে তখন দ্বীপের মত মনে হয়। ছয় ঋতুর বাংলাদেশে প্রাকৃতিক দৃশ্য সম্পূর্ণ ভিন্ন। পৃথিবীতে প্রকৃতির এমন রূপ দু’টি দেশ নেই। অন্যদিকে জাপান পার্বত্য দেশ বিধায় এদেশের প্রাকৃতিক বৈচিত্র ভীন্ন রকম। ফুলে ফলে ভরা জাপানের প্রাকৃতিক রূপের তুলনা হয় না।
ইয়ুকি জাহাজ থেকে নেমে এদিক সেদিক তাকিয়ে নিজের অবস্থান বোঝার চেষ্টা করছে। কিছুক্ষণ পরে সে দেখতে পেল যে তার সঙ্গের লোকগুলি কোথাও যেন উধাও হয়ে গেছে। ইয়ুকি একা ঘাঁসের উপর বসে আছে।তখন সকাল দশটা বাজে।চারিদিকে সে খুঁজে দেখল।তার সাথে যে সব পুরুষগুলি এসেছে – তারা এখান থেকে কোথায় চলে গেছে! যাবার সময়ে তাকে কিছুই বলে যায়নি। ইয়ুকি বড় ভাবনায় পড়ল। এখন সে নিজেকে বড় একা বোধ করতে লাগল। অজানা আরেক ভয় তার মনে এসে বাসা বেঁধেছে। এমন সময়ে সে কি করবে ভাবতে লাগল। হাঁটুর উপর আড়াআড়ি হাত রেখে তার উপর মাথা রেখে বসে রইল। সম্ভবত পনের মিনিট এভাবে বসে থেকে উঠে দাঁড়িয়ে অদূরে যে দোকানটি আছে – সেটার কাছে গিয়ে একজন মহিলাকে ইয়ুকি জিজ্ঞাসা করল, “আমি এখানে কাজ করতে এসেছি। কোথায় গেলে কাজ পাব দয়াকরে বলেন?”
মহিলা তাকে দেশে চোখ কপালে তুলে বলল, “ওমা, এতটুকু মেয়ে, এখানে কি কাজ করতে পারবে তুমি?”
ইয়ুকি বলল, “আমি গৃহস্থের বাড়িতে মেইডের কাজ করতে পারব। ঘরদোর পরীষ্কার করার কাজ করব!”
মহিলাটি বলল, ‘এখানে সে রকম বড় কোন গৃহস্থ নেই। তুমি বরং আরো পূর্ব দিকে যাও। সে এলাকায় কিছু বড় গৃহস্থ আছে। সে রকম পরিবার পেলে তোমাকে মেইডের কাজকরতে হয়তো দিবে!”
ইয়ুকি সেই দোকান থেকে কিছু বাদাম কিনে সোঝা পূর্বদিকে হাঁটতে লাগল। বিকাল তিনটার সময় সে ‘নাকাজাতো গ্রামে’ এক গৃহস্থের বাড়িতে প্রবেশ করে সে ঘরের গৃহিণীকে বলল, “আমি আপনাদের বাড়িতে কাজ করতে চাই।আমি কাজ খুঁজতেছি…”, এতটুকু বলে ঘরের দুয়ারে ঢলে পড়ল ইয়ুকি।অনাহারে তৃষ্ণায় সে দাঁড়িয়ে থাকার বল হারিয়েছে।
এই অবস্থা দেখে মহিলাটি তাকে তুলে বসাবার চেষ্টা করল। মহিলা তাকে বলছে, “তুমি কোন এলাকা থেকে এসেছ আমাকে বল? নিশ্চয় তুমি আজ কিছু খাওনি!”
ইয়ুকি অস্ফুট স্বরে বলল, “আমাকে খাবার পানি দিন – আমি পানি খাব!”
এই বাড়িটির মালিকের নাম ফুরুকাওয়া।সে এই এলাকার একজন ধনীগৃহস্থ। এত বড় সংসারে স্বামী স্ত্রী দু’জন মাত্র। তারা নিঃসন্তান। তাই যুদ্ধের ক্ষয়ক্ষতি সম্পর্কে তাদের তেমন কোন ধারণা নেই। তাদের কোন পুত্র সন্তান থাকলে হয়তো যুদ্ধে যোগদান করত। তারপর হয়ত একদিন তার মৃত্যুর সংবাদ শুনত। কিন্তু সে ধরণের কোন অভিজ্ঞতা তাদের নেই। স্বামী স্ত্রী দু’জনের বয়স পঞ্চাশের কোঠায়। গৃহস্থালি করে তারা ভালই আছে। যুদ্ধ তাদের কোন ক্ষতি করেনি।
মহিলা গ্লাসে করে পানি এনে ইয়ুকিকে দিল। পানি খেয়ে ইয়ুকি কিছুটা সুস্থ বোধ করল। ফুরুকাওয়ার স্ত্রীর নাম তমকো ফুরুকাওয়া। ফুরুকাওয়া তাদের পারিবারিক নাম।
মহিলা ইয়ুকিকে ঘরে নিয়ে তাতামি ফ্লোরে বিছানার উপরে শুইতে দিল।
কিছুক্ষণ বিশ্রাম করে ইয়ূকি উঠে বসল। মহিলা তাকে খাবার এনে দিবে কি না জিজ্ঞাসা করাতে ইয়ুকি বলল, “খাবার আগে আমি গোসল করব। অনেক দিন আমি গোসল করি না!”
