স্বাদ

ডঃ উম্মে বুশরা সুমনা

কোরবান আলীর মেজাজটা হঠাৎ চড়ে গেল আগামীকাল মসজিদ কমিটির নির্বাচন তিনি চেয়ারম্যান পদে দাঁড়িয়েছেনএসময় মাথা ঠান্ডা রাখতে হয় কিন্তু তিনি কোনো ভাবেই রাগ কন্ট্রোল করতে পারছেন না চাকরি থেকে অবসর নিয়েছেন তিন বছর হলোচাকরিতে বসগিরি করেছেন দীর্ঘ বিশ বছর, বাড়িতেও তিনি সিংহ পুরুষের মতো স্ত্রী আর সন্তানদের উপর ছড়ি ঘুরিয়েছেন অবসর নেবার পর থেকে তিনি ক্ষমতাহীন হয়ে গেছেন দুই ছেলে বিয়ে থা করে ঢাকায় স্থায়ী হয়েছে মেয়েরও বিয়ে হয়ে গেছে

কোরবান আলী আর রহিমা বেগম, দুইজনের নির্ঝঞ্ঝাট সংসার পেনশনের টাকা, ছেলেদের টাকা দিয়ে আরামে থাকার কথা, আল্লাহ্‌র যিকির করে সময় কাটানোর কথা কিন্তু নীরবতা তার ভালো লাগে না হুমকি ধমকি, চিৎকার চেঁচামেচি না করলে তার ভালো লাগে না ভিতরটা ফাঁকা ফাঁকা লাগেক্ষমতার স্বাদ না পেলে তার মাথা ঠিক থাকে না

বাড়িতে তার স্ত্রী রহিমা বেগম প্যারালাইসিস হয়ে পড়ে আছেনতেমন উঠতে বসতে পারে না পঞ্চাশ বছর যার কাছ থেকে সেবা নিয়েছেন, সেবাদাসীর মতো যাকে খাটিয়ে মেরেছেন, তিনি আজ বিছানায় দিনের পর দিন পড়ে আছে জীবনে তিনি একগ্লাস পানি ঢেলে খান নি, কাপড় কাচেন  নি, অথচ তাকে এখন স্ত্রীর মুখে খাবার তুলে খাইয়ে দিতে হচ্ছে নিজের আর স্ত্রীর কাপড়ও ধুতে হচ্ছেমাঝে মাঝে ছুটা কাজের মেয়েটা না আসলে রান্না ঘরের কাজও করতে হয় তার জীবনটা এখন সিংহ থেকে একটা মেনী বিড়ালের মতো হয়ে গেছে বাড়িতে তিনি জোরে কথা পর্যন্ত বলতে পারেন না ডাক্তারের রেস্ট্রিকশন আছে কোনো অবস্থাতেই রহিমা বেগমকে উত্তেজিত করা যাবে না আরেকবার স্ট্রোক করলে আর নাকি বাঁচানো যাবে না

শেষ পর্যন্ত কোরবান আলীর ভিতরের রাগটা বের হয়েই গেল মসজিদের একপাশে একটা ছোট্ট লাইব্রেরি আছে বিভিন্ন রকম বইয়ে ভরপুর চারটা শেলফ মুসুল্লিরা পড়ার পর ঠিকমত সাজিয়ে রেখে যায় নাকুরআন, হাদিসের বই সব উল্টা পাল্টা করে রেখে যায় মসজিদের ইমাম  সাহেবের ছেলে আব্দুল্লাহ লাইব্রেরিটা গুছাচ্ছিল তিনি লাইব্রেরিতে ঢোকার সময় খেয়াল করলেন, ছেলেটা তাকে দেখে একটা শেলফের আড়ালে লুকালো তার অনুমতি না নিয়েই ছেলেটা মাঝে মাঝে বই গুছায়, তাকে ঠিকমত সালাম দেয় নাতার মেজাজ চড়ে গেল এটা একটা বেআদব ছেলে

তিনি হুংকার দিয়ে বললেন, ‘অ্যাই ছোকড়া, এদিক আয়আমাকে দেখে লুকালি কেন? বেআদব কোথাকার আজকে তোর কান বরাবর থাবড়া মেরে বেয়াদবি ছুটিয়ে দেবো, বুঝলি আমার টাকার মসজিদ আর আমাকে সম্মান দিতে জানিস না এদিক আয়, বেআদব

‘চাচা, আমি আপনাকে খেয়াল করি নি, সত্যি বলছি খেয়াল করলে অবশ্যই সালাম দিতাম আপনি আমাকে ভুল বুঝতেছেন

‘অ্যাই, কে তোর চাচা, স্যার বল, স্যার বড়দের সম্মান করা শিখিস নিতোর বাপ যেমন বেআদব তুইও তেমন বেআদব

