মুক্তি

খাদিজা ইয়াছমিন

সদ্য নির্মিত টিনের দোতালা ঘর, দুপুরের তীব্র রোদের মধ্যে দূর থেকে ঘরটিকে রুপার বাড়ী মনে হয়। গ্রামের নাম সৈয়দপুর, বাতেন হাজী সেই গ্রামের মাতব্বর এবং প্রতাপশালী সজ্জন লোক। বাতেন হাজী সখ করে টিনের দোতালা ঘর বানিয়েছেন। তার দুজন স্ত্রী ও এক ছেলে, ছেলের বউ এবং নাতি নাতনী মিলে তার সংসার।
বড় দু নাতিকে বিয়ে দিয়ে ঘরে নাত বউ এনেছেন এবং বড় নাতনীকেও বিয়ে দিয়েছেন পাশের গ্রামেই।

ফড়িং এর মত ঘুরে বেড়ায় মেয়েটি। মাথায় দুটো ঝুটি বেধে প্রাইমারি স্কুলে যায়। দাদা, বাবা এবং ভাইদের খুব আদরের । সবাই খুব ভালোবাসে তাকে। বাতেন হাজীর চোখের মনি, কলিজার টুকরা মরিয়ম। বয়স দশ বছর। বাতেন হাজী তার বাড়ীর ভিটাতেই মক্তব করে দিয়েছেন তার নাতি নাতনীরাসহ গ্রামের ছেলেমেয়ারা যাতে আরবি পড়ার সুযোগটা পায়।
মরিয়ম ফজরে উঠেই মায়ের সাথে নামাজ পড়ে সহপাঠিদের সাথে মক্তবে পড়তে যায়। স্নিগ্ধ সকালের মতই মরিয়েমের শৈশব কাটছিলো।

সময় চলে সময়ের মত, কেউ তাকে বাঁধতে পারে না। এই যে এত সুন্দর সময়ের মাঝেও কখনো কখনো অসময়ের পেঁচা ডেকে ওঠে।
শুরু হয় ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ। বাঙালিদের আত্মপরিচয় গঠনের সংগ্রাম। সারাদেশে চলছে যুদ্ধ, বাদ যায়নি মরিয়মদের গ্রামও। মিলিটারিরা টহল দেয়, খুঁজে বেড়ায় মুক্তিবাহিনীদের। কোথাও কাউকে সন্দেহ হলেই বন্ধুকের গুলিতে ঝাঝরা করে দেয় তার দেহ। সবার মধ্যে এক অজানা আতংক। বাতেন হাজীও তার পরিবার নিয়ে ভয়ে ভয়ে দিন কাটাতে থাকে ।

দিন দিন যুদ্ধের ভয়াবহতা বাড়তে থাকে। চারদিকে আতংক ছড়াতে থাকে দাবানলের মত। মিলিটারিদের টহলও বেড়ে গেছে। এখন তারা সন্দেহজনক বাড়ী বাড়ী ঢুকে খুঁজে বেড়ায় মুক্তি বাহীনিদের। এত আতংকের মাঝেও বাতেন হাজী তার টিনের দোতালায় মুক্তিবাহিনীদের আশ্রয় দিতে থাকে। মহিলারা সারাক্ষণ ভয়ে ভয়ে বাড়ীর ভেতরে থাকে, যখন মিলিটারিদের আনাগোনা কম থাকে তখন মরিয়ম খেলতে বের হয়। মরিয়মদের বাড়ি মুক্তিবাহিনীর ভালো আশ্রয়কেন্দের পরিণত হয়। রাইফেল, স্টেনগানসহ যুদ্ধের বিভিন্ন সরঞ্জামাদি ওদের বাড়ীতে রাখা হয়। কিন্তু যখন দূর্ভাগ্য একদৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে তখন মানুষের কিছু করার থাকে না। মিলিটারিরা খবর পেয়ে যায় বাতেন হাজীর বাড়ীতে মুক্তিবাহিনী আছে। তারা হানা দেয় মরিয়মদের বাড়ীতে, মরিয়মরা অন্যগ্রামে পালিয়ে যায়। মুক্তিবাহিনীর সাথে মিলিটারিদের গোলাগুলি হয়, আর ক্ষত বিক্ষত হতে থাকে রুপালি টিনের দোতালা। সে ক্ষতের চিহ্ন আজও বিদ্যমান তখনকার সেই রুপালি বাড়ি আজও আছে তার স্মৃতি নিয়ে প্রবীণদের মত।