ইয়ুকি গোসল সেরে এসে খাবার খেল। তারপর মহিলাকে জিজ্ঞাসা করল, “এখন আমি কোন গ্রামে আছি?”
তার প্রশ্ন শোনে তমকো অবাক হলেন। তিনি সরাসরি ইয়ুকির প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে জিজ্ঞাসা করলেন, “তার আগে আমাকে বল – তুমি কোন এলাকা থেকে এসেছ?
ইয়ুকি বলল, আমি জাপানের দক্ষিণে অবস্থিত ‘কিয়োশিও’ এলাকা থেকে এসেছি।
মহিলা মাথায় হাত রেখে বললেন, “ওরে বাবা, বল কি তুমি? এতো দূর থেকে কি করে তুমি আওমরি এসেছো?দুই হাজার কিলোমিটার দূরত্ব!”
ইয়ুকি মহিলার প্রশ্নের কোন উত্তর না দিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদতে লাগল।
মহিলা ইয়ুকির পিঠে হাত রেখে বললেন, “যদি তুমি কিছু মনে না কর তাহলে আমার নিকট তুমি সব কথা খুলে বলতে পার!”
মহিলার কথা শোনে ইয়ুকির কান্না আরো বৃদ্ধি পেল। সে এবার চিৎকার করে কাঁদতে লাগল। কিছুক্ষণ পরে বলল, “আমার মা বাবার কথা পড়ে পড়ছে। আমার কিছু ভাল লাগছে না!”
তোমার মা বাবা কোথায় আছেন। তাঁরা জীবিত আছেন কি?
ইয়ুকি মাথা নাড়িয়ে বলল, “তাঁরা মারা গেছেন!”
কোথায় কি ভাবে তাঁরা মারা গেছেন? ফুরুকাওয়ার স্ত্রী তমকো জানতে চাইলেন।
ইয়ুকি তমকো ফুরুকাওয়ার নিকট তার বাবা ও মায়ের মৃত্যু কোথায় এবং কখন হয়েছে আস্তে আস্তে সব খুলে বলল।
তমকো সান তার দুঃখের কথা শোনে চোখের পানি মুছে বললেন, “আমাদের কোন সন্তান নেই। তোমাকে আমরা সন্তানের মত আদর করব।এখন থেকে তুমি আর কাঁদবে না।যুদ্ধে রাজধানী টোকিও পুড়ে ছাই হয়েছে। লক্ষ লোকের প্রাণহানির কথা শুনেছি। আমাদের এলাকা উত্তরাঞ্চলে – তাই অ্যামেরিকান সৈনিক এদিকে আক্রমণ করেনি!”
মহিলার কথায় ইয়ুকি মাথা নাড়িয়ে সায় দিয়ে বলল, “আমাকে একটা কাজ দিন। আমি কাজ পেলে আর কাঁদব না!”
ইয়ুকির কথা শোনে তমকো ফুরুকাওয়া খুশি হয়ে বললেন, “অবশ্যই তুমি আজ থেকে আমাদের বাড়িতে থেকে কাজ করবে!”
কিছুক্ষণ পরে ইয়ুকি তার সঙ্গে আনা পুটলিটি এনে মহিলার সামনে রেখে বলল, ‘এটা আপনার নিকট রাখুন!’
মহিলা বললেন, ‘কি আছে তোমার পুটলির ভিতরে – খুলে দেখব কি?’
ইয়ুকি বলল, ‘দেখুন’।
মহিলা পুটলিটি খুললেন। সেটার ভিতরে কিছু টাকা, একটি সোনার হার ও ইয়ুকির মা বাবার ছবি পেলেন।
এই হল ইয়ুকির একমাত্র সম্বল। তার আইডেনটিটি। তার মায়ের রাখা টাকা, ছবি ও নেকলেসটি এতদিন যাবত ইয়ুকি যত্নের সাথে ধরে রেখেছে। আজ সেগুলি তমকো ফুরুকাওয়ার নিকট গচ্ছিত রাখল।
সন্ধ্যায় তাদাশি ফুরুকাওয়া জমিনে কাজ করে ঘরে ফিরলেন। হঠাৎ ইয়ুকিকে দেখে বললেন, ‘এ মেয়েটিকে তুমি কোথায় পেলে?’
