ক্ষমা

ড.উম্মে বুশরা সুমনা

আঁচলে মুখ চেপে কাঁদতে কাঁদতে বাবার বাড়ি যাচ্ছে সালমা। বাবার বাড়ির যাত্রাপথটা কত সুন্দর, সবুজ বিশাল মাঠ, সারি সারি ফসলের জমি, রাস্তার ধারে গা ছমছমে তেঁতুল গাছটা সবই সুন্দর। চোখ মুখে আনন্দের ছাপ আর বুক ভরে নিঃশ্বাস নিতে নিতে বাপের বাড়ি যেত সালমা। কিন্তু আজ তার বুকটা গুমোট চাপা কষ্টের নিঃশ্বাসে ভরপুর। কষ্টের চেয়ে অস্থিরতাই বেশী কাজ করছে, সময় মতো পৌঁছাতে পারবে তো? তাকে যে কথাটা বলতেই হবে, সেই সময় পর্যন্ত তিনি বেঁচে থাকবেন তো? কথাটা না বলতে পারলে যে সে নিজেকে ক্ষমা করতে পারবে না। হায় ক্ষমা! কে চায় কার কাছে! মবিনের হাতের ছোঁয়া পেয়ে সালমার সম্বিৎ ফিরল।

‘চিন্তা কর না, আব্বা সুস্থ হয়ে যাবেন, শহর থেকে বড় ডাক্তার আনব আর আমরা তাকে ভালো অবস্থায় পাব।’

‘কত বছর পর যাচ্ছি বলো তো?’

‘হুম, তা প্রায় চার-পাঁচ বছর হবে মনে হয়।’

হাতের কড়ায় গুণতে থাকে সালমা, কত বছর হবে? চার বছর? না, তা প্রায় পাঁচ বছর হবে, ছোট ছেলেটা যেবার হলো, ঠিক তার আগের বছর, যে বছর আম্মা মারা গেলেন, আব্বা হজ্বে যাবার নিয়ত করলেন সেই বছর।

আম্মা মারা যাবার পর, হজ্বে যাবার আগে আব্বা সব সম্পদ ভাগ করতে চাইলেন। সালমারা চার বোন এক ভাই। আব্বা, বড় চাচা আর ভাই হেলাল মিলে কী সব যুক্তি বুদ্ধি করে সম্পদ ভাগ-বণ্টন করে। দলিলের খসড়া তৈরি করে চার মেয়ে আর জামাইদের ডাকে। সেবারই প্রথম ভাই হেলাল কে বোন আর বোন-জামাইদের খাতির-যত্ন করতে দেখেছিল। সব জামাইদের পছন্দের খাবার জোগাড় করেছিল, নতুন কাপড়-চোপড় কিনে এনেছিল, ভাগ্না-ভাগ্নিদের নতুন জামা-জুতা-সে এক এলাহী কাণ্ড, যেন বাড়িতে উৎসব লেগেছিল। ননদদের দেখলেই যার হাড় মড়মড় রোগ জেগে উঠে, ব্যথায় উঠতে বসতে পারে না, সেই ভাবিও ব্যথাহীন ফুরফুরে মেজাজে ঘুরে বেড়ায়, ছোট ননদের মাথায় তেল দিয়ে খোঁপা করে দেয়। রাতে ভোজ হয়, খাওয়া শেষে সবাই পান চিবোতে চিবোতে একত্রে বসে।

বড় চাচা প্রথম শুরু করলেন, ‘তোমাদের আব্বা এবার হজ্বে যাবার চায়, যাবার আগে সব ভাগ বণ্টন করা ভালো, সারা জীবন ঐ আমার সাহায্য-পরামর্শ নিয়া চলছে। এবারো চাইল, আমি সাহায্য করলাম। ভাগ বণ্টন যেমনই হোক তোমরা খুশি মনে মাইনা নিও, কেউ ব্যাজার হইও না।’