মসজিদের ভিতর চিৎকার চেঁচামেচি শুনে আগত মুসুল্লিরা দৌড়ে এসে থামানোর চেষ্টা করলেন মুসুল্লিদের মধ্যে একজন ঘাড় ত্যাড়া লোক ছিল তিনি আব্দুল্লাহর পক্ষ নিয়ে ইচ্ছেমত কোরবান আলীকে অপমানিত করলেন

অপমানিত কোরবান আলী রাগে ফুঁসতে ফুঁসতে বাড়ি ফিরলেন বাসায় ফিরে মেজাজ আরও খারাপ হয়ে গেল ছোট ছেলে আরমান আর তার বউ বাচ্চা এসেছেআরমান কাছে এসে বলল, ‘আব্বা, আপনাকে এত পেরেশান দেখাচ্ছে কেন? শরীর খারাপ নাকি? মসজিদ থেকে চলে এলেন নাকি? এখন তো আসরের জামাত হবে আমি তো মসজিদেই যাচ্ছিলাম

কোরবান আলী বিরক্তিমাখা কণ্ঠে বললেন, ‘আহঃ অত কথা বলো না তোতুমি যেতে চাচ্ছ, যাও আমাকে নিয়ে অত মাথা ঘামাতে হবে না

ছোট ছেলে আরমান মন খারাপ করে মসজিদে চলে গেল আরমানের ছেলেটা বাবার সাথে বাহিরে যাবার জন্য ঘ্যান ঘ্যান করে কাঁদছে আর হাত-পা ছুঁড়ে জেদ করছে ড্রয়িং রুমের কার্পেটে গড়াগড়ি করে কাঁদতে কাঁদতে প্রস্রাব করে দিল টেবিলের উপর সাজানো বইগুলো মেঝেতে ছিটালোফুলদানীর ফুল গুলোসব ছড়িয়ে দিলএসব দেখে তার মেজাজ সপ্তমে উঠল তিনি চেঁচালেন, ‘বউমা, ও বউমা, আরিয়ানকে নিয়ে যাওপ্রস্রাব করে তো কার্পেটটা শেষ করে দিল ঘরটার কী করে ফেলল, দেখোআজকে রাতে মসজিদ কমিটির লোকজনেরা আসবে, খাবে আর রুমটার একি অবস্থা করে দিয়েছে দস্যি ছেলেটা

আরিয়ানের মা যয়নব হন্তদন্ত হয়ে রুমে ঢুকল কোরবান আলী দাঁত খিচিয়ে বলল, ‘সারাদিন কী এমন কর, শুনি? একটা বাচ্চাও সামলাতে পারো না?’

যয়নব চুপ থেকে সব পরিষ্কার করল কার্পেটটা বাথরুমে যেয়ে ধুয়ে রোদে দিল যয়নব শ্বশুর বাড়িতে সাধারণত আসতে চায় না শ্বশুরের আচরণ সে সহ্য করতে পারে না আজকে দাওয়াত দিয়েছে বলে আরমান তাকে জোর করে ঢাকা থেকে গাজীপুর এনেছে সকালে এসেই ঘর দোর সব পরিষ্কার করেছে, রান্নার কাটা বাছা, মসলা বাটা সব নিজ হাতে করেছে ছুটা কাজের মেয়েটাকে দিয়ে একগাদা কাপড় কাঁচিয়েছেতারপর দুইজন মিলে সেগুলো ছাদে শুকাতে দিয়েছে এতকাজের ভিড়ে বাচ্চাটাকে খাইয়েও দিতে পারে নি, নিজেও খায় নি কাজ করতে করতে বিকেল হয়ে গেল অথচ শ্বশুর তার প্রশংসা তো করলই না, উল্টো বকা ঝকা করে মনটাই ভেঙে দিল

শ্বশুর কোরবান আলীকে যয়নব প্রচন্ড ঘৃণা করে লোকটা সবসময় সম্মান পাওয়ার তীব্র নেশায় বুঁদ হয়ে থাকে কিন্তু সে কখনো তেল দিতে পারে না তেল দেওয়া, মুখের সামনে প্রশংসা করা আল্লাহ্‌ যেমন পছন্দ করেন না, সেও পছন্দ করে না