তমকো ফুরুকাওয়া বললেন, ‘একে আমাদের নিকট প্রভু পাঠিয়েছেন।’
গৃহকর্তা বললেন, ‘কী মিষ্টি চেহারার মেয়ে।ঠিক যেন কাগুইয়াহিমে!’
কাগুইয়াহিমে জাপানের অতি-প্রাচীন রূপকথার এক কাহিনীতে বর্ণিত চন্দ্ররাজের কন্যার নাম।সে রাজকন্যা অত্যন্ত সুন্দরী ছিল। সে কাহিনীটিজাপানে খুবই জনপ্রীয়।গৃহকর্তা ঐ রূপকথার কাহিনীর কাগুইয়াহিমের সাথে ইয়ুকির রূপের তুলনা করে বললেন, ‘মেয়েটি দেখতে ঠিক কাগুইয়াহিমের মতো!’
কয়েকদিন কাজ করে ইয়ুকি বুঝতে পারল যে এই বাড়িতে তার কাজের কোন সীমা নেই। নাই কোন কর্ম-বিরতি। সকাল সন্ধ্যা এ বাড়ির গৃহিণীর সাথে থেকে কাজ করতে হয়। লেখাপড়া করার তার বড় ইচ্ছা ছিল। কিন্তু ফুরুকাওয়া তাকে স্কুলে পাঠালেন না। তমকো সান তাকে আদর করেন বটে। কিন্তু তার ভবিষ্যতের কথা ভেবে দেখলেন না।সেই থেকে ইয়ুকির আর স্কুলে যায়নি।
‘তবু ভাল,’ ইয়ুকি মনে মনে বলল। কিউশিওর লোকদের মতো তাকে এখন আর উপোস করতে হয়না। তাছাড়া এখানে শত্রুর সৈন্যরা এসে ঘুরাঘুরিও করে না। এই পরিবারে খাবারের অভাব নেই।
ইতিমধ্যে বছর পার হয়ে নতুন বৎসরে পদার্পণ করেছে।এখন ইয়ুকির অনেক বুঝ-জ্ঞান হয়েছে।তাকে এখন আর কাজ দেখিয়ে দিতে হয়না।রান্নার কাজও সে কিছু শিখেছে।গোয়াল ঘরে গরুর খাবার ও সে নিয়মিত দেয়।তাছাড়া ধান কাটার সময়ে মাঠে গিয়ে সে ফুরুকাওয়াকে সাহায্য করে।লাঞ্চ রেডি করে তমকো ইয়ুকির হাতে দেয়। মাঠে কর্মরত কর্তাকে লাঞ্চ দিয়ে আসে।
ইয়ুকির মনের ভিতরে কিছু না বলা ব্যথা রয়েছে।তা সে কাউকে বলে যে কিছুটা হালকা বোধ করবে এমন কেউ তার সমবয়সী এই বাড়িটির কাছাকাছি নেই। মাঝে মাঝে নিজেকে তার বড় একলা মনে হয়। খেলার সাথি যদি কেউ থাকত তবুও সে এত বেশি একাকিত্বে ভোগত না। তাই কখনো কখনো ইয়ুকি হাঁপিয়ে উঠে দীর্ঘশ্বাষ ফেলে। এই ভাবে ইয়ুকির ক্লান্ত দিন গুলি আওমরি বিভাগের নাকাজাতো গ্রামে অতিক্রান্ত হচ্ছে।
শৈশব কাল অতিক্রান্ত হলে মেয়েদের দেহের মধ্যে প্রকৃতির পরিবর্তন লক্ষণীয় ভাবে দেখা দেয়। একটি জবা ফুল গাছ রোপণ করলে কয়েক মাসের মধ্যেই সেটা বড় হয়। তাতে সুন্দর লাল ফুল ফুটে।টমেটো বেগুন এসব গাছ রোপণ করলে কয়েক মাসেই বড় হয়ে ফল দেয়। ইয়ুকির দেহেও লক্ষণীয়কিছু পরিবর্তন হচ্ছে।