ভাই হেলাল হালকা কাশি দিয়ে শুরু করে বললেন, ‘ভাগা-ভাগিতে একটু উনিশ-বিশ হয়ই, এইটা মাইনা নিতেই হইব।’

ঘাড় ত্যাড়া মেজ জামাই এবার ভাইজানের কথা থামিয়ে দিয়ে বললেন ‘তা ভাইজান, উনিশ-বিশ হইতেই পারে। সব জমি তো আর সমান দামের নয়, দ্যাখেন খালি দশ-বিশ য্যান না হয়। এত কথা না বাড়িয়ে দলিলের খসড়াটা খুলেন, আমরা দেখি।’

খোলা মাত্রই শুরু হয় হইচই, চিৎকার চেঁচামেচি, আসলে দলিলের খসড়া হয় নি, দানপত্র সব রেজিস্ট্রেশন হয়ে গেছে, মুসলিম আইন অনুযায়ী মেয়েদেরকে ছেলের অংশের অর্ধেক দেয়া হয়েছে, কিন্তু সব ফাঁকিবাজি, যত নিচু আর কম মূল্যের জমি, নদীর ধারের অনাবাদী জমি মেয়েদেরকে দেয়া হয়েছে। উঁচু বসত ভিটা, উচ্চ ফলনশীল জমি, আমবাগান, রাস্তার ধারের জমি সব ছেলে হেলালের নামে দানপত্র করা হয়ে গেছে।

অবস্থা পড়ে যাওয়া বড় বোন শেফালী শুধু কেঁদে উঠে বলেছিল, ‘অনেক আশা নিয়া আইছিলাম আব্বা, এইটা কেমন ইনসাফ হলো!’

সেই রাতেই মেজ জামাই আর বোন রাগ করে চলে গিয়েছিল। সালমার মুখচোরা ভদ্র জামাই অবশ্য সামনে রাগ দেখায় নি, নিজ বাড়িতে এসে ঠাণ্ডা মাথায় চিবিয়ে চিবিয়ে সালমা কে কথা শুনিয়েছিল, ‘যে বাপ মেয়েকে ঠকাতে পারে, সে কোনো বাপই না, আর কোনো দিন বাপের নাম উচ্চারণ করবা না।’

সালমা ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠেছিল, আর কখনো অবশ্য সে তার বাবার কথা তোলে নি, কিন্তু তার বাবার কথা কেউ তাকে ভুলতে দেয় নি। শ্বশুরবাড়ির সবাই এটা নিয়ে উপহাস করা শুরু করেছিল, প্রথমে শাশুড়ি কথা শুনাত, তারপর জায়েরা, ননদেরা এমনকি ভাসুরের ছেলে মেয়েরাও তাকে নিয়ে ঠাট্টা বিদ্রুপ করত। আড়ালে তাকে ‘বালুচরের রাণী’ বলে ডাকত। সালমার কানে সবই যেত, আব্বার প্রতি ধ্বিকি ধ্বিকি ক্ষোভের আগুনটা জ্বলে উঠত, ক্ষোভটা কখন ঘৃণায় পরিণত হয়েছিল সে টেরও পায় নি।

আব্বার অসুস্থতার কথা শুনে এতদিনের বরফ জমা সেই রাগ আর ক্ষোভ নিমিষেই গলতে শুরু করেছে। আব্বার পেট ফুলে গেছে, প্রস্রাব আটকে গেছে, খুব খারাপ অবস্থা, অনেক দিন ধরেই বিছানায় পড়া, তবুও কোনো মেয়েই তেমন দেখতে যায় নি। ছেলে আর ছেলের বউটাও তেমন দেখে না, তাদের অবস্থাও পড়ে গেছে। এখন দিন আনে দিন খায়। গোলাভরা ধান, পুকুর ভরা মাছ, ফলের বাগান আর কিছুই অবশিষ্ট নেই, সব বিরানভূমি। বাপের বাড়ির সব খবরই তার কানে আসত, কিন্তু সে বিশ্বাস করতে পারত না। পাঁচ বছরে এত কিছু পাল্টে গেছে। যে বছর জমি ভাগ হয়, তার পরের বছর থেকেই নদীর গতিপথ একটু একটু করে পাল্টিয়েছিল। তার তিন বছর পর প্রলয়ংকারী ঝড় আর বন্যায় সব ভেসে যায়। সুন্দরী রুপসী নদী সেদিন রাক্ষুসী রূপ ধারণ করে, কী তার আক্রোশ, প্রতিশোধের নেশায় যেন মেতেছিল, এক রাতেই সব গ্রাস করে নিয়েছিল। গঞ্জে একটা দোকান ছিল, সেটাও লস খেতে খেতে নাই হয়ে গেল। এখন শুধু ভিটে মাটি আর সামান্য কিছু জমি পড়ে আছে।

