প্রেম নিয়ে সাহিত্য ও বিজ্ঞান কি বলে?

তাকি নাজিব

প্রয়াত শিল্পী সুবির নন্দীর সেই কাল জয়ী গান- “হাজার মনের কাছে প্রশ্ন রেখে একটি কথাই জেনেছি আমি পৃথিবীতে প্রেম বলে কিছুই নেই।” অর্থাৎ এইযে আমাদের চারপাশে ভালবাসা,প্রেম নিয়ে এতো মাতামাতি, কোলাহল আর উন্মাদনা তবে কি সবই মিথ্যা? আসলেই কি প্রেম বলে পৃথিবীতে কিছুই নেই। পারশ্যের বিখ্যাত কবি হাফিজ প্রেমে মশগুল হয়ে তার প্রীয়ার উদ্দেশ্যে লিখিত রুবাইয়ে বলছেন- “তোমার পথে মোর চেয়ে কেউ সর্বহারা নাইকো, প্রিয়! আমার চেয়ে তোমার কাছে নাই সখী, কেউ অনাত্মীয়। তোমার বেণির শৃঙ্খলে গো নিত্য আমি বন্দি কেন? – মোর চেয়ে কেউ হয়নি পাগল পিয়ে তোমার প্রেম-অমিয়॥” কবির এইযে করুন আকুতি, এইযে প্রেমে বন্দী হৃদয়ের করুন আর্তনাদ সবই কি তাহলে বৃথা, পৃথিবীতে কি প্রেম বলে কিছুনেই!

বিশ্ববিখ্যাত ডাচ চিত্রশিল্পী ভ্যানগগ ভালবাসার নারীর জন্য নিজের কান কেটে ছিলেন।গাব্রিয়েল বেরলাতিয়ে নামের এক কৃষক কন্যার প্রেমে পড়ে তার সত্যতা প্রমাণের জন্যই শিল্পী নিজের কান কেটে উপহার দিয়েছিলেন মেয়েটিকে। পেশায় গাব্রিয়েল ছিলেন একজন পতিতালয়ের পরিচালিকা। সত্যি পাগলপারা প্রেম মানেনা কোন জাতপাত, ধর্ম-বিশ্বাস। মনে পড়েকি প্রথম যৌবনের সেই কিশোরীর কথা। যার কথা ভেবে ঐ কাচা বয়শে সময়ে সময়ে রোমাঞ্চিত হয়েছেন, যাকে এক নজর দেখার জন্য সবকিছু ছেড়ে স্কুলের পথে দাড়িয়ে থাকতেন, কতো চিঠি লিখেছেন তাকে উদ্দেশ্য করে, পকেটে নিয়ে ঘুড়েছেন কিন্তু বেলা শেষে একটি চিঠিও দিতে পারেন নি। আজ সেইসব দিন অনেক দূরের বিষয়। সময় অনেক এগিয়ে গেছে।এখন সুধু তাকে মনে পড়ে যখন মাঝে মধ্যে যখন শোনা হয় জগন্ময় মিত্রের সেই হারানো দিনের গান-

“বলেছিলে তাই চিঠি লিখে যাই,

কথা আর সুরে সুরে

মন বলে তুমি রয়েছ যে কাছে,

আঁখি বলে কত দূরে!”

কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তার গানে বলেছেন-

“সখী, ভালোবাসা কারে কয় !

সে কি কেবলই যাতনাময় ।

সে কি কেবলই চোখের জল ?

সে কি কেবলই দুখের শ্বাস ?

লোকে তবে করে কী সুখেরই তরে এমন দুখের আশ ।”

তবে কি ভালবাসা নামে যে জিনিসটি পৃথিবীতে আছে সেটা কি সুধুই যন্ত্রনাময়! এতোক্ষনতো আমরা আলোচনা করলাম কবি সাহিত্যিক দের কথা,কিন্তু বর্তমানের বৈজ্ঞানিক যুগে আসুন দেখা যাক বিজ্ঞানিরা কি বলেন! বিজ্ঞানিরা বলছেন, প্রেম হচ্ছে অনেকটা আসক্তির মতো। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নৃতত্ববিদ হেলেন ফিশার ও তার দল গবেষনা করে দেখেছেন মানুষের মস্তিষ্কে ভেন্ট্রাল ডেগামেন্ট্রাল এরিয়া যাকে সংক্ষেপে বলা হয় “ভিডিএ”। ভিডিএ হচ্ছে মস্তিষ্কের রিওয়ার্ড সিস্টেমের অংশ। এটি চাওয়া,পাওয়া,উত্তেজনা,ক্ষুধা,আবেগ, ভালবাসা ইত্যাদির সাথে সম্পর্কিত। এটি আসলে মনুষের মস্তিষ্কের সেই অঞ্চল যেখানে নেশা জাতীয় দ্রব্য নিলে আসক্তি তৈরি হয়। এই ভিডিএ অঞ্চলে এ ১০ নামে এক জাতীয় কোষের সন্ধান পেয়েছেন যা ডেপামিন হরমোন তৈরীতে সাহায্য করে।হেলেন ফিসার সদ্য প্রেমে পড়া ছেলে-মেয়েদের মস্তিষ্ক পরীক্ষা করে দেখেছেন যে ভালোবাসার উত্তেজনার ফলে তাদের মধ্যে উচ্চমানের ডোপামিন নিঃসরণ হয়েছে। এই রাসায়নিক পদার্থটি ব্যক্তির মধ্যে পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা তৈরি করে। এক ফোঁটা কেকেন মস্তিষ্কে যে পরিমাণ উত্তেজনা সৃষ্টি করে ডোপামিনও এর ব্যতিক্রম নয়। ফিসার জানান, ডোপামিনের নিঃসরণ বেশি হলে শক্তি বাড়ে, ঘুম ও খাওয়ার চাহিদা কমে যায় ও মনযোগ বাড়ে।