তার বুকের পরিবর্তন সে ইতিমধ্যে লক্ষ করেছে। সে এখন মনে করে যে ফুল গাছের মতোই মেয়েদের জীবন। কিন্তু ছেলেদের দেখলে তেমন মনে হয়না। ছেলেরা খালি গায়ে দৌড়ে বেড়ায়। গরম বোধ করলে গায়ের কাপড় খুলে ফেলে। কিন্তু তার বয়সী মেয়েরা তেমন ভাবে কাপড় খুলে দৌড়াতে পারেনা। অসহ্য গরমেও তার গায়ের কাপড় খুলতে লজ্জা করে। এই লজ্জার কথা তাকে কেউ শিখিয়ে দেয় নি। প্রকৃতি তাকে শিখিয়েছে। সে এখন বুঝতে পেরেছে ছেলে এবং মেয়েদের মধ্যে অনেক বেশি পার্থক্য রয়েছে। অনেক ব্যতিক্রম রয়েছে। ইয়ুকি আয়নার সামনে গিয়ে দাঁড়িয়ে তার বুকের দিকে তাকিয়ে বিস্মিত হয়। এগুলিপদ্মকলি ফুলের মতই সুন্দর। তারপর হঠাত কি যেন ভেবে ইয়ুকি লজ্জায় তার দু’হাতে মুখ ঢেকে বসে রইল। তারপর খিলখিল করে হাসল ইয়ুকি। তার সেই অনাবিল হাসি কেউ দেখেনি। তার সে সুন্দর হাসি এখানে দেখার কেউ নেই। ইয়ুকির মনের ভিতরে এক অদ্ভূত রহস্য খেলা করতে থাকে। নীরবে জানালার কাছে গিয়ে দাঁড়িয়ে মাঠের দিকে তাকিয়ে রইল। মাঠটির অপর প্রান্তে আধা কিলোমিটার দূরে গ্রামের রাস্তাটি নাকাজাতো বাজারের দিকে চলে গেছে। স্কুলের ছাত্রদের স্কুলে যাওয়া আসা করতে দেখা যায়। কিছু দূরে অনুচ্চ একটি পাহাড়ের উপর একটি হাই স্কুল আছে। কিছু ছাত্র সাইকেলে হাই স্কুলে যায়। তাদের দেখে হঠাত ইয়ুকির কান্না আসে। তার মা বাবার কথা মনে পড়ে। আজ যদি তার মা বাবা বেঁচে থাকতেন – ইয়ুকি স্কুলে যেত। অনেক বন্ধু-বান্ধব তার থাকতো। কিন্তু এই গ্রামের বাড়িটিতে ইয়ুকি বড় একান্ত একা। তার ইচ্ছা হয় স্কুলে যেতে। কিন্তু তার ভাগ্য বিরম্বনার কারণে আজ স্কুলে যাওয়া থেকে সে বঞ্চিত।
নাকাজাতোতে ইয়ুকির এখন তের বৎসর চলছে।মনে হয় পলকে চারটি বৎসর অতিক্রান্ত হয়ে গেল। পাড়ার মহিলারা তার দেহের গড়ন ও সৌন্দর্য দেখে মাঝে মাঝে অর্থবোধক মন্তব্য করে। তারা মন্তব্য করে, “ইয়ুকি তোমার এই রূপ যে কোন রাজপুত্রকেও কাবু করে ফেলবে।”
এই সব মন্তব্য শুনলে তার বড় লজ্জা লাগে।ইয়ুকির চোখ দু’টি সুন্দর ও বেশ বড়।জাপানের দক্ষিণ অঞ্চলের মেয়েদের চোখ বড় হয়। তাদের চেহারাও হয় বড় আকর্ষণীয়।উত্তর অঞ্চলের মেয়েরা দক্ষিণ জাপানের মেয়েদের দেহের আবয়ব দেখলে বুঝে ফেলে যে তারা কিয়োশিও অঞ্চলের মেয়ে।শীতকালে তাদের গাল দু’টি জবা ফুলের মত টকটকে লাল হয়। ইয়ুকির গাল দু’টো এখন টকটকে লাল।সে প্রসাধনি করে না।প্রসাধণী সামগ্রীও তার নেই।এসব কিনতে গেলে অনেক টাকার প্রয়োজন। এত টাকা তার হাতে নেই। সেদিন আওকি সানের বউ বলল, “ইয়ুকি তোমার প্রসাধনী সমগ্রীর প্রয়োজন নেই, এমনিতেই তুমি সুন্দরী!”
