অপেক্ষা

আরণ্যকে শবনম

টেবিলের উপর কারাগারের রোজনামচা বইটি।টেবিলল্যাম্পের আলোয় রাজিয়া বেগমের সামনে আলোকিত বলয় তৈরি হয়েছে।পাশে একরাশ ডায়েরী সাজিয়ে রাখা রয়েছে।আর মুক্তিযুদ্ধের কিছু বই।সাফিয়া সেই ছোট্টবেলা থেকে দেখে আসছে,তার আম্মা কতো যত্ন নিয়ে রোজ ডায়েরীগুলো পড়েন,সাতরাজার ধনের মতো আগলে রাখেন।নিজেও লিখেন রোজকার কতো কথা,হয়তো খুব সাধারন কিছু, যার মধ্যে অসাধারন বাসা বেঁধে আছে।কলেজ জীবনে থেকে মায়ের স্মৃতিকথা লেখার শুরু,বাবার যে বিশাল এক অনুপ্রেরণা লুকিয়ে আছে,সে সেটা অনুভব করে।স্কুলে পড়ার বয়স হওয়ার পর থেকে কতো গল্প যে আম্মা তাঁকে পড়ে শুনিয়েছে,তার বাবার ডায়েরী থেকে।রাতভোর হয়ে যেতো ভাবতে ভাবতে ,সেইসব দিনগুলো এতো সজীব,এতো প্রাণদীপ্ত ছিলো।তখন মুক্তিযোদ্ধােদের চিকিৎসা  দিতে,ওর বাবা সীমান্তে গিয়েছেন,নভেম্বর মাসের শেষ দিকে,শীত পড়তে শুরু করেছে।বাবা তার দিল দরিয়া মানুষ,শীতের পোষাক কাউকে দিয়েছেন হয়তো,বাসায় এসেছিলেন প্রয়োজনীয় বস্ত্র-ঔষুধ সামগ্রী  নিতে।বাবার চোখে মুখে নাকি তখন ছিলো বিজয়ের আভাস,মুক্তদেশের পরিতৃপ্তি। আম্মুকে বলেছিলেন,”আর তোমায় বেশিদিন কষ্ট করতে হবে না,রাজিয়া দেখো,আমি কেমন তাড়াতাড়ি ফিরে আসবো…..”তারপর,চিরচেনা হাসি নিয়ে বের হলেন,কতোটা দিন, কতোটা বছর পার হয়ে গেছে,আম্মা প্রতীক্ষা করেন প্রিয়তমের।চিঠিপত্র ঘাটেন,কখনো বা বাবা যেসব এলাকায় কাজ করতেন সেখানে ঘুরে বেড়ান।ডিসেম্বর এলেই কেমন অস্হির হয়ে পড়েন।ডায়েরীর পাতাগুলো হয়তো মুখস্ত হয়ে গেছে,মুক্তিযুদ্ধের বই,স্মৃতিকথায় কাউকে হাঁতড়ে বেড়ান,অফিসে,দলিল-দস্তাবেজে যদি কিছু সন্ধান পাওয়া যায়,প্রিয় মাতৃভূমির সন্তান, কোথায় চিরনিদ্রায় শায়িত আছে……যুদ্ধ কারো জন্য প্রতীক্ষা, কারো জন্য বিজয়ের উল্লাস,কারো জন্য সাহসের হাতিয়ার।
লেখকঃ কবি ও সাহিত্যিক।

আরও পড়ুন