ফিল্ম জগতে এমনকি বন্ধু মহলে প্রেমের ক্ষেত্রে একটা কথা প্রায়ই শোনা যায়,তাহলো “রসায়ন”। আমরা প্রায়ই বলি উমুকের সাথে তার প্রেমের রসায়নটি খুব ভাল। তবে কি বাস্তবেও প্রেম এক রসায়নের খেলা? কথাটা নেহায়েতই মন্দ নয়, বিজ্ঞানীরা দেখেছেন প্রেমে পড়ার সাথে সাথে টেক্সঅরেন আর অক্সসফরেন নামের দুইটি হরমোন সামনা সামনি চলে আসে।আর এই দুইটি হরমোন মানুষকে এমন ভাবে তাড়িত করে যাকে এক কথায় লালসা বলা যায়। এর প্রভাবে মানুষ মরিয়া আচারণ করতে পারে। এটা মহানুভবতা হতে পারে আবার হিংস্রতাও হতে পারে। প্রেমের দ্বিতীয় ধাপ হচ্ছে আকর্ষণ। এ পর্যায়ে সামনে চলে আসে মনোমায়িন নামের একগুচ্ছ স্নায়ু কোষ। এর একটি ডপামিয়ন। অবাক ব্যাপার হলো কোকেন বা নিকোটিন নিলে এই হরমোন যেমন সাড়া দেয় তেমন প্রেমে পড়লেও একই ভাবে সাড়া দেয়। এরপর বলায় যেতে পারে যে প্রেমে পড়াটা এক ধরণের নেশায় আসক্ত হয়ে যাবার মতো। এডরানালিনেরও ভূমিকা আছে তবে সেরটারিনেরও কথা বলতে হবে। এই হরমোনের প্রভাবে মানুষ সাময়িক ভাবে প্রকৃত অর্থে পাগলও হয়ে যেতে পারে। প্রেমের তৃতীয় ধাপ সম্পৃক্ততা। বিশেষজ্ঞরা বলেন যে,মানুষ কখনো আকর্ষণ পর্যন্ত সীমাবদ্ধ থাকতে পারে না । এই ধাপে এসে মানুষ বিয়ে থেকে সংসার পর্যন্ত স্বপ্ন দেখে। তবে এই স্বপ্নের স্থায়িত্ব হবার জন্য দুটি হরমোনের কৃতিত্ব দিতেই হয়। এর একটা হপক্সিডিন আর অন্যটি অক্সডিটিন। যার ফলে মায়ের সাথে সন্তানের সম্পর্ক বা বাঁধন তৈরি হয়। প্রেমের ক্ষেত্রে মানুষ জীন ধারাও প্রভাবিত হয় । তবে একটা কথা না বললেই নয় ,এক গবেষণায় দেখা গেছে যে অসুস্থতায় মানুষের ব্রেইন যেমন কাজ করে,প্রেমে পড়ার ফলে মানুষের ব্রেইন একই ভাবে কাজ করে। তবে যে যাই বলুক জীবনে যারা প্রেম করেছেন তারা অবশ্যই স্বীকার করবেন যে প্রেম এক অদ্ভুদ স্বর্গীয় অনুভুতির নাম। আর যারা প্রেম করেন নি তারা সত্যি দূর্ভাগা। তাদের জন্য বেদনা প্রকাশ ছাড়া আর কিছু করার নেই। তবে যারা প্রেম করছেন তাদের প্রতি রইল এক সাবধান বানী, ভালবাসার উল্টোদিকেই বাস করে ঘৃণা। কজেই এমন কিছু করবেন না যাতে জীবনের পরবর্তী সময়গুলোতে বলতে হয়- “তোমাক মনে হোলেই ভীষণ তিতকুটে লাগে জিভের অগ্রভাগ থেকে শুরু করে একেবারে ভেতরে গিয়ে শরীরটা গুলিয়ে উঠে। তোমাকে ভালবেসেছিলাম ভাবলেই মরে যেতে ইচ্ছে করে; একদলা থুতু জমে থেকে মুখটা মানচিত্র হয়ে থাকে। এমন অসহ্য ঘৃণা নিয়ে তোমাকে মনে করতে চাই না; দয়া করে মুছে যাও; নিশ্চিহ্ন হয়ে যাও…” (কবিতাটি সংগৃহীত, কবির নামটি অজ্ঞাত)

লেখকঃ সাহিত্যিক ও অষ্ট্রিয়া প্রবাসী বাংলাদেশী

 

আরও পড়ুন

উত্তর দিন

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রচার করা হবে না.