সালমা হঠাৎডুকরে কেঁদে উঠল। বাপ-ভাইয়ের দৈন্য দশা যেন চোখের সামনে দেখতে পায়।

‘সালমা, আর কাঁদিও না, আব্বার চিকিৎসাতে যা লাগে আমি দেবো। বড় ডাক্তার আনব। তোমার আব্বাকে নিয়ে তোমাকে অনেক কথা শুনাইছি। আসলে আমারো লোভ ছিল। তোমার বাবার সম্পদে আমার বড্ড লোভ ছিল। তাই ওই রকম করছিলাম। তোমাকে আমি আব্বার কাছে যেতে না দিয়ে অন্যায় করছি। আমাক মাফ করে দিও।’

সালমা এত কষ্টেও মৃদু হাসে, বিড়বিড় করে উঠে বলল, ‘মাফ করব, কিন্তু মাফ করার সময় টুকু কি পাব?’

মবিন সালমার হাতটা আলতো করে ধরে বলল, ‘এই তো, আমরা কাছাকাছি চলে আসছি, বড় বিলটা পার হলেই তোমাদের গ্রামটা, আন্ধার গ্রাম। কী বিদঘুটে নাম। কে এমন নাম রেখেছিল বলো তো? এত সুন্দর গ্রাম আর কী তার নাম! বিশাল বিল, কত আলো বাতাস! এর নাম হওয়া উচিৎ ছিল আলো গ্রাম, তাই না?’

মবিন একাই বকবক করে যাচ্ছে, সালমা যে তার স্মৃতির জলে ডুব দিয়েছে তা সে টেরও পায় না। এই বিলের গল্প শুনত আব্বার মুখে। বিলের ধারে একসারিতে তিনটা পুরাতন গাছ আছে।আব্বা যেদিন গঞ্জে যেত, রাত হয়ে যেত। ঘেমে নেয়ে একাকার হয়ে ফিরতেন। এই তিন গাছের সারি তিনি দৌড়ে পার হতেন। ওখানে নাকি ভুত-প্রেত বাস করে। আব্বার জানের দোস্ত করিম ব্যাপারী একদিন মিস্টি নিয়ে ফিরছিলেন। তখন সন্ধ্যে বেলা, জন মানবহীন বিলের ধার ঘেষে তিনি গান গাইতে গাইতে যাচ্ছিলেন, পরের দিন শ্বশুর বাড়ি যাবেন মিস্টি নিয়ে। কারা যেন নাকি সুরে মিস্টির হাঁড়িটা চেয়েছিল। তিনি দিতে রাজি না হওয়ায় পরের দিন সকালে তার লাশ ভেসে উঠেছিল এই বিলের মাঝখানটায়। আরও কত গল্প ছড়িয়ে ছিল এই রহস্যময় বিল আর তিন গাছের সারি নিয়ে। কুপির আলোয় আব্বা ভাত খেতে খেতে সেই সব গল্প বলতেন।প্রচণ্ড ভিতু ছিলাম, তাই সবসময় আব্বার গাঁ ঘেষে বসতাম। গরম ভাতের ধোঁয়া, কুপির কালচে ধোঁয়া আর আলো আধারিময় পরিবেশে এইরকম গল্প শুনে গা ছমছম করে উঠত। তবুও আব্বার মুখের সেই গল্প গুলো শুনতে ভালো লাগত। গল্প শেষে আমার ভয়ার্ত মুখ টা দেখে তিনি হেসে উঠতেন। তিনি খুব হাসি খুশী মানুষ ছিলেন। কখনো মুখ ভার করতে দেখি নি। একবার শুধু তাকে কাঁদতে দেখেছিলাম। দাদি মারা যাবার পর বড় চাচা কে জড়িয়ে ধরে বাচ্চাদের মতো কেঁদেছিলেন। ওটাই শেষ কান্না। আর কখনো তাকে কাঁদতে দেখিনি।