রাতে কোরবান আলীর বাড়িতে ভোজ হলোতিনি ঘরের লোকের সাথে যেরকম কুৎসিত আচরণ করেন, বাহিরের লোকের সামনে ঠিক তার উল্টো এলাকার চেয়ারম্যান, উকিল, ডাক্তার, স্কুল, কলেজের শিক্ষকসহ আরো গণ্যমান্য মানুষ, সব মিলিয়ে প্রায় বিশজন মানুষ চেটেপুটে খেয়ে গেল কোরবান আলী তাদের সাথে হাত কচলিয়ে বিগলিত হাসি হেসে কথা বললেন তিনি চাকরির প্রথম জীবনে চাটুকার এক কর্মচারী ছিলেন এরপর শেষ বিশ বছর বস হিসেবে দায়িত্ব পালন করে রিটায়ার্ড করেন চাটু, তোষামোদ যেমন পছন্দ করেন ঠিক তেমনি প্রয়োজনে সেটা ব্যবহারও করতে পারেন

পরেরদিন নির্বাচন হলোতিনি মসজিদ কমিটির চেয়ারম্যান হিসেবে নির্বাচিত হলেন মসজিদের ইমাম সাহেব তাকে এড়িয়ে চলা শুরু করল ঠিকমত খুতবায় তার তোষামোদ করে না মসজিদে কোরবান আলী একটা এসি লাগালেন অথচ খুতবায় সেটা ইমাম সাহেব উল্লেখ করলেন নামোনাজাতেও তার নাম ধরে দোআ করে না ভিতরের ক্ষোভটা কোরবান আলী পুষে রাখলেন রমজান মাস এল একদিন তারাবীর নামাজের পর তিনি মুসুল্লিদের উদ্দেশ্যে বললেন, ‘সম্মানিত মুসুল্লি ভাইয়েরা আমার, এই ইমাম সাহেব আপনাদের কয় রাকআত তারাবী পড়িয়েছেন?’

মুসুল্লিরা সমস্বরে বললেন, ‘কেন বিশ রাকআত পড়িয়েছে

কোরবান আলী মুচকি হেসে বললেন, ‘এই ইমাম সাহেব, আপনি উঠেন আপনি জানেন তারাবীর নামাজ কয় রাকআত?’

ইমাম সাহেব চুপ হয়ে যান বিপদ আসন্ন টের পানকোরবান আলী আবার চেঁচিয়ে বললেন, ‘কী ব্যাপার, কথা বলছেন না যে? এত বছর আমাদের ভুল পড়িয়েছেন এখন তো ধরা খেলেন না?’

‘কী ভুল পড়ালাম? তারাবীর নামাজ ৮,১২, ২০ রাকআত সবই পড়া যায়

‘তা এতদিন শুধু ২০ রাকআত পড়ালেন যে এখানে কত বৃদ্ধ মানুষ নামাজ পড়ে, তাদের কষ্ট হয় জেনেও কোনো দিন তো ৮ রাকআত পড়ালেন না? ২০ রাকআত পড়ানোর দলিল বলেন

‘দলিল তো জানি না হাদিস নাম্বার তো মুখস্ত নাই তবে বই দেখে বের করে দিতে পারব

‘দেখছেন, সবাই দেখছেন, এই ইমাম কিছুই জানে না কয় রাকআত পড়ায় তার দলিল পর্যন্ত জানে না আপনার মতো মূর্খ লোককে তো ইমাম হিসেবে আর রাখা যায় না

‘আচ্ছা, আমি চলে যাচ্ছি আমার রিযিকের অভাব হবে না

ইমাম সাহেব মসজিদ থেকে বের হয়ে গেলেন মাসের মাঝখানে তার চাকরি চলে গেল সামান্য চার হাজার টাকা পান দুই ঈদের নামাজ পড়িয়ে যে বাড়তি টাকা পান তা দিয়ে একটু একটু করে সারাবছরের অতিরিক্ত খরচটা চালান মসজিদের ইমামতির টাকা দিয়ে কোনো মতে সংসার চালান ঘরে তার বৃদ্ধা মা,স্ত্রী, চার বাচ্চা, বিধবা বোন, তিন ভাগ্না-ভাগ্নিসহ মোট দশজনের খরচ চালাতে হয় বাচ্চাগুলোকে নিয়ে তিনি নিদারুণ কষ্টে পড়বেন তার চোখ দিয়ে পানি গড়িয়ে পড়লতার মন থেকে দোআ বের হয়ে আসল, ‘আল্লাহ্‌, তুমি এই জালিমকে শাস্তি দিও তার আত্মঅহঙ্কার আর বড়ত্বের শাস্তি দিও তার সম্মান তুমি মাটির সাথে মিশিয়ে দিও

