আদরের ছোটবোন

শাহানারা শারমিন

রাতের বাসি ভাত গরম করে দুই ছেলে মেয়েকে খাওয়ালেন খাদিজা।
বাবলু : মা তুমি ভাত খাইবা না?
খাদিজা: নারে বাজান আমি রোজা আছি।
বীনা : কেনো রোজা আছো মা,রোজা রাখলে কি হয়?
খাদিজা:আল্লাহ খুশি হয়,বড় হলে সব বুঝবি। এখন দুইজনে ইসকুলে যা। আমি দুপুরে কাম থাইকা আইসা গরম ভাত রান্না কইরা দিমু।এই বলে খাদিজা কাজে চলে গেল। প্রতি বৃহস্পতিবার আর শুক্রবার  রোজা রাখে খাদিজা।বাবলু আর বীনা তার দুই ছেলে মেয়ে।বাবলু পঞ্চম শ্রেনীতে আর বীনা দ্বিতীয় শ্রেনীতে পড়ে।স্বামি দুই বছর আগেই সড়ক দুর্ঘটনায় মারা গেছে।সে এখন দুই সন্তান নিয়ে স্বামির ভিটায় থাকে আর মানুষের বাসায় ঠিকা কাজ করে।দুপুর বারোটা বাজলে খাদিজা বাড়ি আসে।বাবলু আর বীনা স্কুল থেকে ফিরবে তাদের জন্য ভাত রান্না করতে হবে।সে ঘরে গিয়ে দেখে কোন সবজি নাই,বাড়ির পাশে থেকে কিছু কচুশাক কেটে আনে খাদিজা। খাদিজা গরম ভাত আর কচু শাকের ভরতা বানাতেই  বাবলু আর বীনা স্কুল থেকে চলে আসে টিফিন খেতে।
বাবলু: মা খুব ক্ষুধা পাইছে তারা তারি ভাত খাইতে দাও।
খাদিজা: বাবলু, বীনা তোরা হাত মুখ ধুইয়া আয়।আমি তোদের জন্য ভাত বারতাছি।
বীনা:কী দিয়ে ভাত রানছো মা?
খাদিজা: কচু পাতা ভরতা  করছি আর গরম ভাত।
বীনা:প্রতিদিন কচুপাতা খাইতে মন চায়না।মাছ খাইছে বড্ড  মন  চায় গো মা!
খাদিজা:মাছ খাওনের কপাল কি তোদের আছে রে মা?তোর বাপ বাইচা থাকলে খাওয়াত।
বীনা :আমি কচু খাইতে পারিনা গলা চুলকায়।আমি ভাত খাব না।
বাবলু: খাইয়া নে বোন, আমি বড় হলে তোর জন্য অনেক অনেক মাছ কিনা আনুম।
বীনা: সত্যি বলছিস তো ভাইয়া?
বাবলু: তিন সত্যি, এখন খেয়ে নে বোন।বীনা এই কথা শুনে খেতে শুরু করলো,খাদিজা মেয়ের ইচ্ছা পুরন করতে পারেনা।দুবেলা দুমুঠো ভাত যোগাতেই তার অনেক কষ্ট হয়।এসব  ভেবে তার চোখ থেকে পানি ঝড়লো।কেউ দেখার আগেই সে আঁচল দিয়ে চোখ মুছে নিল।বাবলু আর বীনা খেয়ে স্কুলে চলে গেলো।স্কুল থেকে ফিরে। কিছুক্ষন খেলাধুলা করার পর মাগরিবের আজানের সময় হয়ে এলো।বাবলু  ঘরে গিয়ে দেখলো তার মা ইফতার করার জন্য বসে আছে।তার সামনে রাখা আছে এক টুকরা গুড় আর শুকনো মুড়ি।আজান হলেই খাদিজা একটু মুড়ি আর এক টুকরা গুড় মুখে দিয়ে ঢকঢক  করে পানি খেয়ে নিল।
বাবলু: মা বড়লোকেরা কত্ত কিছু দিয়ে ইফতার করে,আর তুমি এই সামান্য মুড়ি আর গুড় খাইলা।
খাদিজা:অইসব কিনতে ম্যালা  টাকা পয়সা লাগে বাজান।অত টাকা আমরা কই পামু। আমার এতেই চলবো।
বাবলু:আমি বড় হয়ে তোমার সব কস্ট দূর কইরা দিমু মা!
খাদিজা: আমি দোয়া করি বাজান তুই অনেক বড় হবি।
বাবলু সারারাত চিন্তায় ঘুমাতে পারেনা।তার কানে শুধু মায়ের আর বোনের কথা ভাসে।সারারাত ছটফট করে কাটে বাবুলের। সকাল হলেই বাবুল মাকে বলে “মা আমি আর ইসকুলে যামু না”।
খাদিজা:কেন রে বাজান,মাস্টার কি তোকে মারছে?
বাবলু: না মা আমিও আজ থেকে কামে যামু।তাইলে অনেক টাকা পামু।লেখাপড়া কইরা কি হইবো?
খাদিজা: কি কস বাজান তোর বয়স অনেক কম কি কাম পাবি তুই।এসব চিন্তা মাথায় আনিস না। ইস্কুলে যা।