গাছে যখন ফুল আসে তা ঋতুর পরিবর্তনের সাথে যথা সময়ে মিল রেখে আসে। ইয়ুকি ভাবে মেয়েদের দেহের রূপও সম্ভবত তেমনি ভাবে আসে। প্রকৃতিকে তো কেউ ঠেকিয়ে রাখতে পারেনা। প্রকৃতি তার আপন গতিতে চলে।জাপানের প্রকৃতি যেন কথা বলে।এদেশে প্রকৃতির পরিবর্তন সাত আট বৎসরের একটি শিশুও বুঝতে পারে। চারিদিকে চোখ কান খোলা রেখে তাকালে শোনা যাবে প্রকৃতি কথা বলছে, ‘‘এই যে পৃথিবীর মানুষ চেয়ে দেখ আমি শরৎকালে পদার্পণ করেছি!’’ শরতের বার্তা বাহিকা হল স্পাইডার লিলি, কাশ, কসমস ফুল। শীতকালেও তুষারপাত হলে বুঝা যায় শীতকাল এসেছে। শীতের পরে আসে বসন্তকাল। তখন চেরী ফুল ফুটে প্রকৃতি ঝলমলে রূপ ধারণ করে। জাপানে চেরী ফুল বসন্তের বার্তা বয়ে আনে। বসন্তের পরে আসে গ্রীষ্মকাল।তাপমাত্রা বৃদ্ধি পেলে সবাই বুঝে গ্রীষ্মকাল এসেছে। গ্রীষ্মকালে প্রকৃতি সবুজ রঙ ধারণ করে।ফুটে গ্রীষ্মের ফুল।
ফুরুকাওয়া দম্পতি সিগারেট খায়।তৈল মশলা ইত্যাদি না থাকলে ইয়ূকি এক কিলোমিটার হেঁটে নাকাজাতো গ্রামের বাজারে কেনাকাটা করতে যায়। তখন তাকে দেখে পুরুষ কিংবা মহিলা গায়ে পরে তার সাথে কথা বলে,“তোমার নাম কি? কার মেয়ে তুমি? বয়স কত তোমার?” ইত্যাদি, অনেকেই প্রশ্ন।এইসব প্রশ্ন করলে ইয়ুকি বড় বিরক্ত বোধ করে। সে সংক্ষেপে উত্তর দেয়, “আমি ফুরুকাওয়ার বাড়ির মেয়ে!” ইয়ুকি কখনো বলেনি যে সে ফুরুকাওয়ার মেয়ে। কিন্তু নাকাজাতো গ্রামের অনেকে মনে করে ইয়ুকি সত্যিই ফুরুকাওয়ার সন্তান।
বাজারে যাওয়া আসার সময় সিনিয়র হাই স্কুলের ছেলে ও মেয়েরা তার সাথে কথা বলতে চায়।সবাই তারা সাইকেলে স্কুলে যাওয়া আসা করে। ইয়ুকি যে দোকান থেকে কেনাকাটা করে সে দোকানটি চল্লিশ পয়তাল্লিশ বয়সের একজন মহিলা পরিচালনা করেন।মহিলাটি ইয়ুকিকে বড় আদর করেন।মাঝে মাঝে তাকে লজেন্সের প্যাকেট দেন।ইয়ুকি নিতে চায়না। কিন্তু মহিলাটি তাকে নিতে বাধ্য করেন। তিনি বলেন, “এক কিলোমিটার হেঁটে এসেছ তুমি। ফিরে যাবার সময় তৃষ্ণা পেলে লজেন্স মুখে দিয়ে হাঁটবে!”
এই মহিলার নাম কাওরু কজিমা।তার স্বামী আলাস্কার নিকটবর্তি আত্তো দ্বীপে আমেরিকার সৈন্যদের সাথে সন্মুখ যুদ্ধে মৃত্যু বরণ করেছেন। আত্তো দ্বীপটি শীতল সাগরে অবস্থিত। স্বামীর মৃত্যু সংবাদ পেয়ে মহিলা তার দু’টি পুত্র সন্তান নিয়ে বিধবা হয়েছেন। এই দোকানটি চালিয়ে তিনি কোন প্রকারে তার সংসার চালান। তাঁর প্রথম ছেলের নাম আকিহিরো এবং দ্বিতীয় ছেলের নাম তমহিরো।দু’জনেই সিনিয়র হাই স্কুলের ছাত্র।জাপানের সিনিয়র হাই স্কুল দশম থেকে দ্বাদশ শ্রেণী পর্যন্ত। মহিলার বড় ছেলেটি শান্ত ও লাজুক স্বভাবের। দ্বিতীয় ছেলেটি একটু অশান্ত প্রকৃতির – সে হৈ চৈ করতে ভালবাসে।কিন্তু ইয়ুকি কখনো দু’জনের একজনকেও দেখেনি। অথবা দেখলেও চিনেনি।
শরতের একদিন সকালে ইয়ুকি হাঁটতে হাঁটতে কজিমা সানের দোকানে যাচ্ছিল। মাসটা ছিল অক্টোবর মাস।আওমরিতে অক্টোবরে বেশ শীত।তবে আজকের দিনে আকাশ বড় পরিষ্কার। উত্তরের বাতাস পরিবর্তীত হয়ে আজ দক্ষিণের বাতাস বহমান বলে গত দু’দিনের মতো আজ শীত নেই। রাস্তার দু’ধারের জমিগুলিতে দু’সাপ্তাহ পূর্বেও পাকা ধানে ভর্তি ছিল।এখন সে সব ধান কৃষকেরা কেটে নিয়ে গেছে।ধান গাছগুলি যখন ছিল তখন এই মাঠটিকে মনে হত একটি সুবিস্তৃত সোনালী বর্ণের মোলায়েম কার্পেটের মত। এখন ধান কেটে নেওয়ার পরে অনেক রকম পাখি এসে জমিগুলিতে বসে আদার খায়।বিশেষ করে বড় আকৃতির বক এবং হাঁসগুলি দেখতে খুব সুন্দর। এই দৃশ্য দেখে দেখে যখন ইয়ুকি হাঁটছে ঠিক তখন একটি সুদর্শন যুবক তার পাশে সাইকেলে এসে নামল।
হঠাৎ যুবকটিকে দেখে ইয়ুকি চম্‌কে উঠল।একটু ভয়ের ভাবও তার চেহারায় ফুটে উঠল।সে রাস্তার একপাশে সরে দাঁড়িয়ে নিচের দিকে নির্বাক চেয়ে রইল।
“তোমার সাথে কথা বলতে এসেছি!” কোন প্রকার দ্বিধা না করেই যুবকটি বলল, “আমি সিনিয়ার হাই স্কুলের তৃতীয় বর্ষের ছাত্র। আমার নাম আকিহিরো।তোমার নাম বলবে কি?”