পাঁচ বছর পরের কথা কোরবান আলীর উল্টা-পাল্টা আচরণে মসজিদ কমিটির লোকেরা অতিষ্ঠ হয়ে উঠল তারপর একজন ঘাড় ত্যাড়া কমিটির মেম্বার বুদ্ধি খাটিয়ে তাকে পাগল প্রমাণিত করে মসজিদ থেকে বের করে দিল তার স্ত্রী রহিমা বেগমও সেই বছর মারা গেলেন ছেলেমেয়েরাও তেমন আর কাছে ঘেঁষে না ঢাকায় ছেলেদের সাথেও তিনি থাকতে পারেন না বউরা তাকে সেভাবে সম্মান করে না তার চিৎকার চেঁচামেচি বাচ্চারা শিখবে সেই ভয়ে কোনো ছেলে তাকে ঠিক সেভাবে ডাকে না তিনি এখন সম্পূর্ণ  একা কাজের মেয়েটাও মাসের বেশির ভাগ দিন আসে না ঘরে খাবারের স্তুপ জমে গেছে বাসি খাবারের গন্ধে টেকা যাচ্ছে না তিনি বালতি ভর্তি করে সব খাবার নিয়ে ভাগাড়ের দিকে গেলেন সেখানে চারটা কুকুর চিৎকার করছে একটা বড় হাড্ডির জন্য কামড়া কামড়ি করছে তিনি উচ্ছিষ্ট খাবার গুলো ফেলে দিয়ে কুকুর গুলোকে ‘আহ, আহ, তু তু’ শব্দ করে ডাকলেন কুকুর গুলো সেদিকে কোনো ভ্রুক্ষেপই করল না ক্ষমতার হাড্ডির স্বাদ যে অনেক এই স্বাদ যে তার চিরচেনা

টিকাঃ  আমাদের সমাজের অধিকাংশ মানুষেরাই সম্পদ, সম্মান, আত্মস্বীকৃতি আর ক্ষমতাকে ভালোবাসেসম্পদ, সম্মান আর অর্থবিত্তের পিছনে ছুটে বেড়ায় মসজিদ, মাদ্রাসার, দান-সাদকার ইবাদতের মতো কাজেও বড়ত্ব দেখাতে পছন্দ করে শুধু স্বীকৃতি পাবার বাসনায় ইবলিশ বেহেশত থেকে বিতাড়িত হয়েছিল তার অহঙ্কার, আত্মগরিমা তাকে শয়তানে পরিণত করেছিল আজও মানুষেরা সেই শয়তানেরই পদাংক অনুসরণ করে চলছে ক্ষমতা আর স্বীকৃতির লড়াই এ আজ তারা অন্ধঅথচ একমাত্র আল্লাহই পূর্ণ ক্ষমতাবান এবং প্রবল পরাক্রমশালীসবকিছুর ওপর ক্ষমতাশালী এবং ক্ষমতার নিরঙ্কুশ মালিক তিনি যাকে ইচ্ছে তাকে পৃথিবীতে ক্ষমতা দেন আবার কেড়েও নেন যাকে ইচ্ছে তাকে সম্মানিত করেন আবার অপমানিতও করেন

এ প্রসঙ্গে কুরআনে কারিমে ইরশাদ হয়েছে,‘বলুন ইয়া আল্লাহ! তুমিই সার্বভৌম শক্তির অধিকারীতুমি যাকে ইচ্ছা রাজ্য দান কর আর যার কাছ থেকে ইচ্ছা রাজ্য ছিনিয়ে নাও এবংযাকে ইচ্ছা সম্মান দান কর আর যাকে ইচ্ছা অপমান কর তোমারই হাতে রয়েছেযাবতীয় কল্যাণ নিশ্চয়ই তুমি সর্ব বিষয়ে ক্ষমতাশীল’(সূরা আল ইমরান : ২৬)

কিন্তু সম্পদ, আভিজাত্য আর ক্ষমতার লোভে মানুষেরা অন্ধ হয়ে ছুটতে থাকে এ প্রসঙ্গে রাসূল (সাঃ) বলেন,‘সম্পদ ও আভিজাত্যের প্রতিমানুষের লোভ তার দ্বীনের যে মারাত্মক ক্ষতি সাধন করে,বকরীর পালে ছেড়ে দেয়াদুটি ক্ষুধার্ত নেকড়েও বকরীর পালকে তত ক্ষতি করতে পারে না’ (তিরমিযী১৯৩৫/২৩৭৬, মিশকাত ৫১৮২)কবরে না যাওয়া পর্যন্ত মানুষ ছুটতেই থাকে মিথ্যা অহমিকা, সম্মান আর ক্ষমতার লোভে এ প্রসঙ্গে কুরআনে কারিমে ইরশাদ হয়েছে,‘ঐশ্বর্য, প্রাচুর্য ও অহঙ্কার তোমাদের মোহাচ্ছন্ন করে রেখেছে, তোমরা যতক্ষণ পর্যন্ত না কবরে পৌঁছে যাও’(সূরা আত-তাকাসুরঃ ১)

 

আরও পড়ুন

উত্তর দিন

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রচার করা হবে না.