বাবুল মাথা নিচু করে থাকে।খাদিজা কাজে গেলে বাবলু বীনাকে স্কুলে রেখে  কাজের সন্ধানে বেরিয়ে পরে।রাস্তার পাশ দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে দেখে কিছু ছোট ছোট ছেলেরা ইট ভাটায় কয়লা ভাংছে।বাবলু সেখানে গিয়ে দেখলো এক টুপি পড়া  মুরব্বি চেয়ারে বসে আছে। সে বুঝতে পারলো এইটা হয়ত ম্যানেজার।বাবলু ম্যানেজারের নিকটে গিয়ে বললো ম্যানেজার সাব আমারে কামে লবেন?
ম্যানেজার: চশমার ফাক দিয়ে বাবলুর দিকে তাকিয়ে বললো ।এই ছেমড়া তোর বয়স কত? তুই আইছস এখানে কাম খুঁজতে। যা যা এখানে লোক লাগবে না।
বাবলু : আমার কামডা খুবই দরকার দয়া কইরা কাম দিলে আমার খুব উপকার হইতো।
ম্যানেজার:অনেক ভেবে বলে কাম দিতে পারি  নতুন হিসাবে তোকে ৫০ টাকা দিন দিব।তই টাকা কিন্তু এক সপ্তাহ পরে পাবি।এখন বল তুই  রাজি কিনা?
বাবলু : ঠিক আছে আমি রাজি।এই বলে কাজে লেগে পড়ে।সারাদিন কাজ করে  সন্ধ্যায় বাড়ি ফিরে বাবলু।
খাদিজা:বাবলু  এতক্ষন কই ছিলি বাজান?
বাবলু : মা আমি একটা কাম পাইছি। ইট ভাটায় কয়লা ভাংগা। দিনে পঞ্চাশ টাকা।
খাদিজা: তোকে কে কাজ করতে কইছে?দেখি তোর হাত। বাবলুর কচি হাতে হাতুড়ির আঘাতে আঘাতে ফোসকা পড়েছে।তার দুইহাতের অবস্থা দেখে মায়ের চোখে পানি চলে আসে।।খাদিজা বাবলুর দুই হাতে চুমু খায়।আর বাবলুকে বুকে জরিয়ে নেয়।
বাবলু :মা আমার কিচ্ছু  হয়নি।তুমি কাইন্দনা। আস্তে আস্তে সব অভ্যাস হইয়া  যাবে।
খাদিজা; একদম বেশি কথা কইবিনা।তুই আর কামে যাবিনা।
বাবলু :কোন উত্তর  দেয় না।পরের দিনে  কাউকে কিছু না বলে বাবলু আবার কাজে চলে যায়।এবাবে  একটানা তিন দিন কাজ করার পরে বৃহস্পতিবার  চলে আসে।বাবলু  মনে মনে ভাবে আজ তো মা আবার রোজা রাখছে।আজ তো মা আবার শুকনা মুড়ি আর গুড় দিয়ে ইফতার করবে এইটা কিছুতেই হতে দিব না।আজ কিছু একটা করতেই হবে।বাবলু কাজ শেষে দুই এক পায়ে ম্যানেজারের কাছে গেলো।গিয়ে  বললো “ম্যানেজার সাব আমাকে যদি কিছু টাকা অগ্রিম দিতেন আমার খুব উপকার হইত”।
ম্যানেজার: কি বললি  তোকে না আগেই কইছি, এক সপ্তাহ না হলে টাকা পাবিনা।
বাবলু : হ সাব জানি তো।কিন্তু টাকাটা আমার আজই লাগবো।
ম্যানেজার বললেই হলো, বাবার বাড়ির আবদার পাইছস।যা যা ভাগ এইখান থাইকা।
বাবলু :সাব আপনার হাতে পায়ে ধরি টাকাটা আমাকে দেন।
ম্যানেজার: একটু নরম হয়ে এই উঠ উঠ পা ছার,ছার বলছি।তোকে আগে টাকা দিলে, অই পোলাপানেরাও টাকা চাইবো।
বাবলু : সাব আমার জন্য একটু দয়া করেন।
ম্যানেজার:আগে বল টাকা নিয়া তুই কি করবি?
বাবলু : সাব এই টাকা দিয়ে আমার মায়ের জন্য কিছু খেজুর আর ইফতার আর বোনের জন্য একটা বড় মাছ কিনতাম ।আমার মা রোজা আছে সাব। ইফতারে খাওয়ার মত ঘরে কিছুই নাই। আর ছোট বোনটা সুদা ভাত খাইতে পারে না। মাছ খাওনের লাইগা শুধুই কান্দে আর বোনের চোখে পানি দেইখা আমার মনটা পোড়ায়।একথা শুনে ম্যানেজারের চোখে পানি চলে এলো।এত ছোট একটা ছেলে যে কিনা মা বোনের জন্য এত কষ্ট করছে।অথচ কত ছেলে মেয়েরা মা বাবাকে  সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও ভরণপোষণ করেনা কষ্ট দেয়।
ম্যানেজার; সাবাস বেটা তোর মায়ের আর বোনের প্রতি ভালোবাসা দেখে আমি মুগ্ধ। তোর মত সন্তান যেন প্রতি মায়ের ঘরে জন্ম নেয়।এই কথা বলে সে বাবলুকে বুকে জড়িয়ে ধরলো।

আরও পড়ুন

উত্তর দিন

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রচার করা হবে না.