আমার নাম ইয়ুকি, ‘আমি ফুরুকাওয়ার বাড়িতে কাজ করি!’
‘আমি শুনেছি!’
‘কি শুনেছেন?’
আমি তোমার ব্যাপারে শুনেছি।
কার কাছ থেকে শুনেছেন। আমি তো আপনাকে চিনি না!
‘কি করে তুমি আমাকে চিনবে। আমাকে তুমি কখনো দেখ নি!’
ইয়ুকি প্রতিউত্তরে কি বলবে কিছুক্ষণ চিন্তা করল। তারপর বলল, ‘আপনি কি আগে কখনো আমাকে দেখেছেন?”’
‘অবশ্যই দেখেছি। তুমি আমাদের দোকানে যখন কেনাকাটা করতে যাও তখন তোমাকে আমি ঘরের দু’তলা থেকে দেখেছি’।
কজিমা সানের দোকানের কথা বলছেন?
‘হ্যা, ঠিক ধরেছ, তিনি আমার মা!’
এবার ইয়ুকি কিছুটা স্বস্তি বোধ করল।আগে তার মনে যে সংকুচ টুকু ছিল – তা এখন নেই।
ইয়ুকি বলল, “আমার সাথে কি আপনার কিছু বলার আছে?”
তখন তারা পাশাপাশি হাঁটতেছে।আকিহিরো তার সাইকেলের হ্যান্ডল ধরে হাঁটছে।
“প্রথম যেদিন তোমাকে এক নজর দেখার সুযোগ আমার হয়েছিল তখন…,” এতটুকু বলে আকিহিরো থেমে গেল।
“থামলেন কেন। তখন কি হয়েছিল?”
ইয়ুকি আকিহিরোর মুখের দিকে চোখ তুলে তাকাল এবং তার জীবনের প্রথম একটি যুবকের চোখের সাথে তার চোখাচোখি হয়ে গেল।নিমেষে তার দেহ ভেদ করে যেন বিদ্যুৎ প্রবাহ প্রবাহিত হয়ে গেল। তখন অতীব লজ্জায় তার মুখাবয়ব তার লাল হয়ে গেছে। সে তখন ভাবছে এই রাস্তা দিয়ে আসা যাওয়ার সময় য়েরো অনেক যুবক তার সাথে কথা বলেছে। চোখাচোখি হয়নি। তাদের দেখে তো তার মনে এমন প্রতিক্রিয়া হয়নি! এখন মনে হচ্ছে তার হৃদপিন্ড দ্রুত গতিতে দপ্‌দপ্‌ করছে। এক মিশ্র প্রতিক্রিয়াতে তার মুখমন্ডলে সামান্য ঘাম দেখা দিয়েছে।
গলার স্বর যথাসম্ভব সহজ করে আকিহিরো বলল, “সেদিন তোমাকে দেখে আমার ভাল লেগেছে!”
‘ভাল লেগেছে!’ কথাটা শোনে ইয়ুকির বুক আবার ধক্‌ করে উঠল। এর আগে কখনো তার মনের ভিতরে এমন তোলপাড় অবস্থা হয়নি। এখন সে কি বলবে ভেবে পাচ্ছে না।নিজেকে সংযত করে কোন মন্তব্য না করে নির্বাক দাঁড়িয়ে রইল ইয়ূকি। মনে মনে বলল, “কি লজ্জার কথা। এখন আমি কি জবাব দিব তাকে?” প্রতি উত্তরে কিছুই বলতে পারল না।
এভাবে কতক্ষণ চলে যাওয়ার পরে আকিহিরো বলল, “তোমাকে তো দোকানে যেতে হবে – তাই না?”
ইয়ুকি নিরবে মাথা নাড়িয়ে বলল, “হ্যাঁ, এখন আমি দোকানে যাব”।
তাহলে দাঁড়িয়ে আছ কেন, “আস্তে আস্তে আমার সাথে হাঁট!”
ইয়ুকি কিছু না বলে পাশাপাশি হাঁটতে লাগল।
কিছু দূর যাওয়ার পর আকিহিরো বলল, “কথা বলছ না কেন। কি হয়েছে তোমার – ভয় পাচ্ছ?”
ইয়ুকি কি জবাব দিবে ভাবছে আর তার হাতের নখ দাঁত দিয়ে কাটছে। কিছুক্ষণ পরে হঠাৎ মনের কথাটা বলে ফেলল, “ হ্যাঁ, আমার ভয় লাগছে!”
