রাত্রি নামে অমাবস্যা পর্ব-৩ (একটি মুক্তিযুদ্ধের গল্প)

হাসিনা সাঈদ মুক্তা

যেদিন প্রথম রাশেদ রাত্রিকে দেখলো সে ঘটনাটি ছিল আরও অদ্ভুত ।
সীমান্ত ও তার মা বাসায় ছিল না সেদিন।
রাশেদ মাগরিবের পর সীমান্তকে পড়াতে আসলো।
দরজা দুতিনবার কড়া নাড়তেই ভেতর থেকে কেউ একজন খুলে দিলো।
কনককাঁকনের সেই রিনিঝিনি আওয়াজ শুনেই রাশেদ বুঝে ফেল্ল এ তো সেই…যার হাতের সেমাই পিঠা আর অদ্ভুত সুন্দর হাসির আওয়াজে কোথায় যেন সম্মোহোন করে রেখেছে তাকে।

ভেতরে প্রবেশ করতেই আরও বেশী বিমোহিত রাশেদ।
এই সেই রাত্রি! যার কথা রাশেদ সুযোগ পেলেই শুনতে চায় এখন আগ্রহ নিয়ে…?
রাত্রির চোখে চোখ পড়তেই আরো বেশী সম্মোহিত রাশেদ।
কাজল কালো টানা টানা চোখ রাত্রির আর চোখের পাঁপড়িগুলো যেন পাখির পালকের মতো।
এত গভীর সে চাহনী….!রাত্রি চোখ সরিয়ে নেয়।
বৈঠকখানায় তখন মৃদু আলো জ্বলছিল।
সদর দরজার ফাঁকে দাঁড়ানো রাশেদ জিজ্ঞেস করে এবার,
-সীমান্ত নেই?
-না ওতো মামীমার সাথে বাইরে গেছে।

রাত্রির কন্ঠস্বরেও রাশেদের বুকে যেন শীতল ঢেউ খেলে যায় কেবলই…।
-কি মিষ্টি সুরেলা আওয়াজ তার…!
হঠাৎ রাশেদ খেয়াল করলো, রাত্রির হাতের আঙুল কাঁটা আর তা থেকে টপাটপ রক্ত পড়ছে।মেঝেতেও পড়েছে।
কিছু না ভেবেই রাশেদ রাত্রির হাতটা ধরে বসে।
-আরে কি করছেন?ছাড়ুন আমার হাত…!
একেবারেই অপ্রস্তুত রাত্রি।ওর কন্ঠ আর অভিব্যক্তিতে কিশোরীর লাজ অফুরন্ত।
-ওওওঅঅহ্ আমি দুঃখিত। আসলে আপনার হাতটা কাঁটা দেখলাম তাই…।

-রাত্রি? কে এসেছে মা কার সাথে কথা বলছিস?
রাত্রির মামা অন্দরমহল থেকে জিজ্ঞেস করেন।
রাত্রি এবার তাকায় জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে রাশেদের পানে।
-আমি সীমান্তের টিচার।
-ও
ফের বলে,
-সীমান্তের টিচার মামাজান।
-আচ্ছা তাকে বলে দাও ওরা নেই কাল আসতে বলো…।
-জ্বী মামাজান
রাশেদ এবার জানতে চায়,
-আমি কি জানতে পারি আপনার হাতটা কাঁটলো কি করে?
-ফল কাঁটতে গিয়ে কেঁটেছে….।
মাথা নীচু করে জবাব দেয় রাত্রি।

রাশেদ তার বুক পকেট থেকে কি যেন বের করে এগিয়ে দেয় রাত্রিকে।
রাত্রি অবাক,
-কি এটা?
-রুমাল,দেখুন কিছু মনে করবেননা এটি পুরোনো রুমাল নয় একেবারে নতুন আমার বোন আমার জন্য পাঠিয়েছে।
-কিন্তু আমাকে দিচ্ছেন কেন?
-আপনার হাত অনেকখানি কেঁটেছে।আপনি এটা দিয়ে পট্টি বাঁধুন তাড়াতাড়ি…।
-না না এর দরকার নেই।
-কি হলো রাত্রি? ভেতর থেকে আবারও মামা ডেকে ওঠেন।
রাশেদ দ্রুত প্রস্থান নেয় সেখান থেকে।
রাত্রি কিংকর্তব্যবিমূঢ়।
রুমালটা হাতে নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে সে।

শোবার ঘরে গিয়ে টেবিল ল্যাম্পের আলোয় রুমালটা খুলে দেখে।ততক্ষনে ঘা শুকিয়ে গেছে রাত্রির।  গজ, তুলা ঘরেই ছিল,সেভলন লাগিয়ে তাতে ব্যান্ডেজ করে নিয়েছে রাশেদ চলে যাবার পর পরই।
রুমালটার চারপাশে অনেকগুলো সবুজ পাতায় ভরাট করা,মাঝে লাল বৃত্ত আঁকা তার চারপাশে ছোট ছোট ফুল তোলা।

বৃত্তের মাঝখানে লেখা,”রাশেদ ভাইজান’।
রুমালটাকে দেখে মনে হচ্ছিল আপন স্বদেশ এর কোনো প্রতিকৃতি…, সবুজের বুকে সূর্য যেন তাই জানান দিচ্ছে!আর লাল বৃত্তের মাঝে রাশেদের নামটা হলুদ সুঁতোয় বোনা।
রাত্রির বেশ ভালো লাগে এমন কারুকার্য দেখে,
-মেয়েটার গুন আছে বলতে হয়!
রাশেদের বোন নিশ্চুই কত ভালোবাসা আর যত্ন নিয়ে রুমালে এই কাজগুলো বুনেছে আর উনি আমাকে এমন করে দিয়ে দিলেন রুমালটা?
কি অদ্ভুত জনাব রাশেদ…!