কিছুদিন পরেই মরিয়মরা ওদের বাড়ীতে ফিরে আসে। দেখতে পায় এত সখের রুপালি টিনের দোতালার করুণ দশা। কি আর করা সব মেনে নিতে হয়।
কিন্তু এখন মিলিটারিদের আনাগোনা বেড়েছে মরিয়মের বড় বোনের শশুরবাড়ীর গ্রামে। ওদিকে চলতে থাকে অত্যাচার। যুদ্ধ প্রায় শেষের দিকে। এহেন সময়ে ঘটে এক বিপত্তি।
পুকুরে ভেসে উঠে এক বিভৎস লাশ, এক চোয়ালে গুলি লেগে অপর চোয়াল দিয়ে মাংশ বের হয়ে গেছে, সারা দেহে অনেক আঘাত এবং শরীর পঁচে ফুলে উঠেছে। লাশের সারা দেহে শামুক বাসা বেধেছে নিশ্চিন্তে। চেহারা এতটাই বিকৃত হয়ে গেছে চেনার উপায় নাই।
শুনতে শুনতে জানা গেলো মৃত ব্যক্তি আর কেউ নয় মরিয়েমের ‘তালই’ মহিউদ্দিন সাহেব, ওর বড় বোনের শশুর। দশ বার জন মিলিটারি ওনার বাড়িতে হামলা করলে উনি একাই ফালা নিয়ে বের হন, মিলিটারিদের মোকাবেলা করতে এবং শহীদ হন। সবাই দেখতে যাচ্ছে, ছোট মানুষ কৌতুহল দমাতে না পেরে মরিয়মও দেখতে যায়।

মৃতের পাশে মানুষ থাকতে ভয় পায়, আর বিকৃত লাশ দেখে বড়রা ভয় পাবে স্বাভাবিক। ছোট্ট মরিয়ম লাশের ভয়াবহ চেহারা দেখেই ভয়ে চিৎকার দিয়ে পড়ে যায়, জ্ঞান হারায়। মরিয়মকে বাড়ীতে নিয়ে আসা হয়। শারিরীকভাবে সুস্থ হলেও মরিয়মের মন থেকে ভয়টা যায় না। একা একা ঘরে থাকতে পারে না। মাঝে মাঝেই চিৎকার দিয়ে পড়ে যায়, এলোমেলো কথা বলতে থাকে, কিছু সময় নিথর হয়ে পড়ে থাকে, তারপর ঠিক হয়ে যায়। ওর এসব কিছুই মনে থাকে না। ১৫-২০ মিনিট ও নিজের জগত ছেড়ে অন্য কোন জগতে চলে যায়, যেটা ও মনে রাখতে পারেনা।এভাবেই চলতে থাকে মরিয়মের জীবন।

যুদ্ধ শেষ! বিজয়ের আনন্দ সর্বত্র বিরাজমান। ‘বাংলাদেশ’ নামক একটি শিশু রাষ্ট্রের যাত্রা শুরু। কিন্তু যুদ্ধের পরে পরই মরিয়মদের বাসায় দু দুবার ডাকাত পড়ে এবং বেচারির ভয় আরো জেকে বসে। এবং কিছুদিন পর পর তার ভয়াসুখটা হতে থাকে। তবু সে স্কুলে যায়, খেলাধূলা করে, এদিক ওদিক ফড়িং এর মত ঘুরে বেড়ায়। বাড়ির সবাই তাকে আগলে রাখে কারন ওর ভয়াসুখটা কখন কোথায় হবে মরিয়ম নিজেও বোঝেনা অন্যরাও বোঝেনা। একদম হঠাৎ করেই হয়। সেজন্য কেউই ওকে চোখের আড়াল করেনা।

গ্রামের মেয়েদের খুব দ্রুতই বিয়ে দিয়ে দেয়। মরিয়ম প্রাইমারির গন্ডি পেরুতেই তার বিয়ে হয়ে গেলো। কিন্তু তার ভয়টা গেলোনা, মাঝে মাঝেই চিৎকার করে পড়ে যায়। এসবের মধ্যেও জীবন থেমে থাকেনা, সূর্য্যও আলো দেয়, চাঁদও জোছনা বিলিয়ে যায়। মরিয়মও তার জীবনকে পূর্ণ করতে মাতৃত্বের স্বাদ নেয়। দেখতে দেখতে এখন তার ৭জন সন্তান। এবং সেই ছোট থেকে এখন পর্যন্ত অনেক অনেক চিকিৎসার পরে মরিয়ম এখন আল্লাহর রহমতে একদম সুস্থ।

লেখকঃ কবি ও সাহিত্যিক

 

আরও পড়ুন