আকিহিরো অবাক হয়ে বলল, “ভয় লাগছে তোমার?” তারপর বলল, “ঠিক আছে তাহলে আমি সাইকেল চালিয়ে ঘরে ফিরে যাই, কেমন?”
প্রতি উত্তরে ইয়ুকি কিছু বলতে চেয়েছিল কিন্তু বলতে গিয়েও বলা হল না। সে মাটির দিকে তাকিয়ে চুপ করে রইল। আকিহিরো বিলম্ব না করে সাইকেলে উঠে দ্রুত চলে গেল।
সে যখন চলে যাচ্ছিল তখন ইয়ুকি এক অজানা কারণে বড় খারাপ বোধ করল। কিন্তু লজ্জায় কিছু বলতে পারল না।সে তখন অনেক কিছু ভাবছে। তারপর আপন মনে বিড় বিড় করে বলল, আকিহিরো আমার উপর রাগ করেনি তো! তার সাথে আমি তো হেঁটে তাদের দোকানে যেতে পারতাম। মনে হয় ‘ভয় লাগছে’ বলাতে সে এতো তাড়াতাড়ি চলে গেল। সে তো আমাকে সাহস দিতে পারত। বলতে পারতো, “আমি তো তোমার পাশে রয়েছি, ভয় পাচ্ছ কেন?” কেন সে এ কথাটি বল না? ইয়ুকি মনে মনে বলে। তখন ইয়ুকির মনের ভিতরে অজানা এক ঘূর্ণিঝড় বয়ে গেল। সে ভুল করেছে মনে করল।বিড় বিড় করে বলল, “তাইতো! আমিও তো তাকে ডাক দিয়ে ফিরাতে পারতাম। আমি কেন বললাম না, “এই যে শুনুন, আমি ভুল করেছি – আমার ভুল হয়েছে, আসলে আমার ভয় লাগেনি – দাঁড়ান আমি সঙ্গে যাব!”
এই সব জটিল কিছু কথা ভাবতে ভাবতে হেটে হেটে সন্ধ্যায় ইয়ুকি কজিমা সানের দোকানে গিয়ে পৌছল।
তাকে দেখে কজিমা সান বললেন, ‘আজ এত দেরিতে আসলে কেন? ঘরে ফেরার সময় অন্ধকার হয়ে যাবে তো?’
ইয়ুকি কিছু বলতে যাচ্ছিল, ঠিক তখন দু’তলা থেকে আকিহিরো বলল, “কোন চিন্তা করো না মা, আমি তাকে ফুরুকাওয়ার ঘর পর্যন্ত এগিয়ে দিব!” সে তখন দু’তলায় কাপড় বদলিয়ে হাতমুখ ধূয়ে পড়ার টেবিলে বসেছে। কয়েক মিনিট পরে দ্রুত সিড়ি দিয়ে নিচে নেমে এল।
আবার ইয়ুকির সাথে চোখাচোখি হল তার। ইয়ুকি তার দিকে তাকিয়ে মৃদু হাসল শুধু। মুখে কিছু বলল না। এখন তার মনে হচ্ছে যে আকিহিরো তার বহু দিন আগের পরিচিত নিকটতম একজন।সে যদি তাকে বাড়ি পর্যন্ত এগিয়ে দেয় তা হলে নির্ভয়ে ঘরে ফিরতে পারবে। শপিং লিষ্ট দেখে আকিহিরোর মা সেগুলি ব্যাগে রেখে ইয়ুকির হাতে দিল।
ব্যাগটি হাতে নিয়ে ইয়ুকি বলল, ‘আমি এখন যাই’।
আকিহিরো বলল, ‘মা, আমি তাকে কিছুটা পথ এগিয়ে দিতে চাই!’
‘তাহলে তো খুবই ভাল হয়’।আকিহিরোর মা বললেন।
আকিহিরো ইয়ুকিকে নিম্ন কন্ঠে বলল, “আমি এগিয়ে দিলে ‘ভয় লাগবে’ আবার বলবে না তো? যদি ভয় লাগে এখন বলে ফেল!” এতটুকু বলে আকিহিরো অস্ফুট স্বরে হাসল।
ইয়ুকি আকিহিরোর কথায় লজ্জা পেল।তারপর নিচের দিকে তাকিয়ে বলল, “না, সে রকম কথা আর বলব না। দয়াকরে আমাকে একটু এগিয়ে দিন!”
আকিহিরো বিলম্ব না করে তার সাইকেলটা নিয়ে ইয়ুকির সাথে হাঁটতে লাগল। কিছু দূরে গিয়ে বলল, “এখন ভয় লাগছে না তোমার?”
ইয়ুকি আকিহিরোর মুখের দিকে এক নজর চেয়ে মৃদু হাসল শুধু। তারপর সাহস করে বলেই ফেলল, “আপনাকে সত্যিই আমার ভয় লাগে!”