এখন নাকি আব্বার কান্না বাতাসে ভেসে বেড়ায়। রাত গভীর হলে সেই হুহু কান্নার ধ্বণি নাকি শোনা যায়। গ্রামের অনেক মানুষই শুনতে পায়। কেউ কেউ বলে রোগের তাড়নায় নাকি এভাবে কাঁদে আবার অনেকেই ফিসফিস করে বলে এটা নাকি নিজ কন্যাদের ঠকানোর যাতনার কান্না, অপরাধের কান্না, ক্ষমা চাওয়ার কান্না।

‘ক্ষমা, হায় ক্ষমা, সময় কি পাব?’ সালমা বিড়বিড় করে। গাড়িটা বাবার বাড়ির কাছে এগুচ্ছে। অনেক মানুষের ভিড় দেখে সালমার বুকটা ছ্যাৎ করে উঠে। সালমা প্রার্থনা করতে থাকে ‘হে প্রভু, আব্বাকে একটু বাঁচিয়ে রাখ, তার মায়াবতী কন্যা যে তাকে ক্ষমা করেছে তা জানানোর সময়টুকু পর্যন্ত তাকে তুমি বাঁচিয়ে রাখ।’

 

টিকাঃ ক্ষমা একটি মহৎ গুণ। আল্লাহ্‌ সুবহানা তায়ালা হলেন গাফুরুর রহিম। আল্লাহ্‌ সুবহানা তায়ালার ভালোবাসা, করুণা ও ক্ষমা সম্পর্কে পবিত্র কুরআনে বহু আয়াত এসেছে।সুরা আন্ নিসার ১৪৯ নম্বর আয়াতে ক্ষমার ব্যাপারে বলা হয়েছে, ‘তোমরা যদি কল্যাণ কর প্রকাশ্যভাবে কিংবা গোপনে অথবা যদি তোমরা অপরাধ ক্ষমা করে দাও তবে জেনে রাখ আল্লাহ নিজেও ক্ষমাশীল, মহাশক্তিমান।’

রসুলুল্লাহ(সাঃ) এর অনেক হাদিস রয়েছে। তিনি মুসলমানদের যেসব মোনাজাত শিখিয়েছেন তার একটিতে বলেছেন, ‘হে আল্লাহ্‌, আপনি সবচেয়ে বেশি ক্ষমাশীল, আপনি ক্ষমা করতে ভালোবাসেন, তাই আমাকে ক্ষমা করুন।’

মানুষের পারস্পরিক সম্পর্ক ক্ষমাশীলতার ভিত্তিতে গড়ে তোলা প্রয়োজন। যারা আমাদের প্রতি অন্যায় করে, তাদের আমরা ক্ষমা না করা পর্যন্ত আমরা আল্লাহর তরফ থেকে ক্ষমা লাভের প্রত্যাশা করতে পারি না। পরস্পরকে ক্ষমা করে দেয়া, এমন কি শত্রুকে পর্যন্ত ক্ষমা করা হলো ইসলামের সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষাগুলোর একটি।

লেখকঃ সাহিত্যিক ও একটি প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের ফার্মেসী ডিপার্টমেন্টর সহকারী অধ্যাপক

 

 

আরও পড়ুন