সীমান্তের বাসায় এসে বৈঠকখানায় বসে রাশেদ।
সীমান্তের ঘরটায় রঙ করা হচ্ছে।তার বাবা আশফাক আলম একজন চিফ জাস্টিস।
বাড়ীটা সেই সময় ঢাকায় অবস্থিত বেশ আলিশানও বটে।
বৈঠকখানায় আলিশান সোফা, উপরে সুসজ্জিত ঝাড়বাতি অন্দরমহলে প্রবেশ পথে শামুক ও নানা শুভ্র পাথরের লম্বা লম্বা সারি যা পর্দার মতো আবৃত করে রাখে। তবে ওখানেও সাদা রঙের পর্দা ঝোলানো দিনের বেলা সরিয়ে দেয়া হয় দুপাশ থেকে।
আর অতিথি আসলে পর্দাটা আবারও টানিয়ে দেয়া হয়।

পর্দার ফাঁকে রাশেদের দৃষ্টি ফের।
রাত্রির উপস্থিতি ঠিকই খুঁজে নেয় রাশেদ সেই রিনিঝিনি কাঁকনের ছন্দে।
বৈঠকখানার টেবিলে একটি বই দেখে রাশেদ।
শরৎচন্দ্র চট্টপাধ্যায়ের রচনা সমগ্র।
ভেতরে পৃষ্ঠা ওলটায়। তাতে কালজয়ী দেবদাস গল্পের কয়েকটা পাঁতা ওল্টানো।
-আচ্ছা শরৎ রচনাবলীও পড়া হয়?কার বই এটা সীমান্ত?
-বুবুর।
-মানে তোমার রাত্রি বুবুর?
-জ্বী স্যার।
-আচ্ছা তোমার বুবুকে একটা কথা বলে আসবে?

ভ্রুভঙ্গি করে তাকায় এবার সীমান্ত।মুঁচকী হেসে বলে,

-কি কথা?
-বলবে আমি এই বইটা নিতে চাই,কালই দিয়ে দিবো।
-কিন্তু বুবুর এটা অনেক পছন্দের বই স্যার বুবু কি রাজী হবে?
-আরে শোনো, বলবে দেবদাস গল্পটার শেষটুকু আমি পড়তে পারিনি।আজই পড়ে দিয়ে দিবো…।

সীমান্ত কথামতো রাত্রির কাছে যায়।
রাত্রি বলে,
-আমি তো কেবলই শুরু করলাম?এখন কি করে দিবো?
-বুবু, স্যার বলেছে কালকেই দিয়ে দিবেন।উনি
দেবদাস হবেন। মুচকী হাসি সীমান্তের।
-কি বল্লি?
-না মানে স্যার নাকি দেবদাস
মানে দেবদাস গল্পটা পুরোটা পড়েনি,আজ পড়ে একেবারে সাফা করে দেবেন।অনবরত বাঁদরামো ক্লাস ফাইভে পড়া সীমান্তের।
-তুই যে কি বলিস না!আচ্ছা কাল দিবে তো তোর স্যার।

-হুম বুবু তুমি নিশ্চিন্তে থাক,আমার স্যার এক কথার মানুষ কালই দিয়ে দিবেন তুমি ভেবোনা।
-ঠিক আছে,কাল মানে কালই কিন্তু আমি আর একমুহুর্ত দেরী মানবো না…।
-ঠিক আছে বলে দিবো।

সীমান্ত এবার তার স্যারের কাছে জানায়,

-স্যার পারমিশান গ্রেন্টেড তবে বুবু বলেছে আর এক মুহুর্ত দেরী করবেনা দেবদাসের জন্যে?
-কার জন্য?
-না মানে কালকের পর আর এক মুহুর্ত দেরী করবেনা
এই দেবদাস গল্পের জন্যে।
-হুম ঠিক আছে।
-ও স্যার একটা কথা।
-কি কথা?

রুমালটা আগিয়ে দেয় সীমান্ত।

-আপনি এটা রেখে গিয়েছিলেন।বুবু বল্ল আপনাকে দিয়ে দিতে।

-ও আচ্ছা ধন্যবাদ।কি যেন একটা জিজ্ঞেস করেও আর কিছু বলে না রাশেদ।হাতের আংগুলের কি অবস্থা খুব জানতে ইচ্ছে করে তার।কিন্তু সীমান্তের কাছে ধরা পড়ার কারনে আর কিছু বলে না রাশেদ।

তার দৃষ্টি পর্দা ফু্ঁড়ে,একটিবার কাউকে দেখার অপেক্ষায়…!

চলবে

হাসিনা সাঈদ মুক্তা কবি ও সাহিত্যিক।

২য় পর্বের লিংকঃ

রাত্রি নামে অমাবস্যা পর্ব-২ (একটি মুক্তিযুদ্ধের গল্প)

আরও পড়ুন