“কি বললে তুমি? তা হলে আমি ফিরে যাই!”
মৃদু হেসে ইয়ুকি বলল, “না, আপনি যাবেন না। বাকি পথটুকু আমাকে এগিয়ে দিন!”
হাসল আকিহিরো। তারপর বলল, “আমাকে তোমার ভয় লাগে বললে। এখন আবার তোমাকে এগিয়ে দিতে বলছ কেন?”
আকিহিরোর কথার জবাব দিতে কিছুটা সময় নিল ইয়ুকি, তারপর বলল, “আমি অন্য রকম ভয়ের কথা বলেছি। দয়াকরে আপনি আমার কথায় রাগ করবেন না।
আবার হাসল আকিহিরো।তারপর বলল, “অন্য রকম ভয় মানে কি?”
তা আমি জানি না।যদি জানতাম আপনাকে অবশ্যই বলতাম।
“তুমি পাগল মেয়ে না তো, জানি না বলছ কেন?”
ইয়ুকি চুপ করে হাঁটতে লাগল।আকিহিরোর প্রশ্নের কোন উত্তর দিল না।
“এই মেয়ে তুমি কথা বলছ না কেন?”
এখন বলব ভেবেছি।অতি সংকুচে ইয়ুকি বলল।
কখন বলবে ভেবেছ?
বাড়ির কাছে গিয়ে বলব।
আকিহিরো শান্ত ও মেধাবী ছেলে হিসাবে ক্লাশে পরিচিত। স্বল্পভাষী এই যুবকটি আজ ইয়ুকির সাথে অনেক কথা বলল। হয়তো বা নিজের অজান্তেই বলেছে। ক্লাশের মেয়েদের সাথে কথা বলতে সে লজ্জা পায়। অথচ লাজুক বলে পরিচিত এই যুবকটি আজ ক্ষণিকের পরিচিত মেয়ে ইয়ুকির সাথে পরিচিত হয়ে এতক্ষণ কথা বলল কি করে সেকথা ভাবছে।
অপর দিকে ইয়ুকি আজ প্রথম একটি যুবকের সাথে কথা বলে এতটুকু পথ হেটে এসেছে। তা কি করে সম্ভব হল সে ব্যাপারে নতুন করে ভাবছে। এই ভাবে নিশ্চুপ হাঁটতে হাঁটতে দু’জনে ফুরুকাওয়ার বাড়ির কাছে চলে এল।
আকিহিরো ইয়ুকিকে স্মরণ করিয়ে দিয়ে বলল, “বাড়ির কাছে তো চলে এলাম। এখন তোমার ভয়ের কারণটা খুলে বল?”
এবার ইয়ুকি জীবনে যা করেনি তা করে বসল। সে আকিহিরোর সামনে মুখোমুখি দাঁড়িয়ে একদৃষ্টে তার মুখের দিকে তাকিয়ে বুকে সাহস এনে কোনপ্রকারে বলল, “আমি কি সত্যি সুন্দরী মেয়ে। আমাকে আপনার পছন্দ…?”
‘সে প্রসঙ্গ এখন আনছ কেন?’ আকিহিরো বলল।
ইয়ুকি বলল, ‘আমার সাথে এতটুকু পথ হেটে আসতে আপনার ভাল লেগেছে?’
আকিহিরো বলল, “ভাল খারাপের কথা আমি এখন বলতে পারব না।আমি শুধু তোমাকে এগিয়ে দিতে এসেছি। তোমার ভয় লেগেছে কিনা বল?”
‘জানিনা?’ ইয়ুকি বলল।
জানিনা! এটা কেমন কথা হল।
ইয়ুকি বলল, ‘আমরা এখন বাড়ির কাছে চলে এসেছি!”ইয়ুকি অস্ফুট ভাবে বলল।
আকিহিরো তার কথার কোন জবাব না দিয়ে বলল, ‘এখন আমি ঘরে ফিরে যাব!”
তারপর বলল, “আমার সাথে হাত মিলাবেন না?”
কেন হাত মিলাতে বলছ?
ইয়ুকি বলল, ‘এখন তো আপনার ঘরে ফিরে যাবার সময় হয়েছে, তাই হাত মিলাতে বলছি!’
আকিহিরো নির্বোধের মত তার ডান হাত সামনে এগিয়ে দিল। ইয়ুকি বিলম্ব না করে হাত মিলাল।তারপর সে “সায়োনারা” বলে দ্রুত এক দৌড়ে বাড়ির ভিতরে চলে গেল।

চলবে

আগের পর্বঃ

ঐতিহাসিক উপন্যাসঃইয়ুকি একটি মেয়ের নাম

লেখকঃ জাপান প্রবাসী কবি ও সাহিত্যিক।

আরও পড়ুন

উত্তর দিন

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রচার করা হবে না.